• ২৪ অক্টোবর ২০১৯ ২০:২৬:১৮
  • ২৪ অক্টোবর ২০১৯ ২০:২৬:১৮
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

কুড়িগ্রাম এক্সপ্রেস: যা পেলাম, যা পেলাম না

কুড়িগ্রাম এক্সপ্রেস। ছবি : সংগৃহীত


আশরাফ রাসেল :


‘১৮৭০ এর দশকে এই রেল লাইন (কুড়িগ্রাম-ধরলা) সংলগ্ন অঞ্চলে প্রায়ই দুর্ভিক্ষ লেগে থাকত। দুর্ভিক্ষের প্রকোপ বৃদ্ধি পাওয়ায় বাংলা প্রাদেশিক সরকার নিজস্ব তহবিল থেকে এই অঞ্চলে একটি ন্যারোগেজ লাইন নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেয়। নির্মাণ কাজ শেষে এর নামকরণ হয় কাউনিয়া-ধরলা রেলওয়ে। লাইনটি কাউনিয়া থেকে তিস্তা নদীর পাড় পর্যন্ত এবং তিস্তা নদীর পূর্বপাড় থেকে মোগলহাট হয়ে কুড়িগ্রাম পর্যন্ত বিস্তৃত।’

‘তিস্তা জংশন থেকে অন্য একটি শাখা লাইন কুড়িগ্রাম হয়ে চিলমারী বন্দর পর্যন্ত সম্প্রসারিত হয়। যার দূরত্ব ৩৪.৫০ মাইল। পরবর্তীতে ১৯২৮ সালের জুলাই মাসে ন্যারোগজে লাইনটিকে মিটারগেজে উন্নিত করা হয়।’ (পূর্ব বাংলার রেলওয়ে: ১৮৬২-১৯৪৭: দিনাক সোহানী কবির)

রেল সংযোগে সে সময় এ অঞ্চলের দুর্ভিক্ষ মোকাবিলা বহুলাংশে সহজ হয়। এবং সেই সাথে এ অঞ্চলের অর্থনৈতিক উন্নয়নের দ্বারও উন্মোচিত হয়। অন্য এক বর্ণনায় সোহানী কবির লিখেছেন, ‘একদিকে যেমন বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠান প্রসার লাভ করে রংপুর এবং এর আশপাশ শিল্পাঞ্চলে পরিণত হয় তেমনি রেল স্টেশনকে কেন্দ্র করে রেলভিত্তিক শহর, মিল ও ব্যবসায়িক এলাকা গড়ে উঠে।’ মোটকথা রেল সংযোগের ফলে কুড়িগ্রাম তথা রংপুর অঞ্চল অনেকটা চনমনে হয়ে উঠে।

১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে এ অঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থাার ক্ষয়ক্ষতির পরও রেলই ছিল যোগাযোগের একমাত্র সুলভ এবং সহজতর মাধ্যম। রেলের আবির্ভাবে একদিকে যেমন জনসংখ্যা বৃদ্ধি পায় অন্যদিকে এ জনসংখ্যার ভার বাহক হিসেবে রেলকে সময়োপযুগি করার প্রয়োজন হলেও কর্তৃপক্ষের কাছে তা সমভাবে গুরুত্ব পায়নি। এমনকি যে ৪টি মেইল ট্রেন ঐতিহাসিক চিলমারী বন্দর পর্যন্ত চলাচল করতো তাও ৯০ এর দশকে বন্ধ করে দেয়া হয়। তাছাড়া এরপর এ অঞ্চলে রেলপথে তেমন গুরুত্বসহকারে কোনো সংস্কারও করা হয়নি।

অতঃপর ২০০৯ সালে গণকমিটি এবং জনগণ চলমান রমনা মেইলের সাথে (চিলমারী-পার্বতীপুর) আরো ১টি ট্রেনের দাবি করলে ঐ ট্রেনটি দিনে ২ বার (চিলামারী-তিস্তা) চলাচল করে। যার গতি এবং ব্যবস্থাাপনা অত্যন্ত নিম্নমানের। ফলত: জনগণ ও গণকমিটি ঢাকা-চিলামারী ১টি আন্তঃনগর এবং ২টি মেইল ট্রেনের দাবি জানালে ২০১৫ সালের ১৫ অক্টোবর তৎকালীন এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রী কুড়িগ্রামের জনসভায় গণকমিটির ব্যানারে অর্থনৈতিক অঞ্চল, বিশ্ববিদ্যালয় স্থাাপন ও অন্যান্য দাবির সাথে আন্তঃনগর এক্সপ্রেসের দাবি মেনে ২২ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ পরীক্ষামূলক ৪৫টি সিট বরাদ্দ সাপেক্ষ ‘রংপুর এক্সপ্রেসে’র সাথে ‘কুড়িগ্রাম-লালমনি’ নামে ১টি শাটল সংযোগ দেন এবং যার চূড়ান্ত রুপ প্রকাশ পায় ২০১৯ সালের ১৬ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রীর ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে ‘কুড়িগ্রাম এক্সপ্রেসে’র উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে।

কুড়িগ্রামের গণমানুষ এতদিনের আকাঙ্খা পূরণে আপ্লুত ধন্যবাদ জানিয়েছে প্রধানমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট সকলকে এবং বিশেষ করে গণকমিটির ত্যাগী কর্মীদেরকে। কথাগুলো এখানেই শেষ হবার কথা, কিন্তু তা হলো না। কুড়িগ্রামবাসী ‘কুড়িগ্রাম এক্সপ্রেস’ পেয়েছে ঠিকই, বাস্তবে কিছুই পায়নি নামমাত্র পাওয়া ছাড়া। ‘কুড়িগ্রাম এক্সপ্রেস’ ট্রেনটির সাথে কুড়িগ্রামকে যেন নতুনভাবে জানা গেল। জন্মের আগেই আন্দোলনে এ ট্রেনটিকে গণকমিটি ‘ভাওয়াইয়া এক্সপ্রেস’ নামে বিভিন্ন টেলিভিশন ও সংবাদপত্রে প্রচার করে আসছিলো কিন্তু শুধু নামের খাতিরেই ট্রেনটির নাম ‘ভাওয়াইয়া এক্সপ্রেস’ নয় বরং রংপুরের দারিদ্রপীড়িত এ জেলাকে তার ঐতিহ্য বাংলাদেশ এমনকি বিশ্বদরবারে পরিচয় দেবার যে পরিচয় পেত তা হয়ে উঠলো না।

‘আমরা যা তাই আমাদের সংস্কতি’ ম্যাকাইভারের এ পরিচয় দেবার সূত্র-শক্তি প্রতিষ্ঠিত করতে পারত কুড়িগ্রামবাসী। সেই সাথে মফিজবোধক লজ্জাজনক সম্বোধন আর শুনতে হত না। কেননা এই গানের পরিচয়ই বঙ্গবন্ধু ‘অসমাপ্ত আত্নজীবনী’তে ভাওয়াইয়া সম্রাট আব্বাস উদ্দিন আহমদকে স্মরণীয় করে রেখেছেন। সুতরাং কুড়িগ্রামবাসী পেত নিজের পরিচয় দেবার একটি পরিচয় এবং সে পরিচয় থেকে শক্তি ও সাহস নিয়ে অর্থনৈতিক মুক্তি ও সমৃদ্ধি অর্জন। অধ্যাপক র‌্যাগনার বলেছেন,‘ এ কান্ট্রি ইজ পুওর বিকজ ইটস পিপল আর পুওর।’ কুড়িগ্রামবাসী যে ঐতিহ্যগতভাবে দারিদ্য নয় তা প্রমাণে পুনবার ব্যর্থ হল। কুড়িগ্রামবাসীর এ সাংস্কৃতিক দৈন্যতাতে সমাজবিজ্ঞান ব্যক্তিগত পর্যায়ে দারিদ্র বলে সংজ্ঞায়িত করেছে।

২. ১৬ অক্টোবর ‘কুড়িগ্রাম এক্সপ্রেস’ উদ্বোধনীর দিনটি ছিল কুড়িগ্রামবাসীর ঈদের দিন। কিন্তু এ আনন্দ কতটুকু অর্থবহ তা জানা নাই। গণমানুষের চাওয়া ঢাকা-চিলমারী হলেও লাইনের অনুপযোগিতার দরুণ আপাতত এ ট্রেনটি চলবে কুড়িগ্রাম-ঢাকা রুটে। লাইনের এ বেহাল দশা কবে নাগাদ উপযোগী হবে তার কোন বলবৎ আশ্বাসও পাওয়া যায়নি। এমতাবস্থাায় কুড়িগ্রামের নামে এবং কুড়িগ্রামের জন্য বরাদ্দকৃত ট্রেনটি ঢাকার উদ্দেশ্যে কুড়িগ্রাম ছাড়বে সকাল ৭.২০ এ যা কুড়িগ্রামবাসীর জন্য ভোগান্তির। কুড়িগ্রাম থেকে উলিপুরে দূরত্ব ১৯ কি.মি এবং চিলামারী ২৮ কি.মি হলেও ‘কুড়িগ্রাম রেলওয়ে স্টেশন’ ব্যতিত কোন স্টপেজ নাই, যা উৎপত্তিস্থাল। অন্যদিকে কুড়িগ্রাম রেলওয়ে স্টেশন আসন বরাদ্দ পেয়েছে সর্বমোট ১৪৯টি আর রংপুরের ২টি স্টপেজ রংপুর ও বদরগঞ্জ পেয়েছে মোট ২৩০টি আসন। পক্ষান্তরে শাটল সংযোগ ‘রংপুর এক্সপ্রেসে’ বরাদ্দকৃত ৪৫টি আসন কর্তন করে ১৯টি করা হয়েছে। কুড়িগ্রাম প্রায় ৫ লক্ষাধিক লোক বাইরে থাকে এবং প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১২০০ লোক যাতায়াত করে যার জন্য বরাদ্দকৃত এ আসন পর্যাপ্ত নয়। এ কারণে যাত্রী সাধারন ও কুড়িগ্রামবাসী দুঃখ প্রকাশ করে প্রতিবাদ জানিয়েছে। সুতরাং নিশ্চয়ই সন্দেহের অবকাশ থাকে যে ‘কুড়িগ্রাম এক্সপ্রেস’ গণমানুষের প্রত্যাশিত আন্তঃনগর কি না?

৩. কুড়িগ্রামের অন্যতম বড় বাণিজ্যিক অঞ্চল সোনাহাট স্থালবন্দরের যোগাযাগের একমাত্র ভরসা সোনাহাট রেলসেতু যা ১৮৭৯ সালে তৎকালীন নর্দান বেঙ্গল রেলওয়ে কর্তৃক নির্মিত হয় এবং মুক্তিযুদ্ধর সময় ভারতীয় সেনাবাহিনী এ অঞ্চলকে পাকবাহিনী থেকে রক্ষা করতে ২টি স্লিপার অকেজো করে দেয়। পরে এটি স্থাানীয়ভাবে কোনরকম মেরামত করে চলাচল করা হলেও এটির মেয়াদোত্তীর্ণ হয়েছে ৩০ বছর আগে। আন্তঃনগর চালুর সাথে কুড়িগ্রামের রেল সেবা বঞ্চিত ভূরুঙ্গামারী ও নাগেশ্বরী উপজেলা ২টিকে রেল সুবিধার আওতায় আনার দাবি জানিয়েছিল গণকমিটিও কুড়িপ্রামবাসী। কেননা, ঝুঁকিপূর্ণ এ রেলসেতুটি সংস্কার করা হলে স্থালবন্দরের কার্যক্রম ও বাণিজ্যিক সফলতা গতিময় হবে। যা কুড়িগ্রামের অর্থনীতির মাত্রাকে আরো একধাপ বাড়িয়ে দিবে বলে জনমানুষ বিশ্বাস করে।

ড.সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী লিখেছেন, ‘জীবনে যে ব্যক্তি স্বপ্নের মতো সমৃদ্ধ তার পক্ষে স্বপ্ন না দেখলেও চলে; কিন্তু যে ব্যক্তি দরিদ্র স্বপ্ন না থাকলে তার জীবন থাকে না।’ কুড়িগ্রামবাসী তাই স্বপ্ন দেখে সমৃদ্ধ হবার জন্য। অর্থনৈতিক ও সামাজিক লাঞ্ছনা থেকে মুক্তির জন্য। কুড়িগ্রাম যে মাদক রুটে পরিণত হয়েছে তা যেন কুড়িগ্রাম এক্সপ্রেস দ্বারা প্রভাবিত না হয় এবং কুড়িগ্রাম এক্সপ্রেসের চলমান সকল বৈষম্য ও জড়তা দূর হয় এমন প্রত্যাশায় কুড়িগ্রামবাসী স্বপ্ন দেখে ‘কুড়িগ্রাম এক্সপ্রেস’ কুড়িগ্রামের গণমানুষের এক্সপ্রেস হবে। কুড়িগ্রামবাসীর স্বপ্নকে সমৃদ্ধ করবে।

লেখা পাঠিয়েছেন উলিপুর, কুড়িগ্রাম থেকে

বিজ্ঞাপন

সংশ্লিষ্ট বিষয়

কুড়িগ্রাম এক্সপ্রেস

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0239 seconds.