• ১৭ অক্টোবর ২০১৯ ১৩:৪১:০৭
  • ১৭ অক্টোবর ২০১৯ ১৫:০২:১৭
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

ছাত্র রাজনীতি বন্ধ নয় বরং সঠিক রাজনীতিতে অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে

ছবি : বাংলা


ইমরান হাবিব রুমন :


আমরা হয়তো অনেকেই জানি না, বুয়েট পরিচালিত হয় স্বৈরাচার আইয়ুব সরকার প্রণীত ১৯৬১ সালের অধ্যাদেশ অনুযায়ি, যা ৬১-র কালাকানুন নামে পরিচিত। দেশ স্বাধীন হলেও পাকিস্তানি প্রেতাত্বা এখনো বুয়েটের কাঁধে ভর করে আছে। তৎকালিন পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতা আন্দোলনের সুতিকাগার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্র আন্দোলন দমনের জন্য এই অধ্যাদেশ জারি করে।

এই অধ্যাদেশে ছাত্র-শিক্ষক রাজনীতি তো দূরের কথা মিছিল-মিটিং-সমাবেশের উপরও নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। কিন্তু সচেতন ছাত্র সমাজ এই কালাকানুনগুলোকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ৬২-র শিক্ষা আন্দোলন, ৬৯-এর গণ অভুত্থান, ৭১ এর মুক্তিযুদ্ধসহ স্বাধীনতা পরবর্তী সকল সামরিক-বেসামরিক স্বৈরাচার, সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী গণআন্দোলনে সক্রিয়ভাবে যুক্ত থেকেছে। দেশ স্বাধীন হলেও ৪৯ বছরে বুয়েটের এই কালাকানুনগুলো বহাল রয়েছে।

বন্দুকের নলের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসা স্বৈরাচার এরশাদের পতনের দাবিতে ছাত্র আন্দোলন যখন তুঙ্গে তখন ১৯৮৬ সালের ১২ নভেম্বর তথাকথিত গণতন্ত্র দিবসে স্বৈরাচার এরশাদ ঘোষণা করলেন, ছাত্রদের রাজনীতি করতে দেয়া হবে না। এরশাদের এই ঘোষণার কারণ, ৮২ সালে সামরিক শাসন জারির পর জনগণের গণতান্ত্রিক আশা-আকাংখাকে ধারণ করে প্রথম প্রতিবাদী উচ্চারণ ও প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল ছাত্ররা। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী শাসনামলে রাষ্ট্রপতি শাহবুদ্দিন আহমেদ সরকারবিরোধী তৎপরতা বন্ধের অংশ হিসেবে ‘ছাত্ররাজনীতি আপাতত বন্ধ রাখার কথা বলেন’। ২০০৭ সালে পরোক্ষ সেনা শাসনামলে ২০ আগস্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সেনা সদস্য কর্তৃক বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ছাত্র নির্যাতনের পর সারাদেশে ছাত্রদের নেতৃত্বে যে বিক্ষোভের ঝড় ওঠে তখন ছাত্র রাজনীতি বন্ধের সুপারিশ করা হয়।

২০০২ সালে বুয়েটে টেন্ডার দখলকে কেন্দ্র করে  ছাত্রদলের দুই গ্রুপের গোলাগুলিতে বুয়েটের কেমিকৌশল বিভাগের ২/১ এর ছাত্রী সাবেকুন নাহার সনি নিহত হয়। এর প্রতিবাদে সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টসহ প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠনগুলোর নেতৃত্বে যখন হত্যাকারীদের বিচারের দাবিতে দূর্বার আন্দোলন গড়ে ওঠে সেই আন্দোলন দমন করে ছাত্রদলের সন্ত্রাসীদের রক্ষা করার জন্য তখনও বুয়েটে ছাত্র রাজনীতি বন্ধের নীলনক্সা করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, কিছু সুশীল ব্যক্তি এবং চিহ্নিত গণমাধ্যম এ অপতৎপরতা চালায়। তখন সনির বাবা স্পষ্ট বলেছিলেন, ‌‌'আমার মেয়ে খুন হয়েছে নষ্ট রাজনীতির জন্য, সন্ত্রাসের জন্য যদি বন্ধ করতে হয় তাহলে এই সন্ত্রাস আর নষ্ট রাজনীতি বন্ধ করেন, ছাত্ররাজনীতি নয়।'

এবারও বুয়েটে আবরার হত্যার পর বুয়েটসহ সারাদেশে ছাত্র রাজনীতি বন্ধের অপচেষ্টা চলছে। এমনকি বুয়েট এ্যালামনাই এসোসিয়েশনের কিছু সিনিয়রকে বলতে শুনলাম এই পরিস্থিতির জন্য নাকি ছাত্র রাজনীতি দায়ী। অবাক বিষ্ময়ে লক্ষ্য করলাম উনারা দীর্ঘদিন থেকে বুয়েট ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগের সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে বা যে রাজনীতি যে পরিবেশ বুয়েটে চান্স পাওয়া মেধাবি শিক্ষার্থীদের খুনি বানালো সেটা নিয়েও অবস্থানটা স্পষ্ট করলেন না। আবার অনেকে তাদের সময় ছাত্ররাজনীতি ছিল না তবে ছাত্রদের অধিকারের পক্ষে, দেশের সংকটে আন্দোলন-সংগ্রাম করেছেন বলে ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে সত্যটা আড়াল করতে চাইলেন। প্রকৃত সত্য হচ্ছে, বুয়েটে সেসময় আদর্শভিত্তিক বামপন্থি ছাত্র সংগঠনগুলোর কার্যক্রম ছিল যারা সবসময়ই ছাত্রদের অধিকারের পক্ষে এবং দেশের যে কোন সংকটে লড়াই সংগ্রাম করতো।

বুয়েটের ছাত্র রাজনীতির ইতিহাস হলো এই ক্যাম্পাদের ছাত্ররা সবসময়ই যৌক্তিক আন্দোলনে এবং ছাত্রদের অধিকারের পক্ষে দাঁড়িয়েছে। ফলে ছাত্র সংসদ নির্বাচনেও সবসময়ই বামপন্থি সংগঠনগুলো ভাল করতো। আপরদিকে ছাত্রদল-ছাত্রলীগ সবসময়ই টেন্ডারবাজী-চাঁদাবাজী-নির্যাতন-খুনের সাথে যুক্ত থেকেছে। আমরাও বুয়েটে পড়ার সময় ছাত্র বেতন-ফি, ভর্তি ফরমের মূল্য, ভর্তি ফি বৃদ্ধির বিরুদ্ধে সফল আন্দোলন করেছি। তেল-গ্যাসসহ জাতীয় সম্পদ রক্ষার আন্দোলনে বুয়েট অন্যান্য সকল বিশ্ববিদ্যালয়ের মতোই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে, বুয়েট ছাত্ররা কৃষক-শ্রমিকসহ দেশের সাধারণ মানুষের অধিকার আদায়ে কথা বলেছে।

একটা ঘটনা জানলেই বিষয়টি অনেক স্পষ্ট হবে, ২০০৪ সালে বুয়েট ছাত্রদলের নেতা বকশিবাজারে চাঁদাবাজী করতে গিয়ে গণধোলাই খেয়ে গ্রেফতার হলো। একই সময়ে বুয়েটের ভর্তি ফরমের মূল্য ২০০ টাকা থেকে বৃদ্ধি করে ৫০০/৭০০ টাকা করার প্রতিবাদে আন্দোলন করতে গিয়ে বুয়েটের ৩ জন ছাত্রীসহ আমরা মোট ২৬ জন সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট নেতাকর্মী গ্রেফতার হলাম। বুয়েট ছাত্রের চাঁদাবাজীর ঘটনায় সারাদেশের মানুষের মধ্যে ছিঃ ছিঃ রব উঠেছিল। আর অযৌক্তিক ফি বৃদ্ধির প্রতিবাদে আমাদের গ্রেফতার হওয়ার ঘটনায় মানুষ আশায় বুক বেধেছিল যে বুয়েটের ছাত্ররা শুধু নিজেদের ক্যারিয়ারের কথা ভাবে না, সাধারণ মানুষের কথা চিন্তা করে আন্দোলন করে বুয়েটের ছাত্র-ছাত্রীরা জেলে পর্যন্ত যায়। ২০০৩ সালে ভারতে গ্যাস রপ্তানীর বিরুদ্ধে ঢাকা-বিবিয়ানা লং মার্চে বুয়েটের অর্ধশতাধিক ছাত্রের অংশগ্রহণ দেশবাসির নজর কাড়ে। এরকম শত উদাহরণ দেয়া যাবে।

তাহলে সন্ত্রাসকে সন্ত্রাস না বলে, সন্ত্রাসী সংগঠনকে নিষিদ্ধ ও বয়কটের কথা না বলে, ভালো শক্তির উত্থান ঘটিয়ে খারাপ শক্তিকে পরাস্ত করার কথা না বলে, যে প্রশাসন এদের মদদদাতা তাদেরকে আইনের আওতায় আনার কথা না বলে, ৬১’র কালো অধ্যাদেশ বাতিল করে স্বায়ত্তশাসনের কথা না বলে, দলীয় বিবেচনায় ভিসিসহ প্রশাসনিক নিয়োগ বন্ধের কথা না বলে, যে দূর্বিত্তায়িত-অধঃপতিত রাজনীতি এই মেধাবী ছাত্রদের খুনি বানালো সেই অধঃপতিত বুর্জোয়া রাজনীতি বন্ধ করে; দেশপ্রেমের রাজনীতি, মানুষেরে অধিকার আদায়ের রাজনীতি, উন্নত রুচি সংস্কৃতি-মনুষত্ব-বিবেকের রাজনীতির উত্থান ঘটানোর কথা না বলে ঢালাওভাবে ছাত্ররাজনীতির উপর দোষারোপ করে রাজনীতি বন্ধ করার কথা বলা মানে ছাত্রদল-ছাত্রলীগের সন্ত্রাসী-দুর্বৃত্তায়িত রাজনীতিকে আড়াল করে প্রতিবাদের ভাষা এবং এই সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে সংগঠিত প্রতিবাদকে দূর্বল করে এই অপশক্তিকে কিছুদিন পর আবারও পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা।

একটু খেয়াল করে দেখা দরকার যেসব ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ তাদের পরিস্থিতি কি? গোপালগঞ্জ বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনা আমরা সবাই জানি। হেন কোন অপকর্ম নেই যেটা এই ক্যাম্পসে হতো না। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে লাইব্রেরিতে ছাত্রী নির্যাতনের মতো ঘটনা ঘটেছে, ফি বৃদ্ধি, শিক্ষক নিয়োগে অনিয়ম-দুর্নীতির কথা অজানা নয়। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রশাসনের স্বৈরতন্ত্র আছে, কথায় কথায় নামে-বেনামে ফি বৃদ্ধি আছে, আছে জঙ্গি তৈরির কারখানা শুধু নেই গণতান্ত্রিক অধিকার নেই প্রতিবাদের কণ্ঠ।

তাই সকলের বিবেকের কাছে একটা প্রশ্ন রাখতে চাই, যদি একজন ছাত্র তার সমস্যা ও সংকটের সাথে অন্য ছাত্রটির জীবনের সমস্যা ও সংকটের মিল খুজে পেয়ে যখন একই সরলরেখায় দাঁড়িয়ে তা থেকে মুক্তি পাবার আশায় যৌথ বা সংঘবদ্ধভাবে প্রচেষ্টা করে, সমস্যার মূল উৎস খোঁজার চেষ্টা করে এবং সমস্যাগুলো দেশের আর্থ সামাজিক, রাজনৈতিক ব্যবস্থার সাথে যুক্ত হয়ে আছে সেটা দেখে এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট বক্তব্য হাজির ও একটি লক্ষ্য অর্জনের জন্য জনমত সংগ্রহের চেষ্টা করে, তখন কি সে অন্যায় করে...?

যদি এটা অন্যায় হয় তবে তো আবরার ফাহাদের খুনের বিচার চাওয়ার নৈতিক অধিকার আমাদের নেই। কারণ আবরার তো তার লেখার মধ্যে দিয়ে তার যুক্তি তুলে ধরেছে, তার মতামত ব্যক্ত করেছে। এই যুক্তিকে ভয় পেয়ে, মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে ভয় পেয়ে যারা আবরার ফাহাদকে পিটিয়ে পিটিয়ে হত্যা করলো, কিছু তথাকথিত সুশীলগণেরা বা বুয়েট প্রশাসন বা কিছু শিক্ষার্থী যারা বুঝে হোক না বুঝে হোক সেই মত প্রকাশের স্বাধীনতা আর অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগঠিত হওয়ার অধিকারের বিরুদ্ধেই দাবি তুলছে আসুন, কালোকে কালো সাদাকে সাদা, সত্যকে সত্য আর মিথ্যাকে মিথ্যা বলার সাহস অর্জন করি। সকল অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের শক্তিকে জাগ্রত করি। আসুন অন্তত এতটুকু বুঝি যে, রাজনীতির মানে সন্ত্রাস-দখলদারিত্ব-নির্যাতন-মাদক-টেন্ডারবাজী-চাঁদাবাজী-খুন-নৈতিকস্খলন না। রাজনীতি মানে দেশপ্রেম, রাজনীতি মানে সামাজিক দায়বদ্ধতা, অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের শক্তি।

আমরা যারা যুক্তি এবং বিজ্ঞান মানি তারা জানি সবকিছুতেই দুইটা বিপরীত সত্ত্বা থাকে। ভালো-মন্দ, ন্যায়-অন্যায়, সত্য-মিথ্যা, সুন্দর-কুৎসিত, প্রগতিশীল-প্রতিক্রিয়াশীল ইত্যাদি। আমরা কি ন্যায়-অন্যায়, ভাল-মন্দ, সত্য-মিথ্যা, সুন্দর-অসুন্দর সবই পরিত্যাগ করবো, নাকি অন্যায়-মিথ্যা-খারাপ-কুৎসিতকে পরিত্যাগ করে ন্যায়-ভাল-সত্য ও সুন্দরের পক্ষে দাঁড়াবো?

আবরার হত্যাকাণ্ডে আমাদের ব্যথিত করেছে সবাইকে কিন্তু বেদনা যেন সত্যকে আড়াল না করে। বুয়েটসহ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যদি ছাত্ররা রাজনীতি সচেতন হয়ে সংগঠিত হতো তাহলে কি নির্বিবাদে র‌্যাগিং, গেষ্টরুম নির্যাতন, টেন্ডারবাজী, চাঁদাবাজী, হত্যা, মাদক সেবন চলতে পারতো! শিক্ষা অর্জনের পাশাপাশি যদি বিতর্ক, বিজ্ঞান চর্চা, সাহিত্য-সাংস্কৃতি চর্চা, খেলাধুলা করার পরিবেশ থাকতো তাহলে কি মেধাবী ছাত্ররা সন্ত্রাসীতে পরিণত হতে পারতো! যৌবনের সাহস একটা বড় সম্পদ। সেই সম্পদ যদি দেশের কৃষক-শ্রমিকের পক্ষে, সম্পদ তেল-গ্যাস, বিদ্যুৎ-পানি, বন লুণ্ঠনের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হতো তাহলে দেশের মানুষের সামনে মেধাবী ছাত্ররা নতুন ভরসাস্থল হয়ে দাঁড়াতো। রাজনীতি করো না, ক্যারিয়ার গড়ে তোল- এই দীক্ষা ছাত্রদেরকে কোথায় নিয়ে যাবে? ব্যক্তিগত ক্যারিয়ারের জন্য বিদেশ যাওয়া, দেশে থাকলে দুর্নীতি করা, ক্ষমতাশীলদের লাঠিয়াল হওয়ার যে প্রবণতা তার হাত থেকে কিভাবে বাঁচবে আমাদের মেধাবী ছাত্ররা? ফলে রাজনীতিহীন, জনগণের প্রতি দায়িত্বহীন ছাত্র-যুবক নয় বরং অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী ছাত্র আজ দরকার। তাই ছাত্রদেরকে রাজনীতি বিমুখ নয় বরং রাজনীতি সচেতন করাই আজ সময়ের দাবি।

লেখক: সাবেক শিক্ষার্থী, বুয়েট (ব্যাচ ৯৮) ও সাবেক সভাপতি সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট।

বিজ্ঞাপন

সংশ্লিষ্ট বিষয়

ছাত্র রাজনীতি বুয়েট

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0194 seconds.