• ১৫ অক্টোবর ২০১৯ ১৭:১৪:৫৯
  • ১৫ অক্টোবর ২০১৯ ১৭:১৪:৫৯
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

ভিন্নমত অসহনীয় মানুষ, ‘ক্যানিবাল’ সমাজ ও ‘বন্ধু’ ছাটাইয়ের নোটিশ

ছবি : সংগৃহীত


কাকন রেজা :


অনেকে সামাজিকমাধ্যমে কদিন পরপর ছাটাইয়ের ঘোষণা দেন। ভিন্নমত পোষণকারী সংযুক্তদের বাদ দেয়ার আনুষ্ঠানিক নোটিশ বলতে পারেন। নোটিশে বলা হয়, ‘অমুক’ মত-পথের হবার কারণে তাকে বাদ দেয়া হলো। অথচ এরাই আবার নিজের মত প্রকাশের সময় অন্যকে অগ্রহণীয়-অশ্লীল আক্রমন করেন। যুক্তির বিপরীতে যুক্তি দাঁড় করানোটা একটা শিল্প এটা বোঝার ক্ষমতা নেই এসব ‘নোটিশ’ প্রদানকারীদের।

গালি হলো অক্ষমতার বিকল্প। যুক্তি যেখানে পরাজিত গালাগালি সেখানে শুরু। যারা যুক্তির পক্ষে, তাদের ক্রোধটা সামলাতে হয়। ছাটাইয়ের নোটিশ নয় বরং তাদের অগ্রহণযোগ্যতা-অশ্লীলতা থেকে নিজেকে গ্রহণযোগ্য করার যুক্তিটা বেশি আহরণ করা সম্ভব। সামাজিকমাধ্যমে সংযুক্ত এমনসব মানুষকে বরং আপনি আর্শীবাদ ভেবে নিন। যারা আপনার যথার্থতা প্রমান করার জন্যই মাধ্যমগুলোতে অবস্থান করে।

ধরে নিন আপনার, আমার নিজের সাথেও সংযুক্ত রয়েছেন এমন কয়েকজন। এদের মধ্যে একজন বাংলাদেশি হয়েও মোদি বা ইমরান খানের ভয়াবহ রকম ভক্ত। তার সব কথা-কর্মেই তিনি ভালো খুঁজে পান। তার এমন ‘সবেতে ভালো পাওয়া’টার সাথে আমাদের অনেকের মত হয়তো মিলে না। না মিললেও ব্যক্তিগত ভাবে তার যুক্তিগুলো খুঁটিয়ে দেখুন, বের করার চেষ্টা করুন অসঙ্গতি-অসারতা। বুঝতে চেষ্টা করুন তার মানসিক অবস্থান, আবেগিক জায়গাগুলো। কেন তিনি এমনটা বলছেন, তার পেছনের কারণগুলো কী। ক্ষুদ্র হলেও দেশের একটি অংশের অবস্থান অনেকটা এমনই। আর তিনি সেই অংশেইর প্রতিভূ। সুতরাং তার অবস্থানগত চিন্তাটাকে এড়িয়ে যাওয়ার কোন উপায় নেই বরং তাকে বোঝা ও বোঝানোর প্রয়োজন রয়েছে। আর এজন্যেই ভিন্নমত জানাটা দরকারি।

নিজ স্বার্থ, অবস্থান তথা রাষ্ট্রিক চিন্তা থেকে বের হয়েও কেন এমন ব্যতিক্রমি হয়ে উঠা সেটা বোঝার মানসেই এমন চিন্তার উপস্থাপনা। আর একে আমাদের সামাজিক চিন্তার সাথে রাষ্ট্রিয় চিন্তার সমন্বয় এবং প্রতিবেশিদের সাথে সম্পর্কের খুটিনাটি উপলব্ধির একটা রাস্তা খোঁজার সম্ভাবনাময় প্রচেষ্টা বলতে পারেন। রাষ্ট্র বলছে সর্বোচ্চ ভালো সম্পর্কের কথা, বিপরীতে বেশিরভাগ মানুষের চিন্তা এবং সেই ক্ষুদ্র অংশের ভাবনার সমন্বয় করাটা নেহাতই জরুরি।

আবরার ফাহাদ হত্যাকান্ড এমন জরুরি ভাবনা থেকে কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এই ঘটনা একটা মেসেজ। হতে পারে সেটা সীমাবদ্ধতা নির্ধারণের নোটিশ, বার্তা। সুতরাং একে ছোট করে দেখার কিছু নেই। আমরা মূলত চোখে যা পড়ে তাই দেখি, দৃষ্টির বাইরে চিন্তাটাকে প্রসারিত করা অনেকের পক্ষেই সম্ভব হয়ে উঠে না।

আবরারের শারীরিক মৃত্যুটাই কি সব? এর বাইরে কি কিছু নেই? কেন আবরারকে মেরে ফেলা হলো এই প্রশ্নটা আবরারের শারীরিক মৃত্যুর চেয়ে অনেক বেশি সঙ্গত।  

মানুষের পরিচিতি তার চিন্তায়। একজন মানুষের গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠা তার চিন্তার কারণেই। দৃশ্যমানতা চিন্তার খোরাক জোগায়। চোখে দেখার সাথে চিন্তার সমন্বয় না ঘটলে সেই দৃশ্যমানতাও মানুষকে বিভ্রান্ত করতে পারে। সমুদ্র তীরে প্লাস্টিক বর্জ্য কুড়িয়ে মানুষকে সচেতন করাটা কৌশল। এমন ধরণের কৌশল অনেকেই প্রয়োগ করেন। হিটলার আর আইয়ুব খানরাও করেছিলেন। কিন্তু এই প্রায়োগিক ব্যাপারটার সততা নির্ধারণ করে দৃশ্যের সাথে চিন্তার সমন্বয়।

প্লাস্টিকের বর্জ্য রাখার জন্য যখন নিষিদ্ধ পলিথিনের থলে ব্যবহার করা হয়, তখন সেই দৃশ্যমানতায় সততা থাকে না, শুধু ’উদ্দেশ্য’ থাকে। থাকে নিয়ম ভেঙে নিয়ম শেখানোর জবরদস্তি চেষ্টা। যে চেষ্টা অনেকটা ’ভয় দেখিয়ে জয় করা’ ধরণের। কাউকে ভালোবেসে জয় করার চেয়ে ভয় দেখিয়ে জয় করার এমন চেষ্টাটা বোকামি। আমাদের দেশের মানুষ ভালোবাসাকামী। তারা খনা’র বচণের মতন একগুন ভালোবাসাকে শ’গুনে ফেরত দিতে পারে। তবে এর বিপরীতে ‘মেরেছো কলসির কানা তাই বলে কি প্রেম দেব না’ এমন চিন্তা নিজের পায়ে কুড়াল মারারই শামিল।

যাক গে, ধান ভানতে শিবের গীত থাক। বলছিলাম সামাজিকমাধ্যমে ‘বন্ধু’ ছাটাই নোটিশ নিয়ে। একজনকে দেখলাম নোটিশ দিয়েছেন, আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ডে যিনি নিশ্চুপ, তিনি আমার বন্ধু তালিকায় থাকার যোগ্য নয়- অনেকটা এমন বলে। তার প্রোফাইলে গেলাম, দেখলাম, আবরারের খুনে অভিযুক্ত অনিককে কয়েদিরা পিটিয়েছে তাতে উল্লসিত তিনি। আশাহত হলাম। অভিযোগকারী আর অভিযুক্তের মধ্যে তবে পার্থক্য রইলো কোথায়! আমরাতো অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছি, অন্যায়কে রুখে দেয়ার জন্যেই। যদি অন্যায়ের প্রতিকার অন্যায় দিয়েই করতে চাই, তবে ন্যায়ভিত্তিক সমাজের আশাতো দূরাশা। এই যে ‘একই অঙ্গে এত রূপ’, তা মূলত অন্যায়কারীদের জাস্টিফাইয়ের সুযোগ করে দেয়। অথচ দুঃখের বিষয় এমন ‘ডবল স্ট্যান্ডার্ড’ মূলত আমাদের ‘স্ট্যান্ডার্ড’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আবরারের মৃত্যুকে জাস্টিফাই করতে আরেক মৃত্যুকে টেনে আনা এমনই ‘ডবল স্ট্যান্ডার্ড’। এটা প্রমান করে দেশের একটা শ্রেণির প্রতিক্রিয়া হয় মানুষ দেখে নয়, পরিচিতি দেখে। সেই পরিচিতি হতে পারে রাজনৈতিক, ধর্মীয় বা গোষ্ঠীগত।

এই যে পরিচিতিগত প্রতিক্রিয়া, এর পরিণতিই আমাদের শৃংখলা ভেঙে পড়া বর্তমান সমাজ। যেখানে শৃংখলা থাকে না, যেখানে মৃত্যু স্বাভাবিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। সে সমাজে আবরারের বাবা-মা বা আমাদের আহাজারির সামগ্রিক মূল্য থাকে না। আবেগ থিতু হয়ে আসলে, আহাজারির প্রতিক্রিয়াও মিইয়ে যায়। মিলিয়ে নিয়েন, আবরারের মৃত্যুতে বাঘ বনে যাওয়া মানুষের অনেকেই কদিন পরে বিড়াল হয়ে ঘরে ফিরবেন। আদরে আহ্লাদে নিজ সন্তানের সাথে খুনসুটি করবেন। ভুলে যাবেন আবরারকে। ভুলে যাবেন, মৃত্যু তার সন্তানটির পেছনেও ঘুরছে, সুযোগ পেলেই ছোঁ মারবে যে কোন উছিলায়।

আমাদের এই ভুলে যাবার প্রক্রিয়াতেই দিনে-দিনে গড়ে উঠেছে একটি ‘ক্যানিবাল’ সমাজ। যে সমাজে মৃত্যুর জন্য প্রয়োজন শুধু একটি উছিলার। যে সমাজে দানব হয়ে উঠা নরভোজীরা উপলক্ষ খোঁজে মানুষ সংহারে। আরেক দল সেই মৃত্যুকে ঘিরে প্রতিবাদের নামে করে ক্ষণস্থায়ী ‘উৎসব’। আর সেই ‘উৎসবে’র মাতম ভাঙলে আবার সব স্বাভাবিক।

জানি অনেকে রাগ করবেন, করুন আপত্তি নেই। তবে দূর অতিত নয়, অতদূর কষ্ট করার প্রয়োজন নেই, সাম্প্রতিক সময়গুলো দিকে চোখ ফেরান। একটি মৃত্যুকে ঘিরে কদিন গলাবাজি চলেছে তারপর সব চুপচাপ। এক খাদিজা নিয়ে এত গলাবাজি হলো কদিন ধরে, কিন্তু তারপর? খাদিজাদের মিছিল কি থেমেছে? থামেনি। বরং একের পর এক ঘটনায় মরে বেঁচেছে অনেক খাদিজা। নুসরাতের পর কি আর কোনো কিশোরী মারা যায়নি? গিয়েছে। হয়েছে কিছু? হয়নি।

কেন হয়নি, এমন প্রশ্নের উত্তরে বলি, প্রতিবাদ যখন ‘উৎসব’ হয়, তখন ‘গলাবাজি’ বিষয়টা হয় অনেকটা ফানুসের মতন। যতক্ষণ জ্বলে ততক্ষণই দৃশ্যমান, তারপর ফুরুৎ। ‘কন্টিনিউটি’ না থাকায় পরবর্তী দৃশ্যগুলো নষ্ট হয়। যেমন ‘ফলোআপ’ না থাকায় গুরুত্বপূর্ণ কোনো খবরও হারিয়ে যায়, অনেকটা তেমনি।

মূলত ‘কন্টিনিউটি’ বিহীন প্রতিবাদ আর ‘ফলোআপ’ ছাড়া খবর দুটোই সামগ্রিক চিন্তায় অর্থহীন।

লেখক : কলাম লেখক ও সাংবাদিক।

বিজ্ঞাপন

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0208 seconds.