• ১৩ অক্টোবর ২০১৯ ১২:৩৬:১৩
  • ১৩ অক্টোবর ২০১৯ ১২:৩৬:৫৭
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

সারা দেশ নির্বিকার ভঙ্গিতে নীরব

ছবি : সংগৃহীত


আরিফুল ইসলাম অনিক :


সারা দেশ এক নির্বিকার ভঙ্গিতে নীরব। কেবল গুটিকয়েক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্র হিসাবে অধিকার পাওয়ার আর শ্রমিক অধ্যুষিত এলাকায় কিছু রুজি রুটির দাবি আদায়ের আন্দোলন বাদে। এর মাঝেই চলছে সরকারের প্রচার করা উৎসবের বিশাল পয়সা খরচ করা উন্নয়নের ঢাক।

অথচ সে ঢাকের তীব্র শব্দ আরো নীরব করে ফেলছে দেশের জনগণের স্ফতঃস্ফূর্ত মুখরতাকে। যেখানে রাষ্ট্রীয় সম্পদ জনগণের জন্য খরচ করতে গেলে জনগণের হওয়ার কথা ছিলো আনন্দে উদ্বেলিত সেখানে জনগণ কেমন যেন নির্বিকার, আশাবাদী হওয়ার কোন লক্ষণ ও তার মাঝে নাই। 'দেশের উন্নতি' কিংবা 'উন্নয়নের মহাসড়কে' উঠেও করুণ বৈরাগ্যের সুর।

এই রকম সময়ে বুয়েটের শিক্ষার্থী আবরার হত্যা। সারা দেশ যখন মর্মাহত তখনই চট্টগ্রামে খুন হওয়া আরেক শিক্ষার্থী আবিদের হত্যা মামলা নিয়ে দীর্ঘদিন পর আদালতের ঘোষণা এই সব হত্যাকাণ্ডকে জায়েজ করার  সুযোগ সৃষ্টি করে দিলো। কথা হলো দুইটা হত্যাই আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মী দ্বারা সংগঠিত। সেই জন্য আদালত নীরব আর সহানুভূতিশীল আচরণ করছে আসামীদের পক্ষে এই নির্মম সত্যটাই আরো নগ্নভাবে প্রকাশ পেয়েছে, লোকমনে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। যদিও আবিদ ও এই একই সংগঠনের ছিলো।

আদালতের দীর্ঘসূত্রিতা আর একটা বিষয়কে জনগণের চোখের আড়ালে নিয়ে অস্বচ্ছ ভাবে বিচার করার এই প্রবণতা প্রতিনিয়ত জনগণকে আদালত বিমুখ করে ফেলছে। আদালতের সিদ্ধান্তের উপর আস্থা হারিয়েছে প্রায় সকল শ্রেণি পেশার মানুষ। সাবেক  প্রধান বিচারপতি থেকে শুরু করে একেবারে গরীব শ্রমিকও বিচার বিভাগের প্রতি প্রায় কাছাকাছি দৃষ্টি পোষণ করছে। সবচে হতাশার বিষয় এই যে এই দৃষ্টি অবিশ্বাসের আর সুষ্ঠু বিচার না পাওয়ার। অন্যদিকে কিছু বিচার একেবারে দৃশ্যমান এবং আদালতের প্রক্রিয়ার বাইরে। একের পর এক নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে হত্যা এবং সে হত্যাকে বৈধ করছে বন্দুকযুদ্ধ নামে। অথচ বেসামরিক লোকজনের হাতে এই অবৈধ অস্ত্রের বিপুল সরবরাহ কোথা থেকে আসে এই নিয়ে প্রশাসনের বক্তব্য অস্বচ্ছ এবং এসব নিয়ে খুব জোরদার কোনো কর্মসূচি নাই। এখানেও ধোঁয়াটে জগত।

আবার, রাজপথে আন্দোলনের মাধ্যমে দাবি দাওয়া আদায় করার পথটিতেও হিমালয় সম প্রতিবন্ধকতা। বার বার পুলিশী বাধার পরে  দীর্ঘদিন আন্দোলন করলে দায়িত্বপ্রাপ্তদের কিছুটা ঘুম ভাঙ্গে। এই কুম্ভকর্ণের ঘুম ভাঙ্গালেও সে ঘুম পুনরায় পুরো ব্যবস্থা জুড়ে নামতে একটুও  বিলম্ব হয় না। নিদ্রাভঙ্গের মাঝখানে কেবল কিছুটা আলাভোলা স্বরে ছেলেভুলানো ছড়ায়  বলে ফেলেন উচ্চ মহল জানে সব, সেথায় সব কলরব। সেই উচ্চ মহল টা যে কোথায় কোন আসমানে বিরাজ করে তাও উনারা জানেন না। কী আর করা, ক্লান্ত, হতাশ মানুষগুলো পুনরায় ঘরে ফিরে যায়। এই রকম পরিস্থিতি যেখানে আন্দোলন হয় সেখানে। আর অন্য ক্ষেত্রগুলোতে দায়িত্বপ্রাপ্তরা হয় ঘুমন্ত  নয় ব্যক্তিগত, গোষ্ঠীগত উন্নয়নের কাছে নিজেদেরকে সমর্পণ করে দিব্যি আছেন।

এই যখন অবস্থা তখন দেশের সর্বোচ্চ উচ্চ  মহল থেকে দেশের স্বার্থ বিরোধী নানা চুক্তি হয়। সেসব চুক্তির কিছু জানা যায় আর কিছু জনগণের সামনেই আসে না। যেসব জানা যায় তাও অস্পষ্ট, অস্বচ্ছ। জনগণও ভবিতব্য এমনই ভেবে নিরাশ।

অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক,বৈচারিক তিন ক্ষেত্রেই এইসব পরিস্থিতি যখন বিরাজ করে, জনগণ তখন নিরাশ হয়ে ক্ষমতার সাথে জড়িত সরকার কে বিদায় করতে চায়। কিন্তু এখানে এই পথটাও বন্ধ। কে সরকার পরিচালনা করবে এই বিষয়ে জনগণের মতামত দেয়ার যে গণতান্ত্রিক অধিকার তাও নাই। বাংলাদেশের মানুষ নির্বাচনের মতো নির্বাচন দেখে না বহু বহু বছর। যার ফলে একটা নির্বাচন হীন দেশ দেখে বড় হচ্ছে একটা প্রজন্ম। এই প্রজন্ম এই স্বৈরাচারী শিক্ষা লালন করলে আগামী আরো  দুয়েকটা প্রজন্ম এই চূড়ান্ত পতন মুখী ব্যবস্থা থেকে বের হওয়ার কোন সুযোগ পাবে না একথা ইতিহাসের সাথে সম্পর্কিত।

আবার,এই রকম ক্রান্তিকালে দেশের বুদ্ধীজীবী সমাজ, সুধীজনের উপরও হারিয়েছে জনগণের আস্থা। কে দেবে আশা, কে দেবে ভরসা/ কিংবা চাচা আপন প্রাণ বাঁচা- নীতিতে হাঁটছে এখানকার বিরাট বেকার এবং হতাশ তরুণ সমাজ। যার ফলেই উন্নয়নের ঢাকের গণ বিদারী আওয়াজ চললেও পুরোটা জনপদ মৃত্যুপুরীর রূপটিকেই বার বার ধারণ করতে চায়।

এই অবস্থা থেকে উত্তরণের লক্ষে মাঝে মাঝে এই হতাশ তরুণদেরই একটা অংশ কিছুটা দুঃসাহসে জাতিকে উপহার দিতে চায় নতুন কিছু। কিন্তু এই ব্যবস্থার সবচে ভয়ংকর দিক শক্তিশালী দমন বিভাগ শক্ত হাতে নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে এদের সাথে সর্বোচ্চ নির্লজ্জ আচরণটুকুই করে। এই নির্লজ্জ আচরণের শেষ কোথায়?  রক্তের তোড়ে নাকি প্রশাসনিক সদিচ্ছায়?

এই অনাগত ভবিষ্যতের দিকে তাকালেই আমাদের চোখে টিয়ার গ্যাস। খোলা চোখে সামনের দিকে তাকাবো কবে? প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক কর্তাব্যক্তিরা  দয়া করে বলুন নির্মোহ জায়গা থেকে একবার বলুন কোথায়  আমাদের ও দেশের ভবিষ্যত।

লেখক : সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় সংসদ।

(প্রকাশিত লেখার মতামত লেখকের সম্পূর্ণ নিজের)

বিজ্ঞাপন

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0184 seconds.