• ০৭ অক্টোবর ২০১৯ ১৪:১৪:৫৮
  • ০৭ অক্টোবর ২০১৯ ১৪:১৪:৫৮
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

কেন ছেলেটাকে পিটিয়ে মারলো ওরা?

ছবি : সংগৃহীত


আমিনুল ইসলাম


ছেলেটাকে পিটিয়ে মেরে ফেলা হয়েছে।

বুয়েটে পড়তো ছেলেটা। যেই হলে থাকতো, সেই হলে’ই তাকে পিটিয়ে মেরে ফেলা হলো।

এই খবর পড়ে কেন যেন নিজের মায়ের কথা মনে হচ্ছে। ডাক্তার'রা যখন ঘোষণা করল- ওকে স্কুলে পাঠিয়ে লাভ নেই। আপনারা ওকে বাসায় রেখে’ই পড়ান।

আমার মা সেদিন থেকে পরিবার আর সমাজের সঙ্গে যুদ্ধ করে আমাকে স্কুলে নিয়ে গিয়েছেন, পড়াশুনা শিখিয়েছেন। আমি নিজ চোখে দেখেছি কতোটা কষ্ট আমার মা’কে করতে হয়েছে।

আমার মা’র তেমন কোন চাওয়া ছিল না। তিনি স্রেফ দেখতে চেয়েছিলেন- তার সন্তান অন্য আর কারো উপর নির্ভরশীল না হয়ে নিজের পায়ে দাঁড়াবে।

আমি যেদিন পড়াশোনা শেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে চাকরি পাই; আমার মা’র সেকি আনন্দ। আমার আজও মনে আছে সেই দৃশ্য।

মা মানুষজন’কে গিয়ে বলছে- সবাই আমার যেই ছেলেটা’কে অবহেলা করেছে; বাতিলের খাতায় ফেলে দিয়েছিল, সে-ছেলে’ই এখন নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে গিয়েছে।

আমি পরিষ্কার বুঝতে পারছিলাম মায়ের শরীরী ভাষা। বুঝতে পারছিলাম- এ এক যুদ্ধ জয়ের আনন্দ। যেন তিনি সত্যি সত্যি কোন এক যুদ্ধ জয় করেছেন মাত্র’ই।

আবরার ফাহাদ নামের বুয়েটের যেই ছেলেটাকে আজ রাতে পিটিয়ে মেরে ফেলা হয়েছে; সে ইলেকট্রিক্যালে পড়ছিল। কুষ্টিয়ায় বাড়ি ছিল তার। কাল রাতে’ই কুষ্টিয়া থেকে ঢাকায় ফিরেছিল নিজ হলে।

যেই হল হয়ত তার সেকেন্ড হোম ছিল। সেই হলে’ই তাকে পিটিয়ে মেরে ফেলা হলো। তাকে ডেকে অন্য একটা রুমে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। নিয়ে গিয়েছে ওই হলের’ই অন্য কিছু ছাত্র।

ছেলেটার অপরাধ কি?

সে সরকারের নানান চুক্তি এবং ভূমিকা নিয়ে সমালোচনা মূলক কয়েকটা পোস্ট লিখেছিল তার ফেসবুকে।

ব্যাস! হয়ে গেলো তাকে ‘শিবির’ বানিয়ে মেরে ফেলার ফিরিস্তি! পিটিয়ে মেরে ফেলা হলো তাকে। এই কাজটি করেছে আর কেউ না, বুয়েটের’ই ওই হলে থাকা অন্য কিছু ছাত্র!

কেন’ই বা করবে না? এদের শিক্ষকরাও তো এই শিক্ষা’ই দিয়ে বেড়াচ্ছে।

এক ছাত্রী স্রেফ প্রশ্ন করেছিল - ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ কি?’

এই জন্য তাকে বাপ-মা তুলে গালি দিয়েছে তার শিক্ষক। শেষ পর্যন্ত তাকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে’ই বহিষ্কার করা হয়েছে।

আপনি বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন শিক্ষককে নিয়ে সমালোচনা করুন, দেখবেন ওই শিক্ষকরা আপনাকে নানা সব ট্যাগ দিয়ে বসবে। পারলে নিজেদের পোষা গুণ্ডা বাহিনী দিয়ে পেটাবে। নইলে পরীক্ষায় ফেল করিয়ে দেবে!

এর সব-ই বাস্তব। যেই দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা এমন কাজ করে, সেই দেশের ছাত্র’রা এই সব শিখবে, এটা’ই স্বাভাবিক!

আমি জানি না ছেলেটার রাজনৈতিক আদর্শ কি ছিল। ছেলেটা যেই রাজনৈতিক আদর্শের’ই হোক; তাই বলে কি তাকে শারীরিকভাবে আঘাত করা যায়? কোন সভ্য সমাজে কি এটা চলতে পারে?

অথচ কতো সহজে’ই না ডেকে নিয়ে ছেলেটাকে পিটিয়ে মেরে ফেলা হলো।

ভাবছিলাম ছেলেটার মায়ের কথা। এই মা নিশ্চয় সন্তানকে বুয়েটে পড়ানোর জন্য সেই ছোট বেলা থেকে’ই কঠিন পরিশ্রম করেছেন। প্রতিটা মা’কেই এই সমাজে যুদ্ধ করতে হয়। এই মা নিশ্চয় কঠিন এই যুদ্ধটা চালিয়ে যাচ্ছিলেন

স্রেফ ছেলেটার মুখের দিকে তাকিয়ে। ছেলেটা একদিন ইঞ্জিনিয়ার হবে। নিজের পায়ে দাঁড়াবে।

হলো না আর। হতে দিল না এই সমাজ আর সমাজের হিংস্র মানুষগুলো।

এই জনপদে ভিন্নমত থাকতে নেই। এতো কিছুর পরও যারা মতামত দেয়; তাদের পিটিয়ে মেরা ফেলা হয়।

আপনি হয়ত ভাবছেন- সমস্যা কি! আমি তো নিরাপদ। এই জন্য হয়ত চুপচাপ কিছু না বলে নিরাপদে আছেন।
নিশ্চিত জেনে রাখুন আপনার এই মৌনতা’ই একদিন আপনার বিপদ ডেকে আনবে। সেই বিপদ থেকে উদ্ধার করার কোন মানুষ আপনি তখন খুঁজে পাবেন না। কারণ, আপনি অন্যের বিপদে চুপ ছিলেন। ভেবেছিলেন- আমি তো নিরাপদ।

প্রতিবাদ করুন। সোচ্চার হন। কিছু যদি না পারেন, তাহলে লিখে প্রতিবাদ করুন। সেটাও যদি না পারেন, তাহলে আমার মতো যারা লিখছে, তাদের লেখা অন্যদের সঙ্গে ভাগাভাগি করুন।

নইলে একদিন আপনার মা’কে জীবন যুদ্ধে পরাজিত হতে হবে ঠিক আবরারের মায়ের মতো। কিংবা আপনি যদি মা হয়ে থাকেন; চোখের সামনে নিজ সন্তানকে মেরে ফেলার দৃশ্যও দেখতে হতে পারে স্রেফ একটা ফেসবুক স্ট্যাটাসের কারণে!

লেখক : বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক

এসএ/

 

বিজ্ঞাপন

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0182 seconds.