• ০২ অক্টোবর ২০১৯ ১৭:৪৩:০১
  • ০২ অক্টোবর ২০১৯ ২০:৫৮:৩৩
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

'ইরানে হামলার জন্য ট্রাম্পকে প্রলুব্ধ করেছে ইসরায়েল-সৌদি আরব'

অধ্যাপক ড. মো. আব্দুল মান্নান। ছবি : বাংলা

মধ্যপ্রাচ্যে আইএস ঝড় প্রায় থেমে গেলেও ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীর সাথে সৌদি আরব, লেবালনের হিজ্জবুল্লাহর সাথে ইসরায়েলের সংঘর্ষের মাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে আবারো নতুন করে উত্তেজনা তৈরী হয়েছে। চলমান উত্তেজনার মাঝেই সম্প্রতি ইরানের সাথে পুনরায় আলোচনায় বসার ইচ্ছা প্রকাশ করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল ট্রাম্প। কিন্তু পুরোপুরি নিষেধাজ্ঞা না তুলে নিলে ট্রাম্পের সাথে কোন রকম আলোচনায় বসবে না বলে জানায় ইরান।

আমেরিকার ইরান তথা মধ্যপ্রাচ্য নীতি এবং অঞ্চলটির চলমান পরিস্থিতিসহ নানা বিষয় নিয়ে খোলামেলা কথা বলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আব্দুল মান্নান। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন বাংলা’র নিজস্ব প্রতিবেদক নূর সুমন

বাংলা: আমেরিকা বা দেশটির বর্তমান প্রসিডেন্ট ডোনাল ট্রাম্পের মধ্যপ্রাচ্য তথা ইরান নীতিকে আপনি কিভাবে দেখছেন?  

আব্দুল মান্নান : আমেরিকার বর্তমান মধ্যপ্রাচ্য নীতি ইসরায়েল, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত দ্বারা প্রভাবিত। সেই অর্থে, এরাই ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ইস্যুতে ট্রাম্প প্রশাসনের ইরান নীতিকে প্রভাবিত করে আসছে। এখানে তাদের অর্থাৎ ইসরায়েল, সৌদি আরব, সৌদি মিত্র সংযুক্ত আরব আমিরাত, এবং আমেরিকার স্বার্থ অভিন্ন, আর তা হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যে একটি আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে ইরানের সম্ভাব্য উত্থানকে রোধ করা। তাদের দৃষ্টিতে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির উদ্দেশ্য হচ্ছে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরী করা, যার ফলাফল হবে মধ্যপ্রাচ্যে একটি আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে ইরানের আবির্ভাব। এই ভীতির সঙ্গে যেটা যোগ হয়েছে, সেটা হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের ক্রমবর্ধমান প্রভাব, যেটা সিরিয়াতে, ইরাকে এবং ইয়েমেনে অনেকটা দৃশ্যমান। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, তথাকথিত ইরান হুমকিকে কিভাবে তারা মোকাবেলা করবে। এই প্রশ্নে ট্রাম্প প্রশাসন এবং মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার আঞ্চলিক তিন মিত্রের মধ্যে মতপার্থক্য আছে। আঞ্চলিক তিন মিত্র ট্রাম্প প্রশাসনকে অনতিবিলম্বে ইরানে সামরিক হামলার জন্য প্রলুব্ধ করে আসছে। অন্যদিকে ট্রাম্প প্রশাসন যদিও সামরিক অপশন খোলা রাখছেন, তাদের অগ্রাধিকার অপশন হচ্ছে ইরানের উপর সর্বাত্মক নিষেধাজ্ঞা আরোপের মাধ্যমে 'maximum pressure ' বা 'সর্বোচ্চ চাপ' প্রয়োগ করে ইরানকে তার ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধিকরণ শূন্যতে নামিয়ে আনতে বাধ্য করা।

বাংলা: সম্প্রতি সৌদি আরবের তেলক্ষেত্রে ড্রোন হামলা হলো। ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা হামলার দায় স্বীকার করলেও সৌদি আরব ও আমেরিকা ইরানকে দায়ী করছেন। এই বিষয়টাকে আপনি কিভাবে দেখছেন?

আব্দুল মান্নান : সৌদি আরবের তেলক্ষেত্রে যে হামলাটা হলো, সেটাতে ইরান তার সংশ্লিষ্টতা অস্বীকার করে আসছে। অন্যদিকে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা, যারা সৌদিদের দ্বারা বারবার আক্রান্ত হচ্ছে, তারা এই হামলার দায় স্বীকার করেছে। এটা সবাই জানে যে ইয়েমেন যুদ্ধে ইরান হুতীদেরকে সৌদি আরব এবং সৌদি সমর্থিত ইয়েমেন সরকারের বিরুদ্ধে প্রক্সি হিসেবে ব্যবহার করছে। প্রক্সি যুদ্ধের সুবিধা হলো, এর মাধ্যমে রাষ্ট্র ব্যয়বহুল সরাসরি যুদ্ধ এড়িয়ে যেতে পারে, শত্রুর বিরুদ্ধে অঘোষিত যুদ্ধের দায়দায়িত্ব অস্বীকার করতে পারে এবং শত্রু রাষ্ট্রকে একটি প্রলম্বিত যুদ্ধে বাধ্য করার মাধমে শত্রুর শক্তি ক্ষয় করতে পারে। ইয়েমেনে ইরান এটাই করছে। সৌদি তেলক্ষেত্রে যে মাত্রার হামলা হয়েছে এবং হামলায় যে সমস্ত অস্ত্র ব্যবহৃত হয়েছে, হুতির মতো কোনো অ-রাষ্ট্রীয় সংগঠনের পক্ষে ওই রকম হামলা করা কিংবা ওই রকম অস্ত্র ব্যবহার করা অসম্ভব, যদি না তারা কোনো রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা পেয়ে থাকে।

আবার এমনতো হতে পারে যে সৌদিরা নিজেরাই এটা করেছে, যার উদ্দেশ্য হতে পারে এর দায়দায়িত্ব ইরানের উপর চাপিয়ে দিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনকে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক হামলায় প্রলুব্ধ করা। এইরকম সম্ভাবনাকে নিছক ষড়যন্ত্র তত্ত্ব হিসেবে উড়িয়ে দেয়াটা ভুল হবে। এরকম ঘটনা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে হয়ে থাকে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, আফ্রিকার যেই দেশগুলোতে নিকট অতীতে গৃহযুদ্ধ হয়েছে কিংবা এখন হচ্ছে, সেইগুলোতো শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর ইন্ধন ছিল বা আছে। একটা দেশে গৃহযুদ্ধ হবে, সেখানে জাতিসংঘের শান্তি মিশন যাবে। আড়ালে শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো তাদের সম্পদ লুট করবে।

এই উদাহরণ দেয়ার অর্থ হলো সৌদিরা হয়তো নিজেরাই নিজস্ব তেলক্ষেত্রে হামলা করেছে যাতে করে আমেরিকাকে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে প্রলুব্ধ করা যায়। হুতিরা হয়তো হামলার দায় নিয়ে কৃতিত্ব নেয়ার চেষ্টা করেছে।

বাংলা: সৌদি আরব যদি সত্যিই এমন আহ্বান জানায় ট্রাম্প কি তাতে সাড়া দিয়ে ইরানে হামলা করবে?

আব্দুল মান্নান : আগেই বলেছি, সৌদি আরব এবং অন্য দুই শক্তি ইসরাইল এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত অনতিবিলম্বে ইরানে সামরিক হামলার জন্য ট্রাম্প প্রশাসনকে প্রলুব্ধ করেই আসছে। ট্রাম্প প্রশাসন সামরিক অপশন ওপেন রেখেই সর্বাত্মক অবরোধ আরোপ করে ইরানের উপর সর্বোচ্চ চাপ প্রয়োগ নীতিতে বিশ্বাসী, অর্থাৎ ট্রাম্প চাইছেন যুদ্ধ এড়াতে। এটাতো এখন আর গোপন নয় যে জুন মাসে যখন ইরান হরমুজ প্রণালীতে আমেরিকার ড্রোন ভূপাতিত করলো, তখন ট্রাম্প প্রতিশোধ হিসেবে ইরানে হামলার জন্য সবুজ সংকেত দিয়েছিলেন কিন্তু শেষ মুহূর্তে ট্রাম্প তার সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেন। সৌদি তেলক্ষেত্রে যখন হামলা হলো তখন সৌদি আরব এবং আমেরিকা উভয়েই ইরানকে দায়ী করলো। দৃশ্যত সৌদিরা ইরানের উপর তাৎক্ষণিক হালার জন্য ট্রাম্প প্রশাসনের উপর চাপ তৈরী করেছিল। কিন্তু প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প স্পষ্ট করে দিয়েছেন, আমেরিকা এখনই ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে জড়াবে না।

মজার ব্যাপার হলো, ট্রাম্প তার জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জন বোল্টনকে বরখাস্ত করেছেন। ট্রাম্প বলেছেন, বোল্টন এতই hawkish (যুদ্ধবাজ) যে পারলে এখনই সে ইরানে বোমা ফেলবে। দেখা যাচ্ছে যে ট্রাম্প নিজেই একজন hawkish হয়েও ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ এড়ানোর পক্ষপাতী। এখন প্রশ্ন হলো, ট্রাম্প কেন ইরানের উপর সামরিক হামলাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন না?

মার্কিন নীতি হলো তারা তখনই যুদ্ধ করবে, যখন তারা সরাসরি আক্রান্ত হবে। আমরা এই শতকের শুরুতে ৯/১১ ঘটনা এবং তার ফলশ্রূতিতে আমেরিকার 'সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ' দেখেছি, কারণ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি আক্রান্ত হয়েছিল। এর অংশ হিসেবে তারা আফগানিস্তান আক্রমণ করে আল কায়েদাকে বিতাড়ন করেছে এবং আল কায়েদার আশ্রয়দাতা আফগান তালেবান সরকারকে ক্ষমতা থেকে উচ্ছেদ করেছে। এরপর প্রেসিডেন্ট জুনিয়র বুশ 'ইরাক আমেরিকার জন্য অত্যন্ত হুমকি'-এই তত্ত্ব দাঁড় করিয়ে আমেরিকার জনসমর্থন আদায় করে ইরাকে হামলা করেছে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে দেখা গেলো বুশের এই তত্ত্ব মিথ্যা ছিল। যার ফলশ্রূতিতে মার্কিন জনগণ যুদ্ধের প্রতি বীতশ্রদ্ধ  হয়ে পড়ে। এই অতীত অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায় মার্কিন জনগণ যুদ্ধ চায় না, যতক্ষণ না তাদের দেশ সরাসরি আক্রান্ত হয়।

এখান থেকে বুঝা যায়, ট্রাম্প কেন ইরানের সঙ্গে এখনই যুদ্ধকে অগ্রাধিকার অপশন হিসেবে বিবেচনা করছেন না। জুন মাসে যখন ইরান মার্কিন ড্রোন ভূপাতিত করলো, তখন জনগণ ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ চায় কিনা- এ প্রশ্নে এক মতামত জরিপে দেখা যায় যে ৫৭% মার্কিন জনগণ ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ চায় না যদিনা তাদের দেশ সরাসরি আক্রান্ত হয়। ইরানের বিরুদ্ধে সৌদি তেলক্ষেত্রে হামলার যেই অভিযোগ, সেখানে আমেরিকা সরাসরি আক্রান্ত হয়নি। তাছাড়া, ট্রাম্প একজন ব্যবসায়ী। যখন তিনি কোন বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেন তখন একজন ব্যবসায়ীর মতই লাভ-ক্ষতি হিসাব করেন। যেমন তার 'আমেরিকা ফার্স্ট' মতবাদ। এর তাৎপর্য হলো সৌদির স্বার্থে ট্রাম্প আমেরিকাকে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে জড়াবেন না। আবার সামনের বছর ২০২০ সালে আমেরিকায় প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। ট্রাম্প হয়তো ভাবছেন, জনমতের বিরুদ্ধে গিয়ে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ জড়ানো তার প্রেসিডেন্ট প্রার্থীতাকে সংকটের মুখে ফেলতে পারে। এইসব বিবেচনায় আমার মনে হয়, ইরানের সঙ্গে আমেরিকার যুদ্ধ হওয়ার সম্ভাবনা কম।

বাংলা: সম্প্রতি ট্রাম্প ইরানের সাথে আলোচনায় বসার কথা বলেছেন। আদতে কি এই বৈঠক হবে, আর হলেও কতটুকু সফল হবে বলে আপনি মনে করেন?

আব্দুল মান্নান : বৈঠক আদৌ হবে কি না তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে। ইরানের নেতারা আলোচনার সম্ভবনা নাকচ করে দিয়েছেন। আর বৈঠক যদি হয়, আমার মনে হয় না এটা সফল হবে। কারণ, ট্রাম্পের নীতি হলো ইরান ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধিকরণ শূন্যের কোঠায় নিয়ে আসুক।  এটা ইরানিরা কখনোই মেনে নেবে না। ২০১৫ সালে যে চুক্তি হয়েছিল, সেখানে কিন্তু এটা বলা হয়নি। সেখানে বলা হয়েছে, ইরান  ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করতে পারবে এবং কতটুকু করতে পারবে তার একটা সীমারেখা দেয়া হয়েছিল। তার সঙ্গে সঙ্গে সেখানে একটা আন্তর্জাতিক তদারকির ব্যবস্থাও ছিল। আর ট্রাম্পের নীতি তো পুরো বিপরীত, অর্থাৎ ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধিকরণ শূন্য হতে হবে। ইরান এটা মানবে বলে আমার মনে হয় না। ইরানিরা খুব জাতীয়তাবাদী।

বাংলা: সৌদি আরব ও ইরানের দ্বন্দ্বের কারণ কি?

আব্দুল মান্নান : সৌদি-ইরান দ্বন্দ্বের মূল কারণ কৌশলগত। উভয় রাষ্ট্রই মধ্যপ্রাচ্যে আধিপত্য বিস্তার করতে চায়। এই কৌশলগত দ্বন্দ্বের সঙ্গে যেটা যোগ হয়েছে, তা হচ্ছে তাদের মধ্যে ধর্মীয় পার্থক্য। ইরান শিয়া-মুসলিম প্রধান দেশ। অন্যদিকে সৌদি আরব নিজেকে সুন্নি-মুসলিম বিশ্বের নেতা মনে করে। এর প্রভাব মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য  মুসলিম দেশে পড়েছে, যেগুলোর কোনটি শিয়া প্রধান, কোনটি সুন্নি প্রধান। সৌদি আরব এবং ইরান উভয়েই এই ধর্মীয় পার্থক্যকে পুঁজি করে অন্যান্য আঞ্চলিক দেশগুলোতে তাদের স্ব স্ব প্রভাব বিস্তার করতে সচেষ্ট।

ইরানের শিয়া পরিচয়টা সৌদিদের জন্য একটা বড় হুমকি। এর কারণ কি, সেই প্রশ্নে আমি পরে আসছি। সৌদি দৃষ্টিকোণ থেকে ইরানের শিয়া পরিচয়ের সঙ্গে যেটা যোগ হয়েছে, সেটা হচ্ছে ইরান-সৌদি ভৌগলিক নৈকট্য। ইরান যদি আজ সৌদি আরবের কাছাকাছি না হয়ে দূরবর্তী কোন রাষ্ট্র হতো তাহলে কিন্তু সৌদি আরব তাকে (ইরান) হুমকি মনে করতো না। একটা দেশ আরেকটা দেশকে যে সব কারণে হুমকি মনে করে, সেখানে ভৌগলিক নৈকট্য একটা বড় বিষয়। আমাদেরকে দেখেন না, আজকে যদি ভারত আমাদের পাশে না হয়ে দূরের একটা রাষ্ট্র হতো, তাহলে কিন্তু আমরা ভারতকে হুমকি মনে করতাম না। ইরানের শিয়া পরিচয় এবং সৌদির সঙ্গে তার ভৌগলিক নৈকট্য—এই দুটি ফ্যাক্টর সম্মিলিতভাবে সৌদিদের জন্য হুমকি।

এখন প্রশ্ন হলো 'শিয়া ইরান' কেন সৌদিদের জন্য হুমকি। ইরানে ১৯৭৯ সালে যে ইসলামী বিপ্লব হলো, তা ইসলামে এক নতুন ধরণের মতবাদ চালু করে, যার নাম হলো 'বিপ্লবী দিব্যতন্ত্র' (revolutionary theocracy)। ইরান এই 'বিপ্লবী দিব্যতন্ত্র' মধ্যপ্রাচ্যের অন্য মুসলিম দেশগুলোতে রপ্তানি করার কথা বললো। ইরানের এই মতবাদ সৌদি রাজতন্ত্রসহ অন্যান্য শেখ শাসিত রাষ্ট্রগুলোর শাসক গোষ্ঠীর জন্য এক বিপদ তৈরী করলো। এই যে দ্বন্দ্বের শুরু হলো তা এখনো চলমান।

এখন যেখানে সৌদি আরব যায় সেখানে ইরান যায়, আবার যেখানে ইরান যায় সেখানে সৌদি আরব যায়। এর প্রভাব আমরা সিরিয়া সংকটে দেখেছি। সিরিয়ার শাসক বাসার আল আসাদ সুন্নি নন, তিনি একজন আলাউয়ি। আলাউয়ি হচ্ছে শিয়া মতবাদের একটি শাখা। সৌদি আরব যখন আসাদ বিরোধী সুন্নি গ্রুপগুলোকে সমর্থন দিলো, ইরান তখন আসাদের পক্ষ নিলো। তাদের উদ্দেশ্য কিন্তু ধর্মীয় নয় বরং কৌশলগত, অর্থাৎ আঞ্চলিক আধিপত্য বিস্তারে কেউ কাউকে ছাড় না দেয়া।

আপনি যদি ইয়েমেনে দেখেন, সেখানে হুতিরা একটা গোত্র। ধর্মের দিক থেকে ইরানিরাও শিয়া, হুতিরাও শিয়া। কিন্তু হুতিরা জাইদি শিয়া। অর্থাৎ আমি বলতে চাচ্ছি ইরান এবং ইয়েমেনি হুতি—উভয়ে শিয়া হলেও তাদের মধ্যে শাখাগত পার্থক্য আছে। ইয়েমেনে যখন হুতিরা তাদের কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হলো, তখন ইরান প্রথমেই সেখানে হুতিদেরকে প্ররোচনা দিয়েছে, এমনটা বলা যায় না। ইরান হয়তো হুতিদেরকে এমনটা বলেনি যে, যাও যুদ্ধ করো এবং ক্ষমতা নিয়ে নাও। কিন্তু ইরান যখন দেখলো সৌদি আরব হুতিদের বিরুদ্ধে সুন্নিপন্থী ইয়েমেনি সরকারকে সমর্থন দিচ্ছে, তখন তারা মনে করলো সৌদির বিরুদ্ধে আধিপত্য বিস্তারের লড়াইয়ে সুযোগটা অবশ্যই নেয়া উচিত। তারা শিয়াপন্থী হুতিদেরকে সমর্থন দিলো।

এজন্য ইরান এবং হুতিদের যে সম্পর্ক, সেটা হলো সুবিধাবাদীর। উভয়ে শিয়া হলেও তাদের মধ্যে শাখাগত একটা পাথর্ক্য বিদ্যমান। ইরান হুতিদেরকে সৌদির বিরুদ্ধে প্রক্সি হিসেবে ব্যবহার করছে। আবার হুতিরা যুদ্ধ করেছে নিজ সরকারের বিরুদ্ধে এবং সরকারকে সমর্থনকারী সৌদি আরবের বিরুদ্ধে। তাদের অস্ত্র দরকার। আর তারা সব রকম সহযোগিতা পাচ্ছে ইরানের কাছ থেকে। তাদের এই ঐক্যটা খুবই সুবিধাবাদীর (opportunistic), কোন আদর্শিক নয়। উভয়ের একটা অভিন্ন শত্রু হলো সৌদি আরব।

বাংলা: ইসরায়েল কেন ইরানকে হুমকি মনে করছে?

আব্দুল মান্নান : ইরানে ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের আগ পর্যন্ত ইসরায়েল তাদের ভাল বন্ধু ছিলো। বিপ্লবের পর তাদের নীতিটা পরিবর্তন হয়ে গেলো । বিপ্লবের পর ইরান রাষ্ট্রীয়ভাবে 'ইসরায়েল নিপাত যাক', 'আমেরিকা নিপাত যাক'--এরকম একটি মন্ত্র প্রতিনিয়ত প্রচার করে আসছে। এইরকম একটি মন্ত্র ইরানের শাসক গোষ্ঠীর অভ্যন্তরীণ বৈধতার জন্য অনেক দরকার। পাশাপাশি এই মন্ত্র মধ্যপ্রাচ্যের আরব- মুসলিম দেশগুলোর শাসকগোষ্ঠীকে তাদের জনগণের কাছে হেয় করার জন্যও একটি অস্ত্র। কারণ আরবের মুসলিম দেশগুলোর শাসকগোষ্ঠী ইসরায়েলি দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনি আরবদেরকে তেমন সমর্থন দিচ্ছে না। এক্ষেত্রে ইরান হয়তো ইসরায়েল-বিরোধিতা করে আরব জনগণের সহানুভূতিও অর্জন করতে চায়। কিন্তু এর ফলশ্রূতি কি? সেটা ইসরায়েলের সঙ্গে প্রকাশ্য শত্রুতা নয় কি?

এক কথায়, ইহুদিরাষ্ট্র ইসরায়েল বিরোধিতা ইরানের জন্য এক ধরণের কৌশলগত অস্ত্র, যার মাধ্যমে ইরান আরব-মুসলিম বিশ্ব বা মুসলিম দুনিয়ায় এক ধরণের popular sympathy (জনপ্রিয়তা) অর্জন করতে চায়। আর এর অর্থ হচ্ছে ইসরায়েলের সঙ্গে প্রকাশ্য শত্রুতা। কাজেই ইসরায়েল তো ইরানকে হুমকি মনে করবেই। ইরান যদি মধ্যপ্রাচ্যে একটি আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়, সেটা তো হবে ইসরায়েলের জন্য একটা বড় হুমকি। এজন্যই ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে ইসরায়েল খুবই উদ্বিগ্ন।

বাংলা: পরমাণু সমঝোতা চুক্তি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর ইরান প্রশ্নে ট্রাম্প যে অবস্থানটা গ্রহণ করেন, তাতে আমেরিকার দীর্ঘ দিনের মিত্র ব্রিটেন, ফ্রান্স ও জার্মান তাকে সমর্থন করলো না। এর কি কারণ থাকতে পারে?

আব্দুল মান্নান: আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে 'big  power responsibility' বা 'বড় শক্তির দায়দায়িত্ব' বলে একটা কথা আছে। বড় শক্তিগুলো অনেক ক্ষেত্রে crisis  ম্যানেজমেন্ট-এ ভূমিকা রাখে, যাতে করে সংকট আরো গভীরের দিকে না যায়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ওবামা প্রশাসনের সময় হয়তো এটিই করেছিল। তারা অন্য বড় শক্তিগুলোকে সঙ্গে নিয়েই ২০১৫ সালে ইরানকে একটি চুক্তিতে আসতে রাজি করায়, যা Iran nuclear  agreement নাম পরিচিত। এখন ট্রাম্প প্রশাসন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে এই চুক্তি থেকে প্রত্যাহার করলেও তার ইউরোপীয় মিত্র ফ্রান্স, জার্মানি, ব্রিটেন ট্রাম্পের নীতিকে সমর্থন করেনি।

এই তিন মিত্র কেন ট্রাম্পের নীতিকে সমর্থন করেনি? করবেই বা কেন? ট্রাম্পের নীতি হলো 'America First'। কাজেই তার মিত্ররা কেনই বা ট্রাম্পকে সমর্থন করবে। Iran nuclear  agreement ছিল অনেক চেষ্টার ফল, যেখানে  আমেরিকার ইউরোপীয় মিত্রদের অনেক অবদান ছিল। এখন ইউরোপীয় তিন শক্তি 'বড় শক্তির দায়দায়িত্ব' থেকেই হয়তো ট্রাম্পের নীতিকে সমর্থন করছে না। আরো একটা বড় কারণ আছে Iran nuclear agreement হওয়ার পর ইউরোপীয় শক্তিগুলো হয়তো ভেবেছিল ইরানের উপর থেকে অবরোধ প্রত্যাহার করা হবে এবং তারা ইরানের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য করতে পারবে, বিশেষ করে ইরানের তেলক্ষেত্র উন্নয়ন কিংবা বিভিন্ন অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগ ও ব্যবসা-বাণিজ্য করতে পারবে। ট্রাম্প চুক্তি থেকে আমেরিকাকে প্রত্যাহার করার পর ইরানের উপর একের পর এক অবরোধ দিয়েই যাচ্ছেন। এর ফলে ইরানের সঙ্গে ইউরোপীয় শক্তিগুলো ব্যবসা-বাণিজ্য করার যে আশা করেছিল তা আর হচ্ছে না।

আপনার মূল্যবান সময় দেয়ার জন্য ধন্যবাদ স্যার।

আপনাকেও অনেক ধন্যবাদ।

বিজ্ঞাপন

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0220 seconds.