• ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯ ১৫:১৪:৫০
  • ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯ ১৫:১৪:৫০
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

রুখে দেয়ার সক্ষমতা কি হবে আমাদের?

ছবি : সংগৃহীত


কাকন রেজা :


ডয়চে ভেলে’র একটি খবরের শিরোনাম ছিলো, ‘রুখে দিল যাদবপুর’। খবরটা কলকাতার যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়কে ঘিরে। এমন শিরোনামের পর ‘কী রুখে দিলো যাদবপুর’, এমন প্রশ্নটা স্বভাবতই এসে যায়। যাদবপুর রুখে দিয়েছে বহিরাগতদের বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুপ্রবেশ। যাদবপুর রুখে দিয়েছে, তাদের শিক্ষার্থীদের হেনস্তা, সংঘাত।

হিন্দুত্ববাদী বিজেপি’র চামুন্ডা শক্তি অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদের কর্মীরা যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ করতে চেয়েছিল বহিরাগতদের নিয়ে। কয়েক হাজার কর্মী সমর্থককে নিয়ে তারা বিজেপি নেতা গায়ক এবং কেন্দ্র সরকারের রাষ্ট্রমন্ত্রী বাবুল সুপ্রিয়কে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢুকতে বাধা দেয়ার প্রতিশোধ স্পৃহায় এই কান্ড ঘটাতে চেয়েছিলো। ডয়চে ভেলে’র শিরোনামই জানান দিয়েছে সফল হয়নি সেই চামুন্ডা শক্তি।

কিভাবে রুখলো যাদবপুর তা খবরের ভাষাতেই বলি। ‘মিছিল আসার খবর পেয়েই যাদবপুরের সমস্ত অধ্যাপক দল-মত নির্বিশেষে একজোটে এসে ব্যারিকেড গড়ে দাঁড়ান ফটকের সামনে। তাদের বক্তব্য ছিল পরিষ্কার। বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢুকতে হলে, ছাত্র-ছাত্রীদের কাছে পৌঁছাতে হলে তাঁদের ব্যারিকেড ভেঙেই এগোতে হবে। সংকট মুহূর্তে অধ্যাপকদের এবাবে ছাত্র-ছাত্রীদের পাশে এসে দাঁড়ানো যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃতি।’ বোঝা গেলো, কিভাবে রুখে দিয়েছে যাদবপুর।

কলকাতা আমার খুব একটা পছন্দের জায়গা নয়। ওদের অনেক কিছুতেই আমার ‘নোট’ রয়েছে। তবে স্বীকার করতে দ্বিধা নেই কিছু কিছু জায়গায় ওরা সত্যিই অনুসরণীয়। আর অনুসরণটা এই কারণে যে, ওরা নিজের ভালোটা বোঝে। ওরা জানে, কতটা হলে নিজেরাই বিপদগ্রস্ত হবে। বিপরীতে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে তাকান, ওখানের শিক্ষকদের দিকে তাকান। দেখবেন হাতেগোনা কয়েকজন ছাড়া রুখে দেবার সাহস কিংবা সদিচ্ছা কারোরই নেই। থাকলেও তা দৃশ্যমান হয়নি। রাতের বেলা ছাত্রীরা পর্যন্ত মার খেয়েছে, দিনেতো কথাই নেই। অহরহ শিক্ষার্থীরা নিগৃহিত হয়েছেন, আহত হয়েছেন। এর বিপরীতে শিক্ষকদের অবস্থানটা কী, হাতে হাত রেখে দল-মত নির্বিশেষে দাঁড়ানোর চিত্রটি কি কোথাও কখনো দেখতে পেয়েছেন? পাননি তো। অতএব যাদবপুরের অনুসরণটা দোষের কি?

‘অত্যাশ্চর্য’ শিক্ষক, এক ভিসির কার্যকলাপ তো দেখছিই। যিনি ছাত্র-ছাত্রীদের রক্ষার বদলে বহিরাগত পেটোয়া লেলিয়ে দিচ্ছেন, এমন অভিযোগ ছাত্র-ছাত্রীদের। সেই ভিসির পক্ষে উল্টো দাঁড়িয়েছেন একদল শিক্ষক। এমন একশত সাতজনের উল্টো দিকে মাত্র বিশজন শিক্ষক দাঁড়িয়েছেন শিক্ষার্থীদের রক্ষায়। অদ্ভুত না। না হবার কারণ নেই। যেখানে ভিসির একদিনের চায়ের বিল হয় চল্লিশ হাজার টাকা, সেখানের ব্যাপার অদ্ভুত না হয়ে যায় কই।

আরেক শিক্ষক, তাও আবার মহিলা এবং ভিসি, নিজ পরিবার নিয়ে ‍দুর্নীতির পসরা খুলেছেন, অভিযোগ এমনটাই। কমিশন ভাগ করে দিচ্ছেন একে-ওকে। গণমাধ্যম এমন আটজন উপাচার্যের কার্যকলাপ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। সামাজিকমাধ্যমেও এ নিয়ে প্রতিনিয়ত কথা হচ্ছে। বলা হয়েছে, এক বছরে ওই ভিসির গাড়ির জ্বালানীর জন্য বিশ্ববিদ্যালয়কে দিতে হয়েছে সাইত্রিশ লক্ষ টাকা। তিনি ব্যবহার করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ে চারটি গাড়ি। একটি নিজের জন্য, একটি স্বামীর, অপর দুটি পুত্র ও পুত্রবধুর। পুত্রবধুরটি সমালোচনার মুখে ছেড়ে দিলেও অন্য তিনটি ধরে রেখেছেন যথারীতি।  

ভিসিদের কাহিনি আরো আছে। বর্ণনা করতে গেলে মহাভারত হয়ে যাবে। রয়েছে অনেক শিক্ষকের কাহিনিও। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কেন র‌্যাংকিংয়ে এক হাজারের মধ্যে জায়গা করতে পারে না, সে সব কারণের অন্যতম এমন ভিসি ও শিক্ষকেরাও। হুমায়ূন আহমেদ তার এক লেখাতে এমন শিক্ষকদের বিষয়ে উল্লেখ করেছিলেন। তার উষ্মা প্রকাশ পেয়েছিল সেই লেখাতে। শিক্ষকদের বিষয়ে আমার নিজেরও করুণ অভিজ্ঞতা রয়েছে।

স্বাধীন দেশের বিশ্ববিদ্যালয় হয়েও ভারতের অঙ্গরাজ্যের একটি বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে উঠতে পারেনি এ দেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়। কেন যাদবপুরের মতন দল-মত নির্বিশেষে ছাত্র-ছাত্রীদের স্বার্থে হাতে ধরে দাঁড়ান না অধ্যাপকেরা? কেন সংকট মুহূর্তে ছাত্র-ছাত্রীদের পাশে না দাঁড়িয়ে নিরাপদ দূরত্বে থাকেন তারা? এসব ‘কেন’র ফয়সালা না হওয়া পর্যন্ত যাদবপুরই আইডল হয়ে থাকবে আমাদের সামনে।

স্বাধীন দেশের নাগরিকের আত্মমর্যাদা বোধ থাকে তীক্ষ্ণ। সেই তীক্ষ্ণতার কারণেই অঙ্গরাজ্যের একটি বিশ্ববিদ্যালয়কে ‘আইডল’ মানাটা সঙ্গতই অহংবোধে লাগে। না লাগাটা বরং অস্বাভাবিক। আর এই অস্বাভাবিক ব্যাপারটি আমাদের মেনে নিতে হচ্ছে। আর মেনে নেয়ার দুঃখটা বুকে পুষে রাখতেও হচ্ছে। সাথে পুষে রাখতে হচ্ছে প্রশ্ন, ‘রুখে দেয়ার সক্ষমতা কি হবে আমাদের?’

লেখক : সাংবাদিক ও কলাম লেখক।

বিজ্ঞাপন

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0218 seconds.