• ১০ আগস্ট ২০১৯ ১৪:৩৬:২২
  • ১০ আগস্ট ২০১৯ ১৬:৩৬:২৭
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

কাশ্মীর ক্রাইসিস : উগ্রপন্থার উত্থান এবং উদারপন্থার শংকা

কাশ্মীরী শাল বুননশিল্পী ফারুক আহমেদ ধর। ২০১৭ সালের ৯ এপ্রিল ভারতীয় রাষ্ট্রীয় রাইফেলের সৈনিকরা ফারুককে এভাবে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে। পুরনো ছবি


কাকন রেজা


‘প্রতিটি অমঙ্গলের মধ্যেই মঙ্গল নিহিত রয়েছে’ -এ কথাটি আমি বিশ্বাস করি। এই যে, কাশ্মীরের ঘটনা, ৩৭০ ধারা বিলোপ। পুরো রাজ্যকে সামরিকায়ন করা। মানুষের অধিকারহরণ। প্রতিবাদকারীদের নির্বিচার গুলি। এসবই মন খারাপ করা খবর। কিন্তু এর মধ্যেই যে ভালো খবর লুকায়িত তা হলো, ধর্ম নিরপেক্ষ ভারত তার চেহারাটা সারা বিশ্বের সামনে প্রস্ফুটিত করছে। কলি থাকায় বোঝা যায়নি ফুটে ওঠা এই ফুল কতটা বিভৎস সুন্দর।

আমি প্রবাসী দুই সাংবাদিকের মন্তব্য তথা লেখা দেখলাম সামাজিক মাধ্যমে। একজন আছেন অ্যামেরিকায়, অন্যজন জার্মানে। তাদের দুজনের অনুভূতির প্রকাশের ধরণ অনেকটাই এক। কাশ্মীর কান্ডের পর সেখানকার লোকজন তাদেরকে ভারতীয় ভেবে তিরস্কার করছে। দুটি দেশের মানুষই ভারতকে আখ্যা দিচ্ছে উগ্র ধর্মাশ্রয়ী দেশ হিসাবে। কেউ কেউ ভারতীয়দের ‘হিন্দু তালিবান’ও বলছে। যেটা ভারতের মত একটি গণতান্ত্রিক ও সহনশীল দেশের জন্য পাওনা ছিলো না। কিন্তু ওই যে, ‘ইয়ে’র দোষে প্রজা নষ্ট। দেশটির হয়েছে তাই।

তারপরও ভারতের ভেতর থেকে কিছু মানুষ আওয়াজ তুলছেন। তবে তাদের উপরও চলেছে জুলুমবাজি। সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে কিছুদিন আগে বুদ্ধিজীবী, লেখক, শিল্পী’রা প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন। সে সময় তাদের কাউকে জেলেও পোড়া হয়েছিল, দেশদ্রোহিতার আড়ালে সরকারদ্রোহিতার অভিযোগে। কাশ্মীর কান্ডের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাচ্ছেন সেখানের অনেক মানুষ। ৩৭০ ধারা বিলোপের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ হয়েছে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে। পশ্চিমবঙ্গেও প্রতিবাদ করেছে মানুষ। অথচ এমন মানুষ থাকা সত্বেও দেশটি পরচিতি পেয়েছে উগ্র হিন্দুত্ববাদীর তকমায়।

যখন ভারতীয় শাসকদলের নেতা কাশ্মীরি সুন্দরী মেয়েদের বিয়ে করতে বলেছেন, সেখানে জমি কিনে বসত গড়তে বলেছেন, তখনই দৃষ্টিভঙ্গিটা পরিষ্কার হয়ে গিয়েছে। ওই নেতার বক্তব্যের পরেই কাশ্মীরি মেয়েদের অনুসন্ধানে গুগল সার্চ রীতিমত হাপিয়ে উঠেছে। আর সামাজিকমাধ্যম কাশ্মীরি মেয়েদের নিয়ে নোংরা কমেন্ট এবং চরম অসভ্য বাক্যে ছেয়ে গেছে। এতদিন যারা, মুসলিমরা মেয়েদের অধিকার দেয়নি, দাসী বানিয়েছে, ধর্ষণ করেছে- এমন কথা বলে নিজেদের অসাম্প্রদায়িক বা নারীবাদী প্রমান করতে চাইতেন, তাদের চেহারাটাও পরিষ্কার হয়ে গিয়েছে এই নোংরামোতে। শুধু পরিষ্কার নয়, সুযোগ পেলে উনারা যে নারী নিগ্রহে অন্যদের চাইতেও অনেকটা এগিয়ে তারও প্রমান দিয়েছেন তারা।

যাক গে, এসব নোংরাদের কথা থাক। আশার কথা বলি। ভারতীয় একজন হিন্দু নেতা, যিনি সংসদ সদস্যও তার বক্তব্য শুনলাম সামাজিকমাধ্যমে। যা বিজেপি’র ওই নেতার সম্পূর্ণ বিপরীত। উনি বলেছেন, ইতিহাস দেখতে। বলেছেন, ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামের মুসলমানদের অবদান স্মরণ করতে। ভারতের স্বাধীনতায় মুসলমানদের অবদান আরএসএস সমর্থকদের চেয়ে অনেক বেশি। বলা শুরু করলে আরএসএসের চরমপন্থীদের গলা শুকিয়ে যাবে, যা হয়তো গরুর মূত্রেও ভিজবে না।

তবে পরিস্থিতির যে সবচেয়ে খারাপ দিকটা তা হলো চরম উগ্রপন্থার উত্থানের সম্ভাবনা এবং তার যৌক্তিতার সুযোগ করে দেয়া। ৩৭০ ধারা বিলোপ এবং তার পরবর্তী ঘটনা এটাই স্পষ্ট করেছে। ভারতীয় আরএসএস’র উগ্রপন্থীদের বিপরীতে জইশ-ই-মুহম্মদ মাথা চাড়া দিয়ে উঠবে, এটাই এখন স্বাভাবিকতা। মাঝখান থেকে গ্যাড়াকলে পড়বে শান্তিবাদী, সত্যিকার অসাম্প্রদায়িক মানুষেরা। কাশ্মীর পরিস্থিতি এখন আবেগাশ্রয়ী হয়ে উঠেছে। আর আবেগ যখন তীব্র হয় স্বভাবতই বিবেক তখন কাজ করে না। মানবিকতা, ভ্রাতৃত্ববোধ, অধিকার তখন এক ‘বেকার বাত’।

ভারত-কাশ্মীর-পাকিস্তানের এই জটিলতায় যদি উগ্রপন্থার উত্থান ঘটে, যার লক্ষণ ইতোমধ্যে পরিস্ফুট হতে শুরু করেছে। তবে দক্ষিণ এশিয়ার শান্তি বিনষ্ট হবে এটা নিশ্চিত। মুসলমান আর হিন্দুদের মধ্যে বিভেদ আরো বাড়বে। বিশেষ করে কাশ্মীরি গার্ল সার্চের মতন বিষয়গুলি পরিস্থিতিকে আরো জটিল করবে। আর জটিলতার ‘ক্রিয়েটর’ হবেন বিজেপি’র সেই নেতার মতন কিছু মাথামোটা মানুষ। এমন মাথামোটা নেতৃত্ব প্রতিটা দেশের জন্যই বিপজ্জনক। মাথায় যাদের ‘হলুদ বস্তু’ কম থাকে তাদের জিহ্বার ধার নাকি বেশি হয়। তারা মাথা নয় কথা দিয়েই কাজ সারতে চায়। বিপদটা সেখানেই। সেই বিপদেই পড়েছে বা পড়তে যাচ্ছে দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতি।

লেখক : সাংবাদিক ও কলাম লেখক।

বিজ্ঞাপন

সংশ্লিষ্ট বিষয়

কাশ্মীর

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0218 seconds.