• ১১ জুন ২০১৯ ১৭:০৫:৫৩
  • ১২ জুন ২০১৯ ০০:৩২:১৫
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

‘চেরনোবিল’ একটি মিনি সিরিজ এবং হাজার মাইল দূরের আতঙ্ক এখন দেড়শ মাইল দূরে

ছবি : সংগৃহীত

১.
সম্প্রতি এইচবিও’র একটি মিনি সিরিজ নিয়ে বেশ আলোচনা শুরু হয়েছে। ইউক্রেনের বহুল আলোচিত চেরনোবিলের পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে সংঘটিত দুর্ঘটনা কেন্দ্র করে নির্মাণ করা হয়েছে ৫ পর্বের এই মিনি সিরিজটি। বিশ্বজুড়ে ব্যাপক আলোচিত সিরিজ গেম অফ থ্রোন্সকেও ছাড়িয়ে ‘চেরনোবিল’ এখন আইএমডিবির হাইয়েস্ট রেটেড টিভি সিরিজ। নির্মাণশৈলী ঘটনার গাঁথুনি এমন ভাবে তুলে ধরা হয়েছে, এতে যে কোন সাধারন মানুষই সহজেই চেরনোবিলে ঘটে যাওয়া সেই ভয়াবহ ঘটনার কিছু নমুনা চিত্র আঁচ করতে পারবে। টের পাওয়া যায় পারমাণবিক গৌরবের ভেতরে লুকিয়ে রাখা অমানবিক শরীরটাকে।

২.
যতদূর মনে পরে ২০১১ সালে জাপানের ফুকুশিমায় পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে দুর্ঘটনার কিছুদিন পরই বাংলাদেশে কয়েকদিন বৃষ্টিতে না ভেজার জন্য একটি প্রচারণা হয়েছিলো। ফুকুশিমার দুর্ঘটনা কবলিত বিদ্যুত কেন্দ্র থেকে ছড়িয়া পরা তেজস্ক্রিয় বয়ে আনা মেঘ বৃষ্টির মাধ্যমে আমাদের শরীরের জন্যও ক্ষতিকর হতে পারে। তাই ওই ঘটনার পর কয়েকদিন বৃষ্টিতে ভেজা নিষেধ করা হয়েছিলো। এই বার্তা ঠিক কিভাবে পেয়েছিলাম তা মনে নেই। এটুকু মনে আছে এরপর আমরা বৃষ্টি ভেজা নিয়ে আতঙ্কে কাটিয়েছি কিছুদিন। কিন্তু কয়েকদিন পর আবার জানলাম এই বার্তাটি গুজব ছিলো। অনেকে বলছেন জাপান থেকে যে দূরুত্বে আছে বাংলাদেশ অতটা দূরুত্বে পৌঁছে তেজস্ক্রিয়তার ক্ষতিকর প্রভাবটি নষ্ট হয়ে যায়।

প্রথম খবরের সতর্কতায় যারা আমরা ‘জানালা’ বন্ধ করেছিলাম আবার ‘নিরাপত্তার’ আশ্বাস পেয়ে তাদের অনেকে জানালা খুলেও দিলাম...। কিন্তু ‘তেজস্ক্রিয়’ নামক এই বিষয়টার ভয়াবহতা আমাদের কাছে দুর্ভেদ্যই রয়ে গেলো। আমার কাছে ব্যক্তিগত জীবনে তেজস্ক্রিয়ার আতঙ্ক এতটুকুই ছিলো!

৩.
১৯৮৬ সালের চেরনোবিলে ঘটে যাওয়া পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের দুর্ঘটনায় হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু হয় বলে জানা গেছে। কিন্তু এর সঠিক পরিসংখ্যানটি আসলে কত ছিলো তা আজো জানা যায়নি। কারণ ‘গুজব’ এবং ‘রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা’ নামক শব্দ দিয়ে কঠোর গোপনীয়তার মাধ্যমে সবকিছু মোকাবেলা করে তৎকালীন সোভিয়েত সরকার। আর এর মাধ্যমেই অনেক তথ্যই অজানা এবং অপরিষ্কার রয়ে গেছে এখনো। দুর্ঘটনার পর ৩৩ বছর কেটে গেলেও তেজস্ক্রিয়তার ভয়াবহ প্রভাব এখনও রয়ে গেছে ওই পরিত্যাক্ত হয়ে যাওয়া শহর চেরনোবিলে। আরো বহু ৩৩ বছর কেটে গেলেও নিরাপদ বাসযোগ্য শহর হিসেবে তৈরি হবেনা চেরনোবিল। 

এইচবিওর এই টিভি সিরিজটিতে এইসব সত্যই উঠে এসেছে খুব সুন্দর ভাবে। এর নির্মাণ শৈলী এতোটাই সরল ছিলো যে ‘তেজস্ক্রিয়’ নামক সেই দুর্ভেদ্য হয়ে থাকা শব্দগুলোর প্রভাব কতটা ভয়ঙ্কর তার কিছু নমুনা সাধারন দর্শকরা সহজেই বুঝতে পারবেন।

৪.
মিনি সিরিজ চেরনোবিল দেখতে দেখতে আরো অনেকের মতো আমিও বারবার ভেবেছি বাংলাদেশে তৈরি হতে যাওয়া রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নিয়ে। ওই সিরিজে দেখা যায়, চেরনোবিলে যখন পারমানবিক চুল্লি বিস্ফোরিত হয় তখন তা দেখতে স্থানীয় রেলওয়ে ব্রিজে জড়ো হয়েছিলো। তারা তখনো জানেনা কি ঘটতে যাচ্ছে তাদের জীবনে। অনেকে এক ধরনের উৎসব আমেজ নিয়েই দেখছিলো সেই লেলিহান আগুন। অনেকে এসেছে পরিবার নিয়ে। কিন্তু তাদের শ্বাস প্রশ্বাসের সাথে সাথে যে শরীরের ঢুকছে ভয়ংঙ্কর মৃত্যু তা তারা কেউ বুঝতেও পারেনি। পরবর্তীতে তেজস্ক্রিয়ার প্রভাবে তাদের কেউ আর বাঁচেনি। আর তাই সেই রেলওয়ে ব্রিজের নাম হয় ‘ব্রিজ অব ডেথ’।

চেরনোবিলের ঘটনায় আমরা যেমনটা দেখতে পেয়েছি, ঘটনার সময় মানুষ জানেনা কি ঘটছে। অর্থ্যাৎ আট/দশটি সাধারন কারখানার অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার মতোই মনে হয়েছে তাদের অনেকের কাছে। একটি পারমানবিক প্রকল্পে বিস্ফোরণের ভয়াবহতা সম্পর্কে প্রাথমিক তথ্যও তাদের জানানো হয়নি। এমনকি যখন তাদের এলাকা খালি করতে বলা হয়েছে তখনও ভুল তথ্য দিচ্ছে সরকার। বলা হয়েছিলো কয়েকদিনের ভেতরই ফিরে আসতে পারবেন তারা। অথচ এই অঞ্চল শত বছরেও বাসযোগ্য হবে না। বিজ্ঞানতো সে কথাই বলছে।

যুগ যুগ ধরে যে শহরে বেড়ে উঠেছিলো, যেখানে ছিলো স্বপ্ন-ঘর-সংসার-আবাদী জমি-প্রেম-ভালোবাসা সে সব কিছুই মুহূর্তেই ছেড়ে চলে যেতে হয়েছে। বিস্ফোরণের পর এখানকার বাসিন্দাদের এক কাপড়ে ঘর বাড়ি ছেড়ে যেতে হয়। তারা তখনো জানতো না তাদের আর এই শহরে কোন দিন ফিরে আসা হবে না। ওই ঘর ওই উঠান ওই প্রেম-সংসার সবই পরিত্যাক্ত হয়ে যাবে। প্রতিটি স্পর্শ হয়ে উঠবে মৃত্যুময়!

৫.
বাংলাদেশের পাবনার রূপপুরে যে পারমানবিক বিদ্যুত কেন্দ্র নির্মাণ হচ্ছে সেখানকার মানুষ জানেতো পারমানবিক বিদ্যুত কেন্দ্র কি? তেজস্ক্রিয়ার প্রভাবে কি ঘটতে পারে? একটি দুর্ঘটনা ঘটে গেলে কত মিনিটের ভেতর সেই এলাকা ত্যাগ করতে হবে? সেসব তথ্য কি তাদের জানানো হয়েছে? তাদের কি জানানো হয়েছে যদি কোনদিন কোন ভাবে এই দুর্ঘটনা ঘটে তাহলে কিভাবে এই জনবহুল এলাকা খালি করা হবে? ৩০ মিনিট থেকে কয়েক ঘণ্টার ভেতর? এই প্রকল্পের ঝুঁকি এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা সম্পর্কে কি স্থানীয় মানুষের জানার অধিকার নেই? এখানেতো জীবন মরনের প্রশ্ন। এখানে অস্তিত্ব রক্ষা ভিটে মাটির প্রশ্ন আছে, এখানে আছে প্রজন্মের সুস্থ বিকাশের প্রশ্ন।

যদিও সরকার তরফ থেকে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুত কেন্দ্র বিষয়ক প্রচার পত্রগুলো পড়ে আমরা জানতে পারি এটা শতভাগ নিরাপদ। সবচেয়ে আধুনিক নিরাপদ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।

কিন্তু ১৯৮৬ সালে চেরনোবিলেও বলা হয়েছিলো সবচেয়ে আধুনিক এবং নিরাপদ ব্যবস্থায় নির্মিত হয়েছে এই বিদ্যুত কেন্দ্র। দুর্ঘটনাকে বলা হয়েছিলো ‘ইমপসিবল’। কিন্তু দুর্ঘটনা ঘটেছে।

কেন ঘটেছে? উত্তর হিসেবে যেসব কারণ সামনে এসেছে, এক অদক্ষ পরিচালনার ভুল, দুর্নীতি, কর্তাব্যক্তির খামখেয়ালি সিদ্ধান্ত, শুদ্ধ ভুল যেটাই হোক বসের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত নীতি এবং ডিজাইনে ত্রুটি! যা দুর্ঘটনার আগে শনাক্ত হয়নি!

বাংলাদেশ কি এসব কিছুর উর্ধ্বে? যদি ধরে নেই উর্ধ্বে, তাহলেও কি শতভাগ নিরাপদ বলে কিছু আছে? ঘনবসতি পূর্ণ দেশের জনবহুল এলাকাতে কি আমরা এমন প্রকল্প নিতে পারি?

৬.
এখন সময় বদলেছে, প্রযুক্তি আধুনিক হয়েছে। চেরনোবিলের ঘটনার পর সারা বিশ্ব নড়ে চরে বসেছে। আরো আধুনিক ও নিরাপত্তা সিস্টেম তৈরি হয়েছে। কিন্তু কেউ কেউ এরপরও নিশ্চিন্ত হতে পারেনি। তারা এইসব প্রকল্প থেকে সরে আসতে শুরু করেছে। আবার অনেকে তাদের প্রকল্প চালু রেখেছে। ২০১১ সালে সেই আধুনিক নিরাপত্তার মাঝেই নতুন করে আরেকটি বিপর্যয় ঘটে জাপানে। সুনামি ও ভূমিকম্পের কারণে ফুকুশিমা পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে দুর্ঘটনা ঘটে। এবার দুর্ঘটনার কারণ ছিলো প্রাকৃতিক আঘাত! পরিত্যাক্ত হলো আরো একটি শহর। ঘরবাড়ি-ভিটে মাটি ছেড়ে পালাতে হলো মানুষকে। এই দুর্ঘটনা দেখে জার্মান সরকার ২০২২ সালের মধ্যেই চালু থাকা সব পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ করে দেওয়ার ঘোষণা দেয়। বিশ্ব জুড়েই পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বিপক্ষে জনগণের রায় দিচ্ছে। তৈরি হচ্ছে জনমত। ইন্টারনেট দুনিয়ায় সার্চ করতে গিয়ে বেড়িয়ে আসছে অনেক রকম তথ্য।

জানা যাচ্ছে এর ‘শতভাগ নিরাপত্তা’ নিশ্চয়তা এবং ‘ঝুঁকি’ নিয়ে নানা তথ্য। এসব কিছুই প্রচার করা হোক সমান ভাবে। এই ‘গৌরবের ঝুঁকি’ কিংবা ‘গৌরবের অগ্রযাত্রায়’র পথে হাটবে কিনা সে রায় জনগণই দিক। কিন্তু এজন্য তাদের কাছে সকল তথ্য উন্মুক্ত করা হোক। 

অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন এর ব্যয় নিয়ে, অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন পারমানবিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে, নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা, সক্ষমতা, দুর্নীতি ইত্যাদি নিয়ে। সেসব আলোচনা দেখেছি-দেখছি। এসব কিছু ছাপিয়ে সরকারের ‘শতভাগ নিরাপত্তার’ কথা মেনে ‘যদি’ নামক শব্দটি উচ্চারণ করতে চাই। যদি কোনোভাবে একটি দুর্ঘটনা ঘটে, যদি চেরনোবিল, ফুকুশিমাসহ অনান্য দুর্ঘটনার মতো এই সময়ে এসে নতুন কোন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়ে দুর্ঘটনা ঘটে তাহলে?

শুরুতেই বলেছিলাম, আমার কাছে এক সময় পারমানবিক তেজস্ক্রিয় আতঙ্কটার দূরত্ব ছিলো প্রায় ৪ হাজার ৭০০ কিলোমিটার। এখন সেই আতঙ্কের দূরত্ব এসে দাঁড়িয়েছে দেড়শ মাইলে।

চেরনোবিল, ফুকুশিমা প্রতিদিন ঘটে না, কিন্তু যেখানে ঘটে সেখানে আর ফেরার উপায় থাকে না। চেরনোবিল মিনি সিরিজের একটি কথা কানে বাজচ্ছে- ‘এখানে এখন আর ভালোবাসার স্পর্শ নেই, এখানে স্পর্শে আছে মৃত্যু!’

লেখক : সাংবাদিক এবং স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাতা।

বিজ্ঞাপন

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0197 seconds.