• ১০ জুন ২০১৯ ২০:৪১:১১
  • ১০ জুন ২০১৯ ২১:৫৬:৪৯
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

রোগীর দুঃসংবাদ প্রকাশে চিকিৎসকের সতর্কতা


ডা. মো: খলিলুর রহমান :


আমরা জানি যে, শারীরিক সমস্যা বা অসুখে আক্রান্ত হলেই কেবল মানুষ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয়ে থাকেন। অথবা কঠিন ও জটিল রোগ থাকলে বা রোগী শয্যাশায়ী অথবা হাঁটাচলা করতে না পারলে তার আত্মীয়-স্বজনরা তাকে নিয়ে ডাক্তারের চেম্বারে কিংবা হাসপাতালে আসেন। অবশ্য জরুরি ক্ষেত্রে চেম্বারে না গিয়ে রোগী হাসপাতালের ইমার্জেন্সীতেই হাজির হন।

তারপর ডাক্তার রোগীর কথা শুনে এবং রোগীকে শারীরিকভাবে পরীক্ষা করে সম্ভাব্য কি রোগ হয়েছে সে সম্পর্কে একটা ধারণা লাভ করে থাকেন। সে অনুযায়ী প্রয়োজনীয় Investigation করতে দেন। তখন অস্থির, উদ্বিগ্ন রোগী এবং রোগীর স্বজন ডাক্তারের নিকট জানতে চান-কী রোগ হয়েছে। অথবা অনেক সময় উদ্বিগ্ন রোগী বা তার স্বজনরা জিজ্ঞাসা করে বসেন, ডাক্তার সাহেব মারাত্মক কোনো রোগ হয়নি তো? কোন মরণ ব্যাধি নয় তো? ডাক্তার যদি এসব প্রশ্নের জবাব না দেন তাহলে রোগী বা তার স্বজনদের মনে স্বস্তি আসে না। অথবা তারা ভাবতে থাকেন যেহেতু ডাক্তার কিছু বলছেন না-তার মানে হয়ত কোনো ধরনের খারাপ রোগ হয়েছে! এই যে রোগ সম্পর্কে রোগী বা তার স্বজনের জানতে চাওয়া--এটা খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার। এ কারণে এ সময় পরীক্ষা নিরীক্ষা করতে দিয়ে রোগী বা তার স্বজনদেরকে অভয় দিয়ে পরীক্ষার রিপোর্টের জন্য অপেক্ষা করতে বলাটাই যুক্তিসঙ্গত।

Investigation রিপোর্ট হাতে পাওয়ার পর যদি দেখা যায় রিপোর্ট নরমাল আছে তখন রোগী এবং রোগীর লোককে আমরা বলে দিতে পারি যে এটা খারাপ রোগ নয়। যথাযথ ঔষুধ এবং পথ্য সেবনে বা অপারেশনে (যদি লাগে) রোগ ভাল হয়ে যাবে। তবে Investigation এ  যদি ধরা পড়ে রোগীর কোন মারাত্মক রোগ যেমন- ক্যানসার, কিডনী ফেইলয়োর, হাট ফেইলয়োর কিংবা গর্ভবতীর গর্ভের সন্তানের মৃত্যু হয়েছে তখন এ রকম দুঃসংবাদ- ডাক্তারের চেম্বারে কিংবা হাসপাতালে ভর্তিকৃত রোগী -যেখানেই হোক না কেন তা রোগীর সম্মুখে তাৎক্ষণিক প্রকাশ না করে আস্তে ধীরে সংবাদটি রোগীর আত্মীয়দের বলাটাই কাম্য।

রোগীর কোন মেজর অপারেশন লাগলে সেটাও হঠাৎ করে রোগীর সম্মুখে বলা উচিত নয়। বললে রোগীর মনে হতাশা ও ভীতির সঞ্চার হয়। রোগীর মনোবল ভেঙে যায়। রোগব্যাধিতে আক্রান্ত একজন রোগী এবং তার নিকট আত্মীয় স্বজনরা স্বভাবতই ভয় এবং দুশ্চিন্তাগ্রস্থ থাকেন। এমতাবস্থায় চিকিৎসক যদি তাদেরকে মারাত্মক খারাপ সংবাদ হঠাৎ করে জানিয়ে দেন --তখন রোগী এবং রোগীর আত্মীয়রা দুঃখ,কষ্ট, হতাশা ও দুঃচিন্তায় মানসিকভাবে নিরাশ হয়ে পড়েন। কারণ এমন দুঃসংবাদ কেউই  প্রত্যাশা করে না।

ধরা যাক, চিকিৎসক একজন রোগীকে পরীক্ষা করে বুঝলেন যে রোগীটির Appendicitis হয়েছে। তখন কোনভাবেই আচমকা বলা উচিত নয় যে -এখনই অপারেশন করতে হবে। এখনই না করলে বা দেরী করলে Appendix Burst হয়ে রোগী মারা যাওয়ার সম্ভাবনা আছে। বরং রোগীর স্বজনদের রোগটি সম্পর্কে স্বাভাবিক ধারণা দিয়ে অপারেশনের যৌক্তিকতা এবং তার দ্রুততা তুলে ধরা উচিত। অথবা ধরা যাক, ডায়াগনোসিস হলো রোগীর পিত্তথলীতে পাথর হয়েছে। ঐ রোগী এবং রোগীর লোককে এমনটি বলা নিতান্তই অনুচিত যে দ্রুত অপারেশন না করালে রোগীর পিত্তথলীতে ক্যানসার হতে পারে; যদিও এটা ঠিক যে, পিত্তথলির পাথর থেকে ক্যান্সার হতে পারে। তাই বলে প্রথমেই এটা বলে রোগীকে ভড়কে দেয়া ঠিক হবে না।

আবার এমনও হতে পারে, একজন মহিলা স্তনে চাকা বা টিউমার নিয়ে ডাক্তারের শরণাপন্ন হতে পারেন। ডাক্তার যথারীতি স্তন পরীক্ষা করলেন এবং চাকা বা টিউমারের ধরণ দেখে উনার কাছে ক্যান্সারের মতো মনে হলো। আর  তাৎক্ষনিকভাবে উনি সেটাই রোগীকে বলে দিলেন- মনে হয় আপনার স্তনে ক্যানসার হয়েছে! এমন কথা বলাও সঙ্গত না। 

রোড এক্সিডেন্ট কিংবা অন্য কোন কারণে মারাত্মক আহত মুমূর্ষু রোগী হাসপাতালের ইমার্জেন্সীতে আসলে কিংবা ওয়ার্ডে ভর্তি হলে তখন রোগীকে ঘিরে অনেক লোকের ভীড় থাকে। চিকিৎসক পরীক্ষা করে যদি বুঝে থাকেন যে রোগীর মৃত্যু হয়েছে -মানুষের ভীড়ের মধ্যে তাৎক্ষণিক মৃত্যু সংবাদ প্রকাশ না করে রোগীর আত্মীয় কিংবা বুঝদার কোন ব্যক্তিকে রুমে ডেকে নিয়ে বসিয়ে আস্তে ধীরে তা জানানো বুদ্ধিমানের কাজ। অনেক সময় দেখা যায় যে, এ সময় রোগীর স্বজনেরা উত্তেজিত থাকে। ফলে এমন অবস্থায় এ সকল লোকের সম্মুখে মৃত্যু সংবাদ প্রকাশ করলে চিকিৎসকের শারীরিকভাবে অপদস্ত হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা থাকে। ফলে সাবধানতা অবলম্বন করা উচিত।

আবার জটিল রোগে আক্রান্ত মরণাপন্ন কোন রোগী দেখা যায় হাসপাতালে ভর্তি আছে। চিকিৎসায় তার রোগ নিরাময় না হয়ে অধিকন্তু আরো খারাপের দিকে যাচ্ছে। ভাল হওয়ার কোন সম্ভবনাই নেই। এমতাবস্থায় রোগীর লোককে আগেভাগেই তা বুঝিয়ে বলে রাখা ভাল। বলে রাখা ভাল যে, আপনার রোগীর যে কোন সময় অঘটন ঘটতে পারে। সেক্ষেত্রে রোগীর হঠাৎ মৃত্যু হলেও তার আত্মীয়দের তখন আর কোন ক্ষোভের কারণ থাকে না। 
ফলে কোন দুঃসংবাদ প্রকাশ করার পূর্বে রোগী, রোগীর আত্মীয়-স্বজন বা উপস্থিত রোগীর হিতাকাঙ্খীদের মন-মেজাজ, পরিবেশ এবং পরিস্থিতি প্রভৃতি বিচার বিবেচনা করে একজন চিকিৎসকের দুসংবাদটি প্রকাশ করা সমীচিন। কারণ মৃত্যুর মতো দুঃসংবাদ শোনার পরে উত্তেজনাবশত রোগীর নিকট আত্মীয়দের দ্বারা উপস্থিত ডাক্তারকে শারীরিকভাবে লাঞ্চিত করার মত অনাকাঙ্খিত ঘটনা ঘটার কথা আমাদের অজানা নয়।

পরিশেষে বলব, ডাক্তার এবং রোগী বা তার স্বজনদের মধ্যে পারস্পারিক আস্থা বা বিশ্বাসের জায়গা গড়ে তোলার জন্য আমাদের সকলেরই যত্নবান হওয়া উচিত। এক্ষেত্রে ডাক্তার, রোগী, রোগীর স্বজন এবং মিডিয়া -সবাইকেই আন্তরিক ইতিবাচক ভূমিকা পালন করতে হবে। রোগীর খারাপ কিছু হলেই তার স্বজনদের উত্তেজিত হয়ে হাসপাতাল ভাঙচুর কিংবা চিকিৎসককে লাঞ্ছিত করার প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসা দরকার। রোগী মারা গেলেই ডাক্তার অবহেলা আছে এমন ধারনা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলা উচিত। মনে রাখা দরকার, ডাক্তার কখনোই রোগীর খারাপ চান না। তাছাড়া এটা ভুলে গেলে চলবে না যে, ভাঙচুর বা ডাক্তারকে হেনস্থা করার সময়ও হাসপাতালে আরো অনেক রোগীর চিকিৎসা চলতে থাকে। এসব অনাকাঙ্খিত ঘটনা ঘটালে অন্য রোগীদের চিকিৎসা কাজেও তা বিঘ্ন ঘটায়। এমনকি চিকিৎসা সেবা ব্যাহত হওয়ার ফলে চিকিৎসারত জটিল রোগীদের মৃত্যুও হতে পারে। সেটা কি কারো কাম্য হতে পারে?

আবার আমরা যারা চিকিৎসা পেশায় জড়িত আমাদেরও উচিত রোগীকে সময় দেয়া। তাকে বা তার স্বজনদেরকে কাউন্সিলিং করা। উপরের কথাগুলো মাথায় রেখেই তাদেরকে রোগ সম্পর্কে স্পষ্ট ধারনা দেয়া। সেটা করা হলে অনেকক্ষেত্রে হয়ত অনাকাঙ্খিত পরিস্থিতি এড়ানো সম্ভবপর হতে পারে। তাই আসুন, ডাক্তার এবং রোগীর মধ্যে আস্থা ও বিশ্বাসের সম্পর্ক তৈরীতে প্রত্যেকে আমরা দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করি।

লেখক : অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, সার্জারী বিভাগ, এনাম মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল।

বিজ্ঞাপন

সংশ্লিষ্ট বিষয়

চিকিৎসক সতর্কতা রোগী

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0180 seconds.