• বাংলা ডেস্ক
  • ২৫ এপ্রিল ২০১৬ ১৩:৩৩:২৮
  • ০৬ জুলাই ২০১৬ ১২:৩৬:৫০
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

ভাষা

আজ আবার ফিরিয়ে দিয়েছে ভাষা। জীবনে কতবার যে কতজন ফিরিয়ে দিয়েছে। এতটুকু ধাক্কা লাগেনি। ভাষা আমাকে ফিরিয়ে দিলেই আমার সব শূন্য শূন্য লাগে। এই পর্যন্ত কতবার ফিরিয়ে দিয়েছে ভাষা। কেন তুমি আমাকে ফিরিয়ে দাও, জানি না। তার একটিই কথা, ভাষার অংশই বর্ণ। ও বলে বর্ণ তোমার কেন মনে হয় আমাকে পেতেই হবে? আমি জানি না। আমি বলি সুনীলের কথা মনে আছে ভাষা, স্বাতীকে শূন্যহাত মুঠো করে কমপক্ষে দেড়শ’ বার ভালবাসি বলেছে। স্বাতী পূর্ণহাত মনে করে যতবার বিশ্বাস করেছে ততবারই পেয়েছে শূন্যহাত। তার পরও ফিরিয়ে দেয়নি কোনোদিন। আর তুমি? বার বার আমাকে ফিরিয়ে দাও।

ভাষার সাথে আমার পরিচয়টা খুব ইন্টারেস্টিং। আমার বন্ধু ত্রিশাল থাকত গুলশান তেজগাঁও লিংক রুটে। প্রায় রবিবার দিন তার বাসায় যেতাম। তার পর নাবিস্কো থেকে লেগুনায় ফার্মগেট আসতাম। ভাষা নাবিস্কোর কোনো একটি মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির রিসিপশনিস্ট। সন্ধ্যায় অফিস শেষ করে বাসায় ফিরত। ভাষার মা তখন বিছানায় পড়া। মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছেন। এই চাকরি শেষে ভাষা রাত ৮টার দিকে বাসায় ফিরত। সপ্তাহে তিন দিন সেখানে অফিস করত। বাকি চার দিনের মধ্যে তিন দিন বিভিন্ন ক্লায়েন্ট সামলাতে হতো তাকে। আর এক দিন মাকে নিয়ে হাসপাতাল। মফস্বল শহর ছেড়ে ভাষা মাকে নিয়ে প্রায় বছর পাঁচেক আগে রাজধানীতে আসে। ভাষা তার মায়ের একমাত্র মেয়ে। স্কুলশিক্ষক বাবার মৃত্যুর পর বড় চাচা তাদের একপ্রকার বাড়ি থেকে জোর করে বের করে দেয়। বাবা মারা যাওয়ার পর পরই মা অসুস্থ হয়ে পড়ে। তখন সে ইন্টারমিডিয়েট ফার্স্ট ইয়ারে। মাকে নিয়ে শহরে। আত্মীয়স্বজন যারা ছিল তারা প্রথম প্রথম খোঁজখবর নিয়েছে। বাবার কিছু জমানো টাকা আর নিজের তিনটা টিউশনির টাকা দিয়ে কেটে যাচ্ছিল ভালই। কিন্তু মায়ের চিকিৎসার খরচ মেটাতে তখন মোটা টাকা দরকার ভাষার। এই কম পড়ালেখায় কে চাকরি দেবে। কিন্তু টাকারও দরকার। এখানে-সেখানে ঘুরতে ঘুরতে এক দিন ভাষা হারিয়ে গেল ঢাকারচোরাগলিতে, মানুষের নিষ্ঠুরতায়। ঠিক সেই সময়টাতে নাবিস্কোর মোড়ে লেগুনায় দেখা হতো আমার আর ভাষার। টানা এক বছর তার পিছু নিয়েছি। এক সময় বিপদে পড়ে ত্রিশালের বাসায় যেতাম। কিন্তু ভাষাকে দেখার পর থেকে কোনো কাজ না থাকলেও আমি নাবিস্কোর মোড়ে যাই। ভাষা দেখতে কেমন? ভাষা ভাষার মতোই বহমান। কিন্তু ভাষা আমাকে কোনোদিনই পাত্তা দিত না। আমি তার সাথে লেগুনায় করে প্রতিদিন ফিরতাম। ভাষা তেজকুনীপাড়া নামত, আমি ফার্মগেট। এভাবে পেছনে ঘুরতে ঘুরতে একদিন ভাষা খুব রেগে তেজকুনীপাড়ার বাসার কাছে লেগুনা থেকে নামার পথে আমাকে হাত ধরে টেনে নামাল। নিয়ে গেল তার বাসায়। বাসায় গিয়ে তো আমি থ হয়ে গেলাম। ভাষার মার ডান পাশ প্যারালাইজড। বিছানা থেকে উঠতে পারে না। আর কিছু বলেনি সেদিন ভাষা। পরের সপ্তাহে ভয় ভয় মন নিয়ে গেলাম নাবিস্কো মোড়ে। আমাকে দেখে ভাষা কোনো ভ্রুক্ষেপই করেনি। লেগুনার জন্য অপেক্ষা করছিল। পেছনে গিয়ে দাঁড়ালাম। আমার দিকে একনজর তাকাল। আমি নিচের দিকে তাকিয়ে রইলাম। অপরাধীর মতো দাঁড়িয়ে রইলাম নিশ্চুপ হয়ে। হঠাৎ রিকশা ডাকল ভাষা। রিকশায় উঠে আমার দিকে তাকিয়ে রইল। কোনোকিছু না বলে আমিও উঠে গেলাম। রিকশায় উঠে আমার দিকে না তাকিয়েই বলল, জানো এই প্রথম নিজেকে নির্ভার লাগছে। মনে হচ্ছে এই জীবন সার্থক। আবার নিজেকে খুব দুর্ভাগাও লাগছে। কোনো প্রকার ভনিতা নেই ভাষার কথায়। আমি তখনো আপনি আপনি করি। বলল, ভনিতা করার দরকার নেই। আমার দুর্ভাগ্য যে, আমার জন্ম হয়েছে এবং তোমার সাথে দেখা হয়েছে। আমাকে বলল, জানো আমি কোথা থেকে এসেছি? বললাম, না। আমার এক ক্লায়েন্টের বাসা থেকে। আমি কোনো ব্যবসা করি না। কিন্তু আমার অনেক ক্লায়েন্ট আছে। বুঝলে। তাদের সেবা করতে হয়, কথা শুনতে হয় আরো অনেক কিছু। তার পর কিছু বাড়তি টাকা পাওয়া যায়, যা দিয়ে মায়ের চিকিৎসা করাই। মা জানে না। আমি এই বেঁচে থাকাটা মেনে নিয়েছি। আমি চাই না কাল আবার এই পথে আমার জন্য অপেক্ষা করে নিজের জীবনটাকে বিলম্বিত করো। পড়াশোনা করে ভাল একটা মেয়েকে বিয়ে করে সংসারী হও। শুধু শুধু সময় নষ্ট করো না। আমি বললাম, ভাল মেয়ে বলতে কী বোঝাও তুমি? ভাল-মন্দ বুঝি না। নাছোড়বান্দা আমি। ভাষা আমাকে অনেক বোঝালো। আমি কিছুতেই মানিনি তার কথা। এর পর বাসায় পৌঁছানোর একটু আগে বলল, তোমাকে গ্রহণ করার মতো শক্তি, সামর্থ আর যোগ্যতা আমার নাই। এসো না আমার পিছু পিছু, লোকে তোমাকে খারাপ ভাববে। আমি কিছু না বলে চলে আসলাম। পরের দিন আবার নাবিস্কো মোড়ে। ভাষা মেনে নিয়েছে। তবে সবটুকু না। আমার প্রতিটি জন্মদিনে ও আমার সঙ্গে সারা শহর রিকশায় করে ঘুরে বেড়িয়েছে। পালা পার্বণ আর উৎসবে উপহার দিয়েছে। কিন্তু আমার কাছ থেকে একটি সুতাও নেয়নি। আমার অনেক কষ্ট হয়েছে বার বার আমার উপহার ফিরিয়ে দেওয়াতে। ও বলত, রেখে দাও। যদি নতুন কোনো জন্ম থাকে তবে তোমার কাছ থেকে চেয়ে নিব। যতবার ওর হাত ধরে বলতে চেয়েছি, তুমি আমার। ততবারই ভাষা বলেছে, সুন্দর একটি হাত তোমার হাতে আসবে একদিন। তোমার এত সুন্দর হাত দুটি ময়লা হাতে রাখলে আমার কষ্ট হবে। আমি বলতাম, আর তোমার হাত না পেয়ে যে আমার কষ্ট হয় তা? সে বলত, তাতে মনে কিছু নিও না। আমার সবচেয়ে খারাপ দিনগুলোতে ভাষা ছিল একমাত্র আশ্রয়। যখনই মন খারাপ থাকত ভাষাকে ফোন দিয়ে তার সঙ্গে দেখা করতাম।

ভাষা আমার এমন এক পৃথিবী, যে পৃথিবীর জন্ম না হলে, তার সঙ্গে দেখা না হলে আমার জন্মটাই বোধ হয় মাটি হয়ে যেত। রিকশায় ঘোরার সময় কতবার চেয়েছি ও আমার কাঁধে মাথা রাখুক। কোনোদিন রাখেনি। কোনোদিন না। বলে, তোমার কী মনে হয়? আমার ইচ্ছে হয় না? হয়। ব্যস এইটুকুই। নীরবে মুখ লুকিয়ে কাঁদত। বরং তখন আমার বেশি খারাপ লাগত। খুব কষ্ট পেতাম। ও সবই বুঝত।

একটা সময় এসে মনে হল মানুষের জীবন কেন এমন হয়? ভাষা আমার জীবনে কী এটা সে জানে। আর আমি জানি আমি ভাষার জীবনে কী। আমার চেহারা দেখলেই ভাষা বুঝত আমি কেমন আছি। মাঝে মাঝে ভাষা আমাকে ফোন করে ডেকে রিকশা নিয়ে ঘুরবে। তার এইটুকু ছাড়া আর কোনোকিছু আমার কাছে চাওয়া নেই। অথচ আমার এমন কোনো বিষয় নেই যা ভাষা জানে না। কখন অফিস যেতে হবে, কখন ওষুধ খেতে হবে, কখন ঘুমাতে যেতে হবে, কখন ঘুম থেকে উঠতে হবে। সব। সব ভাষার হাতের নখদর্পণে লেখা আছে। জন্মগত বাউণ্ডেলে আমার সবকিছু এখন নিয়মে চলে, ভাষার কল্যাণে। কতবার বলেছি আমাকে গ্রহণ না করলে এই সব তুমি করতে পার বা না। তখন বলে, দেখ এইটুকু করলে আমার ভাল লাগে। বেঁচে থাকার ইচ্ছে হয়, মনে হয় আমার জীবনে আর কিছু চাওয়া-পাওয়ার নেই। এই নিঃস্ব জীবনে বেঁচে থাকার মানে খুঁজে পাই। এটা নিয়ে আমি বাঁচি। কেন তুমি চাও না আমি এইভাবে বাঁচি। কী বলব বুঝতে পারি না। আমার সব থাকা সত্ত্বেও ভাষা নেই। এতে আমি অসুখী, ভাষা জানে। আর ভাষার কোনোকিছু না থাকা সত্ত্বেও ভাষাকে সুখী মনে হয়। জীবনের অদ্ভুত এক দেয়াল ভাষা আর বর্ণের মধ্যে পার্থক্য তৈরি করেছে। ভাষার ভাবনা এটা। আর আমার? কতদিন কষ্ট পেয়ে ভাষাকে ফোন দিয়ে কেঁদেছি, কিন্তু ভাষা কোনোদিন কাঁদেনি। কী করে ও জীবনের সবকিছু মেনে নিয়েছি আমি জানি না। এত শক্ত মানুষ সে। কতবার চেয়েছি কিছু দায়িত্ব আমাকে দিক, দিবে না।

ভাষার মা মারা গেছেন তিন মাস হলো। আগে ভাষার সঙ্গে প্রতি সপ্তাহে এক দিন দেখা হতো। আর এখন দুই-তিন দিন পর পরই হয়। আবার পড়াশোনা শুরু করেছে। পাস কোর্সে ভর্তি হয়েছে। ক্লাস করে নিয়মিত। পাশাপাশি দুইটা টিউশনি। থাকে তেজকুনীপাড়াতেই। মাঝে মাঝে ওকে খুব ক্লান্ত মনে হয় আজকাল। গতকাল আবার গিয়েছিলাম ভাষার সঙ্গে দেখা করতে। বলেছিলাম এবার তো আর ফিরিয়ে দিবে না আমাকে। কিছু্ক্ষণ হাসল ভাষা। তার পর বলল, যেভাবে আছ সেভাবেই থাক না। কষ্ট পেলে তো অন্তত তোমার কাছে আশ্রয় নিতে পারি। কেন সেটা থেকে তাড়িয়ে দিতে চাও আমাকে। আমি জানি, ভাষা হেরে যেতে রাজি না। তাই গতকালও ভাষা আমাকে ফিরিয়ে দিয়েছে। ঠিক হার-জিত না। ভাষা এমন-ই। ভাষার মতো এমন আর কাউকে দেখিনি। ভাষা আমার জীবনে মহাকাব্য। আমার দুঃখের দিনে, আমার কষ্টের দিনে, আমার বেদনার দিনে ভাষাকেই পাই। তবু গতকাল ভাষা আমাকে ফিরিয়ে দিয়েছে। ও জানে আমাকে ফিরিয়ে দিলে আমি কী করি। গতকালও তাই করেছি। সারক্ষণ হেঁটেছি ফার্মগেট, কাওরানবাজার, পান্থপথ আরো কত কত জায়গায়। আর বার বার ওর ফোন, তাড়াতাড়ি বাসায় যাও, বাসায় যাও। কিন্তু ভাষা আমাকে ফিরিয়ে দিলে আমার ঘরে ফিরতে ইচ্ছে করে না।

কাল ঘরে ফিরতে ফিরতে প্রায় মধ্যরাত হল। এক বিনোদন সাংবাদিক বন্ধুর সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে হাঁটছিলাম। হঠাৎ সে বলছিল তার হারিয়ে যাওয়া প্রেমিকার কথা। তিন বছর হয়েছে সে হারিয়ে গেছে। এই তিন বছরে তার কষ্টের কথা আমাকে বলছিল। বুঝেছিলাম ভালবেসে না পাওয়ার কষ্ট কেমন। কিন্তু আমি যাকে কাছে পেয়েও সারাজীবন পাইনি, তা বুঝাই কী করে। কাউকে বোঝাতে পারি না। ইদানীং মা প্রায়ই বিয়ের কথা বলে। মাকে এটা-সেটা বলে পার করছি। কিন্তু এভাবে কতদিন? ভাষাকে ছাড়া আমার জীবন ভাবা অসম্ভব।

দুই বন্ধু কাল মধ্যরাত পর্যন্ত রাস্তায় ঘুরেছি। কষ্টকে দেখেছি কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে হাঁটতে, এই শহরে। কেবল ভাষা আমাকে ফিরিয়ে দিলেই আমার এমন দিনরাত আসে।

 

বিজ্ঞাপন

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0189 seconds.