• নিজস্ব প্রতিবেদক
  • ২১ মে ২০১৯ ১৬:০০:০৯
  • ২১ মে ২০১৯ ১৬:০০:০৯
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

টেকনো মোবাইলের বিজ্ঞাপনী শর্টফিল্ম বানিয়ে সমালোচিত নুহাশ

ছবি : সংগৃহীত

সম্প্রতি স্মার্টফোন ব্রান্ড টেকনো বেশ ঘটা করে ‘রানিং রাফি’ নামে একটি বিজ্ঞাপন প্রচার করছে। যদিও তারা এটাকে শর্টফিল্ম হিসেবে বলছে। বিজ্ঞাপনী এই শর্টফিল্মটি বানিয়েছেন জনপ্রিয় কথা সাহিত্যিক ও পরিচালক হুমায়ূন আহমেদের ছেলে নুহাশ হুমায়ূন।

গল্পের আইডিয়া ও কনসেপ্ট দিয়েছে ডিজিটাল বিজ্ঞাপনী সংস্থা অ্যানালাইজেন বাংলাদেশ। নির্মাতা ও স্ক্রিপ্ট রাইটার দাবি করেছেন এটি একটি সত্য ঘটনা অবলম্বনে নির্মিত।

গল্পে দেখা যায়, বান্দরবানের এক দুর্গম অঞ্চলে আযানের শব্দ পৌঁছায় না। ফলে সেখানকার মানুষ ইফতারের সময় ঠিক মতো জানেনা। রাফি নামের এক আদিবাসী তরুণ দৌড়ে দৌড়ে এক পাহাড় থাকে আরেক পাহাড়ে যায় আর সবাইকে ইফতারের সময় জানায়। একদিন গ্রামবাসী রাফিকে টেকনো মোবাইল কিনে দিয়ে বলে তোমাকে আর দৌঁড়াতে হবে না। ফোন দিলেই চলবে।

এই গল্প ও নির্মাণ নিয়েই চলছে তুমুল সমালোচনা। সমালোচনাকারীরা বলছেন, পাহাড়ের জীবন যাত্রাকে না জেনে, সেখানকার ভাষা রীতি, সামাজিক নিয়ম-আচারকে না বুঝে থাকলেই কেবল এ ধরনের গল্প লেখা যায় এবং তা নির্মাণ করা যায়। যারা পাহাড়কে জানে, বোঝে তারা বিজ্ঞাপনটা দেখে ‘ধাক্কা’ খাচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন অনেকে।

গল্পে আদিবাসী তরুণের ভাষা-রীতি, কথা বলার ধরন, সুর এবং স্থানীয়দের কথা পোশাক দেখে বোঝার উপায় নেই এটা বান্দরবানের দুর্গম গ্রাম নাকি ঢাকার কোন পরিবার! অনেকেই আদীবাসী পাহাড়িদের জীবন বৈচিত্রকে হেয় করা হয়েছে মন্তব্য করে এই বিজ্ঞাপনকে প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন। আবার অনেকে বিজ্ঞাপনের প্রশংসাও করেছেন।

অঙ্কন চাকমা লিখেছেন, ‘বিশেষ অঞ্চলের জনগোষ্ঠীকে নিয়ে কোনো ভিডিও চিত্র বানানোর আগে তার ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতিগত আচার আচারণের ব্যাপারে ভালো করে জানা উচিত। পাহাড়ের সহজ সরল মানুষের অনূভুতিগুলো কাজে লাগিয়ে ব্যবসা করার আগে প্লিজ একবার চিন্তা করুন গোটা দেশের মানুষের কাছে আপনি পাহাড়কে কিভাবে উপস্থাপন করছেন। পাহাড়ের মানুষের যে আলাদা স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য রয়েছে তা কতটুকু অক্ষুন্ন রাখতে পারছেন। পাহাড়কে বুঝতে গেলে তার কাছাকাছি গিয়ে বুঝতে হবে। দেশের ব্যপক মানুষের উগ্রবাঙালি চিন্তা ধারার ফসল হলো এই তথ্যচিত্রটি। নির্মাতাও এখানে সেই চিন্তাধারার উর্ধ্বে যেতে পারেননি। সবচয়ে অবাক করার বিষয় হলো নির্মাতা এখানে পাহাড়ি ছেলেটির নাম রাফি দিয়ে শুরু করেছেন।পাহাড়ি কোনো ছেলের নাম রাফি হতে যাবে কেন, একজন মানুষের নামের সাথে তার পূর্বপুরুষের ঐতিহ্যগত সাংস্কৃতিক সম্পর্ক থাকে। বৃহত্তর বাঙালি সম্প্রদায় এবং পাহাড়ের মানুষের সংস্কৃতি গত পার্থক্যটা আকাশ-পাতাল তফাত, এই মাচাং ঘরটি বাঙালি মুসলিম সম্প্রদায়ের সাথে কতটুকু সামঞ্জস্য আছে জানি না। তবে পাহাড়ের ছেলে হিসেবে বলতে পারি আজ পর্যন্ত কোনো মুসলিম সম্প্রদায়কে দেখেনি এমন মাচাংঘরে থাকতে।’

বাকি বিল্লাহ লিখেছেন, ‘বান্দরবানে রমজানের আবেগের ক্লাইমেক্সে হাজির হচ্ছে টেকনো মোবাইল। তার আগের ভিজুয়ালটুকু বিরাট এ্যাবসার্ড যদিও। রেডিও বা মোবাইল নেটওয়ার্ক না থাকলেও একটা ঘড়ি জোগাড় করা এমন কি আহামরি ব্যাপার! বস্তুত বাজারে বিদ্যমান ইলেকট্রনিক্স সামগ্রীর মধ্যে ঘড়িই সবচেয়ে সস্তা। আদিবাসী চেহারা এবং আদিবাসী উচ্চারণে কথা বলা ছেলেটা দৌড়ে দৌড়ে সবাইকে ইফতার এবং সেহরীর সময় জানাতেই পারে, সেটা অস্বাভাবিক নয় মোটেও, বরং সুন্দর। যদি দেখা যেত, সেই ইফতারীর সময়ে জানিয়ে দিয়ে এসে নিজ ধর্মমতে প্রার্থনায় বসছে। কিন্তু সে নামাজে কেন দাঁড়িয়ে যাচ্ছে? এই প্রশ্নের যেসব উত্তর খুঁজে পাওয়া যায় তা বিভৎস এক মানসিকতা হাজির করে।

অলকেশ চাকমা লিখেছেন, ‘প্রখ্যাত লেখক হুমায়ুন আহমেদের ছেলে নুহাশ টেকনো মোবাইল কোম্পানির বিজ্ঞাপন নির্মাণ করতে গিয়ে যা করেছেন সেটা তমালের ডালে ঝুলিয়ে কপাল ভিজিয়ে দেয়ার মতো কিংবা না জেনে বুঝে শিশু আঁকিয়েদের মাচাঙ ঘর আঁকার মতো হয়েছে ৷ হতে পারে তার নির্মিত ভিডিও চিত্র বৈচিত্রপ্রিয় অনেকে উপভোগ করবেন ৷ এতে করে টেকনো মোবাইলের কাটতিও বাড়তে পারে কিন্তু একজন পাহাড়ি হিসেবে, পাহাড়ির জীবন যাত্রা জানি বুঝি- হিসেবে তার এই কাজটিকে বেশ বিদঘুটে মনে হয়েছে ৷ এটি আমার কাছে সাহিত্যের গুরু চন্ডালী দোষের মতো দোষনীয় মনে হয়েছে ৷ তাই এই বিজ্ঞাপনটি প্রত্যাহার করার অনুরোধ করছি এবং পাশাপাশি নুহাশ সাহেবকে আরো নিকটে এবং গভীরে গিয়ে পাহাড়িদের জীবন যাত্রা দেখার এবং বুঝার অনুরোধ করছি।’

রুবেল আহমেদ কুয়াশা লিখেছেন, ‘নুহাশ হুমায়ূনের কি কোন ধারণা আছে যে, পাহাড়ে একটা ঘর থেকে আরেকটা ঘর কতোটা দূরে?
এই বিজ্ঞাপন দেখার পর না কি বাঙালি দল বাইন্ধা টেকনো মোবাইল কিনতেছে!
তা কোন বাঙালি? পাহাড়ের না সমতলের? ধর্ম আর আবেগ দুইটাই গুইলা খাওয়ায়া দিছে নুহাশ হুমায়ূন সাহেব।’

নির্মাতা নুহাশ হুমায়ুন এ বিষয়ে ফেসবুকে লিখেন, ‘হ্যা, পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষের কিছু খুবই জটিল ইতিহাস আছে। এর মধ্যে কিছু খুব দুর্ভাগ্যজনক। কিন্তু একটি ফোনের বিজ্ঞাপনের ক্ষেত্রে সেই ইতিহাস ব্যবহার করা বা মনোযোগ আকর্ষণ করাটা হবে অতিরঞ্জন ও আক্রমণাত্মক।

আমাদের গল্প হলো আমাদের নিজেদের ঘরের বাইরে পরিবার খুঁজে বের করা। ঢাকাতেও ফোন, ঘড়ি, রেডিও আছে, কিন্তু তবু এখনও নামাজের জন্য আজান দেওয়া হয়। কারণ এটি সামাজিক বোধ তৈরি করে। আমার মনে হয় রাফিও একই কাজ করেছে, বাড়ি বাড়ি গেছে, কারণ তার নিজের কোনো পরিবার নেই।

আর ‘আঙ্কেল’ বলাটা অভিনেতার পছন্দের বিষয়। মুসলিম সমাজে অংশ নিতে দেওয়ায় ছেলেটি কৃতজ্ঞায় ভরপুর নয়... সে পরিবার খুঁজে পাওয়ায় খুশি।

আমি মনে করি, আপনারা যে বিষয়গুলো তুলে এনেছেন তা গুরুত্বপূর্ণ, একই সঙ্গে আলাপটাও (ডিসকোর্স) গুরুত্বপূর্ণ। তাই ধন্যবাদ’

বিজ্ঞাপন

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0182 seconds.