• বাংলা ডেস্ক
  • ০৭ মে ২০১৯ ১৭:০৯:০৫
  • ০৭ মে ২০১৯ ১৭:০৯:০৫
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

দেশে দেশে রোজা এক, আয়োজন ভিন্ন

ছবি : সংগৃহীত

পবিত্র রমজানে সারা বিশ্বের মুসলিম সম্প্রদায় একযোগে মাসব্যাপী সিয়াম সাধনা করে। সাহরি খাওয়ার মধ্য দিয়ে রোজা শুরু হয় এবং ইফতার গ্রহণের মধ্য দিয়ে শেষ হয়। তবে স্থানের ভিন্নতার কারণে রোজা পালনে পার্থক্য না থাকলেও বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন রকমের রমজান সংস্কৃতিতে রয়েছে।

ফানুস ওড়ায় মিসরীয়রা

রমজান মাসে তুর পাহাড়ের দেশ মিসরে উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করে। রোজা পালনের সুবিধার্থে সরকারি অফিস-আদালতের কর্মঘণ্টা কমিয়ে আনা হয়। এর ফলে মিসরের মানুষ ইবাদত এবং মসজিদে বেশি সময় ব্যয় করতে পারেন। দেশটিতে পরিবারের সদস্যদের একসঙ্গে ইফতার পালনের সংস্কৃতি দেখা যায়। তবে, আধুনিকতার ছোঁয়ায় এই সংস্কৃতিতে ধীরে ধীরে পরিবর্তন আসছে। আজকাল মিসরীয় তরুণরা ক্যাফে ও রেস্তোরাঁতেই ইফতার করতে অভ্যস্ত হয়ে যাচ্ছে। তবে, তারাবির নামাজকে কেন্দ্র করে একটি বিশেষ সংস্কৃতি রয়েছে দেশটিতে।

ইফতারের পরপরই দলবেঁধে ‘আল্লাহু আকবর’ ধ্বনিতে আকাশ-বাতাস মুখরিত করে তারাবির জন্য রওনা হন মিসরীয় যুবকরা। এছাড়াও রমজানের রাতগুলোতে ঘরে ঘরে বাতি জ্বালানো এবং ফানুস ওড়ানো মিসরীয়দের অনেক পুরনো সংস্কৃতি। আমাদের দেশে যেমন, মসজিদে সাইরেন বাজানোর মাধ্যমে সাহরি এবং ইফতারের সময় নির্ধারণ করা হয়। মিসরীয়রা এক্ষেত্রে কামানের গোলার শব্দকে অনুসরণ করে সাহরি এবং ইফতার করে। দেশটিতে মুসলিমদের পাশাপাশি খ্রিস্টান সম্প্রদায়েরও উল্লেখযোগ্য-সংখ্যক মানুষ রয়েছে। রমজান মাসে রোজার সম্মানে তারাও প্রকাশ্যে পানাহার থেকে বিরত থাকে। অনেক খ্রিস্টান সারা দিন উপবাস থেকেও রোজার পবিত্রতা রক্ষা করেন।

তুরস্কে খেজুরের পরিবর্তে জলপাই

রমজান মাসে সরকারি অফিস-আদালতের কর্মঘণ্টা বা সময় পরিবর্তনের কোনো আয়োজন নেই। অফিস-আদালত ঠিক রেখেই তারা ইফতারের আগে ঘরে ফেরার চেষ্টা করেন। সাহরির সময় হলেই দেশটির অলিগলি’তে বেজে ওঠে ড্রামের শব্দ। মানুষকে সময় মতো জাগিয়ে দেওয়ার জন্য একদল তুর্কি ড্রাম বাজিয়ে গান গেয়ে ডাকাডাকি করেন। নারীরাই প্রথমে ঘুম থেকে জাগেন। তারা সাহরির খাবার তৈরি করেন এবং পুরুষদের জাগিয়ে দেন। সাহরি ও ইফতারের সময় তুরস্কেও কামানের গোলার আওয়াজ শোনা যায়। দিনের বেলায় রেস্তোরাঁ এবং খাবারের দোকান বন্ধ থাকলেও দুপুরের পর থেকেই চলতে থাকে ইফতারের আয়োজন। সাহরির সময়ও রেস্তোরাঁগুলো খোলা রাখা হয়। দেশটিতে সাহরি ও ইফতারের সময় অন্য ধর্মাবলম্বী মানুষরাও মুসলিমদের সঙ্গে সৌহার্দ্য বজায় রেখে যোগ দিতে দেখা যায়। মসজিদের পাশে বইমেলা এবং কুরআন প্রতিযোগিতা তুরস্কের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য। এছাড়াও খেজুরের পরিবর্তে জলপাই দিয়ে তারা ইফতারের সময় রোজা ভাঙেন।

রমজানে বদলে যায় দুবাই

আরবের দেশ হলেও আরব আমিরাতের দুবাইয়ে পশ্চিমা সংস্কৃতির বিশেষ প্রভাব রয়েছে। তবে, রমজান মাস শুরু হলে দুবাইয়ের চেহারা বদলে যায়। রমজানের শুরুতেই এক মাসের জন্য নাইট ক্লাব এবং বারগুলো বন্ধ হয়ে যায়। রোজার মাসে প্রকাশ্যে পানাহার কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয় দেশটিতে। এই নিয়ম লঙ্ঘন করলে আইন অনুযায়ী দন্ড দানেরও বিধান রয়েছে। তাই মুসলমানদের পাশাপাশি ভিন্ন ধর্মাবলম্বীরাও খুব সতর্কতার সঙ্গে দেশটিতে চলাফেরা করেন। সরকারি অফিস-আদালতের সময়সূচিতে বিশেষ পরিবর্তন আনা হয়। সকাল ৯টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত অফিসসূচি নির্ধারণ করা হয়। মার্কেটগুলোর সময়ও থাকে নির্দিষ্ট, যেন কোনো ক্রমেই ইবাদতে বিঘ্ন না ঘটে। একে অপরের সঙ্গে পরিচয়ের জন্য ইফতার পার্টি দুবাই রোজাদারদের প্রধান অনুষঙ্গ। সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে সব শ্রেণির মানুষকে নিয়ে কুরআন প্রতিযোগিতা দুবাইয়ের রমজানের সাধারণ দৃশ্য।

উপহার বিনিময় মালয়েশিয়ায়

রমজান মাস আগমনের বার্তা সবার কানেই পৌঁছে যায় সাইরেনের শব্দে। ‘শাহরুন মোবারাকুন’ বলে অভিবাদন জানিয়ে এবং উপহার বিনিময় করে শুরুতেই ভ্রাতৃত্ব বন্ধনকে মজবুত করে নেয় মালয়েশিয়ানরা। রোজা উপলক্ষে সরকার এবং ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ ছাড় দেওয়া হয় নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রীতে। মাসজুড়েই কানায় কানায় পূর্ণ থাকে মসজিদ। তারাবিসহ অন্যান্য নামাজে নারী ও শিশুদের উপস্থিতি লক্ষণীয়। তারাবির শেষে বিশেষ শিক্ষামূলক আসর বসে মালয়েশিয়ার মসজিদগুলোতে। সাহরির পর ঘুমানোর অভ্যাস নেই মালয়েশিয়ার মুসলমানদের। সূর্যাস্ত পর্যন্ত স্থানীয় মসজিদে ধর্মীয় আলোচনা শুনে সূর্য উঠলে নিজ নিজ কাজে বেরিয়ে পড়েন মালয়েশিয়ানরা।

রমজানে ইরানে ৩ দিনের শোক

শিয়া মুসলিমের দেশ ইরান। দেশটিতে বিভিন্ন আয়োজনের মাধ্যমে পালিত হয় মাহে রমজান। এই মাসেই শহীদ হয়েছিলেন হযরত আলী (রা.)। ১৯ রমজানে তিনি ছুরিকাঘাতে আহত হয়েছিলেন। এই ঘটনার দুই দিন পর ২১ রমজান তিনি শাহাদাতবরণ করেন। এই স্মৃতিকে ধরে রাখার জন্য নানা আয়োজনের মাধ্যমে তিন দিন শোক পালন করে ইরানিরা। অনেকে এ তিন দিনকে ‘লাইলাতুল কদর’ হিসেবে পালন করেন। কেউ কেউ প্রকাশ্যেও শোক কর্মসূচি পালন করে থাকেন। রমজান মাসে ইরানের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ থাকে। তবে, এই মাসটিতে ছাত্র এবং শিক্ষকরা বিশেষ দায়িত্ব পালন করেন। তারা দেশটির বিভিন্ন প্রত্যন্ত অঞ্চলে ঘুরে ঘুরে সাধারণ মানুষকে শরিয়ত এবং আধ্যাত্মিক বিষয়ে তালিম দেন। এই মহৎ কাজের জন্য তারা কোনো সম্মানী গ্রহণ করেন না। ইরানের ফকিহদের মতে কোনো ব্যক্তি মাত্র ১৭ কিলোমিটার ভ্রমণ করলেই সে মুসাফির হিসেবে গণ্য হবে। আর মুসাফিরদের জন্য রোজা রাখা ইরানি আলেমদের মতে হারাম। অধিকাংশ ইরানিই মাসব্যাপী ইতেকাফ করে থাকেন। সারা দিন অফিস করে মসজিদে রাত যাপন করে ইতেকাফ করেন তারা। ইতেকাফকারীদের খাবার মসজিদ কর্তৃপক্ষই সরবরাহ করেন।

তিউনিশিয়ায় আত্মীয়দের পুনর্মিলন

রমজানকে কেন্দ্র করে তিউনিশিয়ার ঘর এবং মসজিদগুলো সেজে ওঠে বর্ণিল সাজে। নারী পুরুষের পদচারণায় রাতদিন মুখরিত থাকে শহরের মসজিদগুলো। রমজানকে কেন্দ্র করে অনেকেই মসজিদের আশপাশে বাসা কিংবা হোটেল ভাড়া করেন। এভাবেই মাসজুড়ে মসজিদকেন্দ্রিক রোজা উপভোগ করেন তিউনিশিয়ার ধর্মপ্রাণরা। আসরের পর থেকে ইফতার পর্যন্ত রোজাদারদের জিকিরের দৃশ্য ভিন্ন পরিবেশ তৈরি করে শহরের মসজিদগুলোতে। ইফতার ও সাহরিতে সব আত্মীয়ের উপস্থিতি তিউনিশিয়ানদের বিশেষ বৈশিষ্ট্য। বছরের এ একটি মাসই তিউনিশিয়ার ঘরে ঘরে আত্মীয়দের পুনর্মিলন ঘটতে দেখা যায়।

জার্মানে দুই নিয়ম

ইউরোপের দেশ জার্মানি। মুসলিমপ্রধান দেশ না হওয়ায় সেখানে সরকারিভাবে রোজা শুরুর নির্দিষ্ট কোনো ঘোষণা করা হয় না। ফলে দেশটিতে অবস্থানরত মুসলিমরা দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে রোজা শুরু করেন। একদল মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে একই দিনে রোজা এবং ঈদ পালন করেন। অপর দল স্থানীয় সময়ের সঙ্গে মিল রেখে চাঁদ দেখে রোজা রাখেন। রমজান মাসে দেশটিতে মুসলিমদের মধ্যে শরিয়ত সংক্রান্ত বিষয়গুলোর চর্চা বেড়ে যায়। তাছাড়া ব্যস্ততার কারণে বছরের অন্য সময় আত্মীয় ও পরিবারের লোকদের খোঁজখবর নেওয়া এবং একত্রে বসে খাওয়া না হলেও রমজানজুড়ে একসঙ্গে সাহরি-ইফতার করতে চেষ্টা করেন।

নাইজেরিয়ায় সাহরিতে সিদ্ধ ভুট্টা

আফ্রিকার দেশ নাইজেরিয়ার মুসলমানদের মধ্যে প্রবল ইসলামি মূল্যবোধ লক্ষ করা যায়। তাই তাদের জীবনযাত্রায় রমজান মাসে তেমন বিশেষ কোনো পরিবর্তন লক্ষ করা যায় না। আমরা অনেকে ভাবি, দেশটির মানুষগুলো বর্বর প্রকৃতির। কিন্তু শুধু রমজান মাস নয়, বছরের পুরো সময়ই দেশটিতে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখা হয়। ওজনে কম দেওয়া, খাদ্যে ভেজাল মেশানো নাইজেরিয়ার মানুষরা কখনোই করেন না। এছাড়াও নাইজেরিয়ার মুসলমানরা পারতপক্ষে নামাজ রোজা ছাড়েন না। বছরের অন্যান্য সময়ের মতোই তারা নির্বিঘ্ন ইবাদতে রমজান কাটিয়ে দেন। সাহরি ও ইফতারে কোনো বিশেষ আয়োজন থাকে না তাদের। একটি সিদ্ধ ভুট্টা ও এক গ্লাস পানি দিয়েই সাহরি পর্ব সারেন অধিকাংশ নাইজেরিয়ান। নাইজেরিয়ার তরুণরা কঠিন অসুখ নিয়েও রোজা ছাড়তে রাজি নন।

দীর্ঘ রোজা যেসব দেশে

স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশ আইল্যান্ডে হাতেগোনা মুসলিমের বসবাস। তবে, দেশটির প্রায় আটশো মুসলমানের কাছে রোজার একটি বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। সংযমের দিক থেকে তারা পৃথিবীর অন্য সব মুসলমানদেরকেই ছাড়িয়ে যান।

কারণ, তারা তাদের সময় অনুসারে, রাত ২টায় সাহরি খেয়ে পরের দিন রাত ১২টায় ইফতার করে। এ হিসাব অনুযায়ী, আইসল্যান্ডের মুসলমানদের রোজা হবে ২২ ঘণ্টা। যা বিশ্বের যে কোনো মুসলমানদের চেয়ে ঢের বেশি।

প্রায় ৫ লাখ মুসলমানের বসবাস সুইডেনে। গ্রীষ্মের রোজা সুইডেনদের জন্য সবচেয়ে কঠিন। ইফতার করার মাত্র চার ঘণ্টা পর সাহরি খেতে হয় তাদের। অর্থাৎ সাহরি খাওয়ার পর ২০ ঘণ্টা উপোস থাকার পর ইফতার করেন সুইডেনের মুসলমানরা।

আলাস্কায় সূর্যোদয়ের ১৯ ঘণ্টা ৪৫ মিনিট পর সূর্য ডোবে। এ পুরো সময়টা রোজা রাখতে হয় এখানে বসবাসরত মুসলিমদের। তবে, ওই এলাকার অনেক মুসলিমই সৌদি আরবের সঙ্গে মিল রেখে সাহরি ও ইফতার করেন। গরমের কারণে দীর্ঘ সময় রোজা রাখা কষ্টকর হওয়ায় তারা এমনটি করেন।

আলাস্কার মুসলমানদের চেয়ে ৪৫ মিনিট কম রোজা রাখেন জার্মানীর মুসলমানরা। অর্থাৎ ১৯ ঘণ্টা। রাত ৩টায় সাহরি খেলে পরদিন রাত ১০টায় ইফতার করেন তারা।

ইংল্যান্ডে রোজা রাখাও খুব কষ্টকর। জার্মানির মুসলমানদের চেয়ে মাত্র পাঁচ মিনিট কম অর্থাৎ ১৮ ঘণ্টা ৫৫ মিনিট রোজা রাখেন ইংল্যান্ডের ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা। দেশটিতে অবস্থানরত মুসলিমদের মধ্যে ডায়াবেটিস একটি সাধারণ সমস্যা। তাই এত দীর্ঘ সময় রোজা রাখা তাদের জন্য বেশ কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে।

বিজ্ঞাপন

সংশ্লিষ্ট বিষয়

রমজান

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0179 seconds.