• ০৪ মে ২০১৯ ১৯:৫৩:৩৪
  • ০৪ মে ২০১৯ ২০:০৪:০২
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

আলুপোড়া খাওয়া লোক ও চিকিৎসক বৃত্তান্ত


আমিনুল হক শাহীন :


আলুর গুদাম পুড়লে আলুপোড়া খাওয়া লোকের অভাব হয় না। আমাদের ডাক্তারদের কিছু কিছু ঝামেলায় এমন আলুপোড়া খাওয়া লোকের প্রচুর আনাগোনা দেখি। ডাক্তারি পাশ করার পরে কখনো ডাক্তারি করেন নাই বা ক্লিনিকাল, বেসিক বা একাডেমিক এমন কোনো দায়িত্বের সাথে সম্পর্কও নাই; এমনকি পেশাগত রাজনীতির সাথেও কখনো সংশ্লিষ্ট না এমন অনেককেই হুট হাট ফেসবুকে এসে জ্বালাময়ী একটা স্ট্যাটাস দিয়ে চলে যেতে দেখি।

জ্বালাময়ী স্ট্যাটাস আমাদের ক্যারিয়ার নিয়ে, চাকুরী নিয়ে, সংসার নিয়ে হিমশিম খাওয়া ইয়াং ডাক্তারদের আরও হতাশ ও ডিমোরালাইজড করে দেয়। তারা ঘোষণা দিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে নেমে পরে। যুদ্ধক্ষেত্র বলতে ফেসবুক আর যুদ্ধের অস্ত্র বলতে কি-বোর্ড!!!

ইয়াং ডাক্তাররা তাদের প্রতিবাদ অনেক ক্ষেত্রেই বর্তমান নিয়ে হতাশা আর ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকে করে থাকেন। সেকারণেই তাদের ভাষা কখনো কখনো মার্জিতও হয় না। আবার এই হতাশার কারণেই কিছু কিছু যৌক্তিক ক্ষেত্রে আন্দোলন বা দাবী আদায়ের জন্য জুনিয়র বা ইয়াং ডাক্তারদের যতটুকু ডেডিকেশন দরকার ততটুকুও থাকে না।

যেটা বলছিলাম, আলু পোড়া খাওয়া স্ট্যাটাস নিয়ে। আলু পোড়া খাইতে আসা দুই একজন স্ট্যাটাসজীবীদের সাথে আমার কিছু খাতিরও আছে। তাদের সাথে কথা যে একদম হয় না তাও না। কাউকে কাউকে বলতে শুনেছি “ডাক্তারিতে না থেকে খারাপ করেছি কি! অতো কষ্ট করে ক্যারিয়ার গড়ে সারাদিন সারা রাত রোগী দেখতে হতো। তাতে লাইফ বলে কি কিছু থাকতো?”

আমার কাছে আলু পোড়া খাওয়া স্ট্যাটাসের চারটি উদ্দেশ্য মনে হয়েছে। ১। প্রকৃত পক্ষেই নিজের ডাক্তার সতীর্থদের, জুনিয়রদের বিপদে এগিয়ে এসে সাহায্য করা, ২।  যারা ক্লিনিকাল পেশায় আছে বা আসার চেষ্টায় আছে তাদেরকে পরোক্ষভাবে বোঝানো যে, দেখে যাও ‘তুমি কত কষ্ট পাও রোদ-বৃষ্টি-ঝড়ে, আমি কত সুখে আছি অট্টালিকা পরে’ ৩। বন্ধু বান্ধব বা সিনিয়র-জুনিয়র যারা পেশাগত রাজনীতি করে ভাব টাব নিয়ে আছে, কারো কারো মতে লেজুড় বৃত্তিক রাজনীতি, তারা যে কোন কাজেই আসে না নিজের পেশার লোকের জন্য, তা বোঝানো  ৪। নিজেরাও একটু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বা অনলাইনে আলোচনায় থাকা।

হঠাত করে এসে জ্বালাময়ী স্ট্যাটাস দেয়া ডাক্তারদের অনেকেই ভিন্ন পেশাতে গিয়ে  সফল বা অনেকে আবার সেলিব্রিটি। এদের অনেকেরই প্রচলিত পেশাগত রাজনীতির সাথে বিন্দুমাত্র সম্পর্কও নাই। সম্পর্ক না থাকার কারণে জুনিয়র বা সিনিয়র কারো কাছে কোন দায়বদ্ধতাও নাই। এরকম দায়বদ্ধতা ছাড়া স্ট্যাটাস শ্রেণীতে শ্রেণীতে অবিশ্বাস ছড়ায়।

ডাক্তারদেরকে কখনো সাংবাদিক, কখনো পুলিশ বা কখনো প্রশাসনের বিপক্ষে দাঁড় করিয়ে দেয়। এমনকি কোন কোন ক্ষেত্রে জনগণেরও বিপক্ষে চলে যায় ডাক্তার সমাজ। অথচ ডাক্তারি পেশা কিন্তু জনগণ থেকে আইসোলেটেড কোন পেশা নয়। যেমনটি হয়ে থাকে বিচারপতিদের ক্ষেত্রে, তাদেরকে সাধারণ পাবলিকের সংস্পর্শে যাতে না আসতে হয় সেজন্য বাজারে যেতেও মানা করা হয়। ডাক্তাররা জনগণের ভিতর থেকে তৈরি হয় জনগণের জন্যই। তাই ভিন্ন শ্রেণী বা পেশার সাথে বৈরী মনোভাব ডাক্তারদের জন্য কখনোই মঙ্গল বয়ে আনবে বলে মনে হয় না আমার কাছে।

ছোটবেলায় একটা জিনিস দেখতাম, মনে হয় ব্যাপারটা এখনো সেই রকমই আছে। ফরিদপুরের উপর দিয়ে বরিশালের বাসকে ঢাকায় বা যশোরে যেতে হয়। তাই ফরিদপুর বাসস্ট্যান্ড সব সময় একটা আপারহ্যান্ড নিয়ে থাকে বরিশাল বাসের উপর। উল্টাপাল্টা কিছু করলেই ওরা বরিশালের বাস বন্ধ করে দেয়। তখন বরিশালের বাস সমিতি কিন্তু ফরিদপুরকে ধরে না, ওরা গিয়ে লিয়াজো করে রাজবাড়ির বাস সমিতির সাথে। কারণ ফরিদপুরের ঢাকাগামী বাস যায় রাজবাড়ির উপর দিয়ে। রাজবাড়ির বাস সমিতি তখন যেকোন অজুহাতে ফরিদপুরের ঢাকাগামী বাস দেয় বন্ধ করে। তখন তিন পক্ষ মিলে সমস্যার সুরাহা করে। জামালপুরে রোগী মারা গেলে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী চলে আসেন বা নড়াইলে ডাক্তার না থাকলে এলাকার এমপি হাসপাতাল পরিদর্শনে আসেন ব্যাপারটা সেরকম হতে পারে বলে আমার ধারণা। সেজন্য আমার মনে হয় ডাক্তারদের আরও সতর্ক ও দায়িত্বশীল হতে হবে।

সৃষ্টির আদি থেকে ডাক্তারি একটা মহান পেশা। সৃষ্টির আদি থেকেই ডাক্তারি সেবামূলক পেশা, সামরিক বা প্রশাসনিক পেশা নয়। এ পেশায় ক্ষমতা না, আছে ডিগনিটি। এটা জেনে ও বুঝে এবং মেনে নিয়েই মানুষ ডাক্তারিতে আসে। ডাক্তার সেবা প্রদান করবে আর সরকার ও নিয়োগকর্তা ডাক্তারদের সেবার পরিবেশ ও সম্মান নিশ্চিত করবে। ভয় ভীতি বা বন্দুক ঠেকিয়ে কারো কাছ থেকে টাকা ছিনিয়ে নেয়া যায়, কাউকে সারাদিন টেবিলে বসিয়ে রাখা যায় কিন্তু যথাযথ পরিবেশ নিশ্চিত না করে কারো কাছ থেকে প্রকৃত সেবা আশা করা দুষ্কর। আশা করি যথাযথ কর্তৃপক্ষ এ দিকে নজর দিবেন। দায়িত্বশীল লোকজন ঢালাওভাবে ডাক্তারদের দোষারোপ না করে সমস্যার গভীরে ঢুকে প্রকৃতই সমস্যার সমাধানের চেষ্টা করবেন এ বিশ্বাস রাখি। পরিশেষে ৩৯তম বিশেষ বিসিএস এ নিয়োগপ্রাপ্ত সকল ডাক্তারকে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন। তোমাদের সামনে ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ এবং তোমরাই পারবে।

লেখক : এমবিবিএস, পিএইচডি, চিকিৎসক, গবেষক, রাজনীতিক।

বিজ্ঞাপন

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0197 seconds.