• বাংলা ডেস্ক
  • ২৪ এপ্রিল ২০১৯ ২২:৫২:৪০
  • ২৪ এপ্রিল ২০১৯ ২২:৫২:৪০
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

বাঙালি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মমতাকে দেখতে চাই : কবীর সুমন

কবীর সুমন। ছবি : সংগৃহীত

 

কবীর সুমন। ভারতের বাঙালি। জন্ম ১৯৪৯ সালের ১৬ মার্চ, ভারতের ওড়িশায়। গায়ক, গীতিকার, অভিনেতা, সাংবাদিক ও সংসদ সদস্য। ২০০০ সালে ধর্মান্তরিত হয়ে সমস্ত বাংলায় আলোচিত হন। বিয়ে করেন বাংলাদেশের শিল্পী সাবিনা ইয়াসমিনকে। উনার পূর্বনাম সুমন চট্টোপাধ্যায়।

তিনি মনে মনে মার্কসবাদী, আবার মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়েরও ভক্ত। ২০০২-এর গুজরাটের দাঙ্গা, ২০০৬-এ নন্দীগ্রামের জমির লড়াই, সিঙ্গুর ইত্যাদি নিয়ে গান বেঁধেছেন। অনেক ক্ষেত্রে সশরীরে অংশ নিয়েছেন আন্দোলনেও। পরে যোগ দেন রাজনীতিতে, মমতা বন্দোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেসে। তৃণমূলের প্রার্থী হিসাবে ২০০৯ সালে সাধারণ নির্বাচনে বিজয়ী হন। তিনি স্বীকার করেন, তাঁর মধ্যে স্ববিরোধ রয়েছে। তিনি সোচ্চারে বলেন, “আমি রাজনীতির মানুষ না হলেও, রাজনৈতিক মানুষ”। তাঁর গান কখনও অন্যায় সন্ধি করে না। বরং বরাবরের অভ্যাস, সময়ের কথা বলা। দুই বাংলায় সমান জনপ্রিয় এ গায়ক বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্রের সাধারণ নির্বাচনের মওশুমে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস বাংলা-কে একান্ত সাক্ষাৎকারে এই সময়ের রাজনীতি প্রসঙ্গে অনেক কথা বলেছেন-

আজকের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে যদি ‘আমি চাই’ গানটি লিখতেন, তাহলে কোন ইচ্ছার কথা সর্বাগ্রে বলতেন?

বিজেপি-আরএসএস বিদায় হোক এই দেশ থেকে। যতদিন না ওরা এই অদ্ভুত, বিসদৃশ, অযৌক্তিক জাতিবিদ্বেষ, বর্ণবিদ্বেষ, জাতপাতের হিসেব – এগুলি বন্ধ করছে, ততদিন… তবে বলে রাখি, আমার কিন্তু বিজেপিতে বেশ কয়েকজন বন্ধু রয়েছেন।

তাই! কবীর সুমনের বিজেপি বন্ধু!

আজ্ঞে (চোখে মুখে চেনা হাসি)

আপনার এই বন্ধুরা কি জাতীয় স্তরের বিজেপি নেতা, না কি…

(প্রশ্ন শেষ না করতে দিয়েই) না না, জাতীয় স্তরের। এখানে কেউ নেই (গলায় পরিচিত তাচ্ছিল্য)।

বঙ্গ বিজেপি-তে কি বন্ধুতুল্য কাউকে পান না?

ধুর…(ফের তাচ্ছিল্য, এরপর কয়েক সেকেন্ড ভাবলেন) তবে এখানে একজনকে আমার ভাল লাগে। তিনি হলেন রাহুলবাবু। মানে, বিজেপির প্রাক্তন রাজ্য সভাপতি রাহুল সিনহা। ওঁর সঙ্গে বেশ কিছু আলোচনা সভায় যোগ দিয়েছি, ঠান্ডা মাথায় বেশ যুক্তিগ্রাহ্য কথা বলেন উনি। আশা করি তিনি ভাল আছেন।

বিজেপি-তে আপনার বন্ধু তালিকাটা একটু বলবেন?

বরুণ গান্ধী আমার খুব স্নেহের। তথাগত সতপথি, অর্থাৎ ওড়িশার প্রাক্তন কংগ্রেসি মুখ্যমন্ত্রী নন্দিনী সতপথির পুত্র। তথাগত অসম্ভব মেধাবী ছেলে। এছাড়া, আমার বিশিষ্ট বন্ধু কীর্তি আজাদ। তিনিও বিজেপি-তেই ছিলেন। যদিও আমি শুনেছি, কীর্তি কংগ্রেসে চলে গিয়েছেন। এমন একটা সিদ্ধান্তের জন্য তাঁকে আন্তরিক অভিনন্দন জানাচ্ছি। অর্থাৎ এমনটা কিন্তু নয় যে বিজেপিতে ভাল মানুষ নেই। পার্লামেন্ট করে আমার একটা উপলব্ধি হয়েছে, যে দেশটা আসলে খারাপ না। এ দেশের বহু খামতি রয়েছে, কিন্তু ব্যবস্থাটাকে যদি কেউ ভালভাবে ব্যবহার করতে পারেন, তাহলে সাধারণ মানুষের অপকার হবে না। আমি কখনও (সাংসদ থাকাকালীন) আমার এলাকার প্রয়োজনে কোথাও গিয়ে খালি হাতে ফিরিনি। প্রত্যেকে আমার কথা শুনেছেন। তবু, আমার একাধিক বন্ধু ওই দলে থাকা সত্ত্বেও বলব, বিজেপি দলিত বিরোধী, মুসলিম বিরোধী, বড়লোককে তোয়াজ করা দল। তাই বিজেপি-কে চাই না।

আপাতত আপনার এই একটাই চাওয়া?

হ্যাঁ, একটাই চাওয়া। বন্ধু, বিজেপিকে রুখতে হবে। একই সঙ্গে সরাসরি বলছি, পশ্চিমবঙ্গে বিজেপিকে হঠাতে গেলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দলকে ভোট দিতে হবে। অর্থাৎ বিজেপিকে সিরিয়াসলি সরাতে গেলে মমতাকে ভোট দেওয়া ছাড়া উপায় নেই। ভোট ভাগাভাগি চলবে না। আমি যে খুব তৃণমূলপন্থী, তা কিন্তু না। তবে এই ভোটে বিজেপিকে রুখতে মমতার হাত শক্ত করতেই হবে, এটাই বাস্তবতা। আবার এই রাজ্যেই এক রাজনীতিক আছেন, আমি তাঁকে খুব পছন্দ করি এবং চাই তিনি জিতুন।

কে তিনি?

দীপঙ্কর ভট্টাচার্য। সিপিআই (এমএল লিবারেশন)-এর নেতা। অসাধারণ পণ্ডিত ব্যক্তি, একাধিক ভাষা জানেন, এবং চূড়ান্ত রসবোধ সম্পন্ন মানুষ। আমার মনে হয়, ওঁর মতো মানুষকে যদি ভারতের রাজনীতিকদের মধ্যে পাওয়া যেত…আহা! শুনেছি, দুটি কেন্দ্র থেকে (কৃষ্ণনগর ও হুগলি) লিবারেশন লড়ছে। আমি চাই, ওই দুই কেন্দ্রে ওরা জিতুক।

সে কি! এই তো বললেন, এ রাজ্যে মমতাকে ভোটে জেতানোই বাস্তবতা! তাহলে?

আমি জানি, এই প্রশ্নটাই উঠবে। কারণ আমি স্ববিরোধী কথা বললাম। তবু বলব, ওই দুটি কেন্দ্রে ওরা জিতুক। দীপঙ্করের হাসিমুখ আমি দেখতে পাব কি না জানি না। কিন্তু, আমি দেখতে চাই। এটা যে আমার ব্যক্তিগত প্রণয়ের জায়গা থেকে বলছি তা নয়। আমি মনে করি, দীপঙ্করের মতো মানুষকে দরকার।

কিন্তু…

আমি জানি, আমার ইনকনসিসট্যান্সি আছে। এইটাই আমি। দেখুন, আমি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভক্ত। আমার মায়ের পর এমন ডায়নামিক মহিলাই আর দেখিনি। সাংঘাতিক ডায়নামিক মহিলা। ‘ফেনোমেনান, সো ফুল অফ কনট্রাডিকশনস’। শুনেছি, কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে অতিথি খাতায় রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, “মাই গ্রেটেস্ট ভারচু অ্যান্ড মাই গ্রেটেস্ট ভাইস, দ্যাট ইজ মাই ইনকনসিট্যান্সি”। আমার নিজেরও তাই। মমতা এটা শুনলে হয়ত রেগে যাবে, কিন্তু মমতারও তাই।

আপনি কি তৃণমূলে আছেন?

দেখুন, আমি তৃণমূলের নেতা নই। প্রার্থী হওয়ার আগে সদস্যপদ গ্রহণ করেছিলাম। সাংসদ পদ চলে যাওয়ার পরই আমি ইস্তফা দিই বন্ধু মুকুল রায়ের কাছে। কিন্তু, তৃণমূল দলটাকে আমার ভাল লাগে। দলটার মধ্যে একটা ভাইব্র্যান্ট ডেমোক্রেসি আছে। প্রচুর ঝগড়া হয়, ওটাই গণতন্ত্রের লক্ষণ। সিপিএম আমলে কোথাও কোনও গণ্ডগোল হলে, চোখটা একটু টেরিয়ে বলা হত, “আপনাকে একটু পার্টি অফিসে আসতে হবে।” এগুলো শুনলে ঠাটিয়ে একটা চড় মারতে ইচ্ছা করে। তৃণমূল কিন্তু কারও সঙ্গে এমনটা করে না। ফলে, আমার চোখে সামাজিক আচরণগত দিক থেকে কংগ্রেস এবং তৃণমূল অনেক ঠিকঠাক।

আর মতাদর্শের দিক থেকে?

জানি, আমি যা বলব তা দ্বান্দ্বিক বলেই মনে হবে। তবু বলব, আমি নিজেকে মার্কসবাদী বলেই মনে করি। আমি এও মনে করি, শেষ পর্যন্ত একটা মোর্চা তৈরি হবে (দু’চোখ স্বপ্নালু)। সেখানে দীপঙ্কর ভট্টাচার্যের মতো মানুষ, কানহাইয়ার মতো যুবক নেতৃত্ব দেবেন…

কানহাইয়া কুমারকে আপনার কেমন লাগে?

আমি কানহাইয়াকে প্রধানমন্ত্রী দেখতে চাই। ভারতের বর্তমান জনবিন্যাস অনুযায়ী, পঁয়ত্রিশ থেকে চল্লিশের মধ্যে যাঁদের বয়স, তাঁদের হাতেই নেতৃত্ব তুলে দিতে হবে। আমি চাই, অখিলেশের মতো ছেলেরাও সামনে এগিয়ে আসুন।

কানহাইয়া-অখিলেশদের নিয়ে আপনি এই যে যুব ব্রিগেডের স্বপ্ন দেখছেন, সেখানে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কেও দেখতে চান?

আমি না, ওঁকে ঠিক চিনি না। তাই, বলতে পারব না। ওঁর কাজকর্ম সম্পর্কে ঠিক ওয়াকিবহাল নই। কিন্তু, অখিলেশবাবুর কাজকর্ম সম্পর্কে জানি। রাহুল গান্ধীর কাজ সম্পর্কে আমি ওয়াকিবহাল।

রাহুল গান্ধী সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কী?

খুবই ভাল লাগে ছেলেটাকে। গোড়ার দিকে ওঁকে একটু উদ্ধত মনে হত। পরে বুঝেছি, ওটাই ওঁর রক্ষণের কায়দা। আসলে সারাক্ষণ মানুষ ওঁর উপরে হামলে পড়ত। ইদানিং উনি যেসব কথা বলছেন, তা শুনে বেশ ভাল লাগছে। তবে এই যে হঠাৎ করে প্রিয়াঙ্কা চলে এলেন, এটা ঠিক না। গুষ্টিশুদ্ধু রাজনীতিতে ঢুকে পড়ার এই প্রবণতাটা ভাল লাগে না। কাজের লোক রাজনীতিতে থাক। এই যেমন ধরুন, শুভেন্দু অধিকারী। বাপের ব্যাটা, লড়াকু ছেলে। শুভেন্দু হলেন সঠিক মানুষ, যিনি রাজনীতিতে আছেন।

এই মুহূর্তে আপনার প্রথম চাওয়া যদি আরএসএস-বিজেপিকে রুখে দেওয়া হয়, তাহলে দ্বিতীয় ইচ্ছাটা কি যুব ব্রিগেড?

অবশ্যই। আমি স্বপ্ন দেখি, এমন একটা তরুণ-তরুণীদের দল নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তবে, অন্যদিকে আবার আরেকটা চাওয়াও রয়েছে। জানি, আমি এ কথা বললেই বলা হবে, আমি দিক বুঝে কথা বলছি। কিন্তু, ব্যাপারটা তা না…

কী সেই কথা?

ঠিক যেমন এক সময় মনে হয়েছিল, এক বাঙালি রাষ্ট্রপতি হিসাবে প্রণব মুখোপাধ্যায়কে দেখতে চাই, তেমনই এখন আমি বাঙালি প্রধানমন্ত্রী হিসাবে মমতাকে দেখতে চাই। আমি ভীষণ খুশি হব। আর এখানেই একটা প্যারোকিয়াল জায়গা চলে এল। আমি স্বীকার করে নিচ্ছি।

কেন, প্যারোকিয়াল কেন? ‘দরকার হলে আমি ভীষণ প্রাদেশিক’ – সেই ব্যাপারটা?

মমতা আমার ছোট বোন, একসঙ্গে লড়াই করেছি। তাই মমতাকে প্রধানমন্ত্রী দেখতে চাই। তবে, মমতার ক্ষেত্রে আমার সবচেয়ে যেটা বেশি ভাল লাগে তা হল ওঁর ব্যক্তিত্ব। কারও পরোয়া না করে সোজাসুজি কথা বলছেন। যেমন ধরুন, ও প্রথম যখন দার্জিলিঙে গেল (মমতাকে সুমন ‘তুমি’ সম্বোধন করেন), তখন মঞ্চে উঠে বলল, “আগে যো সরকার থা, রাজ্যকা বারোটা বাজাকে চলা গিয়া”। নিজের হিন্দিতে উনি যা বলেছেন, সত্যিই তো তাই। কিন্তু, এইটা বলার জন্য একজনই আছেন ভারতে, তাঁর নাম মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।

আপনি কি সত্যিই মনে করেন, ভারতের মতো এমন বিরাট ও বৈচিত্রপূর্ণ একটা দেশ মমতা চালাতে পারবেন?

(প্রশ্নটি শুনে অত্যন্ত খুশি) শুনুন, মেয়েটি কালীঘাটের এক এঁদো গলি থেকে উঠে এসেছে। আমি মমতাকে পার্লামেন্টে রেল বাজেট পেশ করতে দেখেছি। বিরোধী সাংসদরা যখন মমতার বক্তৃতায় বারবার ব্যাঘাত ঘটিয়ে বলছেন, উনি যা করার কেবল বাংলার জন্যই করেছেন, সেই সময় মমতা থেমে যায় এবং তার নিজস্ব উচ্চারণ এবং ভঙ্গিমায় দক্ষিণ ও পশ্চিম ভারতের নয়া রেল প্রকল্পগুলি এক এক করে উল্লেখ করতে থাকে। এ সময় মমতার সামনে কোনও কাগজ বা নথি কিছুই ছিল না। গোটাটাই ওর মাথায় রয়েছে। অসম্ভব মেধাবী। সামগ্রিক পরিস্থিতিটা ও মুহূর্তে নিজের অনুকূলে নিয়ে আসে। ব্রিলিয়ান্ট! মনে রাখবেন, ভারতের রেল বাজেটের যা ব্যাপ্তি, তা এই বিশ্বের বহু দেশের জাতীয় বাজেটের থেকেও কয়েক গুণ বেশি। অর্থাৎ এই বিষয়টি সেদিন মমতা যে পরিণত বোধ ও মেধাবী কায়দায় সামলাল, তখন থেকেই আমি বুঝেছি ও পারবে।

ভোটের হাওয়া কী বুঝছেন? কী ফলাফল হতে চলেছে?

বলা খুব মুশকিল। তবে বুঝলেন, বিজেপি হারবে। আর যদি পুরোপুরি না হারে তাহলেও সরকার গড়ার জন্য নিরঙ্কুশ গরিষ্ঠতা পাবে না। আসলে কী জানেন, ওরা যা করেছে, সে জন্যই আর ভোট পাবে না। ওদের ইতিহাসই ওদের আটকে দেবে। এই দেশটাকে বহু দিন ধরেই আমার আর নিজের দেশ মনে হয় না। নাম পরিবর্তনের জন্য সংখ্যাগুরুর গালিগালাজ শুনতে হয় আমাকে। ফলে এই দেশটা আর আমার না। বলতে পারেন, আমার দেশ হল এই বৈষ্ণবঘাটা বাই-লেন (কবীর সুমনের পৈতৃক বাড়ি)। আচ্ছা বলুন তো, এ দেশে যৌবনের প্রতীক কেন (ফুটবল কিংবদন্তী) গোষ্ঠ পাল নন? কেন পাগড়ি মাথায় দেওয়া ধর্মীয় বিবেকানন্দ যৌবনের প্রতীক হবেন?

বিজেপি-কে নিয়ে আপনি অত্যন্ত বিরক্ত। এই নির্বাচনে সরাসরি লড়তে পারছেন না বলে কি আক্ষেপ হয়?

না, না, বিশ্বাস করুন, দল বিষয়টাই আমি পছন্দ করি না। কারণ, সেই দলটা কোথায়, যেটাকে আমি আমার দল বলতে পারব (গলায় আক্ষেপ স্পষ্ট)? আমি চাই সেই দল, যা শুধু পণ্ডিত আর বিশ্লেষক দিয়ে চলবে না। বরং, প্রেমিকের দৃষ্টি দিয়ে দেখবে দেশটাকে। মমতার উপর আমার সবচেয়ে বেশি রাগ হয়, ও আমাকে ভোটে দাঁড় করিয়েছিল বলে। আবার আমি সবচেয়ে বেশি কৃতজ্ঞ কারণ ও আমাকে ভোট করিয়েছিল বলেই আমি গ্রামে গেলাম, এলাকাটা চিনতে শিখলাম।

আপনার প্রাক্তন কেন্দ্রে এবার যিনি তৃণমমূল প্রার্থী, অর্থাৎ মিমি চক্রবর্তীর সঙ্গে কথা হয়েছে?

না। তাঁর সঙ্গে আমার আলাপ নেই।

লোকসভা কেন্দ্র হিসাবে যাদবপুর বরাবরই বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। বিশেষত যাঁরা এখান থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন তাঁরা সব হেভিওয়েট। সেই কেন্দ্রে মিমিকে প্রার্থী হিসাবে কেমন লাগছে?

মমতা যখন মিমি দেবীকে প্রার্থী করেছে, তখন নিশ্চয়ই কিছু একটা ভেবে করেছে। আমি মমতার বিবেচনার উপর ভরসা রাখি। আর যাঁরা মিমির প্রার্থীপদ নিয়ে তামাশা করছেন, তাঁদের মনে করিয়ে দিতে চাই, দক্ষিণ ভারত থেকে বহু অভিনেতা-অভিনেত্রী রাজনীতিতে এসে চূড়ান্ত সফল হয়েছেন। তাছাড়া, আমি নিজে দেখেছি, শতাব্দীকে। তিনিও তো সিনেমা জগৎ থেকে রাজনীতিতে এসেছেন, অথচ বেশ ভাল রপ্ত করে নিয়েছেন রাজনীতির আদবকায়দা। ফলে, মিমিকে প্রার্থী করার মধ্য দিয়ে মমতা হয়ত ফের ক্ষমতায়নের পথে হাঁটল। হয়ত একটা নতুন ব্যক্তিত্বের বিকাশ ঘটবে। নয়া সম্ভবনার দরজা খুলে যাবে। আবার বিষয়টাকে অন্যভাবেও ব্যাখ্যা করা যেতে পারে…

অন্য রকম ব্যাখ্যাটা কী?

ম্যাকিয়াভেলিয়ান দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিষয়টাকে কেউ দেখতে পারেন। তাঁরা হয়ত ভাবতে পারেন, মমতা এমন একজনকে প্রার্থী করলেন যিনি কখনও দলনেত্রীর বিরুদ্ধে মুখ খুললেন না (মুখে ইঙ্গিতপূর্ণ হাসি)।

মিমি তাঁর পূর্বসুরির থেকে কোনও টিপস চাইলে সাহায্য করবেন আপনি?

আমার মনে হয় না, আমার থেকে কেউ কিছু চাইবে টাইবে বলে।

বলছি, কারণ আপনি ২০০৯ সালে যাদবপুরে যে লড়াইটা লড়েছিলেন, সেটা রাজনৈতিকভাবে রীতিমতো কঠিন ছিল।

ওরে ব্বাবা! সে ভীষণ কঠিন লড়াই ছিল। সে কেবল আমি জানি, আর আমার সে সময়ের তৃণমূলের লড়াকু বন্ধুরা জানেন। তাঁরা সব খুদ খেয়ে বড় হওয়া ছেলেপুলে। মানে, চাল জুটত না তাঁদের। আজ শুনি, তৃণমূলের হাতে পয়সা টয়সা এসেছে। কিন্তু, তখন তো কিছুই ছিল না। আমরা জান লড়িয়ে দিয়েছিলাম। আর অন্যদিকে সিপিএম কুৎসা করেছে আমাদের বিরুদ্ধে। এসএফআই দেওয়াল লিখেছিল, ‘কবীর সুমন এইচআইভি টেস্ট কর’। অথচ আমি বলেছিলাম, একটাও অরাজনৈতিক ব্যক্তি আক্রমণের পথে যেন তৃণমূল না হাঁটে। আমরা হাঁটি নি, এবং সিপিএম-কে হারিয়ে দিয়েছি। সিপিআই(এম) একটা নির্লজ্জ দল।

এ রাজ্যে বিজেপি-কে দ্বিতীয় রাজনৈতিক শক্তি হিসাবে মানেন আপনি?

বাংলায় তৃণমূলের আদৌ কোনও প্রতিপক্ষ আছে বলে আমি মনে করি না। বিজেপি একটা বোকা বোকা দল। গায়ে পড়ে চারটি বাজে কথা বলা ছাড়া ওদের আর কোনও কাজ নেই। দেখুন, বিজেপিকে আমি একটা সিরিয়াস রাজনৈতিক দল হিসেবে মানতেই পারছি না। কারণ, ওরা জাতিবিদ্বেষী কথা বলে। ওরা এই অঞ্চলে কাজ করতে পারবে? এখানে ৬০ শতাংশ মুসলিম জনবসতি। এরপর আমি যখন নামব ময়দানে, ওরা কি পারবে? (চোখে মুখে লড়াইয়ের অভিব্যক্তি)

আপনি ময়দানে নামবেন?

মমতা বললেই নামব। আমি বক্তৃতা করব।

তেমন আহ্বান কি এসেছে?

না, আসে নি। কিন্তু এমন ডাক এলে আমি খুব খুশি হব। পুরানো দিনের গণ আন্দোলনের মানুষগুলির সঙ্গে দেখা হবে। তাছাড়া, উন্নয়নের কাজ মমতা যা করেছে, সে সবের জবাব নেই। ভাই, আমি ১৪ বছর ইউরোপ, আমেরিকায় থেকেছি। আমি সোশ্যালিস্ট দেশও দেখেছি, নিকারাগুয়ার বিপ্লবও দেখেছি। তারপর বলছি, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যা কাজ করেছে, যেমন হাসপাতাল গড়ে দিয়েছে, পাশ্চাত্যেও তেমন হাসপাতাল নেই। হয়ত সুইডেন-হল্যান্ডে থাকতে পারে, কিন্তু ইংল্যান্ডে নেই। আমেরিকাতে তো নেইই। এই যে মমতা কন্যাশ্রী করেছে, সবুজসাথীতে সাইকেল দিয়েছে। এর ফলে বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটে গিয়েছে।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রাজ্যে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছেন?

অবশ্যই। মমতা বৈপ্লবিক বদল নিয়ে এসেছে। বিপ্লব কেবল মার্কস বা লেনিন বা মাও-এর তত্ত্ব অনুযায়ী করতে হবে, তার তো কোনও মানে নেই। সরকার হিসাবে না, মানুষ দেখেছেন মমতা কাজ করেছে। ফলে, ভোটে মানুষ মমতাকে খালি হাতে ফেরাবেন না বলেই আমি আশা করি।

আপনি বলছেন, মমতা রাজ্যে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছেন এবং মানুষ তাঁকে ভোটে ফেরাবেন না। তাহলে রাজ্যে এ মুহূর্তে প্রকৃত কোনও রাজনৈতিক লড়াই নেই?

বিজেপি আর সিপিএম নেগেটিভ লড়াই লড়ছে। নিন্দেবাচক লড়াই। ভাবতে পারেন, ওদের আক্রমণের বিষয়, হাওয়াই চটি! আমি তাই ওদের সিরিয়াসলি নিতেই পারছি না (কণ্ঠে তাচ্ছিল্য)। আর মমতা যা কাজ করেছে, তাতে মমতা লাইক অ্যা ক্যুইন বসে থাকতে পারে। আমি যদি মমতা হতাম, তাহলে বসে বসে শুধু হাসতাম। ওর এখন উচিত সম্রাট শাহজাহানের মতো সিংহাসনে বসে থাকা।

তাহলে মমতা সেটা করতে পারছেন না কেন?

মমতা আসলে কাজ না করে থাকতে পারে না। ওর বোধহয় একটা অদৃশ্য হুল ফোটে। সব কাজ ঠিকঠাক হচ্ছে কি না, এটা দেখাই মমতার অভ্যাস। তৃণমূলে আসলে একটা ভাইব্র্যান্ট ডেমোক্রেসি আছে বলেই এটা করতে হয়। জানেন, সোনারপুরে সিপিএম থেকে তৃণমূলে আসা কয়েকজন কৃষক একবার আমায় বলেছিলেন, “স্যার আপনি তো এই রাজনীতি করেন না। আপনি তো বিপ্লবী ধরনের মানুষ। কিন্তু আপনাকে যদি এই দলটা করতে হয়, তাহলে রেজিমেন্টেড পার্টি করতে হবে।” আমারও আজ মনে হয়, এখানে রেজিমেন্টেশন থাকলে ভাল হত। তবে তৃণমূলে সেটা হয়নি, আর হবেও না। কারণ, মমতা যেন রবীন্দ্রনাথের ‘খোলা হাওয়া লাগিয়ে পালে’ গানটা গাইতে গাইতে বেঁচে আছে। ওর বদ্ধ কোনও কিছু ভাল লাগে না। সারাক্ষণ কথা বলে চলেছে…

মমতার কি একটু বাক্ সংযম প্রয়োজন?

না, না। এখন একটু কম কথা বলছে। এক সময় একটু বেশি বলছিল (স্মিত হাসি)।

আপনার কোন মমতাকে পছন্দ, প্রগলভ না কী মিতভাষী মমতা?

অবশ্যই, কম কথা বলা মমতা।

আপনি বন্ধু মুকুলের কথা বলছিলেন। মুকুল রায়ের এই দল বদলকে কীভাবে দেখছেন?

আরে ধুর, এসব কোনও ব্যাপার না। ও দেখবেন আবার একদিন ফিরে এসেছে…

বলেন কী! মুকুল রায় আপনাকে কিছু বলেছেন? তাঁর সঙ্গে আপনার সম্পর্ক কেমন?

মুকুলকে আমার ভাল লাগে। আসলে আমার যাঁদের ভাল লাগে, পাবলিক তাঁদের পছন্দ করে না। যেমন, মদনকে (মদন মিত্র) আমার ভাল লাগে। মদনের মতো এমন চমৎকার মানুষ, যিনি সব সময় অপরের কথা ভাবেন, এমন খুব একটা পাবেন না। সিপিএম আমলে মদন এসএসকেএম হাসপাতালে যত জনকে চিকিৎসার জন্য ঢুকিয়েছেন, সে কথা যদি সিপিএম স্বীকার করত, তাহলে ওদের বংশ পরিচয়টা একটু ভাল হত। দেখুন, আমি যা দেখেছি তাতে মুকুল একজন ঠান্ডা মাথার মানুষ। মুকুলকে একদিন স্পষ্ট ভাষায় একটা কথা বলতে শুনেছিলাম…

কী কথা?

সংসদের বাইরে দাঁড়িয়ে উনি বলেছিলেন, “কবীর দা, তুমি আর মহাশ্বেতাদি যদি না থাকতে, আমরা আজ এই জায়গায় আসতে পারতাম না।” এরপর উনি আরও দু-এক জনকে বললেন, “এটা তোমরা মনে রেখ। কবীর দা যে এই ছটফট করছেন, কারণ উনি আমাদের স্তর থেকে আসেননি। উনি অন্য রকম মানুষ।”

এটা কি সেই সময়, যখন আপনি অপারেশন গ্রিন হান্টের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলেছেন?

হ্যাঁ বন্ধু, এটা সেই সময়। সে সময় আমি কেবল মিডিয়াতেই কথা বলছিলাম।

সেই সময় তো আপনার সাংসদ তহবিলের টাকা বণ্টন নিয়েও শোভন চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে একটা সমস্যা হয়েছিল। আপনার ‘খাও,খাও,খাও’ মন্তব্য ভাইরাল হয়েছিল।

হ্যাঁ, কলকাতার প্রাক্তন মেয়র তথা তৎকালীন দক্ষিণ চব্বিশ পরগণার তৃণমূলের সভাপতি বেশ কিছু বোকা বোকা কথা বলেছিলেন, আমিও সে সবের উত্তর দিয়েছিলাম। বাট হি ইজ নট আ ব্যাড ম্যান। আসলে, রাজনীতি একটা জটিল খেলা। আমার সঙ্গে যদি শোভনের আজ দেখা হয়ে যায় আমরা কথা বলব, আমাদের কোনও শত্রুতা নেই। সে সময় তিনি কিছু অদ্ভুত কথা বলেছিলেন, আমিও বলেছিলাম। এটা অনেকটা টেবিল টেনিস খেলার মতো, উনি একটা বল মারছেন, আবার আমিও সেই বলটাকে একই কায়দায় পাল্টা মারছি। কিন্তু, মুকুলকে বরাবর আমার খুব ভাল লাগত…

তাই?

আরে, হ্যাঁ তো। ও খুব ঠান্ডা মাথার ছেলে। যখন সিপিএম আমাদের তারা চ্যানেল আক্রমণ করল, তখন একমাত্র মমতা ছুটে এসেছিল। মমতার সঙ্গে ছিল মুকুল। মুকুল আমায় বলল, “কবীর দা, এরপর যদি হয়, তুমি আগে থেকে আমায় বোলো।” আমি বললাম, “আগে থেকে আক্রমণের কথা তোমায় কী করে বলব?” ও তখন বলল, “ঠিক আছে, আমি একে ওকে বলে দেব…ইত্যাদি।” মানে ও ব্যাপারটা দেখে নেবে বলেছিল। জানেন, এটা আমার খুব ইন্টারেস্টিং লাগত। আমি আপনাদের খোলাখুলি বলছি, আমরা যেরকম ভাবি, পলিটিক্সটা তেমন একমাত্রিক নয়। অথচ আমরা মনে করি, এটা হয় ‘অবাক জলপান’-এর মতো নাটক, নয়তো ‘বধূ মিছে রাগ কোর না’ গানটার মতো, অথবা মাও সে তুং-এর মতো বন্দুক হাতে নেমে পড়লাম…’কদম কদম বঢ়ায়ে যা’ বলতে বলতে দিল্লিতে গিয়ে পৌঁছলাম, তা তো না (মুখে প্রাজ্ঞ হাসি)…

মুকুল রায়ের কি অভিমান হয়েছে?

দেখুন, মুকুলের কী অভিমান আমি জানি না। তবে, মুকুলের মন খারাপ (সুমনের মুখেও সহমর্মিতার ছাপ স্পষ্ট)। মুকুল তখনও দল বদলায়নি, আমি সে সময় খবরের কাগজে ওর ছবি দেখে ওকে ফোন করলাম। বললাম, “এই মুকুল, তোমার কী হয়েছে? মন ভাল নেই?” ও বলল, “না কবীরদা, আমার মন ভাল নেই।” আমি তখন বলেছিলাম, “মুকুল, আমরা কিন্তু বন্ধু। আমি ওসব কেয়ার করি না (মুখে পরিচিত বেতোয়াক্কা ভাব)। তোমার যদি ভাল না লাগে, তাহলে আমার বাড়িতে এসে একদিন কাটিয়ে যাবে।” আহা, আমার সঙ্গে তো মুকুলের কোনও শত্রুতা নেই, তাহলে বলব না কেন! আরে, নরেন মোদীর সঙ্গেও তো আমার কোনও শত্রুতা নেই…

নরেন্দ্র মোদীকে আপনার কেমন লাগে?

খুব ভাল লাগে। তবে, দেশের নেতা হওয়ার কোনও যোগ্যতা ওঁর নেই। উনি একবার কলকাতায় এসে বলেছিলেন, রাজ্যে পথেঘাটে মহিলাদের জন্য শৌচালয় বিশেষ নেই। এই পর্যবেক্ষণটা আমার ভাল লেগেছিল। অবশ্য, তৃণমূল সরকার এসে প্রচুর শৌচালয় তৈরি করে দিয়েছে।

আপনি একদা রাজ্য সরকারের একটি পুরস্কার নেওয়ায় এক কবি কলম ধরেছিলেন। সম্প্রতি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ডাকা ব্রিগেড সভায় আপনাকে এবং তাঁকে এক মঞ্চে দেখা গেল। বিরোধে কি ইতি?

দেখুন, আমি খোলাখুলি বলছি, ওই মানুষটাকে আমি কখনও অসম্মান করিনি। আমি যেখানে যেখানে যেতাম, উনিও সেখানে গিয়ে আমার পায়ের কাছে উবু হয়ে বসে থাকতেন। গুণী ছেলে। অন্ত্যমিল দিয়ে কবিতা লেখেন, ছড়া লেখেন। কিন্তু, হঠাৎ উনি আমার শিরদাঁড়া নিয়ে চিন্তিত হয় পড়লেন (মুখে ক্ষোভ স্পষ্ট)। আমার মনে হয় ওঁর কোনও সমস্যা আছে। আমার সেদিন ওই সভামঞ্চ থেকে চলে আসতে ইচ্ছা করছিল। ওঁকে সম্মান করার কোনও কারণ আমি দেখছি না (মুখে চোখে তীব্র বিরক্তি)।

তাহলে বিরোধ মেটেনি?

না, না। আরে, আমি সরকারের থেকে একটা পুরস্কার নিয়েছি। উনিও তো নিয়েছেন। তবে অত বড় পুরস্কার পাননি, কিন্তু একটা ছোট পেয়েছিলেন। আর একজনও আছেন…

কে তিনি? তিনি আবার কী করলেন?

তিনি সিনেমায় প্রথম প্লে-ব্যাক করেছেন আমার সৌজন্যে। গানটি ভূপিন্দরের গাওয়ার কথা ছিল, কিন্তু তাঁকে না নিয়ে আমি এই বাঙালি যুবককে নিয়েছিলাম। ‘সেদিন চৈত্রমাস’ সিনেমায় হিরোর লিপে তিনি গাইলেন। আমি কিন্তু গাই নি, অথচ ইচ্ছা করলেই গাইতে পারতাম। আমি সঙ্গীত পরিচালক ছিলাম, আমারও কদর কম ছিল না। দেখুন, তিনি সিপিএমের লোক ছিলেন। ‘তোমাকে চাই, চাই না’ এই বলে সে সময় তিনি অনুষ্ঠান শুরু করতেন। এরপর এইচএমভি-কে দিয়ে আমি যুগল অনুষ্ঠান করালাম, কালক্রমে এসব (ঝামেলা) মিটে গেল। সাংবাদিকরা তখন পিছনে লেগে গিয়েছিলেন, তাই আমি এই চালটা চালি। একই মঞ্চে একবার চলে আসায় এরপর উত্তেজনা প্রশমিত হল।

তারপর…

তারপর হল কী, তিনি তো ছিলেন সিপিএমে। কিন্তু হঠাৎ একদিন সুযোগ বুঝে সেই তিনিই চলে এলেন তৃণমূলে (মুখে অর্থবহ হাসি)। কিচ্ছু বলার নেই। এটা ওঁর ব্যাপার এবং দলনেত্রীর ব্যাপার। কিন্তু, গণসংগ্রামের ধারে কাছে উনি ছিলেন না। গণসংগ্রামের ধারে কাছে যাঁরা ছিলেন না, তাঁরাই এখন আছেন, বেশ আনন্দের কথা। থাকুন। এবার উনি আবারও আমার পিছনে লাগা শুরু করলেন। ‘জাতিস্মর’ সিনেমার জন্য আমি যখন জাতীয় পুরস্কার পেলাম, উনি তখন একটি সংবাদপত্রে লিখলেন, ‘ও তো মিউজিকের কিছুই জানে না। ওটা (সিনেমার গানগুলি) কিছুই হয়নি’। এরপর হঠাৎ দেখলাম, একুশে জুলাইয়ের মঞ্চে উনি একটা গিটার নিয়ে এসে আমার পিছনে দাঁড়িয়ে টিং টিং করছেন (মুখে চোখে ঘৃণা)। কী বলব বলুন তো… আমি স্পষ্ট বলে দিচ্ছি, যদি দেখি কোনও সভায় ওরা (কবি ও গায়ক) আছে, তাহলে আমি সেই সভায় যাব না।

ইউনাইটেড ইন্ডিয়ার সভায় ওঁরা যে উপস্থিত থাকবেন, আপনার জানা ছিল না?

না, আমি জানতাম না। আমি যদি জানতাম, তাহলে যেতাম না। সেদিনের সভা থেকে বেরিয়েই আমি ইন্দ্রনীল সেন মহোদয়কে ফোন করে যা বলার বলে দিয়েছি।

কী বলেছেন?

বলেছি, “এই দ্যাখো, তুমি তো এখন বড় জায়গায় আছ। এই দু’জন প্রাণী যদি থাকে, তাহলে আমায় যেতে বোলো না। আমি কিন্তু, সেক্ষেত্রে অসুবিধা করে দেব।” আমি কারও খাই না, পরি না। আমি সিপিএমকেও তেল দিইনি, তৃণমূলকেও তেল দিই না। অনুষ্ঠান পাওয়ার জন্য আমার সিপিএম ভজনাও ছিল না, তৃণমূল ভজনাও নেই। এটাই আমি (চোখে চেনা আস্ফালন)।

আপনি যা বলছেন, সেসব কথার কিন্তু প্রতিক্রিয়া হবে…

ধুর…আমার কিচ্ছু যায় আসে না। আমি, আমি। যা সত্যি, তাই বলে দিচ্ছি। আমার জীবন বাঁচা হয়ে গিয়েছে। আমি একমাত্র এমপি, যার কোনও মোটরগাড়ি নেই। বাবা-মা এই ছোট্ট বাড়িটি রেখে গিয়েছেন, এখানেই আমি থাকি। এখান থেকে তো আর কেউ আমাকে বের করে দিতে পারবেন না। আমার আর রোজগারের দরকার নেই। আমার খুব ভাল লাগল, কারণ আপনি এই প্রশ্নটা তুললেন…

ভাল লাগল?

হ্যাঁ। কারণ, এটা লড়িয়ে দেওয়ার প্রশ্ন নয়। এনিওয়ে, আমি ইন্দ্রনীল মহোদয়কে এই কথাটা জানিয়েছি। এখন উনি যদি অস্বীকার করেন, তাহলে উনি মিথ্যা বলবেন।

ইন্দ্রনীল সেন কী বললেন?

উনি বললেন, “কবীরদা, আমি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে এই কথাটা পৌঁছে দেব। তবে উনি কী সিদ্ধান্ত নেবেন তা আমি জানি না।” আমি বললাম, “সেটা তোমায় ভাবতে হবে না। তুমি শুধু কথাটা পৌঁছে দিও।” কিন্তু, (ওরা যদি থাকে) আমি আর কোনওদিন যাব না। গেলেও, ‘সেলাম আলেইকুম’ বলে চলে আসব। এই হীনতা শুধু বাঙালিরই আছে। সারা দেশে আমার বন্ধু রয়েছে। তাছাড়া সংসদে গিয়েও দেখেছি, অনেককে দেখেছি।

কী দেখেছেন?

অন্যান্য রাজ্যের মানুষরা এমন না। আমাকে তো অন্য দল থেকে ভোটে দাঁড়াতেও অনুরোধ করা হয়েছে।

কোন দল?

সেটা বলব না। তবে বিজেপি-ও না, সিপিএমও না। আরও অন্য দল রয়েছে। মাস দুয়েক আগেও বলেছে। এই ভোটেই দাঁড়াতে বলেছিল (মুখে চিলতে হাসি)।

পশ্চিমবঙ্গ থেকে?

হ্যাঁ। এছাড়া এ রাজ্যের বাইরে, যেমন রাজস্থান থেকেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে বলা হয়েছিল।

রাজি হলেন না কেন?

না, আমি আর ভোটে দাঁড়াব না। তাছাড়া, সাতটি বিধানসভা চষে ফেলার মতো শারীরিক তাকতও আর নেই আমার।

সম্প্রতি এক জলসায় বলেছিলেন, বিজেপি-কে হারাতে পারলে আপনি বিনা পয়সায় সারা রাত ধরে গান শোনাবেন। ধরুন, ২৩ মে লোকসভার ফলাফলে বিজেপি পর্যুদস্ত হল। তাহলে, আপনি নিজে প্রথম কোন গানটি গেয়ে উঠবেন?

আহা-হা-হা-হা (যেন সত্যিই হয়, এমন অভিব্যক্তি)। বলা মুশকিল। আমি না, কোনও গান গাইব না প্রথমে। আগে ঘর থেকে বাইরে বেরিয়ে গিয়ে ধেই ধেই করে খানিকক্ষণ নাচব। তারপর না হয় ভাবা যাবে, গান-টান নিয়ে….

বিজ্ঞাপন

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0193 seconds.