• ২৪ এপ্রিল ২০১৯ ২২:২৭:১৪
  • ২৪ এপ্রিল ২০১৯ ২২:২৭:১৪
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

একেবারে হারিয়ে যাওয়ার মুখে রয়েল বেঙ্গল টাইগার

ছবি : সিএনএন থেকে নেয়া


ফারহানা করিম :


রাজকীয় সৌন্দর্যের অধিকারী রয়েল বেঙ্গল টাইগার বাংলাদেশের জাতীয় পশু। হলুদের মধ্যে কালো ডোরাকাটা পশুটি বিশ্বের দুর্লভ সৌন্দর্যময় এক প্রাণী। অসাধারণ সুন্দর এই প্রাণীটি পৃথিবীর বুক থেকে হয়তো একেবারেই হারিয়ে যেতে পারে। বিভিন্ন পরিসংখ্যান এবং গবেষণার তথ্য থেকে এই ইঙ্গিতই পাওয়া যাচ্ছে।

গবেষকরা বলছেন, মাত্র ৫০ বছরের মধ্যেই সুন্দরবন থেকে রয়েল বেঙ্গল টাইগার একেবারেই উধাও হয়ে যেতে পারে। প্রসঙ্গত, বাংলাদেশ এবং ভারতের মধ্যে বিস্তৃত ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনে রয়েল বেঙ্গল টাইগারের আবাস। এটিই এই প্রজাতির বাঘের শেষ আশ্রয়স্থল। মূলত চোরাশিকারীদের কারণে রয়েল বেঙ্গল বাঘের অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়েছে। এছাড়া সুন্দরবনের আশেপাশের জনবসতি ক্রমেই বিস্তৃত হয়ে পড়ছে ফলে সংকুচিত হয়ে পড়ছে বাঘের আবাসস্থল।

বিগত শতাব্দীতেই শতকরা ৯৫ ভাগ বাঘ বিশ্ব থেকে হারিয়ে যায়। বর্তমানে বিভিন্ন বনে ৪ হাজারেরও কম বাঘ রয়েছে। এশিয়া মহাদেশের মাত্র কয়েকটি দেশেই বেঙ্গল টাইগারের দেখা পাওয়া যায়। তবে মাত্র কয়েকশ বাঘ এখনো সুন্দরবনে মুক্তভাবে ঘুরে বেড়াতে পারছে।

বর্তমানে মাত্র ১০ হাজার বর্গকিলোমিটারের বেশি কিছু এলাকাজুড়ে রয়েল বেঙ্গল টাইগার দেখা যায়। কিন্তু তাদের এই আবাসস্থল ক্রমেই সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে। বাঘের বাসস্থান সংকুচিত হয়ে যাওয়ার পিছনে মানুষের যেমন হাত আছে তেমনি বৈশ্বিক উষ্ণতাও কম দায়ী নয়। জলবায়ু উষ্ণ হয়ে যাওয়ায় সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে যাচ্ছে ফলে সুন্দরবনের বেশ কিছু দ্বীপই সমুদ্রের মধ্যে বিলীন হয়ে যাচ্ছে।

এদিকে সুন্দরবনের যে অংশটি বাংলাদেশে পড়েছে সম্প্রতি সেখানে বাঘের সংখ্যা বেশ কমে গিয়েছে।  ২০০৪ সাল থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে বাঘের সংখ্যা ৪৪০ থেকে কমে ১০৬টিতে দাঁড়িয়েছে।

ওয়ার্ল্ড ওয়াইল্ড ফান্ডের(ডাব্লিউডাব্লিউএফ) প্রজাতি এবং ভূমি বিষয়ক কর্মসূচির পরিচালক দীপংকর ঘোষ জানান, এই সংখ্যাটি বিপদজনকভাবে কম। তার মতে, চোরাশিকারীদের তৎপরতা বেড়ে যাওয়া, বাসস্থান সংকুচিত এবং বিভক্ত হয়ে যাওয়ার কারণে বাঘের সংখ্যা মারাত্মকভাবে কমে যাচ্ছে।

বিশ্বজুড়ে গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণ অব্যাহতভাবে বেড়ে যাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে সুন্দরবনে বাঘের বসবাসের উপযুক্ত পরিবেশ কতটা থাকবে তা নিয়ে একটি গবেষণা হয় চলতি বছরের শুরুতে। এতে দেখা গেছে, ২০৭০ সালের মধ্যেই সুন্দরবন থেকে বাঘ সম্পূর্ণভাবে হারিয়ে যাবে।  চরম আবহাওয়ার কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে যাওয়ার ফলে বাঘের বাসস্থান পুরোপুরিই সমুদ্রে বিলীন হয়ে যাবে। এছাড়া পানি এবং মাটির লবণাক্ততাও বেড়ে যাবে।

এদিকে সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে যাওয়া এবং বৃষ্টিপাত কমে যাওয়ার কারণে ইতোমধ্যেই সুন্দরবন অঞ্চলে পানির লবণাক্ততা বেড়ে গেছে। যার প্রভাব সুন্দরী গাছের উপর পড়ছে। এই গবেষণায় নিয়োজিত বাংলাদেশের ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটির সহকারী অধ্যাপক শরিফ মুকুল জানান, সুন্দরবন অঞ্চলে লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়ার কারণে সুন্দরী গাছ মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়েছে। এই সমস্যা দূর না করলে অচিরেই এই গাছগুলো মরে যেতে পারে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই যে ম্যানগ্রোভ বনে রয়েল বেঙ্গলের আবাস তা আরো ছোট হয়ে আসবে।

তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নিউজ চ্যানেল সিএনএনকে বলেন, ‘বাঘের বেঁচে থাকার জন্য মিঠা পানি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।  সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা যদি এভাবে বাড়তেই তাহলে বেঙ্গল টাইগারের বেঁচে থাকার আর কোন পথই হয়তো থাকবে না।’

এদিকে বাঘের প্রধান খাদ্য হরিণ। অথচ চোরাশিকারীদের অবৈধ কর্মকাণ্ডের ফলে হরিণের সংখ্যা দিন দিন কমে যাচ্ছে। এটিও বাঘের সংখ্যা হ্রাসের অন্যতম একটি কারণ।

এছাড়া সুন্দরবনের আশেপাশে যেসব জনবসতি রয়েছে সেখানকার মানুষজনও বাঘের সংখ্যা কমে যাওয়ার জন্য কম দায়ী নয়। ২০১৩ সালে করা একটি গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষ এবং বাঘের মধ্যে সংঘর্ষে প্রতিবছর কমপক্ষে তিনটি করে বাঘ মারা যায়। তবে বাঘের আক্রমণে মানুষ মারা যাওয়ার সংখ্যাও কম নয়।  বাংলাদেশের সুন্দরবনে প্রতিবছর বাঘের হামলায় গড়ে ২০ থেকে ৩০ জন মানুষ মারা যায় বলে বিভিন্ন খবর থেকে জানা গেছে। তবে এই সংখ্যা আরো বেশিও হতে পারে। কারণ অনেকেই  বনবিভাগের অনুমতি না নিয়েই সুন্দরবনে বাঘের আবাসস্থলে প্রবেশ করে থাকেন। ফলে বাঘের হামলায় মানুষের মৃত্যুর অনেক খবরই পত্রিকায় প্রকাশিত হয় না।

এদিকে ওয়াইল্ড টিম নামক একটি সংরক্ষণ সংস্থার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আনওয়ারুল ইসলাম সিএনএনকে জানান, বিগত পাঁচ বছরে বাঘের হামলায় মানুষ মৃত্যুর হার অনেক কমে গেছে। স্থানীয় মানুষজনের মধ্যে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের ব্যাপারে জনসচেতনতা তৈরি হওয়ার কারণে এটি ঘটেছে।

তবে বাঘের বাসস্থান সংরক্ষণ করা বেশি জরুরী বলে মনে করেন তিনি। তিনি উল্লেখ করেন, সুন্দরবন যদি সমুদ্রে ডুবে যায় তাহলে বাঘের যাওয়ার আর কোন জায়গা থাকবে না।

ডাব্লিউডাব্লিউএফের সুন্দরবন ল্যান্ডস্কেপ কর্মসূচির রাতুল সাহা জানান, রয়েল বেঙ্গল টাইগারকে রক্ষার জন্য বাংলাদেশ এবং ভারত সরকারের একসঙ্গে কাজ করা উচিত। এক্ষেত্রে যেসব এলাকায় ম্যানগ্রোভ গাছ এবং প্রজাতির সংখ্যা বেশি সেসব এলাকাকে চিহ্নিত করে সেখানে বাঘের বাসস্থান সংরক্ষিত করতে হবে। বাঘের সংখ্যা বাড়াতে হলে অবশ্যই প্রাণীটির বাসস্থান পুনরুদ্ধার এবং সংরক্ষণ করতে হবে।

বিজ্ঞাপন

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0183 seconds.