• ২২ এপ্রিল ২০১৯ ১৪:২৭:৫৩
  • ২২ এপ্রিল ২০১৯ ১৪:২৭:৫৩
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

জুমা থেকে ইস্টার সানডে : মানুষ মরছে মানুষ

ছবি : সংগৃহীত

১৫ মার্চ ২০১৯, শুক্রবার। আজানের সুললিত ধ্বনি ‘হাইয়া আলাল ফালাহ’র (এসো কল্যাণের দিকে) টানে গোটা বিশ্বের মুসলিমরা মসজিদমুখী। মসজিদে হাজির নিউজিল্যান্ডের মুসলিমরাও, ক্রাইস্টচার্চের মুসলিম বাসিন্দারাও সামিল কল্যাণ-কাফেলায়।

অনেকে মূল নামাজের আগে সুন্নত নামাজের পালা সারছেন, অনেকে আবার আছেন ইমামের খুৎবা শোনার অপেক্ষায়। কেউ কেউ তখনো মসজিদে পৌঁছে উঠতে পারেননি, পথে। ঠিক সে সময় তিনশো ষাট ডিগ্রি মোডের ক্যামেরা অন করে গাড়ির স্টিয়ারিং ধরলেন ব্রেন্টন ট্যারেন্ট। বাড়ি অস্ট্রেলিয়ায় নিউজিল্যান্ডে এসেছিলেন কাজে। ট্যারেন্টের গাড়ি চললো, চলতে থাকলে ফেসবুক লাইভ। খটাশ শব্দে গাড়িটা এসে থামলো আল নূর মসজিদের সামনে।

গাড়ির পেছনের হুডটা তুলে বন্দুক বের করলেন ট্যারেন্ট, সাথে নিলেন পর্যাপ্ত কার্তুজ। কোনো কথা নেই ঢুকে পড়লেন মসজিদে যাবার রাস্তায়। প্রথম যার সাথে অস্ত্রসজ্জিত ট্যারেন্টের দেখা, সে নাকি হাত বাড়িয়ে তাকে বলেছিলো হ্যালো ব্রাদার! ভ্রাতৃত্বের ডাকে সাড়া দেননি ট্যারেন্ট। কালবিলম্ব না করে ছুড়েছেন গুলি। তারপর মসজিদে ঢুকে সামনে যারা ছিলো সবাইকে মেরেছেন। একবার নয় কয়েকবার ঘুরে ঘুরে গুলি করেছেন, যাতে শতভাগ মৃত্যু নিশ্চিত করা যায়। কোনো হাহাকার আহাজারিই তাকে থামাতে পারেনি। আল নূর মসজিদ সাফা করে ট্যারেন্ট গেছেন লিন্ডেউড মসজিদে, সেখানেও এলোপাতারি গুলি ছুড়ে কয়েকজনকে মেরেছেন। কেনো মেরেছেন?

মেরেছেন কারণ এরা মুসলিম, এরা অভিবাসী। এদের জাত ভাইরা প্যারিসে হামলা চালিয়েছে, লন্ডন-সুইডেন-জার্মানি রক্তাক্ত করেছে মুসলিমরা। তাই ট্যারেন্টের কাছে সব মুসলিমই সন্ত্রাসী, সবাই খুনি। আর খুনের বদলা নিতে, খুনমুক্ত পৃথিবী গড়তে সব খুনিকে মেরে ফেলাই একমাত্র সমাধান ট্যারেন্টের তরিকায়। হামলার আগে প্রায় শতো পৃষ্ঠার এক ইশতেহার অনলাইনে প্রকাশ করে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করেছিলেন তিনি। যে কারণে হামলার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য জানতে খুব একটা বেগ পেতে হয়নি কারো।

ভয়াল মার্চ পেরিয়ে এপ্রিল, ১৫ মার্চ ছুঁয়ে ২১ এপ্রিল। কদিনের ব্যবধান? মাত্র ৩৫ দিন। ক্রাইস্টচার্চের দুই মসজিদের রক্তের দাগ ধুয়েমুছে সাফ করলেও, হৃদয়ের দগদগে ঘাঁ শুকায়নি এখনো। আর সেই ঘাঁয়ের ওপর দাঁড়িয়েই মানুষের বুকে বসালো আরেক কোপ। সেই কোপে ৫০ ছুঁলো পাঁচের ঘর, মানে মরলো দুইশোর অধিক মানুষ। আর ঘটনাস্থল এবার মসজিদ নয়, গির্জা। খুন হলো কারা? ধার্মিক দুনিয়া কিংবা ট্যারেন্ট এদের পরিচয় দিতে গিয়ে বলবে, খ্রিস্টান! কিন্তু আমি বলছি মানুষ। স্রেফ মানুষ মরলো, মানুষ। জায়গার নামের অদ্যক্ষরেও আছে ‘ক’; ক্রাইস্টচার্চ, কলম্বো। খুনে-খুনে কী অন্তমিল, কী দারুণ ওলট-পালটের পাজল গেম। মুসলিম খুনের দায় খ্রিস্টানের কাঁধে, খ্রিস্টান হত্যায় দোষী মুসলিম। কেউ একবারও বলতে চায় না যে, দুই জায়গাতেই উগ্রপন্থি-অমানুষের হামলায় মরেছে মানুষ।

তবে এই খুনের দায়ের পুরোটার ভারই কী আমরা ক্ষমতাধরদের চোখ দিয়ে দেখে চাপিয়ে দেবো ট্যারেন্ট আর জিহাদিদের কাঁধে? মোটেও উচিত হবে না। ভাবুন তো একবার, সব শিশুই তো সরল মন নিয়ে জন্মায় নরম শরীরে। এদের একক মনকে কেটেকুটে কয়েক নামে ভাগ করে কে? এককথায় বললে উত্তর হবে ক্ষমতা। নরম এক খণ্ড শুভ্র মন নিয়ে জন্মানো ট্যারেন্টকে কে শেখালো হোয়াইট ইজ বেস্ট, হোয়াইট ইজ গুড, সাদা বাদে বাকিরা সব নিকৃষ্ট? কে ওকে বোঝালো মুসলিমরা সন্ত্রাসী, সব মুসলিমই খুনি? ক্ষমতা। এই বৈশ্বিক ক্ষমতা কাঠামো আধিপত্য ধরে রাখতে মানুষের মাঝে বুনে দেয় হিংসার বিষ। যতো হিংসা, ততো ব্যবসা। আজকে যে আমেরিকা বুক চাপড়ে নিজেকে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ অর্থনীতির দেশ দাবি করে, তার পেছনে আছে এক মহা-হিংসার ইতিহাস। এই হিংসা আর ঘৃণা বেচেই কোটি কোটি ডলারের পাহাড় গড়েছে মার্কিন সাম্রাজ্য।

প্রথমে সোভিয়েত জুজু, তারপর তালেবান! তালেবান কার সৃষ্টি? কার দুধে ভাতে সোভিয়েত তাড়াতে আফগানিস্তানে উৎপাত শুরু করেছিলেন ওসামা বিন লাদেন? আমেরিকার। লাদেন ছিলেন আমেরিকার পোষ্যপুত্র। ব্রাদার ফরম অ্যানাদার মাদার! অস্ত্র দিয়ে পেলেপুষে তালেবানকে রিষ্টপুষ্ট করেছে বুশরাই। সোভিয়েত পতনের পর অস্ত্র বেচার কী হবে? ব্যবসা তো আর বন্ধ রাখা যায় না। কিন্তু কারো কাছে অস্ত্র বেচতে হলে তাকে তো ভয় দেখাতে হবে, বোঝাতে হবে আপনি অনিরাপদ। সে জন্য চাই জুজু। এতোদিন যে জুজুর কাজ করে আসছিলো সোভিয়েত।

এবার সেই জুজু তৈরিতে মিত্র লাদেনকে রাতারাতি নাইন-ইলেভেন খেলায় শত্রু বানালো আমেরিকা। আল কায়েদা-তালেবান নির্মূলে শুরু হলো আমেরিকার শুদ্ধি অভিযান। তালেবান ছড়িয়ে গেলো বিশ্বময়। সুদানে হামলা হলেও তালেবান দায় স্বীকার করে, সুইডেনে হলেও তাই। এই হামলা আর দায় স্বীকারের খেলায় ইউরোপের কাছে মুসলিমরা পরিচিতি পেয়ে গেলো জঙ্গি নামে। আর সেই বিশ্বাস আরো পোক্ত করলো আইএস। তালেবানের পড়ন্ত যৌবনে পূর্ণ জৌলুস নিয়ে ২০১৪ সালে এদের আবির্ভাব। যুদ্ধ বিধ্বস্ত ইরাক থেকেই ইসলামিক এস্টেট প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দিলেন, আবু বকর আল বোগদাদি। আইএসের হাতেও মার্কিন অস্ত্র, জোব্বার ওপর চাপানো উর্দিতেও মার্কিন রঙ। আর তাদের লাল গালিচায় স্বাগত জানানোর পটভূমি ইরাকে তৈরি করেছিলো আমেরিকাই, সাদ্দাম দমনের নামে।

আইএসও গণহারে সব হামলার দায় স্বীকার করতে শুরু করলো। মজার বিষয় হলো, আইএস উদ্ভবের বছর খানেকের মধ্যেই হামলার দায় স্বীকার করতে বেমালুম ভুলে গেলো আল কায়দা-তালেবান। আশ্চর্যজনকভাবে চুপ মেরে গেলো লাদেন বাহিনী। আরো একটা চমকপ্রদ ঘটনা ঘটতে থাকলো আইএস আমলে, যেকোনো হামলার দায় স্বীকার করে আইএস বিবৃতি দেয় 'আমাক' নামক অনলাই প্লাটফর্মে। আর সেই দায় স্বীকারের খবর সবার আগে পায় আমেরিকা। হামলার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই আমেরিকা গোটা বিশ্বকে আমাকের বরাতে জানায়, ‘হামলার দায় স্বীকার করেছে আইএস।‘ এই আলাপ দীর্ঘ, বিশ্লেষণও অনেক সময় সাপেক্ষ; এবার ট্যারেন্টে ফেরা যাক। 

আল কায়েদা-আইএস যজ্ঞ দেখে বেড়ে ওঠা ট্যারেন্টের মুসলিম বিদ্বেষী হয়ে ওঠা খুব একটা অস্বাভাবিক কী? তাছাড়া সহস্র বছরের শ্বেতাঙ্গ জাতীয়তাবাদ তো ট্যারেন্ট জিনগতভাবেই পেয়ে গেছেন। দুই মিলে বন্দুক হাতে মসজিদে ঢুকে পড়া অমূলক কিছু নয়। এই ট্যারেন্টই ক'বছর আগেও কাজের ফাঁকে একটু সময় পেলেই ছুটে যেতেন ছোটো ছোটো বাচ্চাদের কাছে, তাদের সাথে খেলতেন, নিজের ঘাম ঝরানো পয়সায় কিনে দিতেন চকলেট। বাচ্চাদের মুখে হাসি ফোটানো মানুষটা কোন ব্ল্যাক ম্যাজিকের জিগাংসায় এমন পশু হয়ে উঠলেন? সেটা হলো ওই ক্ষমতার অপরায়ণ থিওরি, হিংসা-ঘৃণার বীজ রাজনীতি। ছোটো বেলায়ই যদি কোনো সমাজ শিশুর মাথায় পুতে দেয়, সাদারাই উত্তম, কালোরা নরাধম। মুসলিমরা খুনি, অভিবাসীরা অচ্ছুৎ। তবে সেই শিশুর তো বড়ো হয়ে এই করারই কথা।

ক্রাইস্টচার্চে ব্যথিত মুসলমান প্রাণ হয়তো ভাবছে, যাক ভালোই হলো। পঞ্চাশের বদলা আড়াইশোতে নিলাম। কোনো মানুষ অতিরিক্ত পরিমাণ অমানুষ না হলে এমনটা ভাবার ভাবনাই মাথায় আসার কথা না। যদি কেউ ভেবে থাকেন তাদের বলছি, আসলে এই শত্রু শত্রু খেলায় কেউ জেতে না। ট্যারেন্ট কাকে মেরেছে? মানুষকে, একেবারে সাধারণ মানুষ। যারা ক্ষমতার আশেপাশেও নেই। আর শ্রীলঙ্কায় কারা মরেছে? ওই সাধারণ মানুষই। এরা সবাই বলির পাঁঠা। যে মরে সেও পাঁঠা, যে মারে সেও। নানা নামে-বর্ণে এদের ভাগ করে ফায়দা লোটে ক্ষমতা। কারণ এই মানুষেরা ঐক্যবদ্ধ হলে আর বিশ্বে মোড়ল বলে কেউ থাকবে না। ভেঙে পড়বে মহারাজদের ক্ষমতার ভিত। তাই মসনদ টেকাতে আম জনতাকে কেটে টুকরো টুকরো করছে ক্ষমতাধারীরা। কাঁটা দিয়ে তুলছে কাঁটা।

তাদের এই খেলার শিকার অবুঝ ট্যারেন্ট, বোকা আইএস। সবর্বোপরি আমরা সবাই। এ মরলে ও হাত তালি দেয়, খিলখিলিয়ে হাসে।  ও মরলে এ। একবারও ভাবে না জুমার নামাজ কিংবা ইস্টার সানডের প্রার্থণায় যারা মরছে, তারা সবাই মানুষ। খ্রিস্টান-মুসলিম যে নামেই হোক, ক্রাইস্টচার্চ-কলম্বো যেখানেই হোক, গায়ের রঙ যেমনই হোক, ছিটকে যাওয়া রক্তে যিশুর মূর্তি কিংবা কেবলামুখী মেহরাব যা-ই ভিজুক; মানুষ মরছে, কেবল মরছে মানুষ।

লেখক ও সাংবাদিক

বিজ্ঞাপন

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0187 seconds.