• ২১ এপ্রিল ২০১৯ ১৫:০৪:১২
  • ২১ এপ্রিল ২০১৯ ১৫:০৪:১২
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

নটরডেমে আগুন : মানুষ তুমি গির্জা হলেও পারতে!

নটরডেম। ছবি : সংগৃহীত

হাহাকার, চিৎকার; আর্তনাদে শুধু প্যারিস নয় ভারী গোটা বিশ্বের আকাশ। সব মানবতাবাদী-সুশীল-কুশীল-কুশীলবের চোখ ভেজা কান্নার ছোপ ছোপ জলে। বিবিসি-আলজাজিরা-ফ্রেন্স টোয়েন্টি ফোর, দ্য গার্ডিয়ান-টেলিগ্রাফ-ওয়াশিংটন পোস্ট থেকে বাংলার সুখ্যাত-কুখ্যাত গণমাধ্যম; সবার শিরোনাম পুড়ে গেলো, আহা পুড়ে গেলো!

কে পুড়লো? মানুষ নয় ইট সুরকির অবয়ব নটরডেম/ নতরদেম/ নোত্রদেম ক্যাথেড্রাল। মানে মধ্যযুগীয় গির্জায় লেগেছে আগুন। সেই আগুনে পুড়েছে-পুড়ছে পৃথিবীর সব মানবিক মানব হৃদয়।

অশ্রুপাতে গোটা পৃথিবীর সাগর হবার দশা। যে কোনো দিন নটরডেমের নাম শোনেনি, সেও কেঁদে-কেটে একাকার! কেনো কাঁদছে? অন্যরা কাঁদছে তাই! গুঁটি বসন্তের চেয়েও এই কান্না বেশি সংক্রামক। মায়াকান্নার সংক্রমণের হার আরো বেশি।

কান্না মন্দ নয়। কাঁদলে মানুষের মন ভালো হয়। ক্ষোভ কমে। কতিপয় বিজ্ঞানী নাকি এও বলেছেন, কান্নার জল নাকি চোখের জন্য উপকারী; দৃষ্টি শক্তি ঝকঝকে হয়। সে হিসেবে আগুনকে সাধুবাদ, মনুষ্য প্রজাতির তো একটু উপকার হলো। কোনো একটা কারণে হলেও তো কয়েক দিনের জন্য কেঁদে উঠলো এই নির্মম পৃথিবী। আর পশ্চিমাদের চোখের জল তো বিরল ঘটনা। ডুমুরের ফুলের চেয়েও বিরল। অমাবশ্যার চাঁদ হয়তো খুঁজলে মেলে, ডাকলে হয়তো ঈশ্বরও কালেভদ্রে সাড়া দেন। কিন্তু ক্ষমতাবান মহীয়ান-গরিয়ান পশ্চিমারা কাঁদেন একথা ভাবলেও গা শিওরে ওঠে। মাথা ঘুরিয়ে বমি বমি পায়। সেই অবাক কাণ্ড ঘটিয়ে নিমিষেই ক্ষমতাবানের চোখের জলের মতো বিরল বস্তু পৃথিবীকে দেখার সুযোগ করে দিয়েছে আগুন।

প্রাচীন বা মাত্র সাড়ে আটশো বছরের পুরনো গির্জা পুড়লে আমাদের বুক কেঁপে ওঠে। চোখ ভাসে। কিন্তু লাখো-কোটি বছরের আদিম মানুষ পুড়লে, ঝলসে গেলে; আজকাল আমাদের সুড়সুড়িও লাগে না। চোখ ভেজা তো অনেক দূরের আলাপ। আবার সাড়ে আটশো কেন আট হাজার বছরের পুরনো স্থাপত্যশৈলী হলেও এতো কান্নার রোল উঠবে না, বড়ো বড়ো গণমাধ্যমে হবে না শিরোনাম। এই কান্নার রাজনীতির পুরোটাই নির্ভর করে ক্ষমতার ওপর।

এইটা যদি প্যারিসে না হয়ে মোজাম্বিক কিংবা পাপুয়াা নিউগিনিতে হতো, এতো কান্না-আহা উহু রব উঠতো কী বিশ্বময়? বিবিসি কী এটা মূল শিরোনাম করে মিনিটে মিনিটে লাইভ আপডেট দিতো? ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট না হয়ে যদি গাম্বিয়া বা জিম্বাবুয়ের প্রেসিডেন্ট আগুনে পোড়া গির্জা পুনঃনির্মাণের জন্য তহবিল চাইতেন, তবে এক দিনে অর্থের পরিমাণ শতো কোটি ডলার ছাড়াতো কী? সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কী হ্যাশ-ট্যাগের জোয়ার উঠতো? সবাই যেমন হ্যাশট্যাগে ‘আমিই প্যারিস’ বলে ঝড় তুললেন, তেমন কী কোরাস তুলতেন ‘আমিই মোজাম্বিক' বলে?

না, একদমই তুলতো না। তার প্রমাণ পাওয়া গেছে কয়েক দিন আগেই সর্বনাশা বন্যায় ভেসে গেছে মোজাম্বিক, জিম্বাবুয়েসহ আফ্রিকার কয়েকটা দেশ। ঘটেছে হাজারো প্রাণহানী; অর্ধকোটির বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত, খাদ্যহীন-গৃহহীন। পরিস্থিতি সামাল দিতে না পেরে দুই দেশই সরকারিভাবে বিদেশি সাহায্যের জন্য আবেদন জানিয়েছে, কিন্তু তেমন কোনো সাড়ার আলামত পাওয়া যায়নি। যা দিয়েছে ওই জাতিসংঘ। বাকি বিশ্বের মুখে কুলুপ। নটরডেমের জন্য যারা শতো কোটি দিয়েছেন, তারা মোজাম্বিকের দিকে এক ডলারও ছুড়ে দেননি। ভাবটা এমন যে তারা কিছুই শোনেননি।

ফ্রান্সের ইট পুড়লে যতো ক্ষত হয় বিশ্ব হৃদয়ে, গোটা আফ্রিকা পুড়ে গেলেও হয়তো তেমন কিছু ঘটবে না। কেনো ঘটবে না? কারণ ক্ষমতা। তেলা মাথায় তেল সবাই ঢালে। যাকে দিলে লাভ আছে মানুষ তাকেই দেয়। আশপাশে চোখ বুলালেই দেখবেন, গরীব আত্মীয় স্বজনের মানবেতর জীবন যাপনে যাদের কোনো বিকার নেই, গাঁট থেকে একটা সিকি/আধুলিও বের হয় না। তারাই পাড়ার প্রোগ্রাম কিংবা ঢাকা ক্লাবে কোটি টাকা ডোনেশন দিয়ে নাম ফুটায়। কড়াইল বস্তির শিশুর পাতা হাতকে যারা পায়ে ঠেলে চলে যান তারাই আবার গুলশানে বসের ফ্ল্যাটে কুকুরের জন্মদিন উদযাপনে যান হাজার টাকার উপঢৌকন নিয়ে। বসকে দিলে ফায়দা আছে, বস্তিবাসীকে দিলে টাকাটাই মাটি!

আবার যে চোখ নটরডেমের শোকে ঝাপসা, সেই চোখই সিরিয়ার পালমিরার বেলায় বিকারহীন। ইরাকের আল নূরির বেলায় ডেম কেয়ার। মার্কিন জোটের হামলায় ইরাকের লাখ লাখ মানুষ পুড়লো, আফগানিস্তান ঝলসে গেলো। প্রত্ন-সম্পদ পরিপূর্ণ শহরগুলো পুড়ে হলো ছাই। হাসতে হাসতে সেই খেলা দেখলো ম্যাঁক্রো-ট্রাম্প-বুশ-ওবামা-ব্লেয়াররা। কই কারো তো চোখে জল এলো না। ঝলসানো পিগের বারবিকিউ খেতে খেতে এরা দেখে গেলো, এখনো দেখছে মানুষের বারবিকিউ হওয়ার খেল। কই কেউতো আল নূরি কিংবা পালমিরার জন্য তহবিল তুললো না, দিলো না শত কোটি দিনার। শুধু কতো কোটি টাকার ক্ষতি হলো আঙুলের কর গুনে সেই হিসাব করতে থাকলো বিশ্ব কবর জিয়ারতকারী সংস্থা জাতিসংঘ।

যদি প্রশ্ন করা হয় কে আগে, গির্জা নাকি মানুষ? উত্তরটা সবাই জানেন, মানুষ আগে। মানুষের হাত ধরেই উপসানালয়ের আবির্ভাব। মানুষেই বাঁচে উপাসনার রেওয়াজ। মানুষ না থাকলে রোজ গির্জায় ঘণ্টা বাজাতো কে? কে গাইতো কোরাসে সন্ধ্যা পূজার গান? কে বলে উঠতো আল্লাহ, খোদা, ঈশ্বর, ভগবান? জেসাস, মুহাম্মদ, গৌতম, কৃষ্ণ; কারা এরা? সবাই মানুষ। সেই মানুষ পুড়লে যাদের বিকার নেই, যারা রোজ ধর্মের নামে, বর্ণের স্লোগানে কাশ্মীর-ফিলিস্তিন-সিরিয়া-ইয়েমেনে মানুষ পোড়ে। মানুষের ঝলসানো শরীরের ওপর করে নগ্ন নৃত্য। তারা আজ পাথর পোড়া শোকে কাতর হয়ে জমায় শতো কোটি ডলারের তহবিল। তবে কী মানুষের চেয়ে উপাসনালয়ই বড়ো? আমাদেরকে কী এই বলা উচিত তবে, মানুষ তুমি গির্জা হলেই পারতে।

আসল না হোক নকল হলেও একটু চোখের অশ্রু পেতে, হলুদ রঙের লাল আগুনে ঝলসে গেলে। পত্রিকায় জায়গা হতো। এখন দেখো তুমি কী মূল্যহীন, একা পুড়লে কেউ ভজে না। ভজতে হলে, জায়গা পেতে গেলে মরতে হবে কর গুনে কয়েক শতো।সংবাদমাধ্যম তো আজকাল কেবল একশো থেকেই হিসেব শুরু করে, পঞ্চাশেও ঠিক গায় লাগে না। অথচ ক্ষমতাবান গির্জা হলে, একলাই পুরো মাঠ কাঁপাতে।

লেখক ও সাংবাদিক

বিজ্ঞাপন

সংশ্লিষ্ট বিষয়

নটরডেম প্যারিস গির্জা

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0670 seconds.