• ১৭ এপ্রিল ২০১৯ ১৯:১৬:৪৮
  • ১৭ এপ্রিল ২০১৯ ১৯:১৬:৪৮
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

কাঠগড়ায় সাফা: বিশ্বাস-অবিশ্বাসের নগ্ন খেল

প্রতীকী ছবি


নাজমুল রানা :


বিশ্বাস-অবিশ্বাস। দুই শব্দের মাঝে কেবল একটা অ-এর ফারাক। তাতেই যতো হট্টগোল। ধরুন আমি যদি আপনার সাথে সুর মিলিয়ে বলি, ‘আপনার মতোই আমি এই মতে বিশ্বাসী।‌’ বেশ অট্টহাসি হেসে আপনি আহ্লাদে গদগদ হবেন। লুটিয়েপুটিয়ে কলসির প্যাঁচের মতো জড়িয়ে ধরবেন আমাকে। আহ! কতো জনমের এই পরিচয়। কতো শক্ত আপনার আমার বন্ধন।

অথচ মিনিট পাঁচেক আগেও আমি আপনাকে চিনতাম না, এমনকি আপনিও আমাকে না। তবে এতো খাতির জমলো কেন? বিশ্বাস! এক বিশ্বাসই আমাদের বেঁধে ফেললো এক সুতোয়। অনুরণন তুললো দুই মনে। ব্যাপারটা খুবই স্বাভাবিক, যৌক্তিকই বটে।

তবে বিপত্তিটা বাঁধে তখনই, যখন আমি বলি, আপনার সাথে এ বিষয়ে আমি একমত নই। আপনি যে ধারা বা মতে বিশ্বাসী সে মতেও আমার কোনো আস্থা-বিশ্বাস নেই। চিত্রপট পাল্টে গেলো। মোলাকাত ভঙ্গিমা ত্যাগ করে আপনি ঊদ্ধত হবেন খড়গ হাতে! কিন্তু কেন? সব সময় যে আপনার সাথে আমাকে একমত হতেই হবে এমন তো কোনো কথা নেই। আমার পক্ষ নেয়ার অধিকার থাকলে বিপক্ষে যাবার অধিকার থাকবে না কেন? বিশ্বাসের অধিকার যার আছে, তার তো অবিশ্বাসের অধিকারও থাকার কথা। আমার বিশ্বাসকে সাদরে গ্রহণ করে বুকে বুক মিলাতে পারলে, অবিশ্বাসকে কেন নিতে পারছেন না সহাস্যে?

আর এই বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দ্বন্দ্বটা আরো প্রকট হয় যদি এর ভেতরে কোনোভাবে ধর্মের বিষয়টা ঢুকে পড়ে/ঢুকানো যায়। কোনো বিচার-বিবেচনা ছাড়াই অবিশ্বাসী বধে মত্ত হয় বিশ্বাসী দুনিয়া। ন্যায় প্রতিষ্ঠার নামে চলে অন্যায়ের একচ্ছত্র চাষাবাদ। এই দ্বন্দ্বে বিভোর মানুষ একে অন্যের গলায় ছুরি চালাতেও এক মিনিট ভাবে না। বিশ্বাসী যদি চিৎকার দিয়ে বলার ক্ষমতা রাখেন যে, তিনি অমুকে বিশ্বাসী। তবে অবিশ্বাসী কেন শান্ত গলায় মিহি সুরেও বলতে পারবেন না যে, তিনি এ বিষয়ে বিশ্বাসী নন।

প্রত্যেক ধর্ম প্রবর্তকই তো ধর্মীয় বাণী প্রচার করেছেন সেই সময়ে প্রচলিত ধর্ম ব্যবস্থার প্রতি অনাস্থা জানিয়ে। সেই ব্যবস্থার প্রতি অবিশ্বাস জানিয়েই তো পুতেছেন নতুন বিশ্বাসের বীজ। সে হিসেবে বিশ্বাস-অবিশ্বাস একে অপরের পরিপূরক। বিশ্বাস থেকেই জন্মায় অবিশ্বাসের চারাগাছ, অবিশ্বাসের বুকে বেড়ে ওঠে বিশ্বাসের নির্মল পটভূমি। তাই বিশ্বাস এক ধরনের অবিশ্বাস, মানে একটা বিষয়কে বিশ্বাস করলে অন্য কোনো একটা বিষয়কে অবিশ্বাস করতেই হবে। আবার অবিশ্বাসও এক ধরনের বিশ্বাস বটে! কারণ কোনো বিষয়ে বিশ্বাসী না হলে অন্য কোনো বিষয়ে অবিশ্বাসী হয়ে ওঠাও যায় না।

এবার সাফা কবির ইস্যুতে চোখ রাখা যাক। বিশ্বাস-অবিশ্বাসের খেলার নগ্ন জিঘাংসার শিকার এই অভিনেত্রী। শেষ অবধি হাতজোড় করে ক্ষমা চাইতে হয়েছে সাফাকে। কিন্তু তাতেও বিশ্বাসীদের ক্ষোভ কমেনি। নানা মাধ্যমে চলছে হরদম গালাগালি। তার নাটক, সিনেমা -বিজ্ঞাপনও বয়কটের ডাক এসেছে নানা মহল থেকে। সাফার কী অপরাধ? কোন দোষে তিনি এমন উগ্রপন্থি বিশ্বাসের কাঠগড়ায়? ব্যাপারটা খুব সাধারণ। একটা বেসরকারি রেডিওর অনুষ্ঠানে অতিথি হয়ে আসা সাফা কথায় কথায় বলে ফেলেছেন, ‘আমি একদমই পরকালে বিশ্বাস করি না।’ কেন বিশ্বাস করেন না তার ব্যাখ্যাও সাথে সাথে দিয়ে দিয়েছেন সাফা। ব্যাখ্যায় তিনি বলেছেন, ‘সত্যিকারার্থে আমি যেটা দেখি না, সেটা কখনো বিশ্বাস করি না।‘

ভালো কথা, যে বিষয় চোখের সামনে দেখেননি তাতে বিশ্বাস আনা কিংবা অবিশ্বাস করা, দুই ধরনের অধিকারই তো সাফার থাকার কথা। আর সাফা এই কথা যেচে ঢাকঢোল পিটিয়ে নিজে থেকে বলেলনি, বলেছেন অন্যের প্রশ্নের পরিপ্রেক্ষিতে। এক ভক্ত জানতে চেয়েছেন, খোলা মনে নিজের অবস্থান জানিয়ে দিয়েছেন সাফা। এতে তো আরো হাততালি পাওয়ার কথা ছিলো সাফার। যেখানে রোজ ভক্ত মন-পাবলিক সেন্টিমেন্ট রক্ষা করে চলা শোবিজ অঙ্গণের মানুষেরা অনর্গল মিথ্যা বলে চলেন। সেখানে সাফা মিথ্যা বা ভণিতার আশ্রয় না নিয়ে সরাসরি সত্যটা বলে দিয়েছেন।

কিন্তু সত্য বলার দায় এখন তার গলার কাঁটা। গালাগালির পাশাপাশি হয়তো অনেক বিশ্বাসী তাকে হত্যার হুমকিও দিয়ে ফেলেছেন। সামাজিক-পারিবারিক জায়গা থেকেও অপদস্থ হয়েছেন সাফা। সে কারণেই হয়তো ক্যারিয়ার আর জীবন দুই রক্ষায় ফেইসবুক  সাফা লিখতে বাধ্য হয়েছেন, ‘আমি যদি কোনো ভুল করে থাকি সেই ভুলের জন্য আমি পরম করুণাময়ের কাছে ক্ষমা চেয়ে নিয়েছি। তিনি পরম দয়ালু এবং ক্ষমাশীল। তিনি নিশ্চয়ই আমাকে ক্ষমা করবেন।’

বেশ ভালো বলেছেন সাফা। দয়ালু-ক্ষমাশীল স্রষ্টার কাছে সপে দিয়েছেন নিজেকে। তার বিশ্বাস ক্ষমাশীল স্রষ্টা তাকে ক্ষমা করবেনই। কিন্তু ক্ষমাশীল স্রষ্টার সৃষ্ট প্রাণীদের এতো ক্ষমাহীন আচরণ কেন? যারা সাফাকে অবিশ্বাস থেকে বিশ্বাসের দুনিয়ায় পা রাখতে বাধ্য করলেন, তারা কী জানেন বিশ্বাস থাকে বুকে অবিশ্বাসও আসে বুক থেকে। ঘৃণার তীরে বিদ্ধ করে কারো কাছ থেকে ফেসবুকে বিশ্বাসের স্বীকারোক্তি নেয়া গেলেও মন থেকে নেয়া যায় না।

সব ধর্ম, সব বিশ্বাস-ই তো পর মত সহিষ্ণুতার কথা বলে। সব ধর্মই তো বলে ভালোবাসার কথা। রোজ পথে কাঁটা দেয়া বুড়িকে একদিন দেখতে না পেয়ে, মুহাম্মদ (সা.) ছুটে গেলেন তার ডেরায়। অসুস্থ দেখে নেমে পড়লেন সেবায়। কই রাসুল তো অবিশ্বাসী বুড়ির গলা টিপে ধরেননি। বরং সেবা যত্নে সুস্থ করে তুললেন। হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান সব ধর্মেই এমন মানবতার উদাহরণ ভুড়িভুড়ি। কিন্তু সেসব না শুনে, না মেনে আমরা কেন বিরোধী দমনে মত্ত হই তরবারি হাতে।

সাফাকে তো সাফার কথা বলতে দেয়া উচিত। আপনি তার মতে বিশ্বাসী নন, বেশ। প্রয়োজনে আপনি তার কথা শুনবেন না। সাফা তো আপনাকে বলেনি যে, তার কথা আপনাকে মানতেই হবে। শুধু বলেছে, তিনি এটা বিশ্বাস করে না। তিনি তো আর কিছুই বলেনি। কারো ধর্মীয় অনুভূতিতেও আঘাত হানেনি। শুধু নামটা মুসলিম বলে, চেতনার তরবারি নিয়ে দাঁড়িয়ে গেলেন! বাহ, একবার ভেবে দেখেছেন কী নামে ধর্মের পরিচয় নয় ধর্ম বাঁচে চর্চায়। তাই সাফাকে সাফার বিশ্বাস নিয়ে বাঁচতে দিন। প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকেরই নিজের বিশ্বাস নিয়ে বাঁচার অধিকার আছে। আর আপনারা বাঁচুন আপনাদের বিশ্বাস নিয়ে। বিশ্বাস-অবিশ্বাস থাক দিলে, মারণাস্ত্র-হিংসার যুদ্ধ হয়ে বাইরে না আসুক।

লেখক ও সাংবাদিক

বিজ্ঞাপন

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0186 seconds.