• ১৬ এপ্রিল ২০১৯ ২০:১২:০৩
  • ১৬ এপ্রিল ২০১৯ ২০:১২:০৩
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

সব উৎসবগুলো আটকে যায় বখাটে-নিরাপত্তায়!

ছবি : সংগৃহীত


নাজমুল রানা :


মশার থেকে রেহাই পেতে আমরা রোজ রাতে কাপুরুষের মতো মশারির ভেতরে দেহ আটকে রাখি। মশা তাড়ানোর ব্যবস্থা না করে আমরাই পালাই। সেয়ান মশাও কম যায় না, কোনো রকম ফাঁক-ফোঁকর পেলেই মশারির মধ্য ঢুকে পড়ে, নিরাপদে নিরিবিলি কামড়ায়। আর যাদের মশারির ভেতর ঢোকার সাধ্য হয় না, তারা বাইরে ওঁৎ পেতে থাকে। বেরুলেই উপর্যুপুরি কামড় জুড়ে দেয়।

শতকের পর শতক, যুগের পর যুগ ধরে চলে আসছে এই মশা-মশারি ও মানুষের লুকোচুরি খেলা। আমাদের দেশের আইন শৃঙ্খলা-নিরাপত্তার খেলাটাও এরকম। অপরাধ উচ্ছেদ-উৎপাটনের ব্যবস্থা না নিয়ে এরা মত্ত মশারি টানাতে। নিজেরা যতোখানি পারে টানায়, জনগণকেও টানানোর পরামর্শ দেয়। এমনিতেই ফাঁক-ফোঁকর গলিয়ে মশা ঢোকে, তারওপর যদি মশারি হয় ফুটো কি দশা হয় ভাবুন। আমাদের নিরাপত্তা মশারির বেশিরভাগেই কম বেশি ফুটো আছে। তাই নিরাপত্তার চাদর বিছানোর পরও অপরাধ কমে না। নিরাপত্তা রক্ষীর সামনে বসেই খুন করে চলে যায় খুনি, তাদের নাকের ডগায়ই ঘটে ইভটিজিংয়ের ঘটনা।

বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকতে দেখেছি সদর গেইটে পুলিশ, ফাঁড়ি গেইটে পুলিশ। মোড়ে মোড়ে পুলিশ, চত্বরে পুলিশ। বহাল তবিয়তে পুলিশ রয়েছে প্রত্যেক হল গেইটে। তারওপর রাস্তায় টহলদার পুলিশ তো আছেনই। সবমিলিয়ে এক পুলিশময় ক্যাম্পাস। নিরাপত্তা বেষ্টনি আর স্তর হিসেব করলে একে কোনো সামরিক ক্যান্টনমেন্ট বললে ভুল হবে না খুব একটা। এতো পুলিশ থাকার পর তো আর নিজেকে অনিরাপদ ভাবার কারণ নেই, আর ভাবতেইবা যাবো কোনো? যেনো নিরাপত্তাহীনতায় না ভুগি সেজন্যই তো এই নিরাপদ মশারি বুনেছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। তবে মজার বিষয় কখনো পুলিশ প্রহরার দুই হাত দূরেই গলায় ছুরি ধরে ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটতো, এখনও ঘটে। হলের গেইটে  পুলিশ কিন্তু ভেতরেই হয়ে গেছে খুনোখুনি। এরকম ইভটিজিং, মারামারি, অবৈধ অস্ত্রের মহড়াসহ সব অপকর্মই ঘটতো-ঘটছে ক্যাম্পাসে পুলিশের উপস্থিতিতে। আর এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে কোনো আন্দোলন হলেই বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন হাজির হতো মশারি থিওরি নিয়ে।

যেমন ধরুন ইভটিজিং, তাহলে প্রশাসন বললো সন্ধ্যা ছয়টার পর মেয়েরা হলের বাইরে থাকতে পারবে না। আর ভর দুপুরেও ক্যাম্পাসে একা একা হাঁটতে পারবে না কোনো নারী শিক্ষার্থী। ছিনতাই, কেউ একা হাঁটবেন না, রাত আটটার পর বাইরে থাকবেন না। খুনের জেরে আন্দোলন, জাস্ট ক্যাম্পাসটা অনির্দিষ্ট কালের জন্য বন্ধ। তারপর পরিস্থিতি শান্ত হলে মাসখানে পর সময় সুযোগ বুঝে ক্যাম্পাসটা খুলে দিন, ততোদিনে আন্দোলন সংগ্রাম হাওয়া। কিন্তু মশা মারা মানে অপরাধ নির্মূলে কোনো পদক্ষেপ নেই। চোরের ভয়তে কপাট বন্ধ করে থাকা আরকি, চোর বুক ফুলিয়ে রাস্তায় ঘুরবে আর আপনি থাকবেন গৃহবন্দি।

ক্যাম্পাস কাব্য পেরিয়ে এবার আসা যাক জাতীয় পর্যায়ে। ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে পহেলা বৈশাখ বাঙালির প্রাণের উৎসব। তাই সব বাঙালিই নিজেদের মতো করে আড়ম্বরে দিনটিকে উদযাপন করে। সাধ্য ও সংস্কৃতি মতো সাজায় উৎসবের ডালা। বৈশাখের সবচেয়ে নজরকাড়া আয়োজন মঙ্গল শোভাযাত্রা। সারা দেশে ছোটো বড়ো পরিসরে মঙ্গল শোভাযাত্রায় আয়োজন হলেও সবার নজর থাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলার নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত মঙ্গল শোভাযাত্রার দিকে। হাজারো লোকের সমাগমে জনসমুদ্রে পরিণত হয় এই শোভাযাত্রা, আর সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে নারীদের হেনস্তার পৈশাচিকতায় নামে কয়েকজন বখাটে-যৌন নিপীড়ক। ব্যস মশারি থিওরি হাজির। মঙ্গল শোভাযাত্রার সামনে পেছনে, দুই পাশে দাঁড়িয়ে গেলো বন্দুক। চারপাশে আগ্নেয়াস্ত্র মাঝখানে বসে নিরাপদে মুক্তভাবে উৎসব করুন।

শুধু কি এখানেই শেষ? না, আছে আরো বিধি নিষেধ। এই পথ ধরে এভাবে যাবেন, ও পথে যাবেন না। এই গানই বাজাবেন তো এই গান বাজাবেন না। এই কয়টার পর বাইরে থাকবেন না। আরেকটা নতুন খবর শুনলাম বাইকে কে চড়বে আর সাথে কে কে থাকতে পারবে তাও নাকি ঠিক করে দিয়েছে অনেক জায়গার প্রশাসন। এতো কিছুর পর কী আর কোনো উৎসব উৎসব থাকে? উৎসব তো পুরোপুরি স্বতস্ফূর্ত ব্যাপার। মুক্ততাই উৎসবের মূল শর্ত। হাত পা বেঁধে কোমরে গলায় বেড়ি পরিয়ে যদি কাউকে বলা হয়, এবার প্রাণ খুলে ধেই ধেই করে নাচুন, অথবা গলা ছেড়ে গান। আবার কারো মাথার চারপাশে বন্দুক ঠেকিয়ে বলা হলো, আপনি নিরাপদ, এবার প্রাণ ভরে হাসুন! সম্ভব?

বৈশাখ নয় এ দেশের সব অনুষ্ঠানেরই একই দশা। বায়তুল মুকারম বা শোলাকিয়ায় ঈদের নামাজ পড়তে গেলে যেমন অনেকগুলো বন্দুকের নল ডিঙোতে হয়। দুর্গা পূজার বেলায়ও তাই। এই কয়টার মধ্যে প্রতিমা এই নদীতে ফেলবেন। এ পাড়ার বাসিন্দারা এ পথেই যাবেন। আরো অনেক নিয়ম কানুন। যার ফলে কোনো উৎসবই আর উৎসব থাকছে না, হয়ে উঠছে সামরিক কুচকাওয়াজ। প্রাণবন্ত সব আয়োজন হয়ে পড়ছে প্রাণহীন। শেকড়ের আমেজ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে আমাদের চারা গাছ। আমরা মঙ্গল শোভাযাত্রায় পা মেলাচ্ছি কায়দা কানুন মানা কয়েদির মতো। উত্তর কোরিয়ার সমাজতান্ত্রিক স্বৈরশাসক কিম জং উনের বার্ষিক সামরিক প্যারেডে যেভাবে মানুষ যায়, যেমন অনুগত ভঙ্গিতে মেলায় পা। আমাদের এই মঙ্গল শোভাযাত্রারও ঠিক সেই দশা।

অবশ্য এখানে সংকট আছে। উৎসবের সুযোগ নিয়ে অস্থিতিশীলতাও সৃষ্টি করে কিছু মানুষ। তাদেরকে চিহ্নিত করে শায়েস্তা কর হোক। গুটি কয়েক মানুষের জন্য হাজারো মানুষকে খাঁচায় পোরার আদৌ কোনো যৌক্তিক যুক্তি আছে কী? মাথা ব্যথা বলে তো আর মাথা কেটে ফেলা যায় না। পথে নামলে গাড়ি চাপা পড়বো এই ভেবে পথে নামবো না তা কী হয়? তারচেয়ে বরং গাড়িওয়ালাগুলোকেই ঠিক পথে আনতে হবে যাতে তারা ভালোভাবে গাড়ি চালায়, আর কেউ চাপা না পড়ে। কথায় কথায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনের গল্পটা মনে পড়ে গেলো। সমাবর্তনের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে যাবেন রাষ্ট্রপতি। আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর নানা রকম তৎপরতা। সাথে তৎপর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষও। ভালো কথা। হঠাৎ দেখি কাজলা গেট থেকে প্যারিস রোড রাস্তার পাশে থাকা ছোটো ছোটো ফুল গাছগুলোর কোনোটারই মাথা নেই। পাশে থাকা এক সহকারী প্রক্টরকে প্রশ্ন করলাম স্যার, কোন অপরাধে গাছের এই শাস্তি হলো? উনি ফিক করে হেসে বললেন, নিরাপত্তা! বললাম, বেশ। এটা নিরাপত্তার ইতিহাসে যুগান্তকারী সিদ্ধান্তই বটে।

এরপর আরো চমকপ্রদ ঘটনা ঘটলো যেদিন রাষ্ট্রপতি এলেন। সকালে হল থেকে বের হতে গিয়ে দেখলাম গেটে তালা। দ্বাররক্ষীর কাছে জানতে চাইলাম, কেনো এই শাস্তি? তিনি ষোলো পাটি দাঁত এক করে বললেন, মামা নিরাপত্তা! বাইরে হোমরা-চোমরাদের গাড়ির মাতামাতি, গ্রাজুয়েটরা ক্যাপ ওড়াচ্ছেন। আর সাধারণ শিক্ষার্থীরা নিরাপত্তার নামে খাঁচায়! সমাবর্তন মানে যেখানে উৎসব। সাবেক বর্তমানের মেলবন্ধন, গল্পের হাট। সেখানে নিরাপত্তার দোহাইয়ে খাঁচাবাস করে উৎসবটাই মাটি হয়ে গেলো। তাই এরকম বাঘের ভয় দেখিয়ে উৎসব মাটি করে মানুষকে খাঁচায় না পুরে, বাঘটাকেই খাঁচায় ঢোকানো হোক। তাতেই মঙ্গল। বাঁচবে উৎসব, বাঁচবে মানুষ...

লেখক ও সাংবাদিক

বিজ্ঞাপন

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0190 seconds.