• ১৩ এপ্রিল ২০১৯ ২১:২৫:৩২
  • ১৩ এপ্রিল ২০১৯ ২২:১৯:৪৪
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

এ কেমন বিষে নীল হচ্ছি আমরা!


ডা. পলাশ বসু :


নতুন বাংলা বছরের আগমনকে সু-স্বাগত জানাই প্রথমেই। এটা আমাদের কাছে আলাদা একটা আবেদন নিয়ে আসে। কারণ এটা আমাদের। একান্তই আমাদের। আমাদের সংস্কৃতির অংশ। বাংলা নতুন বছরের আগমনে তাই আমাদের মনে অনির্বচনীয় এক ভালো লাগার অনুভূতি কাজ করে থাকে।

যদিও বাংলা নববর্ষ পালনের বিপক্ষে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এখন অনেককেই সরব থাকতে দেখা যায়। অথচ এ উৎসব পালনের জন্য ৩০% বৈশাখী ভাতা নিতে এরা কিন্তু বিন্দুমাত্র কৃপণতা করে না! ধর্মের নামে এই যে আত্মঘাতি মনস্তত্ব, এই যে রাজনীতি নামক নোংরামি সেটা মনে হয় এখন আমাদের সর্বত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ছে। সংস্কৃতির বিপক্ষে ধর্মকে দাঁড় করিয়ে দেয়ার পাকিস্তান আমলের অশুভ প্রবণতা এখনও আমরা বয়ে চলেছি এবং সেই বিষে আমরা নীল হচ্ছি প্রতিনিয়ত।

এ অবস্থার মধ্য দিয়েই অবশ্য প্রতি বছর পহেলা বৈশাখ উদযাপিত হয়ে থাকে। ছায়ানট, চারুকলাসহ আরো অনেক সংগঠন দেশব্যাপী নানা প্রোগ্রাম করে থাকে। ছেলে-মেয়েরা পাঞ্জাবী আর শাড়ি পরে বের হয়। মুখে আল্পনা আঁকে। আনন্দ করে বেড়ায়। তবে, সাম্প্রতিক সময়ে নুসরাত হত্যাকাণ্ড আমাদের এবারের পহেলা বৈশাখের আনন্দকে অনেকখানি ম্লান করে দিয়েছে নি:সন্দেহে। সেই সাথে কিছুদিন আগে ঘটে যাওয়া অগ্নিকাণ্ডে নিহত ব্যক্তিদের জন্যও যে হৃদয় ব্যথাতুর হবে সেটাও চোখ বুঁজেই বলা যায়। যদিও  স্মৃতি মাঝেমধ্যে প্রতারণা করে। আমরা অনকে কিছু ভুলে যায়। নতুন ঘটনার আগমনে তিক্ত অতীতকে ভুলে যায়। নতুন ঘটনা নিয়ে সরব হয়ে উঠি। দিনান্তে সেটাও একসময় মিইয়ে যায়।

কিন্তু যেটা দুঃখজনক ব্যাপার সেটা হচ্ছে, ঘটনা পরম্পরায় আমাদের যে মানসিক বিকৃতি বা দীনতার লক্ষণ দেখতে পাচ্ছি সেটা বড্ড ভাবনার এবং গভীর উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমাদের এমন উন্নাসিক চিন্তাচেতনা কিভাবে সমাজে খুঁটি গেড়ে বসছে সেটা ভাবলে অবাক না হয়ে পারি না। অবশ্য বিষয়টা কি এমন--যে এমন উচ্ছন্নে যাওয়ার মানসিকতা আমাদের ভেতরে আগে থেকেই ছিলো শুধু প্রকাশের উপলক্ষ খুঁজতো? সেটা হলে তো মহা মুশকিল।

এই যেমন নুসরাত নামের মেয়েটি, যে তার শিক্ষকের লোলুপ পাশবিকতার বলি হলো- অথচ সেই শিক্ষকের পক্ষে মানববন্ধন করলো এরা কারা? এরা কোন বিকৃত মানসিকতা লালন করে তাদের মগজে? এখানে তো নারী-পুরুষ, তরুণ-তরুণী সবাই ছিলো!! শুধু তাই নয়, নুসরাতকে মাদ্রাসার ছাদে ডেকে নিয়ে গিয়ে যে শরীরে আগুন ধরিয়ে দিলো সেসব তরুণ-তরুণীরা তো আমাদের সমাজেই বেড়ে উঠছে। এরা নিজের প্রয়োজনে কতটা নৃশংস হতে পারে –ভাবা যায়? আবার নুসরাতের অভিযোগ নিতে যে ওসি গড়িমসি করলো সেও কেমন মানসিকতা লালন করে –যে আইনের রক্ষক হয়ে নিপীড়কের পক্ষ নেয়?

এসব বিচ্ছিন্ন কোনো উদাহরণ নয়। এটা আমাদের নোংরা মানসিকতারই বহিঃপ্রকাশ। এটা “তন্ত্র” নামক এক উত্তরাধিকারের বিষয়। চিন্তাজগতকে যা অবচেতনভাবেই আচ্ছন্ন করে রাখে। নানাভাবে নানারূপে তা প্রকাশিত হয়ে পড়ে- এই যা। এমনই একটা তন্ত্র হচ্ছে পুরুষতন্ত্র। শুধু যে পুরুষ এমন তন্ত্র বা মানসিকতা লালন করে বিষয়টা তেমন নয়। অনেক নারীও এসব পুরুষদের মতোই নারী নিপীড়িত হলে সেই নারীকেই দোষী সাব্যস্ত করে থাকে। সেই নারীর পোশাক, চলন-বলন এসবকেই দায়ী করে থাকে এমন ঘটনার জন্য। নিপীড়কের দায় বা দোষ তাদের কাছে একদমই ধর্তব্য কোনো বিষয় হয়ে ওঠে না।

এই যে নিপীড়ক বা ধর্ষকের পক্ষ নেয়া তরুণ-তরুণী এদের মানসিকতার স্বরূপ দেখলে রীতিমতো শরীর ও মন রি রি করে ওঠে। এমনটা দেখলে যুগপৎ ভয় ও ঘৃণা লাগে। কারণ এমন মানসিকতা জাতি হিসেবে আমাদেরকে পশ্চাদপদ করে তোলে। সমাজের অগ্রযাত্রাকে ব্যাহত করে। নারী-পুরুষের সম্মিলিত প্রয়াসেই যে সমাজ ব্যবস্থা গড়ে ওঠে তার পিঠে ছুরি মারে।

অবশ্য শুধু নুসরাতকে নিয়ে নয়। সাম্প্রতিককালে “গা ঘেঁষে দাঁড়াবেন না” লেখা টি-শার্ট পরা দুটো মেয়ের ছবি ভাইরাল হওয়ার পরে একদল তরুণ-তরুণীকে দেখলাম সোশ্যাল মিডিয়ায় মেয়ে দুটোকে তুলোধুনা করতে। তাদের ঐ যে বললাম “পৌরষত্ব” নামক পুরুষতন্ত্রে নাকি তা বড় বেশি আঘাত করেছে। ভাবটা এমন যেন গা ঘেঁষে দাঁড়াবো না তো কি করবো? এতই যদি মেয়েরা তোমাদের ছুঁৎমার্গ থাকে তাহলে পাবলিক বাসে উঠো কেন- বলে জেরবার হয়ে যাচ্ছে। অথচ যে সহজ সত্যটি এরা এড়িয়ে যাচ্ছে সেটা যাচ্ছে পাবলিক প্লেস হলেই বরং নিজেকে আরো সংযত করতে হয়। কারো সাথে অহেতুক স্পর্শ হলেই (সেটা নারী/পুরুষ যেই হোক না কেন) বরং তাতে দুঃখপ্রকাশ করতে হয়। সেটা করা দূরে থাক, উল্টো চোরের মার গলার মতো এদের গলার স্বর চড়া হয়। এই কি তবে আমাদের মানসিকতা?

আমি অবশ্য এমন ভাবতে চাই না। বরং উল্টোটাই দেখতে চাই। সেটা হচ্ছে, নুসরাতের মতো মেয়েটি মারা গেলে যখন সবার হৃদয় কেঁদে ওঠে সেই বাংলাদেশই আমার দেশ। সেটাই আমাদের সংস্কৃতি। সেটাই আমাদের ভেতরের শক্তি। আমাদের অন্তরের সাহস। মাদ্রাসার শিক্ষকের পক্ষে মানববন্ধন করা ঐসব মানুষদের জন্য বরং করুণা হয়। করুণা হয় ঐসব মানুষদের জন্য যারা কারো টি-শার্টে “গা ঘেঁষে দাঁড়াবেন না” লেখা দেখে “ঠাকুর ঘরে কে রে/ আমি কলা খাই না” এর মতো সোশ্যাল মিডিয়ায় ঝাঁপিয়ে পড়ে তাদের জন্য। কথায় কথায় যারা ধর্মকে টেনে এনে রাজনৈতিক হাতিয়ার করে তোলে তাদের জন্যও করুণা হয়।

“আপনি আচরি ধর্ম পরকে শেখাও” এ মর্মকথা ভুলে গিয়ে এরা পরনিন্দা আর পরচর্চার হাতিয়ার করে তোলে ধর্মকে ব্যবহার করেই। অথচ সেই ধর্মই ওদেরকে বলেছে পরনিন্দা আর পরচর্চা না করতে। তবুও এরা সেটা করেই মজা পায়। কারণ ঐ যে কথায় আছে না “চোরা না শোনে ধর্মের কাহিনী”। এরা ঐ চোরাবেশি ধর্মপালনকারী। এদের বিষে তাই সমাজ যেন নীল না হয়ে ওঠে সে ব্যাপারে সবাইকে সবসময়ের জন্য সচেতন থাকতে হবে।

লেখক : চিকিৎসক ও শিক্ষক। সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগ, এনাম মেডিকেল কলেজ।

বিজ্ঞাপন

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0188 seconds.