• ০৮ এপ্রিল ২০১৯ ২২:০৬:০৯
  • ০৮ এপ্রিল ২০১৯ ২২:৩০:০৩
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

গা ঘেঁষে দাঁড়ানোর দায় ও পুরুষের শিকারোক্তি

ছবি : সংগৃহীত


নাজমুল রানা 


বাসা থেকে অফিস কিংবা ঢাকার যেকোনো গন্তব্য। লোকাল বাস ধরা মানে গা ঘেঁষাঘেঁষি। বিশেষ করে অফিস টাইমে অধিকাংশ পাবলিক পরিবহনে পা রাখাই দুষ্কর। হোক সে সিটিং সার্ভিস অথবা তুরাগ, ছয় নম্বরের মতো লোকাল বাস। আর গন্তব্যের এই যাত্রা যুদ্ধে নারী-পুরুষ সবাইকেই সামিল হতে হয় সমহারে।

এই গাদাগাদি আমাদের রীতি মতো ঠেলে দেয় ঘেঁষাঘেঁষির ময়দানে। নারী শরীর ঘেঁষে দাঁড়ায় পুরুষ, পুরুষ শরীর ঘেঁষে নারী। এ পর্যন্ত ব্যাপারটা দোষের কিছু নয় বরং ব্যাপারটা সহযুদ্ধের, সমানুভূতির।

কিন্তু কিছু পুরুষ অবয়ব এই সহঅবস্থানের সুযোগ নিয়ে নামে স্পর্শের নগ্ন খেলায়। যৌন জিঘাংসায় লোলুপ এই পুরুষ হাত-পা ছোঁয় নারী শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ। বহুবার দেখেছি নারীরা বাসে ওঠার সময় হেলপার অপ্রয়োজনেই সহায়তার নামে শরীর স্পর্শ করে। দু-এক জন নারী অবশ্য সাথে সাথেই প্রতিবাদ করেন, অধিকাংশ নারী ভিড়ের চোটে কিংবা তাড়াহুড়োর কারণে এটা খেয়ালই করে না। আর অনেকে হয়তো এটাকে বেঙ্গলি ট্রাফিক কালচার হিসেবে মেনে নিয়েছে বা দীর্ঘ চর্চা অভ্যেসে ব্যাপারটা গা সওয়া।

এরপর টাকা নিতে আসা কন্ট্রাকটর/সুপারভাইজার নামের মানুষটিও পারলে একটু হাত বুলান নারী শরীরে। ভিড় ঠেলে পেছনে যাওয়ার সময় গায়ে গা ঘষে যান। পাশে দাঁড়ানো পুরুষ যাত্রীরও সম ব্যবহার। সারা বাস খালি, কিন্তু পুরুষ যাত্রীটি দাঁড়াবেন ঠিক নারী আসনে শরীর মিশিয়ে কিংবা এক নারী যেখানে দাঁড়িয়ে আছে ঠিক তার পাশটায় ঘেঁষে। এভাবেই প্রতি পদে পদে পুরুষের লালসার শিকার এই শহরের নারীরা। এ শহরটা মোটেও নারী বান্ধব নয়। বাস থেকে নেমেও তাদের রেহাই নেই। ফুটপাত-ওভার ব্রিজ, মার্কেট থেকে জেব্রা ক্রসিং যেখানেই ভিড় সেখানেই আছে এই ঘেঁষাঘেঁষি রোগ।

ঘেঁষাঘেঁষিতে অতিষ্ট নারীদের মধ্য থেকে যখন কেউ প্রতিবাদ করতে যান, তখন বাঁধে বড়ো বিপত্তি। আশপাশে থাকা অধিকাংশ মানুষ, পুরুষ কিংবা নারী- কেউ তো সহায়তায় এগিয়ে আসবেই না উল্টো দাঁত কেলিয়ে মজা নেবে। দু-একজন তো অতি উৎসাহী হয়ে ঘেঁষাঘেঁষি রোগাগ্রস্ত পুরুষটির পক্ষ নেবে নির্লজ্জের মতো। একবারও ভাববে না, নিজেদের নারী স্বজনরাও প্রতিদিন এমন জঘন্য ঘেঁষাঘেঁষির মধ্য দিয়ে যায় এই রঙ্গপ্রিয় বঙ্গ দেশে। আবার দু-একজন যে প্রতিবাদী নারীর পাশেও দাঁড়ান, এ কথা অস্বীকার করার জো নেই। তবে সে সংখ্যা একোবারেই হাতে গোনা।

বর্তমানে যেকোনো ঘটনা প্রত্যক্ষ করা দর্শকদের অন্যতম কাজ মুঠোফোন ক্যামেরায় ঘটনার স্থিরচিত্র, ভিডিও ধারণ করা। এখানেই তাদের দায়িত্ব শেষ নয়, সেই ছবি ভিডিও আবার সগৌরবে আপলোড করেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। সাথে থাকে অনেক প্রতিবাদী বাক্যালাপ। আর সেই বাক্যালাপে যোগ দেয়া অনেক ভার্চুয়াল মানবাধিকার কর্মী, নারীবাঁদী, বিপ্লবীর কল্যাণে ঘটনা ভাইরাল হয়। এই ভাইরালের কল্যাণে অনেক সময় প্রতিবাদকারী নারী হিরো বনে গেলেও, কখনো সখনো পড়েন বিপাকে। যারা তাকে হাততালি দেয়, তাদের বিপরীতে দাঁড়িয়ে যায় আরেকটি শ্রেণি। এই বিপরীত শ্রেণি প্রতিবাদী নারীর নামে নানা কুৎসা রটান। অনেক সময় যার প্রভাব সরাসরি পড়ে ওই নারীর ব্যক্তি জীবনে। মনে রাখতে হবে এ দেশে ধর্ষণ বা নির্যাতনের শিকার হয়ে নারী বিচার চাইতে গেলে, লোলুপ চোখ তার কষ্ট-মানসিক যন্ত্রণা না দেখে, সুড়সুড়ি দেয়া নির্যাতন কাহিনী শুনতেই বেশি আগ্রহী। গ্রাম শালিসি ময়দান, স্থানীয় থানা থেকে শুরু করে দেশের সর্বোচ্চ আদালতেরও একই দশা। অধিকাংশ সময়ই নারীদের প্রতিবাদ ইতিবাচক কিছু আনতে ব্যর্থ হয়। প্রতিবাদই হয়ে ওঠে আরেক যন্ত্রণার কারণ।

‘গা ঘেঁষে দাঁড়াবে না' এই কথাটিও একই কারণে এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজের গায়ে লেগেছে। পুরুষতন্ত্র জোটবদ্ধ হয়ে মুখর এই স্লোগানের সমালোচনায়। পুরুষতন্ত্র যেহেতু এক মানসিক পরিস্থিতি, তাই পুরুষতন্ত্র বলতে কেবল পুরুষকে বোঝায় না। এই তকমায় নারী পুরুষ সব মিলেমিশে একাকার। পুরুষের পাশাপাশি অনেক নারীও যোগ দিয়েছেন, ‘গা ঘেঁষে দাঁড়াবেন না'র সমালোচনায়। কেবল সমালোচনা বললে ভুল হবে, এটা এখন রীতিমতো নগ্ন সাইবার যুদ্ধে রূপ নিয়েছে। পক্ষ-বিপক্ষ সবাই সাইবার ট্রায়ালও বসিয়ে ফেলেছেন। নিজস্ব যুক্তি আর গায়ে ঠেলা নিক্তিতে চলছে এর জাত বিচার। লক্ষ্য করার বিষয় হলো, এই দু-পক্ষই মৌলবাদী। আর এই মৌল বিবাদে মূল চরিত্র হারিয়ে একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবাদ কর্মসূচি ন্যাকামির পর্যায়ে এসে ঠেকেছে।

ঝামেলাটা আসলে আমাদের মস্তিষ্কে। নারীবাদীরা যে ভোল আওড়ান সেখানেও ঠিক মানুষ নেই, আর পুরুষতন্ত্র তো সৃষ্টির আদি থেকেই শোষক ও নোংরামির ভূমিকায়। নারী কিংবা পুরুষ না হয়ে যদি কেবল মানুষ হয়ে ওঠা যায়, তবেই মুক্তি। এর বাইরে বাদ আর তন্ত্র নামের বিবাদে জীবন শেষ। টি-শার্টের পর টি-শার্টে স্লোগান বদলাবে, কিন্তু পরিস্থিতি পাল্টাবে না। নারী পুরুষ মানব জাতির দু-ই ধারা। আদি থেকে আজ অবধি একসাথে, কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যৌথভাবে পৃথিবীকে এতো দূর নিয়ে এসেছে এরাই। একে অপরকে দিয়েছে নিঃস্বার্থ আবার কখনো শর্তযুক্ত সঙ্গ। কিন্তু বাদের বিবাদ আর ধর্মের যাতাকলে যৌথভাবে এরা ঠিক একক মানুষ পরিচয়ে দাঁড়াতে পারেনি। থেকে গেছে কেবল নারী ও পুরুষ। যে কারণে আজ ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকা পুরুষ, পুরুষতান্ত্রিক লিঙ্গ নিয়ে নারী শরীর ঘেঁষে দাঁড়ায়। আর দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া নারীরা বাধ্য হয়ে গায়ে চড়ায় ‘গা ঘেঁষে দাঁড়াবেন না’ সতর্ক বাণী লেখা টি শার্ট। আর সতর্কতার বিতর্কে রণাঙ্গণ ভার্চুয়াল দুনিয়া। ফাঁকে ফায়দা লুটছে তন্ত্র-বাদ ভেড়ুয়ারা। প্রতিবাদ শেষ অবধি গিয়ে ঠেকছে পুঁজিবাদী ব্যবসায়। কয়েক দিন ‘গা ঘেঁষে দাঁড়াবে না’ টিশার্টের কাটতি ভালো যাবে। এরপর ট্রেন্ড উল্টে আসবে নয়া ট্রেন্ড। চাপা পড়বে এই প্রতিবাদ। কিন্তু ঘেঁষাঘেঁষি বন্ধ হবে না। তাই সব বাদ, তন্ত্র-মন্ত্রের বিভেদ ভুলে মানুষ হয়ে ওঠা জরুরি, সময়ের গুরুত্বপূর্ণ দাবিও বটে।

লেখক ও সাংবাদিক

বিজ্ঞাপন

সংশ্লিষ্ট বিষয়

গা ঘেঁষে দাঁড়াবেন না

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0207 seconds.