• নিজস্ব প্রতিবেদক
  • ০৭ এপ্রিল ২০১৯ ২৩:৩৫:০৭
  • ০৮ এপ্রিল ২০১৯ ১০:১২:০৮
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

এসএম হলে হামলাকারীরা ছাত্রলীগের, ভিডিওতে প্রমাণ

ছবি: ফাইল

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সলিমুল্লাহ মুসলিম (এসএম) হল সংসদ নির্বাচনের প্রার্থী ফরিদ হাসানকে মারধরের ঘটনার বিচার চাইতে গেলে অবরুদ্ধ করা হয় ডাকসুর ভিপি নুরুল হক নূরসহ অন্যদের। এসময় হামলা করা হয় ছাত্র ফেডারেশনের ঢাবি শাখার সভাপতি উম্মে হাবিবা বেনজির, শামসুন্নাহার হলের ভিপি তাসনিম আফরোজ ইমিসহ অন্যদের।

গত মঙ্গলবার বিকেলের এ ঘটনায় পাঁচ জনের মতো আহত হন। এ ঘটনায় আন্দোলন শুরু হলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে অভিযুক্তদের বিচারের প্রতিশ্রুতি দিয়ে গঠন করা হয়েছে একটি তদন্ত কমিটি।

এদিকে হামলার ঘটনায় জড়িতদের চিহ্নিত করা হয়েছে কয়েকটি ভিডিও ফুটেজে। জড়িতরা অনেকেই ছাত্রলীগের নেতাকর্মী বলে জানা গেছে। এদের মধ্যে কয়েকজন আছেন, যারা গতবছরে বিভিন্ন অপকর্মের দায়ে ছাত্রলীগ থেকে বহিষ্কৃত। যদিও ঘটনার পর থেকে ছাত্রলীগ দাবি করে আসছে, তাদের কোন নেতাকর্মী হামলার ঘটনায় জড়িত নয়।

হামলায় জড়িত যারা: এ ঘটনার কয়েকদিন পর কয়েকটি ভিডিও ফুটেজ দেখে হামলাকারীদের সনাক্ত করে আন্দোলনকারীরা। তারা বলেন, ছাত্র ফেডারেশনের সভাপতি উম্মে হাবিবা বেনজিরের শরীরে যে ছেলেটি দৌঁড়ে এসে লাথি মারেন তিনি লোক প্রশাসন বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র ও হল শাখা ছাত্রলীগের সক্রিয় কর্মী মোবাশ্বের মারুফ। তিনি ছাত্রলীগ মনোনীত হল সংসদের জিএস জুলিয়াস সিজারের সমর্থক।

অভিযোগের বিষয়ে মোবাশ্বের মারুফ বলেন, ‘আমি সোমবার দুপুরে ট্রেনে করে কক্সবাজার আসি। এসেই হোটেলে উঠি। আমি এর সঙ্গে জড়িত নই।’ যদিও ট্রেনের কোন টিকিট দেখতে চাইলে দেখাতে পারেননি তিনি। তবে যে হোটেলে ওঠেন তার একটি রশিদ দেখান তিনি। যদিও সেখানে সময়ের কোন উল্লেখ নেই। এছাড়া কক্সবাজার থেকে ঢাকা ওঠার একটি বাসের টিকিট দেখালেও তাতে কোন নাম বা সময় ঊল্লেখ নেই।

হামলার ঘটনার ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে, যারা আন্দোলনকারীদের উপর হামলা করেছিল তাদের মধ্যে রয়েছে- হল শাখার উপ-ক্রিড়া সম্পাদক জাহিদ হাসান, সহ সাধারণ সম্পাদক নওশের আহমেদ, সহসভাপতি মিলন হোসাইন নিরব, নাট্য ও বিতর্ক বিষয়ক সম্পাদক আতিকুর রহমান আতিক, কর্মসূচি ও পরিকল্পনা সম্পাদক নাবিল হায়দার, সহ সভাপতি আরিফুল ইসলাম আরিফ, সাংগঠনিক সম্পাদক সানাউল্লাহ সায়েম এবং হল ছাত্র সংসদের ১ নাম্বার সদস্য আবির রহমান সৈকত।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, হামলাকারীদের নেতৃত্বে ছিলেন হল শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি তাহসান আহমেদ রাসেল, সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান তাপস, হল সংসদের ভিপি মুজাহিদ কামাল ও জিএস জুলিয়াস সিজার তালুকদার।

এদিকে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে হল শাখা ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি ও হল সংসদের ভিপি মুজাহিদ কামালকে ছাত্রলীগ থেকে বহিষ্কার করা হয়। সংগঠনটির গত কমিটির সভাপতি সাইফুর রহমান সোহাগ ও সাধারণ সম্পাদক এসএম জাকির হোসাইন বহিষ্কারের বিষয়টি তখন সাংবাদিকদের নিশ্চিত করেন। একাধিক গণমাধ্যমেও বহিষ্কারের বিষয়টি আসে।

অন্যদিকে, অভিযুক্ত কামালের বিরুদ্ধে বুয়েট মার্কেটের একটি হোটেলে খাওয়া শেষে টাকা না দেয়ায় তার নেতৃত্বে ওই হোটেলে ভাঙচুর করা হয়। এতে একটি মামলাও করে হোটেল কর্তৃপক্ষ। এই মামলায় দুই নাম্বার আসামি হন আরেক অভিযুক্ত ও হল শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক সানাউল্লাহ সায়েম। সায়েমকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দুই বছরের জন্য বহিষ্কার করা হয়।

ভুক্তভোগী উর্দু বিভাগের মাস্টার্সের ছাত্র ফরিদ হোসেনের অভিযোগ, এসএম হল সংসদের জিএস প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করায় জোর করে প্রার্থিতা প্রত্যাহার করায় ছাত্রলীগ। রুমে ইয়াবা ঢুকিয়ে হল থেকে বের করেও দেওয়া হয়। এরপর নির্বাচনের ২০ দিন পর গত সোমবার ‘হলে থাকার অভিযোগে’ রড ও লাঠি দিয়ে পেটানো হয়। হল শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি তাহসান আহমেদ রাসেল, সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান তাপস, হল সংসদের জিএস জুলিয়াস সিজার তালুকদার, হল ছাত্রলীগের সহসহভাপতি ওয়াসিফ হাসান পিয়াস, সাংগঠনিক সম্পাদক রুবেল হোসেন, সানাউল্লাহ সায়েম ও সাব্বির তাকে রুম থেকে বের করে হলের ডাইনিং রুমে মারধর করে রক্তাক্ত করে। এতে তার শরীরে ৩২টি সেলাই দিতে হয়। এ ঘটনায় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে একটি অভিযোগপত্র দায়ের করেন তিনি।

মারধরের ঘটনার পর মঙ্গলবার এসএম হলে যান ডাকসুর ভিপি নুরুল হক নূর, সমাজ সেবা সম্পাদক আখতার হোসেন, শামসুন্নাহার হলের ভিপি তাসনিম আফরোজ ইমি, বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশনের ঢাবি শাখার সভাপতি উম্মে হাবিবা বেনজির, কোটা সংস্কার আন্দোলনের যুগ্মআহবায়ক রাশেদ খান, ফারুখ হোসেনসহ প্রায় অর্ধশতাধিক শিক্ষার্থী। তারা যখন হলের গেটে পৌঁছান তখন তাদের উপর হামলা করে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। এসময় ছাত্র ফেডারেশনের সভাপতি বেনজিরের শরীরে লাথি মারে এক ছাত্রলীগ কর্মী। একই সময় ভিপি ইমির গায়েও হাত তোলা হয়। ডিম হামলা করা হয় তাদের উপর।

অন্যদিকে ভিপি নূর, আখতার হোসেন, রাশেদ খান, ফারুখ হোসেনসহ বেশ কয়েকজনকে হল প্রাধ্যক্ষের কক্ষে অবরুদ্ধ করে ছাত্রলীগের হল শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি তাহসান আহমেদ রাসেল, সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান তাপস, হল সংসদের ভিপি মুজাহিদ কামাল, জিএস জুলিয়াস সিজার তালুকদার, সাহিত্য সম্পাদক আকিব মোহাম্মদ ফুয়াদসহ হল সংসদের নেতাকর্মীরা। এসময় তাদেরকে লাঞ্ছনা এবং বিভিন্ন ভাষায় গালিগালাজ করা হয়।

ঘটনার পরপরই বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ভবনের সামনে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করে আন্দোলনকারীরা। উপাচার্য অধ্যাপক ড. আখতারুজ্জামানের সাক্ষাৎ না পাওয়ায় তারা সারারাত অবস্থান করে সেখানে। পরের দিন বুধবার সকালে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন অধ্যাপক আখতারুজ্জামান। তিনি হামলাকারীদের বিচারের আওতায় আনা হবে বলে প্রতিশ্রুতি দেন। পরে আগামী সোমবারের মধ্যে আলটিমেটাম দিয়ে আন্দোলন স্থগিতের ঘোষণা দেয় আন্দোলনকারীরা।

আন্দোলনকারীদের উপর যখন হামলা করা হয়েছি তখন নিরব ভূমিকা পালন করতে দেখা গেছে প্রক্টর টিমের সদস্যদের। তাদের শরীরে প্রক্টর টিমের পোশাক দেখা গেছে।

ঘটনার সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. এ কে এ গোলাম রাব্বানীকে ফোন করা হলে তিনি বলেছিলেন, সেখানে প্রক্টর টিমকে পাঠানো হয়েছে। তারা দেখবে। প্রক্টর টিমের নিরব ভূমিকার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ওটা হলের অভ্যন্তরীণ বিষয় তো। হল প্রাধ্যক্ষ যাচ্ছে। তিনি দেখবেন।

এদিকে ভিপি নুররা দুই ঘণ্টা অবরুদ্ধ থাকার পর ঘটনাস্থলে আসেন হল প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. মাহবুবুল আলম জোয়ারদার। প্রাধক্ষ ভুক্তভোগীদের উদ্ধার করে বাইরে নিয়ে আসছিল তখনও তাদের উপর ডিম হামলা করা হয়। এই হামলায় বাদ যায়নি হল প্রাধ্যক্ষও। যেটি তিনি নিজেই স্বীকার করেছিলেন।

জানতে চাইলে তিনি বলেন, যখন নূরসহ অন্যদের বের করে আনি তখন ধাক্কাধাক্কি হয়েছিল। এই ধাক্কা আমিও খেয়েছিলাম। আমার গায়েও ডিম নিক্ষেপ করা হয়েছে। অন্ধকারে কারা নিক্ষেপ করেছিল জানি না। তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তারা তদন্ত করে দেখবে।

তদন্তের কোন অগ্রগতি নেই: হামলার ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন করে হল প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. জোয়ারদার। এই তদন্ত কমিটি প্রধান করা হয় হলের সিনিয়র আবাসিক শিক্ষক ড. সাব্বীর আহমেদকে। তদন্তের চারদিন পার হলেও কোন অগ্রগতি হয়নি।

এ বিষয়ে অধ্যাপক সাব্বির আহমেদ বলেন, ছুটির কারণে আমরা কোন মিটিং বা কিছুই করতে পারিনি। তদন্ত শেষ করতে প্রায় চল্লিশ জনের মতো ইন্টারভিউ লাগবে। এতে প্রায় এক মাসের মতো সময় লাগতে পারে বলেও জানান তিনি।

এদিকে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে আগামীকাল সোমবার পর্যন্ত আলটিমেটাম দেয় আন্দোলনকারীরা। এ সময়ের মধ্যে যদি ব্যবস্থা না নেয়া হয় তবে কর্মসূচি চালিয়ে যাবে তারা। জানতে চাইলে ডাকসুর ভিপি নুরুল হক নূর বলেন, উপাচার্য আমাদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে, তারা বিচার করবেন। আমরা আগামী সোমবার পর্যন্ত আলটিমেটাম দিয়েছি। তারা যদি এরমধ্যে বিচার না করে তবে আমরা কর্মসূচি চালিয়ে যাব।

তদন্ত কমিটিকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, তদন্ত কমিটি চাইলে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে তারা দোষীদের খুঁজে বের করতে পারে। এই সময়ই যথেষ্ঠ। আমাদের কাছে সব তথ্য আছে। তারা চাইলে আমরা দিতে পারব।

বাংলা/এসআই

বিজ্ঞাপন

সংশ্লিষ্ট বিষয়

ডাকসু এসএম হল ছাত্রলীগ

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0184 seconds.