• ০৭ এপ্রিল ২০১৯ ২০:০৯:১৫
  • ০৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯ ২১:০৫:২৭
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

‘গা ঘেঁষে দাঁড়াবেন না’র অর্থ কী?

ছবি : সংগৃহীত


পারভেজ আলম :


“গা ঘেঁষে দাঁড়াবেন না” এই বাক্যটি পুরাপুরি আক্ষরিক পাঠ করা ঠিক হবে না। এই বাক্য সম্বলিত টি শার্টের উদ্দেশ্যও নিশ্চয়ই তা নয়। এই বাক্য পাঠ করার সময় অবশ্যই বাংলাদেশের পাবলিক স্পেসগুলাতে প্রতিদিনকার নারী নির্যাতনের প্রেক্ষিত মাথায় রাখতে হবে।

এই প্রেক্ষিত মাথায় না রেখে এই বাক্যকে পাঠ করলে নানান ভুল বুঝাবুঝির অবকাশ থাকে। কেউ কেউতো এই বাক্যকে বর্ণবাদী বলেও প্রচার করছেন, এইটা হলো বাক্যটির পেছনকার জুলুমের তোয়াক্কা না করা আক্ষরিক পাঠ – যেই পাঠ জুলুমের পক্ষেই শক্তি যোগায়।

বাক্যটির মাধ্যমে নারীরা যেই অর্থ প্রকাশ করতে চেয়েছেন তা সবচাইতে ভালোভাবে উঠে এসেছে এই টি শার্টের ছবি এডিট করে নানান ধর্ষকামী ও নির্যাতনমূলক কথা লেখা পুরুষদের হাতেই। যারা ছবি এডিট করে 'দুধে হাত দিবেন না', 'পাছায় লিঙ্গ ঘষবেন না' ইত্যাদি ধরণের কথা লিখে দিচ্ছে, তাদের এই পাঠই টি শার্ট প্রস্তুতকারকদের উদ্দেশ্যমূলক অর্থের সবচাইতে কাছাকাছি।

মেয়েরা যা স্পষ্ট ভাষায় লিখতে পারছে না, এই পুরুষরা ঠিক তাই লিখে দিচ্ছে। বাক্যটির বিরুদ্ধে সবচাইতে আক্রমণাত্মক এবং সহিংস অবস্থান নেয়ার মাধ্যমে তারা আসলে পাবলিক স্পেসে নারীদের বিরুদ্ধে সহিংস একটা সমাজ বাস্তবতাই আমাদের সামনে তুলে ধরছে। সেই সাথে টি শার্টের বাক্যটি তাই এর উদ্দেশ্য পালনে সফল হয়েছে বলা যায়।

কিন্তু "গা ঘেঁষে দাঁড়াবেন না" স্লোগানে যারা আহত বোধ করেছেন তাদের বড় অংশই নিশ্চয় রাস্তাঘাটে নারী নির্যাতন করেন না বা তার সমর্থন করেন না। নারীর পোষাক বিষয়ে ধর্মীয় ও রক্ষণশীল অবস্থান নিয়ে টিশার্টের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশকারীদের দলেও তারা অনেকেই পড়েন না। নারী নির্যাতক এবং নারীর পোষাক ও চলাফেরা নিয়ন্ত্রণে আগ্রহী রক্ষণশীলদের বাইরেও পুরুষদের বড় একটা অংশ আছে যাদের কাছে এই স্লোগানটি আপত্তিকর।

আমার মনে হয় যে, এই আপত্তির জায়গাটা বাংলাদেশের মেয়েদের, এবং অবশ্যই নারীবাদীদেরকে সিরিয়াসলি নিতে হবে। নারী নির্যাতকদের সাথে সমাজের বৃহৎ সংখ্যক পুরুষদের গুলিয়ে ফেললে, আলাদা করতে না পারলে ঐ নারী নির্যাতক পুরুষদেরই লাভ কিন্তু। যেহেতু এই সুযোগে তারা অন্য পুরুষদের সাথে মিশে যেতে পারে সহজেই। সেই সুযোগ তাদের দেয়া ঠিক হবে না।

যদিও "গা ঘেঁষে দাঁড়াবেন না" স্লোগানটি মূলত পাবলিক স্পেসের প্রিডেটর ধরণের নারী নির্যাতকদের বিরুদ্ধে লেখা, কিন্তু বাংলাদেশের অনেক পুরুষের কাছেই এই স্লোগানটি আমাদের সমাজে হাজির থাকা নারী-পুরুষের সম্পর্কের একটা বিশেষ দিক এবং তার সাথে যুক্ত অপমানের উৎপাদন বলে মনে হয়েছে। এই বিশেষ সম্পর্কটা কীরকম? আমার মনে হয়, গা ঘেঁষে দাঁড়াতে মানা করা স্লোগানের মধ্য দিয়েই এই সম্পর্কটি উন্মোচিত হয় বেশ ভালোভাবে। এই গা ঘেঁষে দাঁড়ানোটা কীরকম? রাস্তা ঘাটে চলতে গেলে, বিশেষ করে ঢাকার মতো ব্যস্ত শহরে বাধ্য হয়ে অপরিচিত নারী পুরুষের সাথে গা ঘেঁষে আমাদের দাঁড়াতে হয়, সেই ধরণের গা ঘেঁষা না নিশ্চয় - খেটে খাওয়া নারী পুরুষরা তাদের ব্যস্ত জীবনে এই ধরণের গা ঘেঁষা নিয়া মাথা ঘামায় না। তাহলে এই স্লোগানটিকে নির্যাতক নয় এমন পুরুষরা অপমানজনক হিসাবে পাঠ করছেন কেন?

কারণ, আমাদের সমাজে খুব সাধারণ পরিবারের একটা মেয়েও তার শ্রেণীর একটা ছেলের সাথেই রাজকুমারীর মতো আচরণ করতে শেখে। এমন না যে সে আসলেই রাজকুমারী, সেই প্রিভিলেজতো তার নাই। কিন্তু আমাদের পরিবারগুলার মধ্যে হাজির থাকা পিতৃতান্ত্রিকতা তার মধ্যে একধরণের আভিজাত্যের বোধ গড়ে তোলে, যেই বোধের জায়গা থেকে সমাজের অধিকাংশ পুরুষই তার তুলনায় নিচু বা 'ছোটলোক'।

কোনো এক সম্মানিত বা অভিজাত যুবরাজই তার যোগ্য এবং সেই যুবরাজের আবির্ভাব না ঘটা পর্যন্ত তার প্রতি আগ্রহ দেখানো সকল পুরুষই 'বামন হয়ে চাঁদ ছোয়ার' চেষ্টা করা সীমালঙ্ঘনকারী। আমাদের পরিবারগুলাতে হাজির থাকা পিতৃতান্ত্রিক মতাদর্শগুলা তাকে এইরকম একটা রাজকুমারী হওয়ার ভুল ধারণা দেয়, যদিও বাস্তবে সে নিজের বাপ ও ভবিষ্যত স্বামীর সম্পদ মূলত। এই আভিজাত্যের মতাদর্শে বিশ্বাস করার মাধ্যমে এক দিকে সে নিজ শ্রেণীর পুরুষদের থেকে নিজেকে উচা মনে করে, আরেকদিকে সে বাপ ও স্বামীর সম্পদ হিসাবে নিজেকে পুনরুৎপাদন করে।

নারীর দেহ পবিত্র বস্তু বা 'ট্যাবু' না, বাপ বা স্বামীর সম্পদও না। চলতে ফিরতে গেলে প্রয়োজনে অপরিচিত নারীর গা ঘেঁষে দাঁড়ানো মাত্রই যেমন কোন অপরাধ না, তেমনি অল্প পরিচিত কোন নারীকে ভালো লাগা বোঝাতে নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে ছুয়ে দেয়াও (অথবা নারীর পুরুষকে ছুয়ে দেয়া) বিভিন্ন দেশের সমাজে স্বাভাবিকভাবেই নেয়া হয়। এইসব ছোয়াছুয়ির মধ্যে কোনো চোর-পুলিশ ব্যাপার নাই। কিন্তু আমাদের যে আধুনিক সমাজ গড়ে উঠেছে, তাতে নারী ও পুরুষের মধ্যে ভাষিক ও দৈহিক যোগাযোগের এই স্বাভাবিকতা অনুপস্থিত। ফলে এইখানে একটা চোর-পুলিশ ব্যাপার আছে। ছেলেদের কাছে নারীরা ভিন্ন জগতের মানুষ, তারা অভিজাত, তাদের সাথে স্বাভাবিক যোগাযোগের উপায় কম।

আমাদের সমাজে সাধারণত পুরুষেরা নারীদের ছোয় চোরের মতো, কখনো বা ডাকাতের মতো; আর নারীরা প্রতিনিয়ত তাদের দেহকে রক্ষা করে সম্ভ্রান্ত বাপের সম্ভ্রান্ত কন্যার মতো, পবিত্র রাখে ভবিষ্যতের রাজপুত্র জামাইয়ের জন্যে। এই পরিস্থিতি সবচাইতে ভালোভাবে তুলে ধরেছে বাংলা সিনেমাগুলা যেখানে নায়করা সাধারনত ইভটিজার, আর ভালোলাগা প্রকাশকারী পুরুষদের প্রতি নায়িকাদের একটা সাধারণ ডায়ালগ - আপনার এত্ত বড় সাহস?

"গা ঘেঁষে দাঁড়াবেন না" স্লোগানটি আমার কাছে সেই সমাজকেই উন্মোচিত করে, যেই সমাজে গা ঘেঁষাঘেঁষি একটা চোর-পুলিশ ব্যাপার, যেইখানে চোর-ডাকাতদের মতো নারীর দেহ ছুঁয়ে দেয়া নির্যাতকরাই সবচাইতে স্বাভাবিকভাবে নারীর দেহ ছুঁতে পারে, আর ভদ্রভাবে ভালোলাগা প্রকাশ করতে চাওয়া পুরুষদের বসবাস করতে হয় অপমানিত হওয়ার ভয়ের মধ্যে। আমার মনে হয় "গা ঘেঁষে দাঁড়াবেন না" স্লোগানটি অনেক পুরুষের ঐ অপমানবোধকেই জাগিয়ে তুলেছে। এবং তাদের এই অপমানবোধকে কোনভাবেই নারী নির্যাতক ও নারী স্বাধীনতা সীমাবদ্ধ করতে চাওয়া পুরুষদের প্রতিক্রিয়ার সাথে গুলিয়ে ফেলা ঠিক হবেনা।

বাংলাদেশের নারীদেরকেও, বিশেষ করে যারা নারীবাদের চর্চা করেন, তাদেরও উচিৎ নিজ দেহের "মর্যাদা"র (Dignity) সাথে পিতৃতান্ত্রিক সমাজের চাপিয়ে দেয়া আভিজাত্যের "সম্মান"কে (Honor) না গুলিয়ে ফেলা। এইটা করতে পারলে নির্যাতকদের বিরুদ্ধে সমাজের বড় সংখ্যক পুরুষদেরকে তারা তাদের কমরেড হিসাবেই পাবেন বলে মনে করি। সেইসাথে তাদের ভুলে যাওয়া উচিৎ হবেনা যে সম্মানিত বা অভিজাত নারীর ধারণা একই সাথে সম্মানহীন সেই নারীর ধারণারও উৎপাদন করে যাদের নির্যাতন করার পক্ষে সামাজিক সম্মতি পাওয়া যায়।

লেখক: অ্যাক্টিভিস্ট, লেখক ও গবেষক।

বিজ্ঞাপন

সংশ্লিষ্ট বিষয়

গা ঘেঁষে দাঁড়াবেন না

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0251 seconds.