• ফিচার ডেস্ক
  • ০৫ এপ্রিল ২০১৯ ১৭:৩০:১৮
  • ০৫ এপ্রিল ২০১৯ ১৮:৩৬:২৬
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

মোবাইল ফোন নতুন ‘রক্তাক্ত হীরা’

ছবি : সংগৃহীত

ফারহানা করিম :

আপনি কি সম্প্রতি নতুন মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ কিংবা ট্যাবলেট কিনেছেন? যদি কিনে থাকেন তাহলে নিজেকে অনায়াসেই একজন যুদ্ধাপরাধী হিসেবে বিবেচনা করতে পারেন। আপনার বিবেকই আপনাকে এটা ভাবতে বাধ্য করতে পারে। এতোটুকু পড়ার পর বিষয়টি আপনার কাছে হেঁয়ালিপূর্ণ মনে হতে পারে। তবে পুরো বিষয়টি জানার পর আপনি আমার সঙ্গে একমত হতে পারেন।

বর্তমানে একদম কম দামেই মোবাইল কিনতে পাওয়া যায়। ফলে এটি তৈরি করতে যেসব উপাদান লাগে তা সংগ্রহ করতে যে মূল্য দিতে হয় তা আমাদের জানা থাকার কথা নয়। আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের লাখ লাখ নারী, পুরুষ, শিশুর ঘাম এবং রক্তের বিনিময়ে মোবাইল তৈরির উপাদানগুলো সংগ্রহ করা হয়। যার ফলে তথাকথিত প্রথম বিশ্বের নাগরিকরা নিজেদের হাতের মুঠোয় মোবাইল নামক পুরো বিশ্বকে নিয়ে ঘুরতে পারে। 

আফ্রিকার দেশগুলোর খনি থেকে আহরিত টিন, ট্যাংস্টেন, ট্যানটালাম ও স্বর্ণ আমাদের নিত্যপ্রয়োজনীয় ইলেকট্রনিক গ্যাজেট তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। আফ্রিকার সংঘাতকবলিত এলাকাগুলোতেই এসব খনির অবস্থান। এজন্য এগুলোকে ‘যুদ্ধ খনিজ’ হিসেবে আখায়িত করা হয়। এক্ষেত্রে এসব খনিজ পদার্থকে ব্লাড ডায়মন্ড বা রক্তিম হীরার সঙ্গেই তুলনা করা যেতে পারে। রক্তাক্ত হীরা বললেই বরং যথার্থ হয়।

আফ্রিকার ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গো হচ্ছে খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ একটি দেশ। খনিজের পাশাপাশি সংঘাত ও সহিংসতার জন্যও বিশ্বব্যাপী দেশটি বিশেষ পরিচিতি আছে। আমাদের মত ভোক্তাদের পাশাপাশি কঙ্গো প্রজাতন্ত্র তথ্যপ্রযুক্তির বৃহৎ প্রতিষ্ঠান অ্যাপল, মাইক্রোসফট, স্যামসাংয়েরর কাছে নিজেকে বিক্রি করে দিয়েছে।

সংঘাতময় এলাকা থেকে যেসব খনিজ পদার্থ সংগ্রহ করা হয় তা বিক্রি করে যে অর্থ আয় হয় তার একটা অংশ যুদ্ধবাজ নেতারা নিজেদের অস্ত্র কেনার কাজে ব্যয় করে। এর ফলে ওইসব এলাকায় সংঘাত আরো দীর্ঘস্থায়ী হয়।

খনি থেকে মূল্যবান এসব পদার্থ সংগ্রহ করার জন্য স্থানীয় নারী-পুরুষদের খনি শ্রমিক হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এমনকি শিশুদেরও জোর করে খনির কাজে ব্যবহার করে যুদ্ধবাজ নেতারা। সস্তা শ্রমের বিনিময়ে কোটি কোটি টাকা তারা উপার্জন করে থাকে। এমনকি এসব খনি শ্রমিকদের ক্রীতদাসের মত ব্যবহার করা হয়।

নিরুপায় ও অসহায় এসব মানুষের কাছে ভয়াবহ কষ্টের এই কাজ করা ছাড়া কোনো গতি অবশ্য নেই। কারণ এসব এলাকায় খনি শ্রমিকের কাজ ছাড়া করার মত উল্লেখযোগ্য আর কাজও নেই।

আগে উল্লেখ করা ৪টি যুদ্ধ খনিজের সঙ্গে সম্প্রতি কোবাল্ট নামে আরো একটি নতুন খনিজ যুক্ত হয়েছে। লিথিয়ামভিত্তিক রিচার্জেবল ব্যাটারি বানাতে গুরুত্বপূর্ণ একটি উপাদান এই কোবাল্ট।

যুক্তরাজ্যভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের এক প্রতিবেদনে কঙ্গো প্রজাতন্ত্রের কোবাল্টের খনিগুলোতে কাজ করা হাজার হাজার শিশু শ্রমিকের মানবেতর জীবনের কাহিনী তুলে ধরা হয়েছে। খনিগুলোতে কাজের জঘন্য পরিবেশের বর্ণনাও করা হয়েছে এতে।

মাত্র ৭ বছর বয়সেই শিশুদের খনি শ্রমিকের কাজ করতে বাধ্য করা হয়। এতো কম বয়সি এসব শিশুকে দৈনিক ১২ ঘণ্টা কিংবা তার চেয়ে বেশি সময় কাজ করতে হয়। বাটালি আর মুগুর দিয়ে তারা কঠিন পাথর থেকে মূল্যবান ধাতু সংগ্রহ করে। এতো কঠিন পরিশ্রমের পর দিনশেষে তাদের হাতে তুলে দেয়া হয় মাত্র ২ ডলার।

এছাড়া মাত্র দুই বছর বয়সি শিশুদের এসব খনিজ পদার্থ ধোয়া, পরিবহন করা এবং চূর্ণ করার কাজ করতে হয়। এর বিনিময়ে তারা দৈনিক এক ডলারেরও (৮৩ টাকা) কম অর্থ পায়।

খনিতে শ্রমিকরা প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা ছাড়াই কাজ করেন। ফলে যেকোন সময় খনি ধসে তারা মারা যাওয়ার ঝুঁকি নিয়েই কাজ করেন।

নারীরা ভারী এসব ধাতু মাথায় করে জলাশয়ে নিয়ে যান এবং সেখানে এসব ধাতু ধোয়ার কাজ করেন। এছাড়া এসব ধাতু নির্দিষ্ট শ্রেণি অনুযায়ী গুছিয়েও রাখতে হয় তাদের। খনিতে কাজ করা নারী শ্রমিকদের প্রচন্ড ব্যথায় ভুগতে হয়। এছাড়া তাদের শ্বাসযন্ত্রেরও সমস্যা হয়। কোবাল্টের ধুলায় সব খনি শ্রমিকদেরই ফুসফুসের মারাত্মক রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

খনিতে শিশুদেরই কাজ করতে হয় ১২ ঘণ্টা কিংবা তারচেয়ে বেশি সময়। ফলে স্বাভাবিকভাবেই পূর্ণ বয়স্ক একজন শ্রমিককে আরো বেশি সময় ধরে কাজ করতে হয়। তবে তা যে দিন রাত ২৪ ঘণ্টা টানা কাজ করতে হয় সে বিষয়ে বোধহয় আমাদের কোনো ধারণাই নেই। কখনো কখনো টানা ২৪ ঘণ্টাই তাদের কাজ করতে হয়। এর ফলে ক্লান্তিতে অনেক শ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে।

একজন খনি শ্রমিক অনলাইনভিত্তিক সংবাদমাধ্যম টেক রিপাবলিককে জানান, গভীর খনিতে অনেক সময় আকস্মিক পানি ওঠার ফলে সবকিছু তলিয়ে যায়, যার পরিণতিতে মারা যায় অসহায় শ্রমিক।

ভারী এসব খনিজ পদার্থের বস্তা পিঠে নিয়ে অনেক সময় খনি শ্রমিকদের ৫০ কিলোমিটার কিংবা তার চেয়ে বেশি পথ হেঁটে বিতরণ কেন্দ্রে নিয়ে যেতে হয়। পুরুষরা ছাড়াও নারী এমনকি শিশুদেরও এধরনের ভারী বস্তা বহন করতে বাধ্য করা হয়।

সংঘাতপূর্ণ এসব এলাকায় ধর্ষণ খুব সাধারণ একটি ব্যাপার। নারী শ্রমিকরা প্রায়ই গণধর্ষণের শিকার হয়ে থাকেন। কি সরকারি পক্ষ কি বিরোধী পক্ষ সকলেই ধর্ষণে সিদ্ধহস্ত। প্রাপ্তবয়স্ক নারীতো আছেনই এমনকি ৩ বছর বয়সি শিশু এবং সত্তরোর্ধ্ব বৃদ্ধাদেরও ধর্ষকদের কবল থেকে রেহাই নেই। মূলত স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে ভীতির মধ্যে রাখার জন্যই ধর্ষণকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে থাকে। এর মাধ্যমে খনি এলাকা এবং বাণিজ্য পথ সুরক্ষিত এবং নিজেদের নিয়ন্ত্রণে থাকে।

কঙ্গো প্রজাতন্ত্রে খনি দখল নিয়ে সরকার এবং যুদ্ধবাজ নেতাদের মধ্যে যে যুদ্ধ চলছে তার পরিণতিতে ৫০ লাখের বেশি মানুষ মারা গেছে। এছাড়া ১০ লাখের বেশি নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন।

সংঘাতকবলিত এলাকা থেকে মোবাইল তৈরির উপাদান যেন কেনা না হয় সে ব্যাপারে মানবাধিকার সংস্থাগুলো জোরালো আবেদন জানিয়ে আসছে। তাদের আবেদনে সারা দিয়ে প্রযুক্তিবিষয়ক প্রতিষ্ঠানগুলো অঙ্গীকার করেছিল, তারা এসব এলাকা থেকে যুদ্ধ খনিজ না কেনার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করবে। কিন্তু বাস্তবে এটা যে সম্ভব না, তা সহজেই অনুধাবন করা যায়। কেননা সংঘাতহীন এলাকায় টিন, ট্যাংস্টেন, ট্যানটালাম এবং স্বর্ণ পর্যাপ্ত পরিমাণে পাওয়া যায় না। এছাড়া প্রতিনিয়তই মোবাইল ফোনের চাহিদা বাড়ছে। ফলে এসব খনিজেরও প্রয়োজনীয়তা উত্তরোত্তর বেড়েই যাচ্ছে। 

সংঘাতময় এলাকা থেকে অ্যাপল, ডেল, হিউলেট প্যাকার্ড, হুয়েই, লেনোভো, এলজি, মাইক্রোসফট কর্পোরেশন, স্যামসাং, সনি, ভোডাফোনের মত প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি গাড়ি প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান ডাইমলার এজি, ভক্সওয়াগন এবং চীনা প্রতিষ্ঠান বিওয়াইডি কোবাল্ট কিনে থাকে। তারা এই ধাতুর বিকল্প হিসেবে এখনো কোন কিছু বের করতে পারেনি।

সুতরাং নিজের বিবেকের দংশন থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য আমাদের প্রত্যেকেরই উচিত হবে মোবাইল প্রস্তুতকারী কোম্পানিগুলোর কাছে আবেদন জানানো, যেন সংঘাতময় এলাকা থেকে তারা কোন খনিজ পদার্থ না কেনে। এক্ষেত্রে নেদারল্যান্ডসের ফেয়ারফোনের কথাই বলা যেতে পারে। তারা এসব যুদ্ধ খনিজ ব্যবহার না করেই মোবাইল তৈরি করছে।

বিজ্ঞাপন

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0182 seconds.