• ২৯ মার্চ ২০১৯ ১৭:০৫:৩২
  • ২৯ মার্চ ২০১৯ ১৮:৪৮:২৪
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

আসুন সবাই মিলে বলি- বালাই ষাট!

এক মাসের কিছু আগে (২০ ফেব্রুয়ারি, ১৯) পুরান ঢাকার চকবাজারে ঘটে যাওয়া অগ্নিকাণ্ডে ৭৮ জনের মতো মানুষের প্রাণ নিভেছে। আর গতকাল ঘটলো বনানীর এফ আর টাওয়ারে এমনই ঘটনা। তাতে অবশ্য পুড়ে মারা পড়লো ১৯ জন। সংখ্যার দিক থেকে তা হয়তো কম। কিন্তু ঘটনার ভয়াবহতা বা পৌন:পুনিকতা কিন্তু যথেষ্ট চিন্তার বিষয়।

দিনের শুরুতে যা ভাবেনি এ  হতভাগ্য মানুষগুলো; দিনের শেষে এসে তাই ঘটে গেলো তাদের জীবনে! একেবারে না ফেরার দেশেই চলে গেলেন তারা। আর তার সাথে এক একটা পরিবারে নেমে এলো অসীম শুণ্যতা। কিছুদিন গেলে আমাদের স্মৃতিতে এসব ঘটনা ঝাপসা হয়ে আসবে ঠিকই কিন্তু যে পরিবারগুলো তাদের স্বজন হারালো তারা এমন দগদগে ক্ষত সারাজীবন বয়ে বেড়াবে। তাদের স্মৃতিতে প্রিয়জন হারানোর এ বেদনা বয়ে চলবে নিরন্তর।

যে কোনো দুর্ঘটনা ঘটে যাওয়ার পরে আমরা নানা ধরনের হিসেব নিকেশে ব্যস্ত হয়ে পড়ি। কতরকম কথা হয়। এটা করতে হবে। এটা হলে ওটা হতো না, সেটা হলে এটা হতো না। এরকম নানা ধরনের আলাপ আলোচনা জোরদারভাবে চলার পরে দেখা যায় কিছুদিন পরে আমরা আবার সেই আগের অবস্থায় ফিরে গেছি। মানে পুন:মুশিক ভব হয়ে যায়। এমন সময়ে আবারো একটা দুর্ঘটনা ঘটলে আমরা চোখ কচলানো শুরু করি।  আতশী কাচ নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষনে বসে পড়ি। এই হচ্ছে আমাদের অবস্থা।

নিমতলী ট্রাজেডির পরে যখন চকবাজার ট্রাজেডি হলো তখন আমরা আবারো নড়েচড়ে বসলাম। মাঝে নয় নয়টা বছর কিন্তু চলে গেছে। নিমতলী ট্রাজেডি ফিকে হয়ে গিয়েছিলো। কিন্তু কোথা থেকে কিভাবে যেন প্যান্ডরার বাক্স খুলে দৈত্য বের হয়ে আসলো চকবাজারে। ঘটিয়ে দিলো নিষ্ঠুরতম কাণ্ড আবারো। এরপর আমাদের কর্তাব্যক্তিদের ঘুম ভাঙলো। ক্যামিকেল গুদাম সরাতে তারা উঠেপড়ে লাগলেন। কাজটা চলমান আছে এখনো। তবে বাঁধা আসছে ব্যবসায়ী এবং ভাড়াটিয়াদের কাছ থেকে। কিন্তু এদের কাছে নতি স্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। রাষ্ট্রের চেয়ে দুর্বৃত্ত বা দুর্বৃত্তায়ন শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে না কখনো। কারণ সেটা হলে মুশকিল হবে পদে পদে।

এই টাওয়ারের কথা এখন পত্রিকান্তরে জানতে পারছি যে এর নাকি ১৮ তলা করার জন্য রাজউকের কাছ থেকে অনুমোদন নেয়া হয়েছিলো। পরে ২৩ তলা করা হয়েছে। অর্থাৎ ৫টি তলা বেড়েছে অনুমোদহীনভাবে। এ সময়ে রাজউক কি তা দেখতে পায়নি? তার অনুমোদিত নকশায় ভবন নির্মাণ হচ্ছে কিনা তা দেখার দায়িত্ব কি  রাজউক পালন করেছে? নাকি “গিভ এন্ড টেক” পদ্ধতিতে তা রাজউকের জ্ঞাতসারেই বেড়েছে?

ফায়ার সার্ভিসের অনুমতি কি নেয়া হয়েছিলো বিল্ডিং তৈরির সময়? সেটা কি মানা হয়েছে? যদি মানা না হয়ে থাকে তাহলে এ বিল্ডিং তৈরি হলো কিভাবে? এখানেও কি  তাহলে দুয়ে দুয়ে চার হয়েছে? এসব প্রশ্নের উত্তর নেই। থাকলেও তা আছে দায়সারা গোছের হয়ে। কেউ  এসব দেখভাল না করার জন্য শাস্তি পাবে না- এটা বলাই যায়। কারণ এতদিন কেউ তো পায়নি। ফলে এফ আর টাওয়ারের অনুমোদহীন বেড়ে ওঠা, সেখানে অগ্নিকাণ্ড এবং তার ফলে যে অনাকাঙ্খিত মৃত্যু এর দায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নিতে হবে আগে। সেই অনুযায়ী তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নিলে তারা দায়সারাভাবে তাদের কাজগুলো চালিয়েই যেতে থাকবে। আর মানুষ মরতেই থাকবে। সরকারের সমস্ত উদ্যোগ তাতে ভেস্তে যাবে। মানুষ বিরক্ত হবে। ক্ষুব্ধ হবে।

ছাত্র আন্দোলনের পরেও যেভাবে রাস্তায় গণপরিবহণগুলো আজ অবধি তাদের পুরোনো রূপ ধরে রেখে প্রতিনিয়ত মানুষ হত্যা করে চলেছে তা দেখলেই পরিষ্কার হয়ে যায় যে সরকারের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট কর্তাব্যক্তিদের উৎসাহ বা আগ্রহ কতটা! গতকালও সড়কে ২৪ জন মরেছে। কোনো ঘটনার সাথে কোনো ঘটনার তুলনা হয় না ঠিকই তবুও যদি এ প্রশ্ন করি- এফ আর টাওয়ারে অগ্নিকাণ্ডের চেয়ে এ ভয়াবহতা কি কোনো অংশে কম? এর উত্তর কি অজানা আমাদের কাছে? কারণ প্রতিদিন এভাবেই সড়কে অকাতরে প্রাণ যাচ্ছে। কিন্তু জাতীয়ভাবে সমন্বিত পরিকল্পনা নিয়ে রাস্তাঘাটে ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনারোধ আমরা তেমন কোনো উদ্যোগ কেন এখনও নিচ্ছি না- তা আমার বোধগম্য নয়।

যে কোনো দুর্ঘটনাকে (সেটা অগ্নি, সড়ক, নৌ, রেল, বজ্রপাত বা অন্য যাই হোক না কোনো) রোধ করার মানসে আমরা যদি নির্মোহভাবে পরিকল্পনা প্রণয়ন, তার বাস্তবায়ন, তদারকি এবং সেই সাথে এ কাজের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিবর্গকে জবাবদিহিতা এবং শাস্তির আওতায় আনতে পারি তাহলে তা অনেকাংশেই কমিয়ে আনা সম্ভব। সেখানেই আমাদের ঘাটতি রয়েছে বোধ করি। যা কিছুই ঘটুক সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের গাফিলতি থাকা সত্ত্বেও তাদের কখনই শাস্তির আওতায় আনা হয় না বিধায় এমনতর অবস্থা দিনের পর দিন চলতে পারছে।

পরিশেষে, আমাদের আমজনতার একটা হীন মানসিকতার উদাহরণ দিয়ে এ লেখার ইতি টানতে চাই। সেটা হচ্ছে, এফ আর টাওয়ারে ভয়াবহ দুর্ঘটনার সময়ে এই যে হাজার হাজার লোক হাঁ করে দাঁড়িয়ে থেকে জরুরি কাজে বাঁধা সৃষ্টি  করলো। সেলফি, ভিডিও এসব তুললো। প্রশ্ন হচ্ছে যারা এসব করলো –এরা কারা? এরা এবং এদের এহেন জঘন্য নিম্নরুচির কাজ কি আমাদের ভবিষ্যৎ রুচির নির্ণায়ক হয়ে উঠবে কোনো কালে? যদি সে সম্ভাবনা দেখতে পান তাহলে আসুন সবাই মিলেই বলি- বালাই ষাট! এদের থেকে মুক্তি চাই।

লেখক : চিকিৎসক ও শিক্ষক। সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগ, এনাম মেডিকেল কলেজ।

বিজ্ঞাপন

সংশ্লিষ্ট বিষয়

আগুন বনানী নিমতলী

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0181 seconds.