• ১৪ মার্চ ২০১৯ ১৫:২৫:২৬
  • ১৪ মার্চ ২০১৯ ১৬:০১:৫৭
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

জলে তাদের জন্ম-মৃত্যু, জলেই ভাসে জীবন

ছবি: আরিফ রহমান

মানতা সম্প্রদায়- যে জীবনের শেকড় মাটির দেখা পায়না। জলে ভেসে ভেসেই কেটে যায় পুরোটা জীবন। তাদের স্থায়ী কোনো বসত নেই মাটির পৃথিবীতে। ঘর, সংসার, জন্ম-মৃত্যু সব কিছুই জলের উপর হয়। ভাসমান নৌকায় তারা ঘর বাঁধে, সংসার করে, জীবন জীবিকার সন্ধান করে। নিজস্ব কোনো ভূমি নেই তাদের। জোয়ার ভাটার সাথে জড়িয়ে আছে তাদের জীবনের গল্প। ঘাটে ঘাটে নোঙ্গর ফেলা আবার নোঙ্গর তুলে নিয়ে অন্যত্র ছুটে চলে এইতো মানতা সম্প্রদায়ের জীবন চক্র।

আধুনিক জীবন ব্যবস্থার কোনো ছোয়া নেই তাদের জীবন যাপনে। মানতা সম্প্রদায়ের জীবন ব্যবস্থা অনেকটা বেদে সম্প্রদায়ের মতো। তবে মানতা সম্প্রদায়ের মানুষ নিজেদেরকে বেদে হিসেবে পরিচয় দিতে নারাজ। অনেকের মতে বেদেদের আদী নাম ‘মনতং-মান্তা’। অনেকে মনে করেন বেদেরা এ দেশে এসেছে আরাকানের ‘মনতং-মান্তা’ নৃ-গোত্র থেকে। সেখান থেকেই মানতা সম্প্রদায়।

বেদে এবং মানতা সম্প্রদায় উভয়ই যাযাবরের মতো জীবন কাটায়। মানতা সম্প্রদায় নৌকায় করে জীবন জীবিকা নির্বাহ করে। নৌকা বহর নিয়ে ঘুরে বেড়ায় এখানে ওখানে। ওই নৌকাতেই তাদের জীবন-সংসার। পেশায় এরা মৎস্যজীবী। তাদের জীবন ব্যবস্থা বিচিত্র। জন্ম মৃত্যু বিয়ে সব কিছুই নৌকাতে হয়। নির্দিষ্ট কোনো ভূমি নেই তাদের। নদীই তাদের আশ্রয়স্থল। তারা ইসলাম ধর্ম পালন করে। মুসলিম হলেও তাদের জীবন যাত্রায় আছে নিজস্ব ঢঙ। আর এ কারণেই মানতা সম্প্রদায় নামে পরিচিত। জীবিকার প্রধান উপায় মাছ ধরা। জাল, মাইজাল, বড়শি নিয়ে মাছ ধরে পুরুষেরা। নারীরাও এ কাজে কম পটু নন। একটু বয়স হলেই সন্তানেরাও মাছ ধরায় সাহায্য করে বাবা-মাকে। স্কুলে যাওয়া হয়ে ওঠে না বেশির ভাগেরই।

ছবি: আরিফ রহমান

দেশের প্রধানত উপকূলবর্তী জেলাগুলোর নদীর তীর ধরে হাঁটতে থাকলে দেখা মিলবে সারি সারি নৌকা। প্রতিটি নৌকাতে একটি করে পরিবার, সে পরিবারের সমস্ত সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না মিশে আছে ঐ ছোট্ট নৌকাটিতে।

নিজস্ব কোনো ভিটে মাটি ভূমি না থাকায় মানতা সম্প্রদায়ের কারো মৃত্যু হলে সাধারনত এরা সেই মৃতদেহ জলেই ভাসিয়ে দেয়। তাদের জীবন যেমন, বিবাহরীতিও তেমনি অভিনব। পছন্দের কোনো মেয়েকে তার পিতার নৌকা থেকে নিজের নৌকায় তুলে নিলেই বিয়ে হয়ে যায়! আবার বনিবনা না হলে স্বামী তার স্ত্রীকে পিতার নৌকায় ফের পাঠিয়ে দেন, পিতার নৌকায় আসলেই হয়ে যায় তালাক! এটাই মানতাদের বিবাহ রীতি। তবে বর্তমান সময়ে এর মাঝে পরিরর্তনের হাওয়া লেগেছে। কিছু কিছু বিবাহ সরকারি খাতায় রেজিস্ট্রি হচ্ছে। মুসলিম রীতি অনুযায়ী কাজি ডেকেও বিবাহ পড়ানো হচ্ছে। তবে মানতা জনপদের কারো জন্ম-মৃত্যুর নিবন্ধন হয় না। আবার তাদের বসবাস বাংলাদেশের অসংখ্য নদীতে ছড়ানো ছিটানো বলে তাদের মোট সংখ্যা হিসেব করাও সম্ভব হয়নি।

ছবি: আরিফ রহমান

মানতা সম্প্রদায়ের ‍প্রায় সবাই অশিক্ষিত। মূলত নদীতে ভাসমান জীবন কাটানোর কারণে মানতাদের পড়াশোনা করা হয়ে ওঠেনা। এছাড়াও অভাব-দারিদ্রতা তাদের শিক্ষা বিমুখ করে রেখেছে। তবে নতুন প্রজন্মের অনেকে শিশু পড়াশুনার চেষ্টা করছে।

অসুখ-বিসুখে মানতাদের ভোগান্তির শেষ নেই। পানিবাহিত রোগে মানতারা সবচেয়ে বেশি ভোগে। নদী দূষণের সরাসরি শিকারে পরিনত হচ্ছে এই সম্প্রদায়ের মানুষেরা। শিক্ষা, চিকিৎসা, খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি প্রভৃতি মৌলিক অধিকার থেকে পুরোপুরি বঞ্চিত মানতা সম্প্রদায়।

ছবি: আরিফ রহমান

এতো এতো সংকট কষ্ট তবুও ভাসমান এই জীবন ছেড়ে আসতে পারেনি মানতারা। নদীর সাথেই তাদের যত মান-অভিমান, বেঁচে থাকা, ভালোবাসা। ভিটে মাটি শেকড়হীন এক ভাসমান জীবনের অদ্ভুদ গল্প বয়ে চলা একটি গোষ্ঠি হয়ে এখনো সংগ্রাম করে টিকে আছে মানতা সম্প্রদায়।

বিজ্ঞাপন

সংশ্লিষ্ট বিষয়

মানতা সম্প্রদায়

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0199 seconds.