• ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ ১৬:৩০:১৮
  • ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ ১৬:৩০:১৮
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

নদীতে আগুন লাগলে নগর কি রক্ষা পায়

শেখ রোকন। ছবি : সংগৃহীত


শেখ রোকন :


প্রশ্ন হচ্ছে, পুরান ঢাকায় দাহ্য পদার্থ ও প্লাস্টিকের এত কারখানা ও গুদাম জুটল কী করে? নিমতলী বা চকবাজার অগ্নিকাণ্ড মাত্রা ও গতিতে এত বেশি ভয়াবহ হওয়ার কারণ তো কেমিক্যালের এসব কারবারই। হুমায়ুন আজাদের কবিতার ভাষায় বলা যায়- 'কি করে জমলো এত আবর্জনা?' (মানুষের সঙ্গ ছাড়া)। উত্তরটা অবশ্য আরেক হুমায়ুন, সদ্য দায়িত্বপ্রাপ্ত শিল্পমন্ত্রী নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ুন দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। বলেছেন- 'পুরান ঢাকার কেমিক্যাল ব্যবসা বংশপরম্পরায় চলে আসছে।' (সমকাল, ২২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯)।

প্রশ্ন হচ্ছে, এই তরল বা কঠিন বিষ কি আসলেই ঢাকার ঐতিহ্য? বাস্তবে উল্টোটা। ঢাকা আড়ে ও বহরে সম্প্রসারিত হওয়ায় যে অংশকে আমরা 'পুরান ঢাকা' নাম দিয়েছি, চার শতাব্দী আগে সেখানেই গড়ে উঠেছিল 'আধুনিক' শহর। মোগল শাসকরা সেখানে সুবে বাংলার রাজধানী স্থাপন করেছিল মূলত বুড়িগঙ্গার আশীর্বাদ পেতে। কারণ এই নদী বঙ্গের আর সব নদীর সঙ্গে সম্পর্কিত; এই নদীতে প্লাবন নেই, ভাঙন নেই। আর নগর মানেই তো বিপুল পানির প্রয়োজন! আরও আছে, তৎকালীন ঢাকা মানে বুড়িগঙ্গা ছাড়াও দোলাই, নড়াই নদী ও অর্ধশতাধিক খালের এক জলজ-জাল। কথিত আছে, তৎকালীন ঢাকা বিশ্বের দ্বাদশতম সুন্দর শহর হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছিল। তবে সেই ঢাকা মানে আজকের যাত্রাবাড়ী-উত্তরা প্রলম্বিত ঢাকা নয়, নিমতলী ও চকবাজারের আশপাশের 'পুরান ঢাকা'।

প্রশ্ন হচ্ছে, সেই পুরনো অথচ মনোরম ঢাকা আমরা হারিয়ে ফেললাম কীভাবে? অবনতি শুরু হয়েছিল নদী থেকে। রাজনৈতিক রাজধানী ছাড়াও অর্থনৈতিকভাবে পূর্ববঙ্গের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠায় ঢাকায় বাড়তে থাকে জনসংখ্যা। এই অঞ্চল ছাড়াও ভারতীয় উপমহাদেশের অন্যান্য অংশ থেকে আসতে থাকে ব্যবসায়ী ও পুঁজিপতিরা। একদিকে গৃহস্থালি বর্জ্য, অন্যদিকে কারখানার বর্জ্য- বর্ধিষ্ণু ঢাকার যত আবর্জনা ঢেলে দেওয়া হতে থাকে বুড়িগঙ্গায়। এক পর্যায়ে বুড়িগঙ্গার পানি সরাসরি পান করা অসম্ভব হয়ে ওঠে। ১৮৭৪ সালে চাঁদনী ঘাটে স্থাপিত হয় ঢাকার প্রথম পানি শোধনাগার। পরবর্তীকালে শোধন করেও আর বুড়িগঙ্গার পানি পানের যোগ্য করে তোলা যায়নি। খোদ বুড়িগঙ্গাও মরে যেতে থাকে একসময়; যেমন জৈবিকভাবে, তেমনি দৈহিকভাবে।

প্রশ্ন হচ্ছে, পুরান ঢাকায় কেমিক্যাল ও দাহ্য পদার্থের কারখানা ও গুদামের সঙ্গে বুড়িগঙ্গা মরে যাওয়ার সম্পর্ক কী? সরাসরি কিছু সম্পর্ক তো আছেই। যেমন পুরান ঢাকার কারখানাগুলোতে ব্যবহূত রাসায়নিকের বড় অংশ শেষ পর্যন্ত পাশের নদীটিতে গিয়েই নামে। এমনকি রাসায়নিকের জার ও ড্রাম কীভাবে বুড়িগঙ্গায় ধোয়া হয়, সেই দৃশ্য অনেক আলোকচিত্রেই ধরা পড়ে। এর কোনো কোনো রাসায়নিক নদীর পানি ও এর জীববৈচিত্র্যের জন্য রীতিমতো বিষ। পাশাপাশি প্লাস্টিকের কারবারও বুড়িগঙ্গার মৃত্যুর জন্য বহুলাংশে দায়ী। ঢাকাসহ সারাদেশের যেসব পলিথিন বা প্লাস্টিক সংগ্রহ করা হয়, তার বৃহত্তম বাজার ও আড়ত পুরান ঢাকাতেই অবস্থিত। বেচাকেনা শুধু নয়, সেগুলো 'রিসাইকেল'ও করা হয় একই এলাকায়। সেই প্রক্রিয়ায় উদ্বৃত্ত প্লাস্টিকের ঠাঁই হয় নদীতেই। বুড়িগঙ্গার তলদেশে ৮-১০ ফুট পলিথিন স্তর কি শুধু শুধু জমেছে? সহজলভ্য কাঁচামাল থাকায় প্লাস্টিক পণ্যের এন্তার কারখানাও গড়ে উঠেছে সেখানে। আর কারখানার উৎপাদনে নতুন 'প্লাস্টিক দানা' আমদানি হয় টনকে টন। বলা বাহুল্য, এই উৎপাদন ও পুনরুৎপাদন প্রক্রিয়াতেও প্রয়োজন হয় বিবিধ রাসায়নিক তরলের।

প্রশ্ন হচ্ছে, পুরান ঢাকাতেই কেন এত কেমিক্যালের কারবার? ঢাকার অন্যান্য অংশে কেন রাসায়নিকের গুদাম ও কারখানা নয়? এর উত্তর সহজ। সেখানে পরিবেশ দূষণ সহজ। প্লাস্টিক ও রাসায়নিকের যাবতীয় বর্জ্য সহজেই গড়িয়ে দেওয়া যায় বুড়িগঙ্গায়। ঢাকারই অন্য কোথাও এমন বেপরোয়া পরিবেশবিনাশী তৎপরতা চালানো কঠিন। কিন্তু পরিবেশ চৌকিদারদের পক্ষে পুরান ঢাকার গলি ও তস্য গলিতে গিয়ে নজরদারি চালানো কঠিন। আর গোদের ওপর বিষফোড়ার মতো কিছু রাজনীতিকও সবসময়ই থাকেন। যারা মনে করেন, প্রাণঘাতী এই  প্লাস্টিকই পুরান ঢাকার ঐতিহ্য। স্বচ্ছতোয়া নদী-খাল ও ঘুড়ি ওড়ানো নির্মল আকাশ নয়।

প্রশ্ন হচ্ছে, উপায় কী? উপায় একটাই- দূষণ বন্ধ করতে হবে যে কোনো মূল্যেই। পুরান ঢাকায় ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধের কথা বলছি না। পরিবেশ সুরক্ষিত রেখেই প্লাস্টিক ও রাসায়নিকের কারবার চালানোর উপায় অনেক আছে। সেগুলো স্বভাবতই ব্যয়বহুল। পরিবেশগত সুরক্ষা  নিশ্চিত করা গেলে দশের সর্বনাশ করে একের পকেট ভারী করার প্রবণতা অবশ্যই কমবে।

প্রশ্ন হচ্ছে, যদি পরিবেশ দূষণ বন্ধ করা না যায়? তাহলে পুরান ঢাকায় কেমিক্যালের কারবার ও প্লাস্টিকের পোয়াবারো নিয়ন্ত্রণে আনা যাবে না। তরল আগুনে পুড়তে থাকবে বুড়িগঙ্গা। আর নদীর সেই আগুন কীভাবে নগরকেও ভস্মীভূত করে, তার  প্রমাণ নিমতলীর পর চকবাজারেও তো আমরা দেখলামই!

লেখক ও গবেষক
skrokon@gmail.com

বিজ্ঞাপন

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0183 seconds.