• ১২ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ ১৮:৫১:৩১
  • ১২ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ ১৯:১১:৪৪
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

গর্ভবতী নারী 'অযোগ্য' ও ওএসডি

পুরুষদের প্রশিক্ষণের আওতায় আনা হোক

আফরোজা সোমা। ছবি : সংগৃহীত


আফরোজা সোমা 


গর্ভবতী হওয়ায় 'অযোগ্য' বিবেচনা করে এক ইউএনও-কে ওএসডি করা হয়েছে। অন্যায় কাণ্ডটি ঘটেছে নারায়ণগঞ্জে। এই অন্যায়টি থেকে আবারো এটিই প্রতীয়মান হয় যে, বাংলাদেশে লৈঙ্গিক বৈষম্য দূর করার এই দীর্ঘ ও ক্লান্তিকর লড়াইয়ে শুধু নারীদের উপরে মনোযোগ দিলে হবে না। মূলত মনোযোগ দিতে হবে পুরুষের দিকে। এই কথাটি আমি বহুভাবে বহুবার বহু জায়গায় বলেছি, বলছি এবং বলে যাবো।

লৈঙ্গিক বৈষম্য দূর করতে হলে পুরুষদের ব্যাপকভাবে বিভিন্ন লেভেলের প্রশিক্ষণের আওতাভুক্ত করতে হবে। স্কুল পর্যায় থেকে শুরু করে একাডেমিক বিদ্যায়তনের প্রতিটি স্তরে ছেলেশিশু, কিশোর ও তরুণদেরকে প্রশিক্ষণ দিতে হবে।

পাশাপাশি, কর্মজীবনে প্রবেশ করা মাত্রই পুরুষদের জন্য আয়োজন করতে হবে আলাদা প্রশিক্ষণ। যেখানে শেখানো হবে লৈঙ্গিক সমতা।

পুরুষের মনোজগতের পরিচর্যা প্রয়োজন। তাদের মগজের কোষে-কোষে সমাজ যেসব অন্যায় ও অন্যায্য ধারণাগুলোকে গেঁথে দিয়েছে, যত্ন নিয়ে সেগুলোকে তুলতে হবে।

ড্রয়িং খাতায় পেন্সিলের ভুল দাগ মুছতে গেলে যতটা দরদ দিয়ে ইরেজার চালাতে হয়, ততটা মনোযোগ ও দরদ দিয়ে আমাদের সমাজের ইনফেক্টেট পুরুষদের সারিয়ে তোলা দরকার।

আর এই জন্য শুধু দলে-দলে নারীদের প্রশিক্ষণ দিলে হবে না। প্রশিক্ষণের মূল টার্গেট হতে হবে পুরুষ। কেননা প্রাইমারিলি পুরুষেরাই মূল প্রতিবন্ধকতা তৈরিকারী। সমাজের প্রচল ধারণার নামে, পরিবার রক্ষার নামে, ঐতিহ্য রক্ষার নামে তারাই তোলে বাধার বিন্ধাচল।

এই বাধা সবসময় মারপিট করে বন্দী করে রাখার উগ্র রূপ ধরে আসে না।

প্রেমের নামে বন্দী করে রাখার মধ্য দিয়েও প্রকাশিত হয় এই বাধার স্বরুপ। আর এবারে যেমন প্রকাশিত হয়েছে, গর্ভবতী হওয়াকে 'অযোগ্য' হিসেবে ধরে নিয়ে এক নারীকে ওএসডি করার ঘটনায়।

আপনারা কি হুমায়ুন ফরিদী ও ঋতুপর্ণা অভিনীত রাঙা বউ সিনেমাটি দেখেছেন? সেই সিনেমার নিপীড়ন একরকম। সেখানে আছে প্রেমের নামে জুলুমের প্রতি সহৃদয়তা। সেখানে আছে প্রেমের নামে নারীর বন্দীত্বকে হালাল করার প্রচেষ্টা।

আরো নানান নিপীড়ন আছে। যেমন, স্ত্রী ডিভোর্স চাইলেও যৌন-অক্ষম স্বামীটি তাকে ডিভোর্স দিচ্ছে না নিজের গোমর ফাঁস হয়ে যাবার লজ্জার ভয়ে, সেটি আরেক রকমের নিপীড়ন। আবার এই নারীটিই যখন নিজেই তালাক দিয়ে নিজের জীবন বেছে নিচ্ছেন তখন তাকে নষ্টা, ভ্রষ্টা, মাগী, পতিতা, বলে তার চরিত্রহনন করে বেড়ায় যে সাবেক স্বামী ও স্বামীর আত্মীয় স্বজন-- সেটিও পুরুষতান্ত্রিক সমাজের নিপীড়নেরই আরেকটি প্রকাশ।

চরিত্রহীনতার অভিযোগ এনেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক রোমানা মঞ্জুরকে শারীরিকভাবে নিপীড়ন করে অন্ধ করে দিয়েছিল তার স্বামী।

তাই, লৈঙ্গিক বৈষম্য দূর করার এই লড়াইয়ে আগে জোর দিতে হবে পুরুষের মনোলোক পরিবর্তনের দিকে।

একজনের দেহে অসুখ রেখে আরেকজনের দেহে ওষুধ প্রয়োগ করলে অসুখ তো ভালো হবেই না উল্টো সুস্থ্য ব্যক্তির অসুস্থ হবার আশঙ্কা বাড়বে।

সমতা আনয়ন সহজ নয়। সাদা চোখে মনে হতে পারে, এতো মেয়েরা পড়ছে, রাজনীতিতে আসছে, মিডিয়াতে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে, অতএব সমতার আর বাকী কী!

আছে জনাব! বাকী আছে।

লৈঙ্গিক কারণে সমাজে যে বৈষম্য বিরাজমান এর ভয়াবহতা কৃষ্ণাঙ্গ-শ্বেতাঙ্গের চেয়েও গভীর; এর বিস্তার ধর্মের নামে মানুষে-মানুষে বিভাজন তৈরি করার চেয়ে বেশি।

সমতার কিতাবী ধারণা থাকা আর বাস্তবে তার প্রয়োগ ঘটিয়ে জীবন যাপন করা এক কথা নয়।

সময় এসেছে। এখন পরুষদের মুক্তির জন্য পুরুষতন্ত্রের নিপীড়নমূলক কাঠামো থেকে বেরিয়ে আসা প্রয়োজন।

একটি ছেলেকে জন্মের পর থেকে যেভাবে গড়ে-পিঠে পুরুষ বানিয়ে তোলা হয় তা অত্যন্ত অমানবিক। একটি ছেলের কাছ থেকে শৈশব থেকে কেড়ে নেয়া হয় তার কান্নার অধিকার; কেড়ে নেয়া হয় তার আবেগ প্রকাশের অধিকার।

ছেলেটিকে শেখানো হয় কান্না মেয়েলি। ছেলেটিকে শেখানো হয় আবেগ মেয়েলি। ছেলেটিকে এমনকি তার বাবার মৃত্যুর দিনেও কাঁদতে দেখতে চায় না এই ভয়ংকর পুরুষ সমাজ।

ছেলেটিকে জন্মের পর থেকে মালবাহী ঘোড়ার মতন করে সংসারের বোঝা টেনে চলা বলদ হিসেবে তৈরি করা হয়। তাকে শেখানো হয় তোমাকেই নিতে হবে সকল দায় দায়িত্ব। তোমাকে হতে হবে ভারবাহী গাধা।

এইরকম ভারবাহী গাধার কাছ থেকে আপনি মানবিক আচরণ আশা করেন কিভাবে?

যেই ছেলে সমাজের এইরকম অমানবিক ট্রেনিং-এর ভেতর দিয়ে বড় হবে তার কাছে আপনি মানবিক অনেক কিছুই প্রত্যাশা করতে পারেন না। কারণ তার বড় হওয়ার মধ্যে সে মানবিকতার স্পর্শ ও শিক্ষা পায়নি।

তাই, বৈষম্য-মূলক এই সমাজে নারীর প্রতি নিপীড়ন প্রবলভাবে দৃশ্যমান হলেও পুরুষের ছদ্ম-মৃত্যুর ঘটনাও কম নয়।

পরুষেরা সারাজীবন ভারবাহী হতে শেখেন, পরুষ হতে শেখেন, রক্ষক হতে শেখেন, ভক্ষক হতে শেখেন। কিন্তু মানুষ হবার তালিম তারা পান না। মানুষ হবার সুযোগও তারা পান না।

তাই, সময় এসেছে, আওয়াজ তুলুন। নারীর উপরেও দায়িত্বের বোঝা বাড়ান। পুরুষের মতনই নারীকেও নিতে হবে বাবা-মা ও সংসারের সমান দায়িত্ব। আর নারীর উপরেও দায়িত্বের ভার দেয়ার প্রয়োজনেই উত্তারাধিকার মূলক সম্পত্তিতে নিশ্চিত করুন নারী ও পরুষের সমানাধিকার।

এই কাজগুলো করা গেলে পুরুষেরা মুক্তি পাবে সমাজের বানানো এক পুরুষালী বন্দীশালা থেকে আর নারী মুক্তি পাবে পরুষের বানানো নিপীড়নমূলক সমাজ থেকে।

সংসার স্বর্গলোক নয়। কিন্তু কিছু পদক্ষেপ নিলে, স্বর্গ না হোক অন্তত আমরা ইউরোপের কাছাকাছি মানের মানবিক সমাজে উন্নিত হতে পারবো।

বৈষম্য মুর্দাবাদ। মানবিক সমাজ জিন্দাবাদ।

লেখক : শিক্ষক

বিজ্ঞাপন

সংশ্লিষ্ট বিষয়

গর্ভবতী ওএসডি

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0223 seconds.