• বাংলা ডেস্ক
  • ১০ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ ১৫:২১:৫৩
  • ১০ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ ১৮:৫৫:১৫
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

অন্য মোদিরা

ছবিটি ২০০৩ সালের, নরেন্দ্র মোদি যখন গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী। সরকারি বাসভবনে নিমন্ত্রণে মিলিত হয়েছিল মোদি পরিবার।

♦ ফারহানা করিম

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বিপুল ক্ষমতার অধিকারী। গত নির্বাচনে তার দল বিজেপির নেতৃত্বাধীন জোট ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে জয়লাভ করার পর চার বছর ধরে তিনি সুবিশাল ভারত রাষ্ট্র শাসন করে আসছেন। ক্ষমতা ব্যবহারের ক্ষেত্রে তার আগের প্রধানমন্ত্রীরা এতোটা সৌভাগ্যশালী ছিলেন না।

স্বাভাবিকভাবেই এমন ক্ষমতাশালী প্রধানমন্ত্রীর আত্মীয়স্বজনও প্রভাবশালী হবেন বলেই ধারণা করা হয়। কিন্তু আশ্চর্যজনক হলেও সত্য, নরেন্দ্র মোদির ক্ষমতাবলয়ের মধ্যে তার কোন আত্মীয়স্বজনের নাম কখনো শোনা যায়নি। ভারতের বেশিরভাগ মানুষই মোদির স্বজনদের ব্যাপারে একদমই অজ্ঞ বলা যেতে পারে।  আসুন জেনে নেয়া যাক, অন্য মোদিদের অবস্থান কোথায়।

৭৭ বছর বয়সি সোমভাই মোদি ২০১৫ সালে পুনেতে একটি এনজিও পরিচালিত অনুষ্ঠানে যখন মঞ্চে ওঠেন তখন কেউ জানতো না তিনি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বড় ভাই।  দর্শকরা যখন তথ্যটি জানতে পারেন তখন বলতে গেলে তারা বিস্মিতই হয়ে যান।  সোমভাই জানান, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং তার মাঝখানে একটি পর্দা রয়েছে। সাধারণ মানুষজন তা বুঝতে না পারলেও তিনি তা অনুধাবন করতে পারেন।

নরেন্দ্র মোদির সবচেয়ে বড় ভাই সোমভাই মোদি ভাদনগরে একটি বৃদ্ধাশ্রম চালান।

সোমভাই বলেন, ‘আমি নরেন্দ্র মোদির ভাই, প্রধানমন্ত্রীর নয়।  প্রধানমন্ত্রী মোদির কাছে আমি কেবল ভারতের ১২৫ কোটি জনগণের একজন, যারা তার ভাই এবং বোন।’

সোমভাই মোদি ভাদনগরে একটি বৃদ্ধাশ্রম পরিচালনা করেন। গত আড়াই বছর ধরে তিনি তার প্রধানমন্ত্রী ছোটভাইয়ের সঙ্গে একবারও সাক্ষাত করেননি বলে জানান সোমভাই মোদি।  তবে মাঝে মধ্যে দুই ভাই ফোনে কথা বলেন।

নরেন্দ্র মোদির ছোট ভাই পংকজকে ভাগ্যবানই বলা যেতে পারে।  তিনি গুজরাটের তথ্য বিভাগের একজন কর্মকর্তা।  নরেন্দ্র মোদির মা হীরাবেন এই ছোট ছেলের সঙ্গেই গান্ধীনগরে তিন কক্ষের একটি বাড়িতে থাকেন। ফলে মায়ের সঙ্গে দেখা করার জন্য ছোট ভাইয়ের বাড়িতেই মোদিকে পা রাখতে হয়। প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর অবশ্য ২০১৬ সালের মে মাসে তিনি তার মাকে এক সপ্তাহের জন্য প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনে আতিথ্য দিয়েছিলেন।

মোদি পরিবারের বংশলতিকা

অতীতে ভারতের সব প্রধানমন্ত্রীর জীবনযাপন দেখলে আমরা দেখতে পাই, ঐতিহ্যগতভাবেই তারা সবাই পরিবারের সঙ্গে খুব ঘনিষ্ঠ ছিলেন। ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওয়াহেরলাল নেহেরু তার কন্যা ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গেই থাকতেন। নেহেরু পরবর্তী ভারতের প্রধানমন্ত্রী লাল বাহাদুর শাস্ত্রী তার পুরো পরিবারের সঙ্গেই একত্রে থাকতেন।  এমনকি তিনি প্রধানমন্ত্রী ভবনে থাকার জন্য তার সন্তান এবং নাতি নাতনিদেরও নিয়ে এসেছিলেন।

ইন্দিরা গান্ধীর দুই পুত্র সঞ্জয় ও রাজীব গান্ধী তাদের পরিবার এবং সন্তান সন্ততি নিয়েই প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনে ছিলেন।  এমনকি অবিবাহিত প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ীও যখন ৭ নম্বর রেসকোর্স রোডের বাড়িতে ১৯৯৮ সালে উঠে এসেছিলেন সেসময় তার পালক কন্যা নমিতা ভট্টাচার্য এবং তার স্বামী রঞ্জনও তার সঙ্গে ছিলেন।

অথচ বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি যিনি একসময় চা বিক্রি করতেন বলে সবাই জানে, তিনি দামোদারদাস মূলচান্দ মোদির ছয় সন্তানের মধ্যে তৃতীয়। মূলত তার বাবার মালিকানাধীন চায়ের দোকানেই তিনি চা বিক্রি করতেন। মোদি প্রায় সময়ই নিজের পরিবারের দারিদ্র্য নিয়ে কথা বলতে পছন্দ করেন। তিনি বলেন, ‘কোন বড়  আফিসের বড় পদের জন্য আমার জন্ম হয়নি। আমার যা ছিল, আমার পরিবার, আমার বাড়ি -সবকিছুই জাতির জন্য ত্যাগ করেছি।’

বড়ভাই অমরুত মোদি; হাতে পুরনো সেই ইস্ত্রি ১৯৬৯-৭১ সময়ে নরেন্দ্র মোদি যখন তার সঙ্গে থাকতেন তখন এটি ব্যবহার করতেন।

পরিবারের সঙ্গে মোদির এই বিচ্ছিন্নতা তার জন্য শাপেবর হয়ে উঠেছে। ফলে তার বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত দুর্নীতির অভিযোগ ওঠার পথ অনেকটাই রুদ্ধ হয়ে গেছে।

মোদির পরিবার এখনও গুজরাটে সাধারণ মধ্যবিত্তের জীবনযাপন করে। ২০০১ সালে নরেন্দ্র মোদি গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী নির্বাচিত হন। এরপর তিনি দীর্ঘদিন ওই পদে ছিলেন। তিনি ছিলেন সাধারণ নিম্নবিত্ত পরিবারের একজন  সন্তান। মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পরেও তার পরিবারের সদস্যদের যেমন অর্থবিত্তের দিক দিয়ে কোন উন্নতি ঘটেনি তেমনি ভারতের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরেও তার পরিবার মধ্যবিত্তের বাইরে উপরের শ্রেণীতে উঠতে পারেনি।

নরেন্দ্র মোদির আরেক বড় ভাই ৭৪ বছর বয়সি অমরুতভাই মোদি একটি প্রাইভেট কোম্পানি থেকে ফিটার মিস্ত্রি হিসেবে অবসর নিয়েছেন। তিনি গুজরাটে পুত্র সঞ্জয়ের সঙ্গে চার কক্ষের একটি বাড়িতে অবসর জীবনযাপন করছেন। আর সঞ্জয় সামান্য ছোটখাট একজন ব্যবসায়ী।

নরেন্দ্র মোদির চাচাত ভাই ভারতভাই মেদি; লালাওয়াড়া গ্রামে একটি পেট্রল পাম্পের কর্মচারি হিসেবে কাজ করেন।

প্রধানমন্ত্রীর আত্মীয় হিসেবে নরেন্দ্র মোদির পরিবারের সদস্যদের কখনো কোনো সুবিধা নিতে দেখা যায়নি। তারা আর দশজন ভারতীয়র মতই লাইন ধরে ব্যাংক থেকে টাকা তোলেন। বিমানের সাধারণ আসনেই চলাফেরা করেন।

সঞ্জয় জানান, তার কাকা নরেন্দ্র মোদির বয়স যখন কম ছিল তখন তিনি কড়া ইস্ত্রি দেয়া পোশাক পরতে পছন্দ করতেন। এখনো তিনি সযত্নে সেই ইস্ত্রিটি রেখে দিয়েছেন। এছাড়া তাদের বিখ্যাত কাকার আরেকটি শখের বস্তু ছিল। সেটি হলো একটি টেবিল ফ্যান। এটিও তিনি রেখে দিয়েছেন। ভবিষ্যতে হয়তো কোন যাদুঘরে তা দেখা যেতে পারে।

কট্টর হিন্দুত্ববাদী সংগঠন আরএসএসের সদস্য হওয়ার পর সংগঠনটির আদর্শ মেনে মোদি ১৯৭১ সাল থেকে পরিবারের সঙ্গে দূরত্ব বাড়াতে থাকেন। ফলে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরেও তার পরিবারের সদস্যদের ক্ষমতার বলয়ের বাইরে রাখতে তাকে খুব একটা বেগ পেতে হয়নি। অবশ্য এক্ষেত্রে মোদি তার পরিবারের সদস্যদের নিয়েও গর্ব করে থাকেন। তিনি বলেন, ‘এই কৃতিত্ব মূলত আমার ভাই এবং তাদের সন্তানদের। তারা সাধারণ জীবনযাপনে অভ্যস্ত। আমাকে কখনোই কোন কিছুর জন্য চাপ দেয়নি। আজকের দিনে এটা খুব কঠিন একটি ব্যাপার।’

নরেন্দ্র মোদির ছোটভাই প্রহ্লাদ মোদি; সরকারবিরোধী এক সমাবেশে।

অবশ্য মোদির ছোটভাই প্রহ্লাদ মোদি যিনি ন্যায্যমূল্যের একটি ছোট দোকানের মালিক এবং গুজরাট রাজ্যের ন্যায্য মূল্যের দোকান মালিক সমিতির সহ-সভাপতি, তিনি বড় ভাইয়ের কড়া সমালোচক। এমনকি যখন তিনি গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন তখনো তার সমালোচনার সুযোগ পেলে ছাড়তেন না প্রহ্লাদ মোদি।

অনেকেই মনে করেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তার পরিবারের সঙ্গে বেশ কঠোর আচরণই করে থাকেন।  কিন্তু ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী বিশ্বাস করেন, ক্ষমতা মানুষের নিষ্পাপ স্বভাবকে কলুষিত করে। ফলে আত্মীয়স্বজনকে ক্ষমতা বলয়ের বাইরে যতদূর রাখা যায় ততই মঙ্গল। এজন্যই তার বিরুদ্ধে আর যত অভিযোগই উঠুক না কেন অন্তত স্বজনপ্রীতির অভিযোগ থেকে তিনি এখনো মুক্ত বলা চলে।

বিজ্ঞাপন

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0673 seconds.