• ৩১ জানুয়ারি ২০১৯ ১৯:২৮:২১
  • ৩১ জানুয়ারি ২০১৯ ১৯:২৮:২১
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

কুমুদিনী হাজংয়ের স্মৃতিতে অম্লান সেই সেদিনের দ্রোহ

ছবি : বাংলা

তখন বৃটিশ শাসনের একদম শেষ সময়ে এসে যে কয়টি আন্দোলন তীব্র নাড়া দিয়েছিলো সমগ্র ভারতবর্ষকে তার ভেতর বৃহত্তর ময়মনসিংহ-নেত্রকোনা অঞ্চলে গড়ে ওঠা টঙ্ক আন্দোলন অন্যতম। কৃষকদের ফসল লুটে নেয়ার বিরুদ্ধে মাথা উচু করে প্রতিবাদে দাঁড়িয়ে যাওয়া সংগ্রামী মানুষদের উপর চলছিলো ব্রিটিশ সরকারের পুলিশ বাহিনীর তাণ্ডব অত্যাচার।

আন্দোলনকারীদের খুঁজতে গ্রামে গ্রামে তল্লাশী চালাতো। সেই সাথে চলতো লুটপাট-নির্যাতন-অগ্নিসংযোগ-ধর্ষণ। এইসব তাণ্ডব চলতো ময়মনসিংহ জেলার ম্যাজিস্ট্রেট ব্যাস্টিনের নেতৃত্বে। 

এমনই এক তল্লাশী অভিযান শুরু হয় ১৯৪৬ সালের ৩১ জানুয়ারি। বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী জেলা নেত্রকোনার সুসং দূর্গাপুরের স্রোতস্বিনী সোমেশ্বরী নদীর তীড়ে হানা দেয় ব্রিটিশ পুলিশ। অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে হাজির হয় স্নিগ্ধ সবুজ গ্রাম বহেরাতলীতে। গ্রামটি মূলত হাজং ও গারো অধ্যুষিত। আন্দোলনের সাথে যুক্ত লঙ্কেশ্বর হাজংকে ধরতে তার বাড়ি যায় পুলিশ। তাকে না পেয়ে তার স্ত্রী কিষানী কুমুদিনী হাজংকে টেনে হিঁচরে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যেতে থাকে। তাদের অত্যাচার নির্যাতনে কুমুদিনী হাজং চিৎকার করতে থাকে। এই আর্তনাদ পৌঁছে যায় আশে পাশের মানুষের কানে। খবর পায় আন্দোলনের অন্যতম নেত্রী রাসমনি হাজং।

হাতে খোলা দা নিয়ে ৩০/৩৫ জন নারী নিয়ে দ্রুত পৌঁছে যান ঘটনাস্থলে। স্বশস্ত্র পুলিশ বাহিনীর সামনে এসে গড়ে তুলেন মানব ব্যারিকেড। কুমুদিনী হাজংকে ছেড়ে দিতে বলেন। কিন্তু মারমুখি পুলিশ এতে আরো হিংস্র হয়ে ওঠলে শুরু হয় সংঘর্ষ। খোলা দা নিয়েই বন্দুকের সামনে ঝাঁপিয়ে পরেন রাসমনি হাজং। ছিনিয়ে নেন কুমুদিনী হাজংকে। তখন পুলিশের গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে যায় এই সংগ্রামী মানুষটির দেহ। কোথাও কোথাও উল্লেখ আছে তার গায়ে ১০টি গুলি করা হয়েছিলো। এই সময় রাসমনি হাজংয়ের পাশে থাকা সুরেন্দ্র হাজং নামে আরেক আন্দোলনকারী কৃষকও প্রাণ দেয়। তবে তার আগে এক বৃটিশ পুলিশের বুকে বিধিয়ে দিতে পেরেছিলো বল্লম।

সেদিন প্রায় আড়াই ঘণ্টা লড়াই চলে কৃষকদের সাথে পুলিশের। এক সময় তারা পিছু হাটে। ওই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে প্রাণ দেয় দুই হাজং নেতা। আহত হয় অনেকে। সেই সাথে দুই পুলিশের প্রাণ যায়।

টঙ্ক মানে ধান কড়ারী খাজনা। হোক বা না হোক কড়ার মতো ধান দিতে হবে। টঙ্ক জমির ওপর কৃষকদের কোনো স্বত্ব ছিল না। জমিদাররা ইচ্ছে মত খাজনা আদায় করতো। লুটে নিতো ফসল। জঙ্গলে পরিষ্কার করে যে কৃষকরা তৈরি করেছিলো ফসলি জমি সেই কৃষকদেরকেই কৌশলে ঠকিয়ে ফসল লুটে নিতো বৃটিশদের দালাল হিসেবে পরিচিত জমিদাররা। আর এর বিরুদ্ধেই গড়ে উঠেছিলো ঐতিহাসিক আন্দোলন।

এই আন্দোলনের প্রথম শহীদ হাজং মাতা রাসমনি হাজং। হাজংরা আজো গভীর শ্রদ্ধা ভরে স্মরণ করে বিপ্লবী রাসমনি হাজংকে। বিধবা নিঃসন্তান রাসমনি হাজং ছিলেন মানুষের সেবায় নিবেদিত। যে কোনো প্রয়োজনে তিনি ছুটে যেতেন। একদিকে নারীদের বিপ্লবী দীক্ষায় দীক্ষিত করতে বিভিন্ন কৌশল সেখাতেন, অধিকারের প্রশ্নে সরব থেকে সংগঠিত করতেন অন্যদিকে গ্রামের দরিদ্র মানুষের জন্য শিক্ষা চিকিৎসারও ব্যবস্থা করতেন নিজের উদ্যেগেই। আর এসব কারণেই তাকে হাজংরা মা বলে ডাকতো। তিনি হাজং মাতার সন্মানে ভূষিত হয়েছেন। 

তার একটি বাণী বেশ জনপ্রিয়। তিনি বলেছিলেন- ‘আমি নারী, আমি জানি নারীর সম্ভ্রমের মান। নারীর মান আমি রক্ষা করবো, নয় মরবো। তোরা থাক তোদের নীতি নিয়ে বসে।’

প্রতিবছর এই দিনে তার স্মরণে সোমেশ্বরী নদীর তীরে বহেরাতলী গ্রামে মেলা শুরু হয়। এই মেলা চলে ৭ দিন। তার স্মরণে বহেরাতলী গ্রামে নির্মিত হয়েছে একটি স্মৃতিসৌধ।

বিজ্ঞাপন

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0187 seconds.