• ২৮ জানুয়ারি ২০১৯ ২২:২৪:২৮
  • ২৯ জানুয়ারি ২০১৯ ২৩:৪৬:১৮
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

ফাতেমার জন্য ভালবাসা, ওসি মোস্তাফিজকে কুর্নিশ

নিজের মায়ের নামে নাম রেখে শিশুটিকে মায়ের মর্যাদা দিলেন পটুয়াখালী সদর থানার ওসি মোস্তাফিজুর রহমান। ছবি : সংগৃহীত


মোজাব্বীর হাসান


‘মানসিক ভারসাম্যহীন নারীকে ধর্ষণ’ কিংবা ‘মানসিক ভারসাম্যহীন নারীর রাস্তায় সন্তান প্রসব’ কিংবা ‘আবারো মানসিক ভারসাম্যহীন নারীকে ধর্ষণ’ অথবা ‘আবারো মানসিক ভারসাম্যহীন নারীর সন্তান প্রসব’ শিরোনামে প্রায়ই পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশিত হয়। এরকম ঘটনা বাংলাদেশের কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলে শুধু নয়, সারা দেশেই ঘটছে।

কিন্তু কিভাবে মানসিক ভারসাম্য হারান এই ঋতুমতি নারীরা? কিভাবে মানসিক ভারসাম্য হারান কিংবা কিভাবে গর্ভবতী হয়ে পড়েন এইসব ‘পাগলি’ মেয়েগুলো তা প্রায় ক্ষেত্রেই আমাদের জানা হয়ে ওঠে না। এই নারীরা কি জন্মগত মানসিক ভারসাম্যহীন নাকি সমাজে বেঁচে থাকার লড়াইয়ের আঘাতে ক্ষত-বিক্ষত হয়ে মানসিক ভারসাম্যহীন হয়ে পড়েন? আমাদের কাছে নেই তার পর্যাপ্ত কোনো গবেষণা বা পরিসংখ্যানও। 

কিভাবে মানসিক ভারসাম্য হারান এই নারীরা? হয়তো ধর্ষিতা হয়ে মানসিক আঘাত সইতে পারেননি। হারিয়েছিলেন মানসিক ভারসাম্য। কিংবা প্রলোভন দেখিয়ে শরীরে দখল নিয়েছিলেন কোনো নরপশু। এমনই হতে পারে জঠর জ্বালায় দু‘মুঠো অন্নের জন্য বিক্রি করেছিলেন অরক্ষিত শরীর। কিংবা কোনো কাপুরুষ বিয়ে করেছিলেন, একটা সময় তার ধান্ধা শেষ হয়ে গেলে মেয়েটিকে অসহায় করে দিয়ে সটকে পড়েছেন। হতে পারে অনেক কিছুই। তবে যাই হোক না কেন, সত্য এটাই যে, পাগলি গর্ভে ধারন করেছিলেন এক ভ্রুণ।

হতে পারে অনেক কিছুই। তবে এটাই সত্যি অনেক নারী সমাজে নানান কারণে মানসিক ভারসাম্য হারান। অনেক মানসিক ভারসাম্যহীন নারী এই সমাজে থাকেন অরক্ষিত, অসহায়। এরকম নারীদের গর্ভে চলে আসে ভ্রুণ। সেই অবুঝ নারীদের গর্ভে বেড়ে ওঠে আদম-সন্তান। তারা জন্ম দিয়ে ফেলেন আশ্চর্যরকম ফুটফুটে দেবশিশু। সেরকমই এক ফুটফুটে শিশু জন্মেছিল পটুয়াখালী সদরের রাস্তার ‘পাগলী’টির কোলজুড়ে।

দুই
১৪ জানুয়ারি ২০১৯। পটুয়াখালী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এক এক নারীর জন্ম দেন এক দেবশিশু। ওইদিন পটুয়াখালী জেলার সদর উপজেলার কমলাপুর এলাকার রাস্তায় প্রসব বেদনায় কাতরাচ্ছিলেন সেই নারী। পরিচয়হীন ওই নারী ছিলেন মানসিক ভারসাম্যহীন। তাকে রাস্তা থেকে তুলে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যান পটুয়াখালী সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোস্তাফিজুর রহমান। ওইদিনই সেই নারী হাসপাতালে একটি ফুটফুটে কন্যা সন্তানের জন্ম দেন।

ভাগ্যের পরিহাস, ওইদিনই নাড়ীছেড়া ধনকে হাসপাতালে ফেলে উধাও হয়ে যান মানসিক ভারসাম্যহীন ‘পাগলী’ মা। পিতৃপরিচয়হীন সেই কন্যাশিশুটিকে সেদিন থেকে নিয়মিত দেখাশোনা করতে থাকেন ওসি মোস্তাফিজুর রহমান। নিজের সন্তানের মতো পরম মমতায় দেখভাল করতে থাকেন তিনি। পাশাপাশি আশায় আশায় খুঁজতে থাকেন শিশুটির মাকে; তার শিশুটিকে তার কোলে তুলে দিবেন বলে। কিন্তু ১৪ দিন পেরিয়ে গেলেও পাওয়া যায়নি হতভাগ্য নারীটিকে। কিন্তু কি করবেন শিশুটিকে? অবশেষে সিদ্ধান্ত হয় সরকারি নীতিমালা মেনে শিশু কেয়ারে হস্তান্তরের। কিন্তু হস্তান্তরের সময় বিপত্তি দেখা দেয় শিশুটির পরিচয় নিয়ে। এ সময় মহান হৃদয়ের অধিকারী পুলিশ অফিসার মোস্তাফিজুর রহমান শিশুটির নাম রাখেন তার পরম শ্রদ্ধেয় মায়ের নামে।

মোস্তাফিজ সাহেব তার মৃত মায়ের ‘ফাতেমা রহমান’ নামটি পরম শ্রদ্ধায় উত্সর্গ করেন কন্যাশিশুটির নাম হিসাবে। অতপর শিশুটিকে সমাজসেবা অধিদপ্তরের শিশু হোম কেয়ারের কাছে তুলে দেয়া হয়। এসময় শিশুটির টানে আবেগে আপ্লুত হয়ে ওঠেন শক্ত মনের ‘পুলিশ’টি। অঝোরে কেঁদে ফেলেন ওসি মোস্তাফিজ।

তিন
মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় আবেগের প্রতিশব্দ মা। একজন সন্তানের সবচেয়ে বড় শ্রদ্ধার পাত্র তার জন্মদাত্রী জননী। স্রষ্টার পরেই আমরা মাকে স্থান দিয়ে থাকি। মায়ের পায়ের নীচে সন্তানের বেহেশত বলে আমরা আজন্ম মায়ের পায়ের নীচে পড়ে থাকি। সেই মায়ের নামকে আমরা অসম্মান করি না কখনই।
তাছাড়া আমরা সচরাচর নিজেকে সম্ভ্রান্ত ভাবতেই আত্মশ্লাঘা অনুভব করি। সচরাচর আমরা এইভাবেই নিজের পরিচয় লিপিবদ্ধ করি যে, তিনি ঐ এলাকারর একটি সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহন করেন। আর থানার ওসিতো অভিজাতই। শুধু প্রথম শ্রেণীর একজন কর্মকর্তাই নয়, নিদেনপক্ষে শিক্ষিত  ও ক্ষমতাশালী পদের একজন অফিসার।

এই সমাজের এরকম আভিজাত্যের সমপর্যায়ের কোনো মহোদয় রাস্তার একটি পাগলির ‘বেজন্মা’ বাচ্চার নামের সাথে পরম মমতার, পরম শ্রদ্ধার নিজের জন্মদাত্রী মায়ের নাম জড়াতে রাজি হবেন?  আমাদের মনে হয়না। কিন্তু অবলীলায়, পরম মমতায়-ভালবাসায় সেই কাজটি করেছেন ওসি মোস্তাফিজুর রহমান।

পুলিশের কাছে নাগরিক হিসাবে আমাদের প্রত্যাশা অনেক। রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে থাকা সরকারের শাসননীতি ও পুরোনো ও বিদ্যমান পুলিশ আইেনের নানা ফাক-ফোকরের কারণে এদেশের পুলিশ সদস্যদের কখনোই আমরা আপন ভাবতে পারি না। আমরা পুলিশ  বাহিনীর প্রত্যাশিত ভূমিকার বিপরীত চেহারা ও নিষ্ঠুরতার কারণে প্রায় ক্ষেত্রেই পুলিশকে ঘৃণা করে থাকি। প্রকাশ্যে না বললেও, পুলিশকে আমরা মনে মনে মানুষের মর্যাদা দিতে কুণ্ঠা বোধ করি। কিন্তু আমরা ভুলে যাই যে, অপরাপর নিষ্ঠুর বর্গের মতো পুলিশও রাষ্ট্রের একটি অংশ। অনেক বর্বরতার উপস্থিতি থাকলেও পুলিশ বাহিনীির প্রতিটি সদস্যই আমাদের মতো একেকজন আদমসন্তান।

‘ফাতেমা রহমান’-এর মানবিক সন্তান ওসি মোস্তাফিজরা এই বাহিনীরই সদস্য। কোনো ভ্রান্ত সম্ভ্রান্তের অহঙ্কার-অহমিকা নয়, যারা অবলীলায় নিজের মায়ের নামটা উত্সর্গ করতে পারেন রাস্তার পাগলিটার সন্তানকে। যারা নিঃসঙ্কোচে প্রমাণ দিতে পারেন সবার উপরে মানুষ সত্যের বাণীকে। 

শ্রদ্ধা ও ভালবাসা ওসি মোস্তাফিজুর রহমান। বাংলাদেশ পুলিশে আপনাদের সংখ্যা ক্রমে বাড়তে থাকুক। যাদের সামনে গেলে শ্রদ্ধায় আমাদের মাথাটা নিজের অজান্তেই যেন কুর্নিশ করে ওঠে...

লেখক : সাংবাদিক

বিজ্ঞাপন

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0733 seconds.