• ১৬ জানুয়ারি ২০১৯ ১৪:৫৬:৪৭
  • ১৬ জানুয়ারি ২০১৯ ১৫:১৮:৩০
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

সাহসী শাহনাজের অশ্রুত জয়

শাহনাজ আক্তার। ছবি : বাংলা


আমিনুল ইসলাম মিঠু :


সাহসী এক নারীর নাম শাহনাজ আক্তার। জীবন যুদ্ধে টিকে থাকার লড়াইয়ে যিনি হার না মানা এক মানুষ। জীবিকার মাধ্যম বাইকটি হারিয়ে দিশেহারা হলেও প্রত্যাশা ছিল সকলের সহযোগিতায় ফিরে পাবেন বাহনটি। অবশেষে মঙ্গলবার দিবাগত রাতেই অভিযান চালিয়ে নারায়ণগঞ্জের সাইনবোর্ড এলাকা থেকে শাহনাজের বাইকটি উদ্ধার করে পুলিশ।

তেজগাঁও জোনের সহকারী কমিশনার আবু তৈয়ব মো. আরিফ হোসেন আন্তরিকতার সঙ্গেই পুরো ঘটনাটির সফল সমাপ্তির পথ দেখান। এ সময় ঘটনাস্থল থেকে প্রতারক জনিকে আটক করা হয়।

শাহনাজের মতো অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য বাংলাদেশ পুলিশকে ধন্যবাদ। সেইসঙ্গে ধন্যবাদ সেসকল মানুষকে যারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে খবরটি প্রচারের পরপরই শাহনাজকে নতুন বাইক দিয়ে সাহায্যের প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছেন। গণমাধ্যমের ভূমিকাও কম ছিল না বাইকটি ফেরত পেতে। বিশেষ করে অপরাধ বিষয়ক সাংবাদিক বন্ধুরা জানান পর ঘটনাটির সার্বিক তদারকি করেন।

শাহনাজের সঙ্গে পরিচয় গেলো বোরবার রাতে। সেদিন কারওয়ান বাজার থেকে বাসা ফেরার পথে উবারে বাইক কল করি। ওপাশ থেকে চালক বললেন, ভাই আমি একজন নারী চালক। আমার বাইকে রাইড নিতে আপনার কোনো আপত্তি আছে নাকি? আমি বললাম, না, নেই। আমি ফেসবুকে আপনাকে নিয়ে পোস্ট দেখেছি, আপনি আসুন। ওই মুহূর্তে আমি ছিলাম বাংলা ডট রিপোর্টের অফিসে। সঙ্গে সঙ্গে সম্পাদক রঞ্জু ভাইকে বললাম, আমি যে রাইডার পেয়েছি উনি একজন নারী রাইডার, আজ উনাকে নিয়ে ফেসবুকে পোস্ট দেখেছি। আপনি চাইলে বাংলায় একটি প্রতিবেদন তৈরি করতে পারেন একজন নারীর সাহসী এই পদক্ষেপ নিয়ে।

এজন্যই সাহসী বলছি, কারণ আমাদের সমাজ ব্যবস্থায় একজন নারী বাইক চালিয়ে সংসারের হাল ধরার মতো ঘটনা এখনো বিরল বলা চলে। তাছাড়া কেউ কেউ রাইড শেয়ার করলেও তা শুরু নারীদের জন্য। কিন্তু শাহনাজ সবাইকেই রাইড দেন।

শাহনাজ আক্তার যিনি দু’টি সন্তানের মুখে অন্ন তুলে দিতে বেছে নিয়েছেন বাইকে যাত্রী পরিবহন সেবাকে। সেদিন (গেলো রোববার) শাহনাজ জানালেন, দু’টি মেয়ে নিয়ে মিরপুরে বসবাস করেন। স্বামী তাকে ত্যাগ করায় দুই মেয়ে নিয়ে চলছে জীবন সংগ্রাম, পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী শাহনাজ। এক মেয়ে নবম, আর এক মেয়ে প্রথম শ্রেণিতে পড়ে। খুবই কষ্টে দিন যাচ্ছিল। তাই অগত্যা বাইক নিয়ে পথে নেমে পড়েন জীবন সংগ্রামে। উবার বা পাঠাও অ্যাপের মাধ্যমে বাইক চালিয়ে যা আয় হয় তা তিনি ঘরভাড়া ও মেয়েদের লেখাপড়ার খরচসহ যাবতীয় খরচ মেটান। 

সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছেন শাহনাজ। প্রতিদিনই সব খরচ বাদে পাঁচ থেকে ছয়শ টাকা নিয়ে ঘরে ফিরতে পারেন। এ টাকা দিয়ে দৈনন্দিন সংসার খরচ করলেও সঞ্চয় করা সম্ভব হচ্ছে না বলেও জানান। কারণ ঘরভাড়া, দুই মেয়ের পড়াশোনা, খাবার সব মিলিয়ে মাসে প্রায় ২০ হাজার টাকার মতো খরচ হয়ে যায়। তাই শাহনাজ একটি স্থায়ী চাকরি করার ইচ্ছের কথা জানান সেদিন।

আর  শাহনাজকে নিয়ে সংবাদ প্রচার হওয়ার পরই সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হন সাহসী এই নারী। অনেকেই তার এ কাজের প্রশংসা করে বাহবা দেন। তবে সুখ বেশিদিন টিকেনি হঠাৎই গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যায় তিনি বাংলার ডট রিপোর্টের অফিসে হাজির। আমাকে দেখেই কেঁদে ফেললেন। বিধ্বস্ত চেহারায় এসে হু হু করে কান্না করে দিলেন। বলতে লাগলেন, ভাই আমাকে সাহায্য করেন। আমার সব শেষ, বাইকটি নিয়ে গেছে। শুনে অনেকটা চমকে উঠি। কীভাবে হলো জানতে চাইলাম। বেঁচে থাকার একমাত্র সম্বলটি হারিয়ে অসহায় মানুষটি কাঁদতে থাকলেন।

ওই সময় বাংলা ডট রিপোর্টের সম্পাদক রফিকুল রঞ্জু ভাই, উপস্থিত এক সাংবাদিক ও আমি তাকে শান্তনা দিয়ে পুরো ঘটনা জানতে চাইলাম। এরপর জানালেন কীভাবে যাত্রীবেশে এক ছিনতাইকারী সারাদিন রাইড নিয়ে টাকা দেয়ার নাম করে খামার বাড়ি এলাকায় নিয়ে একটি অফিসের সামনে অনেকক্ষণ বসিয়ে রাখে। এরপর এসে তার কাছে জানতে চায় নারী হয়ে বাইকটি চালান কীভাবে। এরপর ওই লোক চাবি চাইলে তিনি সরল মনে বাইকের চাবি তুলে দেন। পরক্ষণেই চালানোর কথা বলে বাইক স্টার্ট দিয়ে সটকে পড়েন ছিনতাইকারী।

জীবিকার বাহনটি ফেরত চেয়ে কান্নায় ভেঙে পড়া শাহনাজের আকুতি করে বলেন, ভাই আজ ৬ হাজার টাকা ধার করে মেয়েকে স্কুলে ভর্তি করেছি। বাইক না চালালে কিভাবে সেই টাকা ফেরত দিবো? আমার বাইকটি এনে দেয়ার ব্যবস্থা করেন। তিনি জানান, এক লাখ ৫৮ হাজার টাকা ধার করে বাইকটি কিনেছেন জীবন সংগ্রামে টিকে থাকার তাগিদে। এরমধ্যে ৬০ হাজার টাকা পরিশোধ করেছেন। বাইক না চালালে বাকি টাকা শোধ দিতে পারবেন না। না খেয়ে থাকতে হবে পুরো পরিবারকে, দুই মেয়ের লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যাবে।

এদেশে অনেক নারী আর্থিক অনটনের কারণে বেছে নেন ভুল পথকে। সেখানে শাহনাজের মতো একজন নারীর জীবন সংগ্রামের বাইকে যাত্রী পরিবহনের পদক্ষেপ নিঃসন্দেহে সাহসী উদ্যোগ। নারীর উন্নয়ন ও ক্ষমতায়নের পাশাপাশি আত্ম-সামাজিক উন্নয়নে শাহনাজ আক্তার হতে পারে অনন্য এক উদাহরণ। শাহনাজের বাইক খোয়ানোর কান্না যেন সমাজের প্রত্যেকটি মানুষের হৃদয় ছুঁয়ে যায়। আর তাই তো শাহনাজের ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে পোস্ট করার পরপরই ব্যাপক সাড়া ফেলে। অনেক ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন শাহনাজকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়ার ঘোষণা দেন। ভাইরাল হয়ে উঠে শাহনাজের বাইকটি ফেরত পাওয়ার দাবি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও তৎপর হয়ে উঠে বাইকটি উদ্ধারে। সেই সঙ্গে শাহনাজকে অনেকেই বাইক কিনে দেয়ার ইচ্ছে পোষণ করলেও শাহনাজ সাহায্যের পরিবর্তে বাইকটি উদ্ধারের আকুতি জানিয়েছেন বারবার।

তিনি বলেন, ‘ভাই আপনারা যারা আমার পাশে দাঁড়িয়েছেন সকলের কাছে আমি কৃতজ্ঞ। তবে আমি কারো সাহায্য নিয়ে বাঁচতে চাই না। আমার কষ্টার্জিত অর্থের বাইকটি উদ্ধারের ব্যবস্থা করে দিন। আমি আর কিছু চাই না।’

এ কথা শুনে নিজের ভেতরে সাহসী এই নারীর প্রতি শ্রদ্ধা বহুগুণ বেড়ে গেল যেন। কারণ নারী হলেও শাহনাজ একজন প্রবল ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন মানুষ হিসেবেই নিজের অবস্থান ব্যক্ত করেছেন। শাহনাজের মতো হার না মানা মানুষই হতে পারেন অনুপ্রেরণার এক নাম।

লেখক : অনুসন্ধানী সাংবাদিক

বিজ্ঞাপন

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0255 seconds.