• ০২ জানুয়ারি ২০১৯ ১৯:৩৫:১৯
  • ০২ জানুয়ারি ২০১৯ ১৯:৩৫:১৯
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

হ্যাপি নিউ ইয়ার এবং স্কুলের খরচ

ছবি: সংগৃহীত

মাহা মির্জা

১.
আমাদের সঙ্গে থাকেন দুলন আপা, তার বাড়ি ময়মন্সিংয়ের মুক্তাগাছায়। নিরন্তর সংগ্রাম করে মেয়ের পড়াশুনার খরচ চালায়। সরকারি স্কুলে পড়লে খরচ থাকার কথা না, কিন্তু সমস্যা হলো, মুক্তাগাছার এই স্কুলে গত ৭-৮ বছর ধরে কোনো ক্লাস হয়না। বাচ্চারা স্কুলে যায়, রোল কল হয়, দুপুর পর্যন্ত ক্লাসে বসে থাকে, তারপর বাড়ি চলে আসে। যাদের কিছুটা সামর্থ আছে তারা কোচিং করায়। যে কঠোর পরিশ্রমী নারী ৫ হাজার টাকা বেতন পায় এবং একা সংসার টানে, প্রতি মাসে তার বেতনের পাঁচ ভাগের এক ভাগ চলে যায় গ্রামে ফেলে আসা বাচ্চাটার কোচিং করাতে!! ফিমেল স্টাইপেন্ডের কথা জিজ্ঞেস করেছিলাম, বললো, ওটা সবাই পায়না, স্কুল কমিটি আর মেম্বারদের সঙ্গে যাদের ভালো সম্পর্ক, তাদের ছেলেমেয়েরা পায়।
২.
নিউমার্কেট এলাকায় থাকে মিনা। আমাদের বহুদিনের পরিচিত। ২টা মেয়ে পল্টন স্কুলে পড়ে। তার একটাই স্বপ্ন, মেয়েরা বড় হয়ে তার মতো বাসাবাড়িতে কাজ করবেনা, অফিসে চাকরি করবে। অথচ সবখানে একই গল্প- স্কুলে কিছু পড়ায় না! ভীষণ স্বল্প আয়ের এই মাও বাচ্চাদের প্রতিটা সাবজেক্টে কোচিং করায়। দুই মেয়ের জন্যে মাসে খরচ হয় পনেরোশো টাকা। বছরের শুরুতে মেয়েদের ভর্তি ফি, টেক্সটবুকের বাইরে বাধ্যতামূলক দুই-দুই চার হাজার টাকার বই, নতুন জামার খরচ- এসব চিন্তায় রাতে ঠিকমতো ঘুমাতে পারেনা। যার মাসিক আয় দশ হাজার টাকা, ঘর ভাড়া ৬ হাজার টাকা, কোচিং-এর খরচ দেড় হাজার টাকা, বছরের শুরুতে কি হাল হয় তার? দিন আনি দিন খাই সিঙ্গেল মা কেমন করে কোথেকে স্কুলের বাড়তি খরচের যোগান দেয়?
৩.
শহরে মানুষ বাড়ছে। মিরপুরেও হু হু করে জনবসতি বাড়ছে। সরকারি স্কুলে কুলায়না, তাই প্রাইভেট স্কুলের সংখ্যাও বেড়েছে। মিরপুর-আগারগাঁও এলাকায় সরকারি স্কুল বলতে শেরেবাংলা নগর, পীরেরবাগ, আর গণভবন প্রাথমিক বিদ্যালয়। বিপুল চাহিদা, সিট্ কম। খুবই অল্প আয়ের দুটো পরিবারকে চিনি, সরকারি স্কুলে জায়গা পায়নি, প্রাইভেট স্কুলে ভর্তি করেছে। এসব স্কুলের বেশিরভাগ বাচ্চাই নিম্নবিত্ত পরিবারের। এমনিতেই পাঁচশো টাকা বেতন, তারউপর বছরের শুরুতে বাড়তি ভর্তি ফি, সেটাও বারোশো টাকার কম না। তারউপর দেড় দুই হাজার টাকার এক্সট্রা বই।

তালতলা থেকে মিরপুর এগারো পর্যন্ত মেট্রো রেলের কাজ চলছে। রাস্তার পাশে শয়ে শয়ে মার্কেট, দোকানপাট। ব্যবসার অবস্থা খারাপ। সরু রাস্তায় ঘন্টার পর ঘন্টা জাম লেগে থাকে। ধুলা, ইটের স্তুপ, পার্কিং বলে আর কিছু নাই। বর্ষাকালে কোমর পর্যন্ত ময়লা পানি জমে থাকে। ফার্নিচারের দোকানগুলোয় দিনের পর দিন লোক নেই। এইসব এলাকার মিষ্টির দোকানদার, কাপড় ব্যবসায়ী, কাঠের কারিগর, এমনকি ফল বিক্রেতাও সরকারি স্কুলে জায়গা না পেয়ে ছেলেমেয়েকে 'মানুষ' বানানোর অদম্য ইচ্ছায় প্রাইভেট স্কুলে দেয়। এমনিতেই ব্যবসায় মন্দা, তারউপর হাড়ভাঙ্গা খাটুনির টাকা জলের মতো খরচ হয় কোচিং মাস্টারের পিছনে। আছে কোনো সভ্য দেশ, স্কুলে যা পড়ায়, তার কোনো ভ্যালু নেই? কোচিংয়ে যা পড়ায় সেটাই অফিশিয়াল শিক্ষা ব্যবস্থা? জানেন এমন কোনো দেশের নাম?
৪.
আমার চেনা গন্ডিটা ছোট। এই ছোট গন্ডির মধ্যেই প্রতি বছরের শুরুতে এই হাহাকার দেখি। ৫ বছর আগে বিল্ডিং ছেড়ে চলে যাওয়া ছুটা বুয়া অসহায়ের মতো নানুকে ফোন দেয়, 'খালাম্মা আমি পেয়ারা, আমারে ৩ হাজার টাকা ধার দেন, ছেলেটারে ভর্তি করাবো, নতুন বই কিনতে লাগবে।' বুঝতে পারি, হ্যাপি নিউ ইয়ার জিনিষটা তাদের জন্যে একটা মূর্তমান অভিশাপের মতো।

তারা বলবে, মানুষের ইনকাম বেড়েছে, তাই বুয়ার বাচ্চাও কোচিং করে। কিন্তু এই বাড়তি টাকার যোগান কোথেকে আসে, খোঁজ নেবার দায় তাদের নেই। পার ক্যাপিটাল ইনকাম বাড়ে, কোচিং এর খরচ বাড়ে, ধারদেনা বাড়ে, আর শুধু মরিচপোড়া দিয়ে ভাত খাওয়া মানুষের সংখ্যাও বাড়ে।

প্লিজ আমাকে চ্যালেঞ্জ করুন, শিরদাঁড়া সোজা করে চোখের দিকে তাকিয়ে বলুন, আমার চেনা গন্ডির মানুষগুলোই শুধু ‘ফকিন্নি’, আর বাকিরা সবাই উন্নয়নের জোয়ারে ভাসছে।

লেখক: গবেষক ও এক্টিভিস্ট

বিজ্ঞাপন

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 5.9829 seconds.