• নিজস্ব প্রতিবেদক
  • ০৩ ডিসেম্বর ২০১৮ ২২:২১:১৪
  • ০৩ ডিসেম্বর ২০১৮ ২২:২১:১৪
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

যে স্কুলে পরীক্ষার ফলাফলে কোনো প্রথম-দ্বিতীয় নেই!

ছবি : সংগৃহীত

স্কুল আছে। পরীক্ষাও আছে। ছাত্র-ছাত্রীরা সেই পরীক্ষায় অংশও নেন, তবে পরীক্ষায় কাউকে প্রথম-দ্বিতীয় নির্বাচিত করা হয় না। তাই নেই কোনো রোল নম্বরও। মুখস্থ বিদ্যার উপর নয়, এখানে যে যার মেধা দিয়েই পরীক্ষা দেয়। সব শিক্ষার্থীই এখানে সমান।

প্রতিযোগিতার নামে আগে পরে কিংবা এগিয়ে থাকা পিছিয়ে থাকার কোনো সুযোগ নেই এখানে। তাই এখানে যান্ত্রিক প্রতিযোগিতাও নেই শিশু শিক্ষার্থীদের মাঝে। এমনই একটি নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের নাম ‘আমাদের পাঠশালা’।

সুবিধা বঞ্চিত শিশুদের সুশিক্ষা শিক্ষিত করার প্রাথমিক প্রচেষ্টা করছেন আমাদের পাঠশালার শিক্ষকরা। আমাদের প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থার সাথে আছে পাঠশালার পাঠদানের বিস্তর ফারাক। মূলত প্রচলিত শিক্ষা পদ্ধতিকে অনেকটা চ্যালেঞ্জ জানিয়েই চলছে পাঠশালার শিক্ষা কার্যক্রম।

জানা গেলো এখানে পরীক্ষার ভিত্তিতে কোনো রোল নম্বর হয় না। সারা জীবন স্কুলে একটি রোল নম্বর দিয়েই চলতে হয়। অর্থ্যাৎ ভর্তির সময় যে রোল নম্বর তার থাকে সেটাই তার রোল। গ্রুপ ভিত্তিক শিক্ষা কার্যক্রমে উৎসাহী করা হয় ছাত্র-ছাত্রীদের। প্রথম শ্রেণি থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত বিদ্যালয়ে পড়ানো হয়। তবে এই শিক্ষার্থীদের আরো শিক্ষা কার্যক্রমে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত সহায়তা করেন তারা। সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষদের ভেতর সুষ্ঠু এবং গতবাধা প্রচলিত শিক্ষা পরিবেশের বাইরে এক ভিন্ন শিক্ষাদান প্রতিষ্ঠান গড়ে ‍তুলেছে আমাদের পাঠশালা।

রাজধানীর মিরপুরে পল্লবীর মুসলিম বাজার এলাকায় ছোট একটি ভাড়া বাড়িতে শুরু হয় ‘আমাদের পাঠশালার’ পাঠদান কর্মসূচি। বিদ্যালয়ে এখন বার্ষিক পরীক্ষা চলছে। সে পরীক্ষার বিষয়টি সামনে এনেই পাঠশালার প্রতিষ্ঠাতা এবং পরিচালক আবুল হাসান রুবেল বলেন, ‘পরীক্ষা কী আনন্দের হয়? পরীক্ষা মানেই তো কেবল মুখস্থ বিদ্যার বাহাদুরি। পরীক্ষা কী কেবল রোল নাম্বার আগে পিছে করার যান্ত্রিক প্রতিযোগিতা!! 
না! পরীক্ষায় এই অসম যান্ত্রিক প্রতিযোগিতাকে আমাদের পাঠশালা প্রত্যাখ্যান করে। আমাদের পাঠশালায় পরীক্ষা মানে নিজেরাই নিজেদের জানাকে সৃজনশীলতা দিয়ে ব্যাখ্যা করার প্রক্রিয়া। সে কারণে আমাদের পাঠশালায় কোনো রোল নম্বর নাই। সকলেই এখানে সমান। নেই কোন ‘ল্যাং মারা’ মনোবৃত্তির চাষবাস।

বার্ষিক পরীক্ষার মাধ্যমে আমাদের পাঠশলার ২০১৮ সালের শিক্ষাবর্ষ সমাপ্ত হচ্ছে। আমাদের সময় শেষ হচ্ছে এই ক্যাম্পাসেও, জানুয়ারি থেকেই নতুন ক্যাম্পাসে যাব আমরা।’

রুবেল আরো বলেন, ‘আমাদের এখানে প্রশ্ন পদ্ধতিই এমন ভাবে করা হয় যাতে শিক্ষার্থীরা কি মুখস্থ করলো তার চেয়ে বেশি প্রাধান্য পায় তার কতটুকু শিখলো বুঝতে পারলো। ফলে উত্তরটাও সেভাবেই লিখতে হয়। সে এখানে আরো নতুন কোনো ভাবনা ভাবতে পেরেছে কিনা কল্পনা করতে পেরেছে কিনা সে সবকেই আমরা গুরুত্ব দেই। এছাড়াও ছবি আঁকা নাচ গানসহ বিভিন্ন দিকে শিক্ষার্থীদের মেধা বিকাশের সুযোগ করে দেয়া হয়।

শুরু হয় যেভাবে আমাদের পাঠশালা :
স্কুলটির প্রতিষ্ঠাতা আবুল হাসনাত রুবেল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া অবস্থায় সমাজের সুবিধা বঞ্চিত মানুষদের জন্য কিছু করার তাড়না অনুভব করতেন। সেই তাড়না থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের লেখাপড়া জীবন শেষ করে ২০০২ সালে যুক্ত হন বাংলামোটরের “সুলতান- ছফা পাঠশালা” নামের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। যেখানে ছিন্নমূল শিশুদের পড়ানো হয়। কিন্তু সেখানে কাজ করতে গিয়ে তিনি দেখলেন দাতাদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত ও পরিচালিত স্কুলে তার চিন্তার সাথে মিলছে না। তাই তিনি সেই স্কুল থেকে বেরিয়ে এসে নিজেই একটা স্কুল তৈরী করার স্বপ্ন বুনতে থাকেন। 

শুরু হলো রুবেলের স্বপ্ন নিয়ে পথ চলা। তিনি তার কাছের বন্ধু মহল ও শুভাকাঙ্খিদের সাথে এ নিয়ে কথা বলা শুরু করলেন। পেয়ে গেলেন তার ফলও তার এই স্বপ্নের যুদ্ধে যুক্ত হলেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করা রণজিত মজুমদার। এরপর যুক্ত হলেন রণজিতের আরেক বন্ধু ওসমানী মেডিকেল কলেজ থেকে ২০০৪-৫ সালে পাস করা কাজী মুনতাসির বিল্লাহ।

সেই ইচ্ছাশক্তি নিয়ে ব্যক্তিগত চাওয়া পাওয়ার উর্ধ্বে উঠে নেমে পরলেন স্কুল তৈরীর কাজে। সকলে মিলে ২০০৬ সালে চাঁদা সংগ্রহ করে ঢাকায় পল্লবীর মুসলিম বাজার এলাকায় ভাড়া করা ছোট্ট একটি বাসায় শুরু হলো আবুল হাসনাত রুবেল ও তার বন্ধুদের স্বপ্নের স্কুলের। স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে পরিচালিত এই প্রতিষ্ঠানটির নাম দেয়া হয়- ‘আমাদের পাঠশালা’। যা আজ আলো ছড়িয়ে যাচ্ছে প্রায় ২৪০ জন সুবিধা বঞ্চিত শিক্ষার্থীদের মাঝে।

ছাত্র-শিক্ষক সবাই সবার বন্ধু :
আমাদের পাঠশালার কথা মুখে মুখে জেনে গেছেন অনেকেই। উদ্যোক্তা, শিক্ষকদের বন্ধু স্বজন শুভাকাঙ্খি যারা দেখতে যাচ্ছেন এই পাঠশালাটিকে তারাই মুগ্ধ হচ্ছেন। মুখে মুখেই ছড়িয়ে আছে এই পাঠশালার নানা গল্প কথা। এখানে ছাত্র শিক্ষক সবাই সবার বন্ধু। শিক্ষা পরিবেশও বন্ধুত্বের সৌহার্দ্যপূর্ণ।

বর্তমানে আমাদের পাঠশালায় শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন ১১ জন। দিন দিন বাড়ছে শিক্ষার্থীর সংখ্যাও। পরীক্ষার ফলাফলও বেশ ভালো করছে এই বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। এখন প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন তোফাজ্জেল হোসেন।

বিজ্ঞাপন

সংশ্লিষ্ট বিষয়

আমাদের পাঠশালা পরীক্ষা

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.1631 seconds.