• ২৪ নভেম্বর ২০১৮ ১৯:৩৬:৫৬
  • ২৪ নভেম্বর ২০১৮ ১৯:৩৬:৫৬
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

তাজরীন অগ্নিকাণ্ডের ৬ বছর : মামলার সর্বশেষ আপডেট

ছবি : সংগৃহীত

আশুলিয়ার নিশ্চিন্তপুরে অবস্থিত তাজরীন ফ্যাশনসে অগ্নিকাণ্ডের পর ৬ বছর হল। আপনার জানেন, ২৪ শে নভেম্বর ২০১২ সালে সন্ধ্যায় আগুন লেগে এই পোশাক কারখানায় ১১৯ জন শ্রমিক পুড়ে মৃত্যুবরণ করেন।

আহত হয় আরো অনেক শ্রমিক, যাদের অনেকেই আজীবনের জন্য পঙ্গু হয়ে গিয়েছেন। একজন আহত শ্রমিক, রূপালী গত ৬ই সেপ্টেম্বর মারা গিয়েছেন। রূপালী অগ্নিকাণ্ডের দিন কারখানার ৪তলা থেকে লাফ দিয়ে প্রাণ বাঁচান। তাঁর বাবা মনে করেন, আঘাত-ক্ষত শুকিয়ে গেলেও, রূপালী কখনও কাজে বা স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাওয়ার মানসিক শক্তি অর্জন করতে পারেনি।

১৯৯০ সালে সারাকা গার্মেন্টসে আগুনের ঘটনা থেকে শুরু করে তাজরীন অগ্নিকাণ্ড— এই সকল ক্ষেত্রেই আমরা লক্ষ্য করেছি কারখানা মালিকসহ সকল দোষী ব্যক্তিবর্গ বিচার প্রক্রিয়ায় কালক্ষেপনকে কৌশল হিসেবে ব্যবহার করেছে এবং বিচার ব্যবস্থার বাইরে থেকে গিয়েছে। এখানে উল্লেখ্য, তাজরীন অগ্নিকাণ্ডের মামলায় সাক্ষ্য গ্রহণ প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পর, গত ৩ বছরে ২৬ টি শুনানি হয়েছে, তার মধ্যে মাত্র ৫টি শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষ সাক্ষী হাজির করতে পেরেছে। এই ২৬ টি শুনানিতে আদালতে উপস্থিত থেকে আমাদের মনে হয়েছে সাক্ষ্য গ্রহণের দীর্ঘসূত্রিতা বিচারিক ব্যবস্থার একটি কাঠামোগত সমস্যা এবং দু:খজনক হলেও সত্য, শ্রমিকের ‘নগন্য’ জীবনের ক্ষেত্রে এই দীর্ঘসূত্রিতা আরো প্রকট।

এই অগ্নিকাণ্ডের পরে তাৎক্ষণিকভাবে স্বররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। এই তদন্ত কমিটি ১৭ই ডিসেম্বর ২০১২ তারিখে ‘আশুলিয়ার নিশ্চিন্তপুরে অবস্থিত তাজরীন ফ্যাশন লিমিটিডে সংঘটিত মর্মান্তিক অগ্নিকাণ্ডের বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কর্তৃক গঠিত কমিটির তদন্ত প্রতিবেদন’ শিরোনামে তাদের প্রতিবেদন জমা দেন।

প্রতিবেদনটিতে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয় যে, এই দুই ব্যক্তি [মো. দেলোয়ার হোসেন ও মাহমুদা আখতার]এ বিশাল কারখানাটির [তাজরিন ফ্যাশন্স লিমিটেডের] মূল মালিক ও ব্যবস্থাপক। তারা সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে নিজ মালিকাধীন কারখানার নীচ তলায় শ্রমিকদের চলাচলের পথকে গোডাউন হিসেবে ব্যবহার করেন এবং একটি ত্রুটিপূর্ণ নকশা অবলম্বনে ইট ভাটার মত একটি ভবন নির্মাণ করেন। -‘আশুলিয়ার নিশ্চিন্তপুরে অবস্থিত তাজরীন ফ্যাশন লিমিটিডে সংঘটিত মর্মান্তিক অগ্নিকাণ্ডের বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কর্তৃক গঠিত কমিটির তদন্ত প্রতিবেদন’ (পৃ: ৩৭)

একই তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের পরিশেষে চূড়ান্ত সুপারিশে উল্লেখ করা হয় যে, তাজরিন ফ্যাশন লিমিটিড-এ সংঘটিত এই মর্মান্তিক মৃত্যুর বিষয়টি খুবই স্পর্শকাতর। যা দেশে এবং বিদেশে ব্যাপকভাবে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। আগুন লাগার বিষয়টি নাশকতা হতে পারে, তবে এত বিপুল মর্মান্তিক মৃত্যুর জন্য মালিকের অমার্জনীয় অবহেলাই দায়ী। এটি সুস্পষ্ট ভাবে অবহেলাজনিত মৃত্যু ঘটানোর অপরাধ। তাই তাজরীন ফ্যাশন লিমিটেড এর মালিককে দণ্ড-বিধির ৩০৪ (ক) ধারায় আইনের আওতায় এনে বিচারে সোপর্দ করার সুপারিশ করা হল। - ‘আশুলিয়ার নিশ্চিন্তপুরে অবস্থিত তাজরীন ফ্যাশন লিমিটিডে সংঘটিত মর্মান্তিক অগ্নিকাণ্ডের বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কর্তৃক গঠিত কমিটির তদন্ত প্রতিবেদন’ (পৃ: ৪০)

অগ্নিকাণ্ডের পরবর্তীতে বিভিন্ন সংবাদপত্র ও তদন্ত প্রতিবেদনে কারখানার যে সকল ত্রুটি প্রকাশিত হয় তা কারখানা মালিকসহ ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের অবহেলা তথা অবহেলাজনিত মৃত্যু ঘটনাকে প্রমাণ করে। যথা: 

১. তাজরীন ফ্যাশন্স লিমিটিডের ফায়ার সেফটি সার্টিফিকেট-এর মেয়াদ উত্তীর্ণ হয় দুর্ঘটনার ৫ মাস আগে (জুন ২০১২)। অর্থাৎ কারখানাটি অগ্নিনির্বাপক সনদ ছাড়াই পরিচালিত হচ্ছিল।

২. কারখানাটি একটি নয় তলা বিশিষ্ট ভবন। এটির কেবলমাত্র তিনতলা পর্যন্ত নির্মাণের অনুমোদন ছিল। অর্থাৎ কারখানাটির বাকি ছয়তলায় অনুমোদন ছাড়াই শ্রমিকরা কর্মরত ছিলেন।

৩. কারখানাটির প্রতি তলায় সিড়ির কাছে কার্টন, সুতা, কাটা কাপড়ের পাহাড় ছিল। প্রথম তলার সিড়ির কাছে দুটো হাই ভোল্টেজ ইলেক্ট্রিক ট্রান্সফর্মার রাখা ছিল। দ্বিতীয় তলায় নারী শ্রমিকদের সিড়ির কাছে বয়লার ছিল। এই সকলই কারখানা আইনের লঙ্ঘন।

এই সকল তথ্যের ভিত্তিতে সরকারি বিভিন্ন সংস্থাসহ ৪টি তদন্ত কমিটির সব ক’টিই এই অগ্নিকাণ্ডের জন্য মালিককে অভিযুক্ত করে রিপোর্ট দিয়েছে। এই পরিপ্রেক্ষিতে অগ্নিকাণ্ডের পরে মালিকসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ২টি মামলা করা হয়। আশুলিয়া থানার পুলিশ বাদী হয়ে যে মামলাটি দায়ের করে তার তদন্ত কর্মকর্তা ছিলেন তিন জন। আশুলিয়া থানার পুলিশ পরিদর্শক মো. মোস্তফা কামাল, সিআইডির সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার মো.মনসুর আলী মন্ডল, সিআইডি পুলিশ-এর পরিদর্শক এ.কে.এম মহসীন উজ্জামান খাঁন। তারা ২০১৩ সালের ২ ডিসেম্বর ৩২৩/৩২৫/৪৩৬/৩০৪/৩০৪-ক/৪২৭ দ. বিধিতে সিএমএম কোর্টে অভিযোগপত্র দাখিল করে। সাক্ষী করা হয় ১০৪ জনকে।

অগ্নিকাণ্ডের দায়ে অভিযুক্ত মালিকসহ ১৩ জনের বিরুদ্ধে ৩রা সেপ্টেম্বর ২০১৫ সালে অভিযোগ গঠিত হয়। পরবর্তীতে সাক্ষ্য গ্রহণ প্রক্রিয়া শুরু হয় অক্টোবর ১, ২০১৫। এ্যাক্টিভিস্ট নৃবিজ্ঞানী’র সহযোদ্ধারা প্রথম থেকেই এই আইনী প্রক্রিয়াটি গভীর মনোযোগের সাথে পর্যবেক্ষণ করে আসছে। এই মামলাতেও নানা দীর্ঘসূত্রিতার পর ৩রা সেপ্টেম্বর ২০১৫ তারিখে অভিযোগপত্র গৃহীত হয় কোর্টে। শুরু হয় বিচার কাজ। কিন্তু সাক্ষ্য গ্রহণ নিয়ে শুরু হয় টালবাহানা, যা এখনো চলছে। এই মামলা সাক্ষ্য গ্রহণ প্রক্রিয়ার একটি সংক্ষিপ্ত চিত্র তুলে ধরছি: 

অক্টোবর ১, ২০১৫: রাষ্ট্রপক্ষ সাক্ষী হাজির করতে পারেনি

নভেম্বর ১, ২০১৫: রাষ্ট্রপক্ষ সাক্ষী হাজির করতে পারেনি

জানুয়ারি ১০, ২০১৬: একজন সাক্ষী হাজির হয়। এই মামলার মূল বাদী, আশুলিয়ার থানার তৎকালীন পুলিশ কর্মকর্তা আদালতে তার সাক্ষ্য দেন। তার সাক্ষ্যের মধ্য দিয়ে সাক্ষ্য গ্রহণ প্রক্রিয়া শুরু হয়। 

ফেব্রুয়াররি ৭, ২০১৬: রাষ্ট্রপক্ষ সাক্ষী হাজির করতে পারেনি

এপ্রিল ১০, ২০১৬: অগ্নিকাণ্ডের দিন কারখানায় কর্মরত ছিল এমন দু’জন শ্রমিক সাক্ষ্য প্রদান করেন। 

মে ৮, ২০১৬: রাষ্ট্রপক্ষ সাক্ষী হাজির করতে পারেনি

জুন ৫, ২০১৬: রাষ্ট্রপক্ষ সাক্ষী হাজির করতে পারেনি

জুলাই ১১, ২০১৬: রাষ্ট্রপক্ষ সাক্ষী হাজির করতে পারেনি

আগস্ট ১৩, ২০১৬: রাষ্ট্রপক্ষ সাক্ষী হাজির করতে পারেনি

সেপ্টেম্বর ২৫, ২০১৬: রাষ্ট্রপক্ষ সাক্ষী হাজির করতে পারেনি

নভেম্বর ১৩, ২০১৬: রাষ্ট্রপক্ষ সাক্ষী হাজির করতে পারেনি

জানুয়ারি ২৯, ২০১৭: আদালতে তাজরীন অগ্নিকাণ্ডের একজন আহত শ্রমিক সাক্ষ্য দিয়েছিলেন। রাষ্ট্রপক্ষ, আসামিপক্ষের সকল উকিলের প্রভাব উপেক্ষা করে তিনি তার বয়ান দেন, বার বার নানাবিধ অযৌক্তিক প্রশ্ন করে তার বয়ানকে বাধাগ্রস্ত করা হলেও তাকে টলাতে পারেনি। 

ফেব্রুয়ারি ২৬, ২০১৭: রাষ্ট্রপক্ষ সাক্ষী হাজির করতে পারেনি

এপ্রিল ২, ২০১৭: রাষ্ট্রপক্ষ সাক্ষী হাজির করতে পারেনি

মে ১৪, ২০১৭: রাষ্ট্রপক্ষ সাক্ষী হাজির করতে পারেনি

জুলাই ৭, ২০১৭: রাষ্ট্রপক্ষ একজন সাক্ষী হাজির করেছিল। ঘটনাস্থল থেকে পুলিশ কিছু পুড়ে যাওয়া কাপড়, কয়লা, কাগজপত্র মামলার তদন্তের জন্য আলামত হিসেবে সংগ্রহ করে — এই জব্দ তালিকায় সাক্ষী হিসেবে সই করেছিলেন উপস্থিত সাক্ষী। 

১৩ আগস্ট ২০১৭: রাষ্ট্রপক্ষ সাক্ষী হাজির করতে পারেনি

৮ অক্টোবর ২০১৭: রাষ্ট্রপক্ষ সাক্ষী হাজির করতে পারেনি। আসামি পক্ষের প্রধান উকিল মারা যাওয়াতে তারা পরবর্তী শুনানির তারিখ ৩ মাস পরে দেয়ার আবেদন করে। বিচারক সাক্ষ্য গ্রহণের জন্য তারিখ ঘোষণা করেন ৮ই নভেম্বর ২০১৭।

৮ নভেম্বর ২০১৭: রাষ্ট্রপক্ষ সাক্ষী হাজির করতে পারেনি। 

১১ জানুয়ারি ২০১৮: রাষ্ট্রপক্ষ সাক্ষী হাজির করতে পারেনি। বিচারক পাবলিক প্রসিকিউটরকে বলেন, সাক্ষী হাজির করতে পারছেন না, এই মর্মে একটা দরখাস্ত আদালতে জমা দেন ।

২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮: ঢাকা বারের নির্বাচনের কারণে আদালত বসেনি। 

২২ এপ্রিল, ২০১৮ : রাষ্ট্রপক্ষ সাক্ষী হাজির করতে পারেনি। 

২০ জুন, ২০১৮: রাষ্ট্রপক্ষ সাক্ষী হাজির করতে পারেনি। জামিনে থাকা তিনজন আসামী হাজিরা দেয়নি বলে তাদের নামে ওয়ারেন্ট ইস্যু করার আদেশ দেন আদালত।

৩০ জুলাই, ২০১৮: রাষ্ট্রপক্ষ সাক্ষী হাজির করতে পারেনি। ২০১৩সালে দেয়া উচ্চ আদালতের এক আদেশের প্রেক্ষিতে অভিযুক্ত তাজরীন কারখানার মালিক, মো. দেলোয়ার হোসেনের পাসর্পোট ও বিদেশ ভ্রমনের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। অভিযুক্ত মালিকের আইনজীবীরা এই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়ার জন্য আদালতে একটি আর্জি পেশ করেন। আদালত তা নামঞ্জুর করেন। 

১১ সেপ্টেম্বর, ২০১৮: রাষ্ট্রপক্ষ সাক্ষী হাজির করতে পারেনি। 

১৬ অক্টোবর, ২০১৮: বিচারক পূজার ছুটিতে থাকায় আদালত বসেনি। রাষ্ট্রপক্ষ সাক্ষী হাজির করতে পারেনি। 
আগামী সাক্ষ্য গ্রহণের তারিখ: ২৭শে নভেম্বর ২০১৮

এই দেশে প্রতিদিন লাশের মিছিল। এই মিছিলে ছয় বছর আগে তাজরীন অগ্নিকাণ্ডে নিহত শ্রমিকদের লাশ আমাদের স্মৃতির অনেক আড়ালে চলে গিয়েছে। জনগণের টাকায় বেতনভুক্ত রাষ্ট্রপক্ষের উকিল 'বিচারে'র সম্ভাবনাকে তিল তিল করে নষ্ট করে — তাই দেখতে আমরা প্রতি শুনানিতে আদালতে হাজির হয়েছি।

আদালত বসার আগে বারান্দায় আসামিদের রাষ্ট্রপক্ষের উকিল-আর্দালীর সাথে সৌহার্দ্য বিনিময় করতে দেখি। মাস্তানসম উকিলদের সাথে নিয়ে সদম্ভে দাঁড়িয়ে থাকেন মালিক মো. দেলোয়ার হোসেন। 

একটা জনগুরুত্বপূর্ণ মামলা পরিচালনায় রাষ্ট্রপক্ষের চরম অবহেলা, অভিযুক্ত মালিকপক্ষের সাথে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ আঁতাত কিভাবে বিচার প্রক্রিয়াকে ক্ষতিগ্রস্ত করে তার জ্বলজ্বলে উদাহরণ তাজরীন অগ্নিকাণ্ডে দায়ের করা এই মামলা।

লেখকদ্বয় : সায়দিয়া গুলরুখ, শহিদুল ইসলাম সবুজ, কামরুল হাসান, নাজনীন শিফা এবং মাহমুদুল সুমনসহ নৃবিজ্ঞানী গবেষক দল।

বিজ্ঞাপন

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.1648 seconds.