• ১৯ নভেম্বর ২০১৮ ২২:৩৮:৪৮
  • ১৯ নভেম্বর ২০১৮ ২২:৩৮:৪৮
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

নির্বাচনী জোট, ভোট আর নৈতিকতা

ডা. পলাশ বসু। ছবি : সংগৃহীত

গণতান্ত্রিক দেশে নির্বাচন হচ্ছে ক্ষমতা বদলের একমাত্র হাতিয়ার। এ ছাড়া অন্য কোনো প্রথাসিদ্ধ উপায় নেই। যদিও অনেক সময় দেখা যায় তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে জনগণের মতামতের তোয়াক্কা না করে বন্দুকের নলের মুখে ক্ষমতা পরিবর্তনের ঘটনাও ঘটে থাকে।

গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে ধ্বংস করে দিয়ে রাজনীতিতে রাজনীতিবিদদের পরিবর্তে পেশীশক্তি, টাকাওয়ালা, লুটেরা ধনিক শ্রেণি এবং আমলাদের আগমন ঘটে থাকে—এসবের আড়ালেই।এ কারণেই বলা হয় দূর্বল গণতন্ত্রও উদার স্বৈরতন্ত্রের চেয়ে ভালো। কারণ গণতন্ত্র একটা প্রক্রিয়া। ধীরে ধীরে নানা প্রতিকূলতাকে জয় করেই এক সময় সে মাথা উঁচু করে দাঁড়ায়। গণতন্ত্র রাতারাতি আকাশ থেকে জারি হওয়ার বিষয় নয়। জীবনবোধের সাথে গণতন্ত্রের সম্পর্ক এক এবং অভিন্ন।

আমাদের দেশে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে সকল দল অংশগ্রহণ না করায় রাজনীতিতে এক ধরনের টানাপোড়েন চলছিলো। এ বছর ডিসেম্বরে আবার জাতীয় নির্বাচন হতে যাচ্ছে। সে নির্বাচনে সকল দল অংশ নিলে এ টানাপোড়েন হয়তো সামনে কেটে যাবে। এখন অবধি হাবভাব দেখে মনে হচ্ছে সকল দলই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে।

নির্বাচনে অংশ নেয়ার জন্য এখন মোটা দাগে নিবন্ধিত এবং অনিবন্ধিত সকল দলই প্রায় দুটো জোটে ঢুকে পড়েছে। একটা হচ্ছে জনাব কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট এবং অপরটি হচ্ছে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মহাজোট। অন্যদিকে কাগজে কলমে এখনও টিকে আছে বিএনপির নেতৃত্বে ২০ দলীয় জোট। যদিও নির্বাচনী আসন বন্টনের সময়ে এরাও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টে ঢুকে যাবে। ফলে লড়াই হবে মূলত কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট বনাম আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে গঠিত মহাজোট প্রার্থীদের মধ্যে। তাই এবারের নির্বাচন প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ এবং উৎসবমুখর হবে বলেই মনে হয়। যদিও ভোটের এখনও ৪০ দিন বাকি। একটু অপেক্ষা করলেই সময়ের সাথে সাথে বিষয়টা পরিষ্কার হয়ে যাবে।

তবে, যেটা খুব দরকার সেটা হচ্ছে একটা গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের সাথে সাথে রাজনীতিতেও যেন একটা গুণগত পরিবর্তন সূচিত হয় সেদিকে লক্ষ্য রাখা। সেটা যে কতটা হবে- সে বিষয়ে সন্দেহ থেকেই যায়। ‘রাজনীতিতে শেষ কথা বলে কিছু নেই’ বলে যে আপ্তবাক্য আমরা শুনে থাকি সেটা রাজনীতিকে মহত্তর করেছে নাকি খাঁটো করেছে সেটা বুঝে উঠতে আমি রীতিমতো হিমশিম খাই। এর অর্থ কি রাজনীতিতে নীতি বলে কিছু নেই নাকি ক্ষমতার স্বার্থে যে কোনো দলে সুবিধামতো সময়ে ভিড়ে যাওয়াকে ন্যায়সঙ্গত বলে ধরে নেয়া?

জোট করতে গেলে অপরাপর দলসমূহের ভেতরে নীতির মিল থাকার আবশ্যকতা বেশি নাকি স্বার্থের মিল থাকাটা বেশি জরুরি? নাকি দুটোই দরকার? নাকি নীতিবিহীন শুধু স্বার্থের মিল হলেই চলে? সাম্প্রদায়িক দলের সাথে অসাম্প্রদায়িক দলের জোট- রাজনীতিতে ঠিক কতটা গুণগত পরিবর্তন আনতে পারে? অথবা স্বাধীনতার বিরোধিতাকারী ঘাতক দলের সাথে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের দল হিসেবে দাবি করা কোনো দল কি জোট গড়ে তুলতে পারে? এমন জগাখিচুড়ি জোট হলে ক্ষমতার পালাবদল হলেও হয়তো হতে পারে তাতে আপামর জনসাধারনের উপকার কতটা হতে পারে? আমার মনে হয় এমন জোট হলে তাতে জনগণের সমস্যার সমাধান বা রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন কোনটাই না হওয়ার সম্ভবনাই বেশি থাকে।

রাজনীতিতে রাজনীতিবিদদের পরিবর্তে পেশীশক্তি, টাকাওয়ালা, লুটেরা ধনিক শ্রেণি, স্বাধীনতাবিরোধি চক্র এবং আমলাদের আগমন আমাদের দেশে পঁচাত্তর উত্তর রাজনীতিতে ক্যান্সারের রূপ নিতে শুরু করে। সেটা এখন ব্যাপকতর রূপ লাভ করেছে। এ কারণেই ১/১১ নিয়ে এই যে রাজনীতিবিদদের মুখে যুক্তিসঙ্গত যে বিরোধিতা আমরা দেখি সেটা ম্লান হয়ে যায় ১/১১ এর কুশীলব সেনা কর্মকর্তা জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরি নির্বাচনে দাঁড়ানোর আশায় যখন প্রথমে আওয়ামী লীগ এবং পরে জাতীয় পার্টি থেকে মনোনয়ন ফর্ম সংগ্রহণ করেন। এখন তো উনি এরশাদ সাহেবের একদম রক্ষাকর্তার দায়িত্বে।এতে এরশাদ তথা মহাজোট রক্ষা পেলেও গণতন্ত্র কি নির্বাসনে যায় না?  

আবার ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে জাতীয় জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠনের প্রাক্কালে শুনেছিলাম কামাল হোসেন গংরা বলেছিলেন বিএনপির সাথে ঐক্য হতে পারে যদি তারা জামাতে ইসলামীকে ছেড়ে আসার ঘোষণা দেয়।দুঃখের ব্যাপার হচ্ছে ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে বিএনপিকে নিয়ে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠিত হয়েছে ঠিকই তবে বিএনপিকে জামাত ছাড়ার ঘোষণা দিতে হয়নি। বরং তারা ২০ দলীয় জোটে বহাল তবিয়তেই আছে। ঐক্যফ্যন্টের সাথে আসন বন্টন হলে জামাতও ২০ দলীয় জোটের ব্যানারে আসন সমঝোতা করেই নির্বাচন করবে। তাহলে ড. কামাল হোসেনের কথার মূল্য কোথায় রইলো? এদিকে বিএনপি-জামাত জোটের আমলে বোমা হামলায় নিহত আওয়ামী লীগ সরকারের প্রয়াত অর্থমন্ত্রী শাহ এ এম এস কিবরিয়ার ছেলে ড. রেজা কিবরিয়া ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করার ঘোষণা দেয়ার পরে নৈতিকতার পারদ লজ্জায় দেশ ছেড়েছে বলে মনে হয়। লজ্জা এখন হয়ত ড. রেজা কিবরিয়ার সাথে উনার কর্মস্থল জাতিসংঘে তালাবন্দি হয়েছে বোধ করি।   

মাননীয় রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদ সাহেব এই তো কিছু দিন আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে বলেছেন রাজনীতি হয়ে গেছে এখন গরীবের ভাউজ। ভাউজ মানে ভাবি। অর্থাৎ গরীবের সুন্দরী বউকে ভাবি ডেকে যেমন সকলে রঙতামাশা করতে উৎসাহী হয় তেমনভাবে আমাদের রাজনীতিও হয়ে গেছে পেশীশক্তি, টাকাওয়ালা, লুটেরা ধনিক শ্রেণি এবং সামরিক-বেসামরিক আমলাদের কাছে গরীবের ভাউজ তুল্য।

তাই রাজনীতিকে যদি পরিচ্ছন্ন রাখতে হয়, গঠণমূলক করতে হয় তাহলে এসব শীতের পাখি বা সুসময়ের কোকিলদেরকে রাজনীতির ময়দান থেকে বিদেয় করতে হবে। সেই কাজটি দলগুলো যতদিন না করছে ততদিন রাজনীতি পরিচ্ছন্ন হবে না। এতে গুণগত পরিবর্তনও আসবে না। শুধুমাত্র জোট গঠন এবং একটা কথিত নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতার পালাবদল হয়তো হতে পারে কিন্তু তাতে রাজনীতির বন্ধ্যাত্ব কাটবে বলে মনে হয় না। ফলে নৈতিকতাবিহীন এসব নির্বাচনী জোট আর ভোট-- যে মিতের মা, সেই মাঐ হয়েই কাগুজে বিষয়ে পরিণত হবে।

লেখক : চিকিৎসক ও শিক্ষক। সহযোগী অধ্যাপক, ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগ, এনাম মেডিকেল কলেজ।

বিজ্ঞাপন

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.1658 seconds.