• ১৭ নভেম্বর ২০১৮ ২১:০০:৫১
  • ১৭ নভেম্বর ২০১৮ ২২:৫১:৫৩
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

হিরো আলম, ছক্কা সাইফুর ও আমাদের গণমাধ্যম

ছক্কা সাইফুর (বায়ে) ও হিরো আলম (ডানে)। ফাইল ছবি

নির্বাচনের ডামাডোল বাজছে। আর এই নির্বাচনকে ঘিরে ‘মনোনয়ন উৎসব’ চলছে। এবার জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সরসরি রাজনীতি থেকে যুক্ত নয় এমন কিছু মানুষ-তারকা আলোচিত ব্যক্তিরা বিভিন্ন দল থেকে মনোনয়ন কিনে এই মনোনয়ন উৎসবের তর্ক বিতর্ক রঙ্গ-রসে উস্কে দিচ্ছে।

আলেচনায় একটি নাম বেশ হাস্যরসের সৃস্টি করেছে আমাদের নাগরিক কৌতুকময় জীবনে। সে পালে হাওয়া দিয়ে আরো উস্কে দিচ্ছে গণমাধ্যম। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বগুড়া-৪ আসন থেকে  প্রার্থী হিসেবে জাতীয় পার্টি থেকে মনোনয়ন কিনেছেন বহুল আলোচিত হিরো আলম। যার পুরো নাম আশরাফুল আলম সাইদ।

হিরো আলমের যোগ্যতা, রুচিবোধ চাল-চলন চেহারা নিয়ে বেশ কৌতুক হচ্ছে প্রচ্ছন্নভাবে। গণমাধ্যমের ‘টক শো’ গুলোতেও তাকে নিয়ে বেশ ইঙ্গিতপূর্ণ প্রশ্ন করতে দেখা গেছে। আর এসব নিয়ে তর্ক-বিতর্কও চলছে বেশ।

একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের টকশোতে তাকে প্রশ্ন করা হয় ‘আপনি যে অবস্থার মধ্যে আছেন আপনার কি মনে হয় একজন সাংসদ হওয়ার মতো সকল যোগ্যতা আপনার আছে?’ পাঠক উপস্থাপকের প্রশ্নটি খেয়াল করুন- ‘একজন সাংসদ হওয়ার মতো সকল যোগ্যতা’। প্রশ্নকারীর প্রশ্নের ধরন উপস্থাপনে যাওয়ার আগে আমরা যদি অন্যদের ক্ষেত্রে বিষয়টি খেয়াল করি তাহলে কি তাদের এই রকম প্রশ্নের সম্মুখীন হতে দেখি কিনা?

হিরো আলম উত্তর দিয়েছিলেন, দেখুন যোগ্যতা কয় ধরনের আমি জানিনা, আমি স্বপ্ন দেখেছি, যেমন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর কথা ধরুন- উনি ছিলেন চায়ের দোকানদার, আমাদের মাশরাফির কথা ধরি, উনিতো ক্রিকেট খেলেন উনি কিভাবে রাজনীতিতে এলেন? আমাদের গায়িকা মমতাজ উনি গান করেন, উনি কিভাবে রাজনীতিতে এলেন...?’

এরপর উপস্থাপিকা মাশরাফির জনপ্রিয়তাকে সামনে এনে যা বললেন তার সারমর্ম হচ্ছে এই যে, মাশরাফি যে লেভেলের মানুষ তিনি ‘ক্রিকেটের রাজা’ তিনি পারতেই পারেন, তাই বলে আপনি কিভাবে তা বলেন। বেশ এলিট একটা শ্রেণি ভাবনা থেকেই মূলত হিরো আলমকে টকশোতে ডেকে আকারে ইঙ্গিতে হেনেস্তার করার চেষ্টা আমরা দেখছি। রাজনীতিতে রাজনৈতিক যোগ্যতা অর্জন করতে হয় এটা এক জায়গার জনপ্রিয়তা কনভার্ট করে অন্য জায়গায় যোগ্য হয়ে ওঠার বিষয় না।

তুমুল জনপ্রিয় ক্রিকেটার মাশরাফিকে রাজনৈতিক মাঠে রাজনৈতিক ভাবেই নিজেকে প্রমাণ করতে হবে। আর সেভাবেই তিনি হয়ে উঠবেন যোগ্য রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। সেক্ষেত্রে শুধু হিরো আলমের রাজনৈতিক যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে বাকিদেরকে বাহ বাহ দেয়াটা হলো একটি শ্রেণি পক্ষপাত মূলক আচরণ। সহজ ভাষায় বলতে গেলে, এলিট নাগরিক সমাজের দাম্ভিকতাপূর্ণ আচরণ। আর এই আচরণের মধ্য দিয়ে গণমাধ্যমের চরিত্র-যোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন উঠে আসে।

হিরো আলমের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক যোগ্যতা নিয়ে আমরা যে প্রশ্ন তুলেছি একই প্রশ্ন অন্যদের ক্ষেত্রে তুলতে পারছি কি না? জাতীয় সংসদে কতজন সংসদ সদস্য রাজনৈতিক ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে উঠে এসেছে? অর্থ্যাৎ কয়জন সরাসরি রাজনীতি করে সংসদ সদস্য হয়েছেন? শুধু ব্যবসা থেকে সরাসরি সংসদ নির্বাচনে আসা এবং টাকা-প্রভাব ছড়িয়ে নির্বাচিত হওয়াদের সংখ্যা কত? তাদের রাজনৈতিক যোগ্যতাই বা কী? জনগণের অধিকার আদায়ে তারা নির্বাচনের আগে কতটা কাজ করেছেন? এইসব প্রশ্নকে আলোচনার তুঙ্গে পৌছে দিতে পেরেছে কিনা মিডিয়া? টকশোগুলি সরগম হয়ে উঠে কিনা এমন আলোচনায়?

নির্বাচনে নবাগতদের ভীড়ে অন্য অনেকের চেয়েই তো এগিয়ে আছে হিরো আলম। কারন তার এর আগেও স্থানীয় পর্যায়ে নির্বাচন করার অভিজ্ঞতা রয়েছে। আমি বলছি না হিরো আলম রাজনৈতিক নেতা হিসেবে যোগ্য, আবার ‘ব্যক্তি অভিজ্ঞতা’র আলোকে অযোগ্য হিসেবে তাকে মন্তব্য করতে গেলে সাথে আরো কিছু নাম যোগ করতে হবে। সেসব পাশ কাটিয়ে যখন হিরো আলমকে ধরে কথা বলা হয় তখনতো আলোচকের সততা নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই।

এই মুহুর্তে আমরা সিলেটের ছক্কা সাইফুরের ঘটনা মনে আসছে। ছক্কা সাইফুর পেশায় ছিলেন বাবুর্চি। দিন আনি দিন খাই অবস্থা। তবে পাগলাটে সাইফুর এলাকায় প্রতিবাদী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তার এই প্রতিবাদ নিয়েও মানুষ হাসাহাসি করতো। কারন কেউ আসুক আর না আসুক সমাজের নানা অসঙ্গতি, স্থানীয় সমস্যা তুলে ধরে সাইফুর একাই প্রতিবাদ করতো। এই সাইফুরের ছিলো নির্বাচনী বাতিক। সে  বিভিন্ন সময় নির্বাচনে প্রার্থী হতো। এনিয়েও হাসি মজা কম হয় নাই। একবার তো প্রেসিডেন্ট পদ প্রার্থী হয়ে ছিলেন তিনি! তখনও তুমুল আলোচনা তাকে ঘিরে। বলাই বাহুল্য সে আলোচনায় ছিলো হাস্যরস কৌতুক।

এভাবেই ১৯৯০ সালে উপজেলা নির্বাচন করেন চেয়ারম্যান পদ প্রার্থী হিসেবে। নিজেই প্রার্থী, নিজেই নিজের কর্মী। একা একাই পোস্টারিং, মাইকিং করে সরগরম করে ফেলেছিলেন এলাকা। প্রতিদ্বন্দী প্রার্থীর অপকর্ম তুলে ধরে বক্তব্য দেয়ায় তার উপর হামলা হয়। তাকে মারধর করে। এরপরই বদলে যায় চিত্রপট। নিরীহ একজন মানুষকে এভাবে মারলো! মেনে নিতে পারেনি এলাকাবাসী। তার পক্ষে সিলেট পাইলট স্কুলের ছাত্ররা প্রথম মিছিল নিয়ে নামে। এরপর তরুণ যুবকরা নামেন। স্থানীয় জনতার জোয়ার নামে সাইফুরের পক্ষে। সাইফুরের ডাব মার্কা নিয়ে সবাই যে যার মতো প্রচারণা চালায়। ভোটেও ঠিক তাই। বিপুল ভোটে নির্বাচিত হয় সাইফুর। আর এই জয়কে এলাকাবাসী মন্তব্য করে সাইফুর ছক্কা পিটিয়েছে। সেই থেকে তার নামও হয় ছক্কা সাইফুর।

এই সাইফুরের গল্প মনে রাখতে হবে। সেই সাথে শুধু মাত্র চেহারা ও ব্যক্তি দূর্বলতা নিয়ে দায়িত্বশীল যেসব মহল থেকে অশ্রদ্ধাপূর্ণ ভাষা ব্যবহার করছেন তাদের মনে রাখতে হবে জনগন দাম্ভিকতার জবাব অদ্ভুত সব কায়দায় দিয়ে থাকে। জনগণ হয়তো এমন জবাব দিবে যে এলিট দাম্ভিকতা নিয়ে তখন আপনার হতভম্ব হয়ে বসে থাকা ছাড়া আর কিছুই করার থাকবে না।

লেখক: সাংবাদিক ও নির্মাতা।

বিজ্ঞাপন

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.1621 seconds.