• ১৭ নভেম্বর ২০১৮ ১৭:১৩:৪৯
  • ১৭ নভেম্বর ২০১৮ ১৭:১৩:৪৯
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

ইশতেহারে ঐক্যফ্রন্টের ডা. জাফরুল্লাহর প্রস্তাব এবং কিছু বিকল্প ভাবনা

ছবি : সংগৃহীত

ফাইজ় তাইয়েব আহমেদ

কৃষক-শ্রমিক-ছাত্র-বয়স্ক মানুষ এই ৪টি শ্রেণির কথা মাথায় রেখে ঐক্যফ্রন্টের ইশতেহারে ৫টি প্রস্তাব যুক্ত করার প্রস্তাব দিচ্ছেন গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের অন্যতম উদ্যোক্তা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী। জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের খসড়া ইশতেহারে ৫ প্রতিশ্রুতির প্রথমটি কৃষি পণ্য মূল্য ও কৃষি কর্মসংস্থান কেন্দ্রিক। এই কাল্যাণ ধর্মী প্রস্তাবনা গুলো "গণ"র সাথে নাড়ীর টান তৈরি করা (পড়ুন তৃণ মূল ব্যবস্থাপণা) গুণীজন ডা জাফ্রুল্লাহ চৌধুরীর করা। এখানে শুধু কৃষি নিয়ে করা প্রথম প্রস্তাবনার যে মহৎ চিন্তা, তার লক্ষ অর্জনের পদক্ষেপ হিসবে কয়েকটা প্রতি চিন্তা নিয়ে আলোচনা করা প্রয়াস পাচ্ছি। খসড়া প্রস্তাবে যা বলা হয়েছে-

স্থানীয় সমবায়ের মাধ্যমে কৃষকের উৎপাদিত পণ্যের উৎপাদন খরচের সর্বোচ্চ দ্বিগুণ মূল্য স্থির হবে বিক্রয়মূল্য হিসেবে এবং নগরবাসী কৃষিপণ্য পাবেন উৎপাদক সমবায় সমিতির নির্ধারিত মূল্যের সর্বোচ্চ ২-৩ গুণ অধিক মূল্যে। কৃষকের প্রতি কেজি মুলার স্থানীয় বিক্রয় দর ৫ টাকা হলে তা নগরবাসী পাবেন ১০-১৫ টাকায়। প্রয়োজনমাফিক সকল কৃষিপণ্য উৎপাদনের জন্য ভর্তুকি দেয়া হবে। যাতে কৃষিতে কর্মসংস্থান বাড়ে এবং ভারত ও পাশের দেশগুলো থেকে কৃষিজাত পণ্যের আমদানি কমে।

প্রতিচিন্তা :
বাংলাদেশে কৃষি পণ্যের দাম বাড়ছে অন্তত ১৩টি প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ কারণে। এই কারণ গুলোর অধিকাংশই অবকাঠামোগত, পদ্ধতি গত এবং দুর্নীতি সংশ্লিষ্ট। এই কারণগুলোর প্রত্যক্ষ সমাধান না করে কৃষি পণ্যের ভোক্তা পর্যায়ে দাম ঠিক করে দেয়া হবে দীর্ঘমেয়াদে অকার্যকর পদক্ষেপ এবং কৃষি অর্থনীতি বিকাশের দিক থেকে হঠকারী। শুধু উৎপাদনে ভর্তুকি দেয়ার কিঞ্চিৎ সুফলে গা না ভাসিয়ে ও দুর্নীতি বান্ধব ভর্তুকির একমুখী পদ্ধতির বিপরীতে সার, বীজ, কৃষি সারঞ্জাম ও রোগ প্রতিরোধ কেন্দ্রিক সাপ্লাই চেইন ঠিক করে উৎপাদন, সংরক্ষণ, বিপনন ও ট্রান্সপোর্টেশনের সমস্যা গুলো এড্রেস করা হোক। কৃষি আবাদকে চাহিদা ভিত্তিক সমন্বিত রেজিস্ট্রেশনের আওতায় এনে উৎপাদন মূল্যের বিপরীতে ইলেকট্রনিক পেমেন্ট মেথডে সরাসরি কৃষকের ব্যাংক একাউন্টে ভর্তুকি দিবার নতুন উদ্যোগ চাই। এতে করে সার ও সেচে ভর্তুকির চাপ ও দুর্নীতি দুটাই কমবে।

স্থানীয় সমবায়ের মাধ্যমে কৃষকের উৎপাদিত পণ্যের উৎপাদন খরচের সমীক্ষার সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানাই। 
বিক্রয় মূল্য নির্ধারণ না করে দিয়ে বিক্রয় মূল্য বাড়ার কারণ গুলো এড্রেস করুন। 
চাহিদা ও উর্বরতার ভিত্তিতে ফলন সমন্বিত ভাবে রেজিস্ট্রেশন করুন। 

রেজিস্টার্ড ফলনের উৎপাদন মূল্য বিক্রয় মূল্য থেকে বেশি হলে কৃষককে সোশাল সেইফটি নেটে আনতে ইলেকট্রনিক পেমেন্ট এর দুর্নীতিত মুক্ত মেথডে ডিরেক্ট ইন্টারফেইসে ভর্তুকি দিন। 

চলমান সার ও সেচের ডিজেলে ভর্তুকি সিস্টেম পরিবর্তন করুন। এখানে রাষ্ট্র যে টাকা ভর্তুকি দেয় তার চাইতে বেশি চাঁদা, ঘুষ, প্রসেসিং ফি, স্পীড মানি আদায় হওয়ায় ভর্তুকির সুফল কৃষকের হাতে পুরোপুরি পৌঁছে না, কিন্তু রাস্টের টাকা ঠিকই খরচ হয়। মৌসুমের শুরুতে রেজিস্টার্ড ফলনের কৃষককে সহনীয় কিস্তিতে সার ও বীজ সাপ্লাই দিয়ে ফলন উৎপাদনের অব্যবহতি পরেই বাকি পরিশোধের একটা টেকসই ও সহনীয় সরকারী-বেসরকারি যৌথ এগ্রি ফাইনান্সিং/ব্যাংকিং মডেলে ডেভেলপ করতে হবে। এতে নিয়ন্ত্রণ হীন ক্ষুদ্র ঋণ এবং কো-অপারেটিভ সোসাইটির মহাজনী সুদের ডিপেন্ডেন্সি কমে আসবে। এই ফাইনানশিয়াল কাজ গুলো স্টান্ডার্ডাইজ করতে হবে। 

কৃষিতে কর্মসংস্থান বাড়ানোর উপলব্ধি ভালো। তবে তার জন্য চাই কৃষককে ফলনে কানেক্টেড রাখা, উৎপাদন মূল্য কৃষি পণ্যের বিক্রয় মূল্য থেকে কম রাখার বন্দবস্ত করা এবং সর্বোপরি কৃষিকে গতর খাটা কায়িক শ্রম থেকে অবমুক্ত করে যান্ত্রিক সুবিধাময় পেশা হিসেবে রূপান্তর ঘটিয়ে আনন্দঘন করে তোলার এন্ড টু এন্ড সমন্বিত পরিকল্পনা।

ফিরে দেখা : অন্তত যে ১৩টি কারণে কৃষি পণ্যের দাম বাড়ছে?

বাংলদেশের শহুরে নাগরিক বিভিন্ন ব্যয় ভারে নূজ্য থাকেন, নিন্ম বিত্তের প্রায় শতভাগ উপার্জিত জীবিকা খাদ্য সংক্রান্ত খাতে ব্যয় হয়। আমাদের বিকাশমান মধ্যবিত্তেরও সিংহ ভাগ উপার্জন খাদ্য পণ্য ক্রয়ে ব্যয় হয়। নদীর সারফেইস ওয়াটার, ভূগর্ভস্ত পানির স্বল্পতা কিংবা দুষ্প্রাপ্যতা, ঋতুর পরিবর্তন, খরা, রাসায়নিক ব্যবস্থাপনার জঞ্জাল, কৃষি ঋন এবং কৃষি উপকরণের কোম্পানি নির্ভরতার প্রত্যক্ষ কারণে দিন দিন বাড়ছে কৃষি উৎপাদন ব্যয়। সেই সাথে রয়েছে দাম বৃদ্ধির পিছনের কিছু পরোক্ষ কারণ। এই সব নিয়ে একটি সংক্ষিপ্ত আলোচনা টানছি এখানে-

১।​​ কৃষি পণ্য রেজি​স্ট্রেশন​, বিভিন্ন ফলনের ​​​ভারসাম্য এবং ডাইভার্সিটি :

বাংলাদেশে​​ কৃষি পণ্য উৎপাদন চাহিদার ভিত্তিতে রেজিস্টার্ড নয় অর্থাৎ চাহিদার আলোকে উৎপাদন ও উৎপাদন টার্গেট নেয়া হয় না। রেজিস্টার্ড না থাকায় ​​ফলনে ​​ভারসাম্য এবং ডাইভার্সিটি নেই। ফলে​ একদিকে​ বিশেষ বিশেষ এলাকায় বিশেষ বিশেষ ফলন বেশি করা হয়। এতে হয় বাম্পার ফলন হচ্ছে, বাম্পার মানেই ফলনের দাম কম​, বিক্রি করতে না পারা, ফলন গরুতে খাওয়ানো, হারভেস্ট না করা​।​

​ফলনে ভারসাম্য এবং ডাইভার্সিটি​ এমন একটা ব্যাপার যা সরকার এবং কৃষি প্রশাসনই শুধু দেশের সামগ্রিক ভোক্তা চাহিদা ও দূর্যোগ ব্যবস্থাপনার চাহিদার আলোকে নির্ণয় করতে পারে। সেই আলোকে বিশেষ বিশেষ ফলন উৎপাদনের জন্য কৃষককে উৎসাহ এবং প্রণোদনা দিতে পারে। প্রণোদনা হচ্ছে বীজ, সার, ফলন ভেদে নিউট্রিশন, কৃষি পরামর্শক এবং চাষাবাদ বিষয়ক টুলস ইত্যাদির ব্যবস্থা করা, যোগান দেয়া বা এগুলোর প্রাপ্তিকে ফেসিলিটেইট করা। এগুলো আমাদের তৃণমূল পর্যায়ে বিস্তৃত আঞ্চলিক কৃষি অফিসের মাধ্যমে করতে পারার কথা। কিন্তু হায়! এসব কিছুই না করে উনারা সারের ডিলারশীপ ভিত্তিক ঘুষ আদান প্রদানে ব্যস্ত থাকেন। দূর্যোগ ব্যবস্থাপনার জন্য খাদ্য পণ্য সংগ্রহের কাজে যে ফান্ড দেয়া হয় সেটার নয় ছয় করা এবং ফলন কিনে কৃষক হয়রানি করে ঘুষ আদায়ই উনাদের প্রধান কাজ। কৃষকরা সমস্যা নিয়ে কৃষি অফিসে গেলে বরং বিপদেই পড়েন।

কৃষক সরকারের কাছ থেকে সরাসরি রাসায়নিক সার, বীজ, কীটনাশক জৈব সার পাচ্ছেন না। এগুলো এজেন্ট/ডিলার/দালালের মাধ্যমে আসে। এই সাপ্ল্যাই চেইনটা নিয়ে ভাবার সময় এসেছে, মূল দামের সাথে এদের বখরা যোগ হয়। এর বাইরে আছে দলীয় কর্মীদের অনুকল্য এবং আরো এক স্তরের দালালী ব্যবসা। ফলে ক্ষুদ্র ঋণ নিয়ে জিএমও বীজের ফলন করেন।

তাছাড়া বৈচিত্রহীন চাষের একচেটিয়া মডেলে একটি এলাকায় সবাই ধান করলে চাইলে অন্য ফলন করা যায় না। কৃষক পর্যায়ে বিচিত্র ফলনের সমাহার আনা দুস্কর হয়েছে পরিপার্শ্বের কৃষি ফলন ও পরিবেশের কারণে, তাই এই কাজে কৃষি প্রশাসনকে খুব প্রয়োজন।

ফলন রেজিস্ট্রেশন এবং এর অনুকূলে বীজ সার দেয়ার সাপ্লাই চেইন ডেভেলপ না করা, ফসলকে চাহিদার আলোকে সমন্বিত করা হয় না বলে এবং উৎপাদিত কৃষি পণ্যের উৎপাদন মূল্য নির্ধারিত না হওয়ায়, একদিকে উৎপাদক ন্যায্য মূল্য বঞ্চিত হচ্ছে আবার সময়ে সময়ে পণ্য দামে সরকারের নিয়ন্ত্রণ হীনতা দেখা যাচ্ছে। দেখা যায় কৃষক কখনও হায় হায় করে আবার কখনো সময় বুঝে বেশি দাম নিবার চেস্টা করে।

​২​। কিছু ফলন (ধান,​ আলু​, আম, পেয়ারা, বড়ই​, কাঁঠাল, বিভিন্ন সবজি ইত্যাদি​) এর বাম্পার হলেও একই মৌসুমের অন্য ফলনের ব্যাপক চাহিদা থাকা স্বত্বেও উৎপাদন হচ্ছেই না, প্রতি বছর আদা, পেঁয়াজ, রসুন, মসুর ডাল বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয় যেগুলা কিনা একটা রাসায়নিক চাষাবাদের একটা ইন্ডাস্ট্রিয়াল মডেলে ক্ষতিকর ভাবে উৎপাদিত অর্থাৎ সেগুলো অতি রাসায়নিক সার, হরমোনাল স্প্রে নির্ভর জিএমও জাত ফলন, স্বাস্থের জন্য যা খুবই ক্ষতিকর​। এখানে কিছু আমদানিকারক চক্র রয়েছে যারা পিঁয়াজ এর মত ফলন গুলো স্থানীয় ভাবে উৎপাদনে কিংবা উৎপাদন সহজীকরনে পরোক্ষ বাঁধা দেয়, রাজনৈতিক দুবৃত্তায়নের যুগে অপ্রতিরোধ্য চক্র হয়ে উঠেছে।

৩। অন্যদিকে ভূগর্ভস্ত সেচের পানি দুষ্প্রাপ্য থাকায়, নদিতে পানি না থাকায় এবং খরায়​ (অনাবৃষ্টি), কিংবা অতি বৃষ্টি এবং শিলা বৃষ্টিতে এলাকার সবাই ক্ষতি গ্রস্ত হচ্ছে।​ মানে, সেচে অতিরিক্ত খরচ হচ্ছে। একদিকে সার ও বীজে কোম্পানি নির্ভরতা, খরুচে সেচ, সেই সাথে ক্ষুদ্র ঋণের উচ্চ সুদ, অন্যদিকে অনিয়ন্ত্রিত আমদানীর মহড়া সব মিলে আজকের কৃষি অনিশ্চয়তায় পূর্ণ।

৪। বিশ্বের সবচাইতে ঘন বসতি পুর্ন দেশে মাস প্রোডাক্টিভিটি নিশ্চিত করতে আমাদের থানা এবং ইউনিয়ন ভিত্তিক আঞ্চলিক কৃষি অফিস গুলোর হয়ে উঠা দরকার ছিল এক একটি কৃষি সরঞ্জামের ঘর (টুলস হাউজ), যাতে কৃষক তাঁর কায়িক শ্রম থেকে মুক্তি পান। কৃষিকে পেশা হিসেবে আনন্দময় হিসেবে উপভোগ করেন। এক একটি কৃষি অফিসের এক একটি সহায়ক কৃষি ফার্ম হয়ে উঠার কথা ছিল, ছিল এক একটি ফ্রি পরামর্শ কেন্দ্র, ট্রেনিং সেন্টার এবং হাতে কলমে প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। কিন্তু এসব স্বপ্ন। সামান্য পাওয়ার টিলার এর ভাড়া দিতেই কৃষকের আর্থিক দম ফুরায়। গতর খাটানো কায়িক শ্রম নির্ভর বলে মাধ্যমিকের সামান্য শিক্ষার গন্ডি জোড়াতালি দিয়ে পেরুনো কৃষক সন্তানও কৃষির প্রতি উচ্ছন্নতা দেখায়। আর আমাদের ধামাধারী শুহুরে এলিট সমাজে "চাষা"বাদ যেন এক ঘৃণিত পেশা!

​৫​। বাংলাদেশে কৃষকের জন্য উপযোগী ফারমার্স মার্কেট হয়ে উঠেনি শহরে, ফলে শহরের ভোক্তা এবং গ্রামের উৎপাদনকারীর মাধ্যে কয়েক স্তরের দালাল চক্র কাজ করে।​ কাওরান বাজারের মত বড় বাজার গুলোতে ব্যক্তি কৃষকের ফলন নিয়ে আসার সুযোগ নেই। বা বাজারে সরাসরি কৃষকের কোন স্থান সংরক্ষিত নাই, এখানে দালালের একচেটিয়া দখল প্রভাব।

এতে করে কৃষি পণ্য উৎপাদনের পিছনে যে মান, পরিশ্রম, পরিবেশ ও বৈচিত্রগত বহু গল্প থাকে, তা ক্রেতার অজানাই থাকে। দেশে অরগ্যানিক বা জৈব কৃষি ফলনের উদীয়মান বাজার এর পুরোটাই সুপার শপ ভিত্তিক। প্রধান প্রধান পাইকারি ও খোলা বাজারে জৈব পণ্যের বিপণন সুযোগ সৃষ্টি করা দরকার। পবিত্র রমজান মাসে এবং অন্য ফেস্টিভালে মজুতদাররা বাজার নিয়ন্ত্রণ করে, এখানে কৃষক তেমন সুবিধা পান না। কারন ফলন তারা আগেই লট ধরে বেচে দিতে বাধ্য, কিছু সামান্য ব্যাতিক্রম ছাড়া !

​৬​। কৃষি পণ্য ​​ট্রান্সপোর্টেশন একেবারেই মানহীন। ফলজ পণ্য, দানাদার শস্য, পাতা জাতীয় সবই একই খোল ট্রাকে, যাত্রীবাহী বাসের ছাদে কিংবা বক্সে অত্যন্ত গরমের মধ্যে, অত্যধিক বাতাসে, রোদে পরিবহণ করা হয়, মানে পরিবহণটির অভ্যন্তর ভাগ লেয়ারড নয়, তাপানূকুল পরিবেশ তো আশাই করা যায়না। মানে বলছি দেশে সবজি সহ নানা রকম কৃষি পণ্য পরিবহণের উপযোগী কোন যুতসই পরিবহণ ব্যবস্থা গড়ে উঠেনি। সাধারণ ট্রাকই সকল পণ্যের ট্রান্সপোর্ট ডেস্টিনেশন। গবেষণায় দেখা গিয়েছে ১৫-২০% পণ্য শুধু পরিবহণে নষ্ট হয়। আবার পরিবহণে পণ্যের মান নষ্ট হয়ে কিছু অংশ মূল্য হারায়। ​​​

৭। ট্রান্সপোর্টেশন​ সেকটরে পুলিশের চাঁদাবাজিও ভয়ানক। ২০১৫ তে পবিত্র কুরবানীর ঈদের সময় দেখা গিয়েছে এক ট্রাক গরু উত্তর বঙ্গ থেকে ঢাকায় আসতে পথে পথে চাঁদাবাজি হয়। এগুলো প্যাসিভ কষ্ট হয়ে কৃষি​ উৎপাদনের দাম বাড়াচ্ছে। ২০১৩ সালে দৈনিক প্রথম আলোর এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২২ হাজার টাকা চাঁদা দিতে হয় ১০ টনের একটি ট্রাককে ৪৩৯ কিমি পথ অতিক্রম করতে। বোধ করি, সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে এই পরিমাণ বেড়েছে। কৃষি পণ্যের দাম কিভাবে কমবে যেখানে রাষ্ট্রীয় বাহিনীই চাঁদাবাজিতে নিয়োজিত।

​৮। স্থানীয় পাইকারি বাজারের সমিতি নির্ভর, পুলিশি এবং রাজনৈতিক হয়রানি ভর করে এই সব সমিতি নেতাদের মাধ্যমে। স্থানীয় দুর্বিত্ত রাজনীতির লোকে​রা শকুনের মত লুফিয়ে থাকে​ কখন ফলন তোলার সময় হবে! সিন্ডিকেট করে দাম নির্ধারণ করা হয় এবং কৃষককে উৎপাদিত পণ্য স্থানীয় বাজারে সিন্ডিকেট নির্ধারিত পাইকারি মূল্যে ফলন বিক্রিতে বাধ্য করা হয়।

​৯​। ঋন থাকায়​​ ফলন সংরক্ষণ (স্টোরেইজ) করতে পারেন না​ আমাদের প্রান্তিক​ কৃষক​, উৎপাদনের অব্যবহতি পরেই তা বিক্রয় করে ঋণের কিস্তি কিংবা দেনা শোধ করতে হয়। তার উপর​ উচ্চ আদ্রতার এবং উচ্চ তাপমাত্রার আবহাওয়ায়​ পচনশীল সবজি জাতীয় কৃষি পণ্য সংরক্ষণের কোন উপায়ই দেশে নেই,​ এগুলো নিয়ে কোন পরামর্শ নেই, টুলস সাপোর্ট নেই, গবেষণা নেই, নেই কোন ইনফাস্ট্রাকচার। রিমোট জায়গাগুলোতে কোল্ড স্টোরেইজ ফ্যাসিলিটি সীমিত, প্রান্তিক কৃষক এখানে এক্সেস কম পান, সাধারণত মজুতদার কোল্ড স্টরেজ ব্যবহার করেন।

আবার কারিগরি ব্যাপার হোল ভিন্ন ভিন্ন ফলনের চাহিদা মোতাবেক আমাদের কোল্ড স্টরেজ ক্লাসিফাইড নয়, দেখা যায় পুরটাই আলুর উপযোগী! ফলে কৃষকরা তারা এন্টি ক্লোরিনেটেড ওয়াটার, কার্বাইড কিংবা ফরমালিন ব্যবহার করছেন! ​উৎপাদিত পচনশীল পণ্যের সংরক্ষণ না থাকায় মৌসুমের বাইরে ফলনের কোন বাজার নেই। এতে কৃষককে অনেক বেশি উৎপাদিত বাল্ক পণ্য মৌসুমেই বাজারে ছাড়ার বাধ্যবাধকতা থাকে। (উদাহরণ ভিন্ন ভিন্ন জাতের আমের হারভেস্ট ডিউরেশন ৩-৪ সপ্তাহ, লিচূর মাত্র ২ সপ্তাহ,কাঠলের ৩-৪ সপ্তাহ ,সংরক্ষণ ব্যবস্থা না হাকায় এই ক্ষুদ্র সময়ের মধ্যেই আপনাকে বাজারজাত করতে হবে! )।

তাই পরিমানের তুলনায় বেশি উৎপাদন হলেও সমন্বিত বাজারজাতকরনের অভাবে পচনশীল পণ্য পানির দরে বিক্রি হয় ফুল মৌসুমে যদিও পড়ে আকাশচুম্বী থাকে দাম। এতে বিষ মিশিয়ে সংরক্ষণের প্রবণতা বাড়ে, এই কাজ সাধারণত দালাল এবং মজুতদারেরাই বেশি করে। উপরন্তু বাংলাদেশ এমন একটি কৃষি উৎপাদনকারী দেশ যার পণ্য প্রবাসী বাংলাদেশীরা কিছু মাত্র ভোগ করলেও আমাদের কোন ভিনদেশি ভোক্তার আন্তর্জাতিক বাজার নেই, এর প্রধান কারন মানসম্পন্ন খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরন, ফুড গ্রেড প্রসেস, মান্সম্পন্ন প্যাকেজিং এবং বিপণন। এই কাজে থাইল্যান্ড, ফিলিপাইন এবং ব্রাজিলকে ফলো করতে পারে বাংলাদেশ।

১০। কৃষি পণ্যের বাজার বাজার : একটি কৃষি পণ্যের অন্তত ৬ রকমের বাজার থাকা চাই-

ক। মৌসুমে দেশি ভোক্তার বাজার 
খ। মৌসুমে​র​ বাইরে দেশি ভোক্তার বাজার ​
গ। মৌসুমে ​বি​দেশি ভোক্তার বাজার ​ ​
ঘ। মৌসুমে​র বাইরে ​ ​বি​দেশি ভোক্তার বাজার ​ 
ঙ। এই পণ্য জাত প্রসেসড ফুডের বাজার দেশে (যেমন ফলের ক্ষেত্রে ড্রাই ফ্রুট,জুস, জুস তৈরির নেক্টার) 
​​চ। ​এই পণ্য জাত প্রসেসড ফুডের বাজার বিদেশে (খেয়াল করবেন- পেয়ারার জুস পৃথিবীর অন্যতম দামি, কিন্তু মৌসুমের শেষ দিকে গরুতে খায় আমাদের দেশে!)।

আফসোস হচ্ছে, আমাদের কৃষকের বাজার "ক" তেই সীমাবদ্ধ। হ্যাঁ মজুদকারীরা বিষ মিশিয়ে "খ" বাজার তৈরির চেষ্টায় আছেন, সেই সাথে পুরো খাদ্য চক্র বিষাক্ত হয়ে উঠেছে, ঘরে ঘরে আজ মানুষ স্বাস্থ্য ঝুকির মধ্যে। অথচ কৃষি প্রধান দেশে সরকারের আন্তরিকতা থাকলে মৌসুমে​র​ বাইরে দেশি ভোক্তার বাজার​ ফুড গ্রেড প্রসেসের মধ্যে থেকেই বের করা যায়। মোট কথা আমাদের কৃষি উৎপাদন বেশি মাত্রায় অনিয়ন্ত্রিত এবং আন এক্সপ্লোরড।

এই ছয় রকমের বাজারের বাইরেও এই সময়ে অরগ্যানিক কৃষি পণ্যের জন্যও এই ৬ টি প্যারালাল বাজার সৃষ্টি করা সম্ভভ। একজন কৃষককে মোট ১২ রকমের বাজারে তাঁর উৎপাদিত পণ্য বাজারজাত করণের সুযোগ করে দিলে বাংলাদেশের কৃষি এবং খাদ্য নিরাপত্তায় এক অভাবনীয় মাত্রা যোগ হবে। বাংলাদেশ পৃথিবীর ৪র্থ বৃহত্তম কৃষি উৎপাদনকারী দেশ, কৃষিতে আমাদের অর্জন অবশ্যই অসামান্য। উৎপাদনের এই অর্জনকে খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরনে সঞ্চারিত করা গেলে সেটা হবে একটা টেকসই উন্নয়ন।

​১১​। এখন প্রায় সব বীজই জিএমও, এগুলা থেকে উৎপাদিত ফলনের বীজ থেকে চারা হয় কিন্তু ফল হয় না। ফলে প্রতি বছর চারা কেনার বোঝা, আর এগুলা যেহেতু পতঙ্গ প্রতিরোধী নয় তাই এদের সার বীজ কীটনাশক স্প্রে বেশি লাগে। এগুলা সব মিলে কৃষকের​ উৎপাদন খরচ বাড়ছেই, সেই সাথে​ বছর বছর ঋনের দায় বাড়ছেই। কোন বিরল ফলনের জাত চাষ করা চাষি তার ফলন থেকে ডিস্কন্টিনিঊ হয়ে জান, ফলে ধান বা সবজির বিশেষ জাত ২-৩ বছর চাষাবাদ না হবার কারনে বিলুপ্ত হয়ে যায়। পরে চাইলে তা আর পাওয়া যায় না। ফলে দিন দিন দেশীয় জাত বিলুপ্ত হয়ে বিদেশি কোম্পানির উপর জি এম ও চারা নির্ভরতা আসছে যা রোগ বালাই এবং পতঙ্গ প্রতিরোধী নয়। আপনাকে তাদের সার, এন্টি ফাঙ্গাস, এন্টি ব্যাক্টেরিয়াল কীটনাশক স্প্রে কিনতে হবে। যেহেতু এগুলো ব্যবহার করে উপকারী পোকাগুলোর প্রজাতি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, তাই ক্ষতিকারক পোকাগুলো আরো বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠছে। মানে হোল আপনাকে বছর বছর আরো শক্তিশালী ঔষধ (সার, এন্টি ফাঙ্গাস, এন্টি ব্যাক্টেরিয়াল কীটনাশক স্প্রে ইত্যাদি) কিনতে হবে। এভাবেই আপনি সার বীজ কীটনাশক ছত্রাকনাশক সব কিছুর জন্য কোম্পানি নির্ভর হয়ে উঠবেন। এটা সরকার এবং প্রশাসনের লোকদের আমরা বুঝাতে পারছিনা। আফসুস। উনাদের বুঝে আসে না, কেন কৃষকের উৎপাদন ব্যয় দিন দিন বাড়ছে।

বিদেশী বীজ ও চারার অনিয়ন্ত্রিত আমদানীর ফলে স্থানীয় চারা উৎপাদন ও সঠিক সময়ে চারা প্রাপ্তির বিষয় সুরক্ষিত নয়। অন্যদিকে যেহেতু বিদেশী চারা ও বীজ আমদানি একটি নিবিড় উৎপাদন মান ও রোগ প্রতিরোধী নিয়ন্ত্রণের ভিতর দিয়ে যায় না তাই এই বীজ ও চারায় ফলনও সুরক্ষিত নয়। প্রায়ই দেখা যায় গাছ দ্রুত বাড়ে কিন্তু এগুলোতে ফলন হয়না। অর্থাৎ এতে খরচ চাপ বাড়ে উৎপাদন মূল্যে।

১২। বাংলাদেশের ​প্রত্যন্ত জনপদে পণ্য পরিবহণ এবং নাগরিক ট্রাস্পোর্টেশন সেবা পৌঁছে দেয়াই হবার কথা ছিল- বিআরটিসি'র আর রেলের কাজ। কিন্তু তা না করে বিআরটিসি ওয়েল স্ট্যাব্লিশড রুট গুলোতে এসি বাস সার্ভিস নিয়ে ব্যস্ত আছে, অধিক ব্যয় দেখিয়ে প্রফিট হাতিয়ে নেয়ার মচ্ছব ​বানাচ্ছে একের পর এক​। আর রেল! কি আর বলবো- ইঞ্জিন না কিনে কোচ কিনা নিয়েই ব্যস্ত আছে​! ফলে​ সাধারণ ট্রাক - নসিমন-করিমন-টেম্পু আর পাম্প চালিত যান সহ স্থানীয় উদ্ভাবন গুলোই হয়ে উঠেছে গ্রামীণ মানুষের​ জন এবং পণ্যের​ পরিবহণ।​ অতি অবাক করা বিষয় কৃষি উৎপাদনের জন্য বাংলাদেশে আজো কোন পরবহন ব্যবস্থা দাঁড়া করায়নি "বি আর টি সি" এবং বাংলাদেশ রেলওয়ে। আজো উত্তর বঙ্গ, দক্ষিণ বঙ্গের পণ্য শহরে আনার জন্য কোন বিশেষায়িত বাস ট্রেন নেই, ক্লাসিফাইড এবং লেয়ারড রেল কোচ নেই, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কোচ নেই, বি আর টি সি এবং রেলের! অথচ মাস এগ্রি এবং ফিশারিজ প্রডাক্ট কিছু নির্দিস্ট বেল্ট থেকেই আসে। চাঁদাবাজি, বখরা, কমিশন মুক্ত রেল এবং বি আর টি সির ক্ল্যাসিফাইড কৃষি পণ্য পরিবহণ ব্যবস্থা তৈরি করা গেলে বাংলাদেশের কৃষিকে এবং কৃষি পণ্যের ট্রান্সপোর্টেশন এবং বাজারজাতকরনের ব্যবস্থাপনা গুলোকে এক অভাবনীয় উচ্চতায় আনা যাবে।

১৩। মহাসড়কের পাশে, ফেরি ঘাটে, জ্যামে মাইলের পর মাইল দাঁড়িয়ে থাকে নন প্রায়োরিটি কৃষি পণ্য বাহী ট্রাক। সকাল ৬ টার মধ্যে ঢাকায় প্রবেশের বাধ্যবাধকতায় পড়ে, ৬-১০ টা ঢাকা বাইপাসের সুযোগ না থাকায় আটকে থাকে হাজার হাজার ট্রাক, এসব পণ্য মূল্য বাড়াচ্ছে, শ্রম ঘন্টা নষ্ট হচ্ছে! এইসব পরোক্ষ বিষয় নিয়ে ভাবাই সময়ের দাবি। ​

​​কিন্তু শহরে বসে আমরা নাগরিকরা দামই চাই শুধু! যদিও বহুবিধ প্রত্যক্ষ পরোক্ষ কারণে কৃষক সর্বসান্ত এবং কৃষি তাঁর কাছে মোটেই নিরাপদ অ আনন্দঘন পেশা নয়। হাঁ কিছু দালাল মধ্যস্বত্য ভোগ করে বড় লোক হচ্ছেন। এগুলার জন্য লীডারশীপ এবং কৃষি প্রসাশ​নের স্ট্রাকচারাল খামখেয়ালীপনা​ দায়ী। কিভাবে উপরে ব্যাখ্যা করেছি, এখানে​ শুধু একটা বিশেষ আইন করলেই বা নির্দেশ দিলেই হবে না। 

একটা সমন্বিত কৃষি উৎপাদন​, প্রক্রিয়া জাতকরন, ফলন সমন্বয়, গবেষণা, স্টোরেজ​, পরিবহণ এবং বিপনন ব্যবস্থা​র ফ্রেইমোয়ার্ক ​দাঁড়া করাতে হবে যাতে মধ্যস্বত্য দালালের অংশগ্রহণ​ সিস্টেমেটিকেলি কমে আসে, যাতে ডিরেক্ট চ্যানেলে সরাসরি কৃষক তার পণ্য শহরের বাজারে আনতে পারবেন (ফার্মারস মারকেট) কিংবা ​সু​পার চেইন গু​লো​ ডাইভার্স কৃষক সোর্স থেকে পণ্য কিন​তে বাধ্য থকবেন​, যাতে কৃষক দেশী বিদেশী ক্লাসিফাইড বাজার এক্সপ্লোর করতে পারেন। সেই সাথে​ রাসায়নিক​ সার​,​​ জৈব সার, কীট নাশক, জৈব বালাই নাশক,​ বীজের বন্দোবস্ত করতে হবে,​ মোট কথা​ চাহিদার আলোকে উৎপাদনকে উৎসাহিত করতে ​প্রয়োজনীয় প্রণোদনা দেয়া হবে​।​ রাসায়নিক সারে উৎপাদিত বাজারের বাইরে প্যারালাল অরগ্যানিক কৃষি পণ্যের বাজার তৈরিও সময়ের দাবি। ​

দাম কমানোই যেন অগ্রসর নাগরিকের একমাত্র কাম্য না হয়। বাংলাদেশের কৃষি উৎপাদনে এখনও কৃষক ও তার পরিবারের লোকজনের ব্যয়িত শ্রম ঘণ্টার হিসেব কাউন্টেড হয় না। পিছনের ব্যাপার গুলো নাগরিকদের বুঝতে হবে, নাগরিক সচেতনতা তৈরি করে সরকারের উপর চা​প​ দিতে হবে। আমাদের সরকারগুলো​ জ্ঞানহীন দুর্নীতি প্রবণ হীনমান্য লোকে গড়া, এই ব্যাকডেটেড লোক গুলার দেশকে সার্ভিস দেবার ক্যাপাবিলিটি সীমাবদ্ধ। তবে তারা যে​ সত্যিকারের দুরদর্শী সমাধান ভিত্তিক কাজ​ করছে না এটা তাদের চোখে আঙুল দিয়ে না দেখাতে পারলে তারা কিছু​ই​ করবে না।​ ​​তাই কৃষি এবং খাদ্য পণ্যের দাম বাড়ার দায় কৃষককে না দিয়ে প্রশাসন এবং সরকারকে মৌলিক ইনফাস্ট্রাকচারের অনুপুস্থিতির জানান দিক অগ্রসর নাগরিক! 

কৃষি ব্যবস্থাপনার সেন্স আসুক নাগরিকের মাঝে, 
কৃষি প্রশাসনের ব্যবস্থাপনা সেন্স উন্নত হোক, 
​কৃষি উৎপাদন প্রক্রিয়াজাতকরণ পরিবহণ এবং বিপননের মান্সম্পন্ন জ্ঞান ছড়িয়ে যাক।

লেখক : সিনিয়র সফটওয়্যার সলিউশন আর্কিটেক্ট, ভোডাফোন নেদারল্যান্ডস।

বিজ্ঞাপন

সংশ্লিষ্ট বিষয়

ঐক্যফ্রন্ট ইশতেহার

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.1628 seconds.