• ১৩ নভেম্বর ২০১৮ ২০:১২:৩৭
  • ১৩ নভেম্বর ২০১৮ ২২:০৮:৫৯
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

বন্দিত্বের একশো দিন!

ছবি : সংগৃহীত


আবদুল্লাহ মাহফুজ অভি :


শহীদুল আলম। সময় যত গড়াচ্ছে এই নামটি ততোই যেন উন্মোচিত হচ্ছে মানুষের কাছে। আরো বেশি জানছে মানুষ একজন শহীদুল আলমকে। সাধারন নাগরিকদের কাছে তিনি যতটা অচেনা ছিলেন এখন যেন ততটাই চেনা। তরুণদের বুকে পিঠে তার ছবি, ঢাকার দেয়ালে তার ছবি, খবরের কাগজে তার ছবি, কখনো বা কোনো বিমানের পেছনে ঘুড়ির লেজের মতো উড়ছে ব্যানার- ‘ফ্রি শহীদুল’। শহীদুলকে মুক্তি দাও...। 

শহীদুল আলমের মুক্তির দাবি ঢাকার শাহবাগ থেকে পৌঁছে যায় নিউইউর্কের উৎসব মুখর হল রুমেও। যেখানে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রতিভাবান আলোকচিত্রীরা ছুটে আসেন পুরস্কার নিতে, সেখানেও শহীদুল। নাহ তিনি স্ব-শরীরে হাজির হতে পারেননি সেই ‘লুসি অ্যাওয়ার্ড’ অনুষ্ঠানে। বিশেষ সন্মাননা জানিয়ে তাকে দেয়া 'হিউম্যানিটারিয়ান অ্যাওয়ার্ড’ টি তিনি নিজে গ্রহণ করতে না পারলেও তার পক্ষে মঞ্চে হাজির হন বরেণ্য বুদ্ধিজীবী গায়ত্রী স্পিভাক। ধীর পায়ে মঞ্চে উঠে যান। শহীদুল আলমের পক্ষে পুরস্কার নিয়ে বলেন- ‘আমরা শহীদুলের মুক্তি চাই’।

লেখক-বুদ্ধিজীবী গায়ত্রী যখন আন্তর্জাতিক মঞ্চে শহীদুল আলমের মুক্তি চাইছেন তখনই হয়তো ঢাকার কোনো দেয়ালে কোনো তরুণ রং তুলিতে এঁকে গেছেন ‘ফ্রি শহীদুল’। এখনো সামাজিক কিংবা নাগরিক আন্দোলনে চেনা চোখ গুলো শহীদুল আলমকে খুঁজে বেড়ায়। কিন্তু শহীদুল আলম নেই সেখানে, তিনি কারাগারে বন্দি। তিনি কারাগারে থাকলেও বন্দি শহীদুল আলমের খবর ছড়িয়ে পরে সবখানে। ক্যামেরা হাতে শহীদুল আলমকে রাজপথে দেখা না গেলেও তার একটা উপস্থিতি থেকে যায় কোথায় যেন। এই উপস্থিতি কখনো কারো প্লাকার্ডে কিংবা কখনো কারো ক্যামেরার ক্লিকে।

তথ্য প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারায় গ্রেপ্তারের পর কেটে গেলো বন্দিত্বের ১০০ দিন। জামিন হয়নি তার, মুক্তি পায়নি শহীদুল আলম। কিন্তু তার মুক্তির দাবির সাথে সাথে তিনি যেন আরো বেশি প্রকাশিত হয়ে উঠেছেন সবখানে। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমের বরাতে আমরা জানতে পারি পশ্চাত্যের বিলাসী জীবন ছেড়ে শহীদুল আলম ফিরে এসেছিলেন বাংলাদেশে কঠিন জীবন বেছে নিয়ে। চাকচিক্যময় ফটোগ্রাফির ভুবন রেখে শহীদুল আলম ক্যামেরা তাক করেন সংগ্রামী মুখের দিকে। এ সবই ছিলো আমাদের অজানা। আমরা জানলাম ইউনিভার্সিটি অব লন্ডন থেকে অর্গানিক কেমিস্ট্রিতে পিএইচডি করা শহীদুল বিচিত্র পেশা আর জীবনের সাথে যুক্ত থেকেছেন মানুষকে কাছ থেকে দেখবেন বলে।

আলোকচিত্রী তরুণদের কথা ভেবে গড়ে তোলেন পাঠশালা। শেখান-শিখেন। আমরা জানতে পারি এই শহীদুল আলম ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের ছবি নিয়ে দেশে প্রথমবারের মতো ছবি প্রদর্শনীর আয়োজন করেছিলেন। আলোকচিত্র জগতে এমন নানা ধরনের বৈপ্লবিক উদ্যোগ নিয়ে ছিলেন শহীদুল আলম। যার পথ ধরে ডালপালা শাখা প্রশাখা ছড়িয়ে গেছে নানা প্রান্তে। কিন্তু শহীদুল আলম থেকে গিয়েছিলেন আমাদের দৃষ্টির আড়ালেই। কিন্তু এখন সেই শহীদুল আলমকে আমরা আরো বেশি জানি।

শহীদুল আলম সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রমের সমালোচনা করে কথা বলতেন। আন্দোলন সংগ্রামের ছবি তুলতেন। সেই সব কথা ছবি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও ছড়িয়ে পড়তো কখনো কখনো। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম শহীদুল আলমের বক্তব্যকে গুরুত্বের সাথে নেয়া হতো। আর এই কারণেই কি শহীদুল আলম বন্দি?  এই আক্রোশ কত দূর পৌঁছাবে আমরা জানিনা। আমরা দেখি আদালতে শহীদুল আলমের জামিনের আবেদন করেন আইনজীবী। আবেদন নামঞ্জুর হয়। কখনো আদালত বিব্রত বোধ করেন। শহীদুল আলম থেকে যায় কারাগারের ভেতর। তার হাতে ক্যামেরা নেই। তবে চোখ দিয়ে শহীদুল আলম হয়তো বন্দীত্বের বিভিন্ন দৃশ্যকে ফ্রেম বন্দি করছেন।

শিল্পী অমল আকাশ তার একটি লেখায় জানিয়েছেন শহীদুল আলমের স্ত্রী নৃবিজ্ঞানী রেহনুমা আহমেদ প্রতিদিন কারাগারে যান। শহীদুল আলমের সাথে দেখা করেন। কেরানীগঞ্জে অবস্থিত কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে ফিরে আসেন হাতে একটি সংখ্যা লিখে। সেই সংখ্যাটি হলো শহীদুল আলমের বন্দিদিনের সংখ্যা।  এককেটি দিন যায় আর সংখ্যা বদল হয়। আজ তার হাতে লিখা ‘১০০’। কারাগারে বন্দিত্বের শততম দিন...। 

শুনেছি কারাগারে শহীদুল আলমকে বন্দিরা বেশ শ্রদ্ধা করে মর্যাদা করে। শিক্ষক শহীদুল শিল্পী শহীদুলকে হয়তো রাষ্ট্র যথাযোগ্য মর্যাদা না দিতে পারলেও কারাগারে বন্দিরা তাকে সন্মান করেন। শহীদুল আলমের কাছ থেকে কেউ কি নিতে পেরেছে দু একটি ফটোগ্রাফি টিপস? তাদের খুব কাছেই যে রয়েছে আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন আলোকচিত্রী।

শহীদুল আলম মুক্তি পাক। ফিরে এসে কুয়াশার ভোরে শিউলি ফোটা সকালকে তুলে ধরুক তার যাদুকরি ছবির ফ্রেমে। আমরা অপেক্ষায় আছি...। আমরা অপেক্ষায় থাকবো। মুক্তির অপেক্ষা।

লেখক : সাংবাদিক ও নির্মাতা।

বিজ্ঞাপন

সংশ্লিষ্ট বিষয়

শহীদুল আলম আলোকচিত্রী

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.1634 seconds.