• ১৩ নভেম্বর ২০১৮ ১৭:২১:২৮
  • ১৩ নভেম্বর ২০১৮ ২০:২৮:১০
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

হিরো আলম ও আমাদের শ্রেণি বিদ্বেষী মন

ছবি : সংগৃহীত


আফরোজা সোমা :


আমাদের চিন্তাভাবনা কি এখনো তীব্রমাত্রায় ক্লাস নির্ভর বা শ্রেণি সচেতন?

কথাটা মনে এলো হিরো আলমের নির্বাচনী মনোনয়ন ফরম তোলার পর 'সুশীল-শিক্ষিত' ও অপেক্ষাকৃত অার্থিকভাবে সচ্ছল নাগরিকদের ফেসবুক প্রতিক্রিয়া দেখে।

পাশাপাশি, মেইনস্ট্রিম মিডিয়াতেও সোমবার তাকে দেখা গেলো।

একটি টেলিভিশনের সংবাদ-বিশ্লেষণী এক অনুষ্ঠানের শ্রদ্ধেয় একজন অতিথি হিরো আলমকে জিজ্ঞেস করলেন, ''আপনি তো এমনিতেই অনেক বিখ্যাত, আবার রাজনীতিতে আসা কোন উদ্দেশ্যে? কী করতে চান রাজনীতিতে?"

আপাতঅর্থে প্রশ্নটা নিরীহই বটে। কিন্তু, 'অনেক বিখ্যাত' শব্দটাতে আমার কান আটকে গেছে। তাছাড়া এই শব্দ-দ্বয় ডেলিভারি দেবার সময় বক্তার স্বরটাও লক্ষনীয়।

বাংলাদেশে শ্রেণি ভেদে হিরো আলমের গ্রহণ যোগ্যতা, তাকে নিয়ে ফেসবুকীয় সুশীলীয় ট্রল ইত্যাদি বিষয়ে যারা অবগত আছেন তারা এই প্রশ্নটির ডেলিভারি শুনতে-শুনতেই অনুভব করবেন যে, প্রশ্নটিও আসলে একধরনের বুলিং-এরই নামান্তর।

হিরো আলমকে এনে সাক্ষাতকারের নামে যেভাবে বিনোদন করা হয়েছে বা সার্কাস হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে সেভাবে কি অন্যান্য তারকা যেমন সঙ্গীতশিল্পী কনকচাপা ও বেবী নাজনীন, চিত্রনায়ক সোহেল রানা, অভিনেতা ডিপজল, নায়িকা কবরী ও ময়ূরী ও অন্যান্যদের এনেও করা হয়েছে বা হবে?

কিংবা আমাদের কোটি মানুষের প্রাণপ্রিয় মাশরাফিকে কি এই প্রশ্নটা করা হয়েছে এভাবে গলা টানতে-টানতে যে, ''আপনি তো এমনিতেই অনেক বিখ্যাত, আবার রাজনীতিতে আসা কোন উদ্দেশ্যে? কী করতে চান রাজনীতিতে?"

হিরো আলমের এমপি হবার যোগ্যতা নাও থাকতে পারে। তাকে মনোনয়ন দেয়া নাও হতে পারে। বা মনোনয়ন দেয়া হলেও সে ভোটে ফেল করতে পারে। সেটা তার গণতান্ত্রিক অধিকার।

কিন্তু হিরো আলম 'আনস্মার্ট', 'অশিক্ষিত', 'গরীব' 'ফকিন্নির পুত' 'মুর্খ' (এই কথাগুলো আমি ফেসবুকে এই দুই দিনে হিরো আলমকে নিয়ে লোকের কমেন্টে পড়েছি) তাই সে নির্বাচনের মনোনয়ন ফরম কিনতে পারবে না বলেই সাব্যস্ত করেছে আমাদের সুশীল মন।

কিন্তু এই সুশীলরাই আবার দেখি সাবোলটার্নদের পক্ষে নানাখানে কথা বলেন। তারাই আবার শ্রেণি-বর্ণ ও জাত্যাভিমানের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন।

আমরা নিম্নবর্গের সংস্কৃতি নিয়ে গালভরা কথা বলি। কিন্তু একজন প্রকৃত নিম্নবর্গের মানুষ যখন নির্বাচনে দাঁড়ানোর জন্য মনোনয়ন ফরম কিনেছেন মাত্র সেটিই 'সুশীল-শিক্ষিত' সমাজ মেনে নিতে পারছে না।

তাকে নিয়ে আমরা বুলিং করতে ছাড়ছি না। তাকে নিয়ে 'মজা' নিতে ছাড়ছি না। তাকে পরোক্ষে 'র‌্যাগ' দিতে ছাড়ছি না।

হিরো আলমের পক্ষে বা বিপক্ষে আমি নই। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের সাথে লক্ষ্য করছি যে, আমাদের সুশীল মন কতটা বর্ণবাদী সেটিই ঠেলে বের হয়ে আসছে হিরো আলমের ঘটনাটি দিয়ে।

আপনি ফেয়ার এন্ড লাভলীর বিজ্ঞাপনের বিরোধীতা করেন। কারণ এটি সমাজে বর্ণবাদ ছড়ায় বলে আপনি মনে করেন।

আফ্রিকান বংশোদ্ভুত কাউকে তার গায়ের বর্ণের কারণে কৃষ্ণাঙ্গ বলা হলে সেটি আপনার সুশীল মনে কষ্ট দেয়। সেটিকে আপনার সুশীল মন বর্ণবাদ বলে চিহ্নিত করতে পারে।

আপনি এশিয়ান বলে, আপনার চামড়া বাদামী বলে সাদা চামড়ার দেশে কোনো বিমানবন্দরে আপনাকে যখন অন্যের চেয়ে বেশি সময় ধরে চেক করার নামে ভোগান্তি দেয়, আপনার পাসপোর্টটা যখন অহেতুক হাতে নিয়ে উল্টেপাল্টে নেড়ে-চেড়ে দেখে, আপনার নামের আগে মোহাম্মদ লেখা দেখে যখন আপনাকে অতিরিক্ত আরো কিছু প্রশ্ন করে ‘হিউমিলিয়েট’ বা ‘অপদস্ত’ করে তখন আপনি যৌক্তিকভাবেই বিরক্ত হন।

কিন্ত হিরো আলম 'শুদ্ধ ভাষায় ঠিক মতন মনোনয়ন শব্দটা উচ্চারণ করতে পারে না' বলে, সে দেখতে 'আনস্মার্ট' বলে 'অশিক্ষিত' বলে তাকে যখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ট্রল করেন, তাকে যখন খারিজ করে দেন তখন কি সেটি বর্ণবাদী আচরণ নয়, মহামান্য?

ঠিক এই মানসিকতা থেকেই তৈরি হয়েছিল আর্য আর অনার্যের মিথ। এইজন্যই আমাদের মিথের অসুরেরা দেখতে হিরো আলমের মত কালো, খাটো, বিদঘুটে। হয়তো অসুর মানেই হিরো আলমের মতন দাঁত উঁচা।

হে হিরো আলমকে-নিয়ে-ট্রল-করা-সমাজ, আপনার মুখে কি নিম্নবর্গের সংস্কৃতির জয়গান তথা সাবোলটার্ন সোসাইটির কালচারাল ফাইট বা এই ভূখন্ডের মিথের সেলিব্রেটি অসুর রাবণের পক্ষে গান গাওয়াটা মানায়?

একটু ভেবে দেখবেন।

আমিও প্রকৃতই হিরো আলমের সমাজের একজন। নগরের সুশীল দেবতা আর অশিক্ষিত-গরীব-আনস্মার্ট গেঁয়ো অসুরের এই দ্বিধা বিভক্ত সমাজে আমি আসলে অসুরগোত্রভুক্ত।

আমি কৃষক ও গরিব সমাজের মানুষ। আমার পাড়ার খেলার সাথীরা বড় হয়ে কেউ গার্মেন্টেসে কাজ করতে গেছে, কেউ ওয়ার্কশপ দিয়েছে, কারো কৈশোরে বিয়ে হয়ে গেছে, কেউ রোগে ভুগে মরে গেছে। অপেক্ষাকৃত অবস্থাপন্নরা অর্থনৈতিকভাবে ভালো আছে। তবে, আমার পাড়ায় খেলার সাথীদের বেশির ভাগই 'মান বাংলায়' কথা বলে না। আমার বংশেও এলিট বা অভিজাত কেউ নাই। আমি খেটে-খাওয়া পরিবারের মানুষ। আমার আত্মীয়-স্বজনেরাও সব গরীব। হয়তো অন্যের কাছে হাত-পেতে খায় না। কিন্তু তারা গরীব। তারা সুশীলীয় ‘হাই ক্লাস কালচার’ বোঝে না। তারা সুশীলীয় হাই-আর্ট-কালচারের সাথে নিজেদের রিলেট করতে পারে না। তারা সুশীলদের সাথে ‘এলিয়েনেটেড’ বা বিচ্ছিন্ন বোধ করে। অবশ্য আপনারাও যে তাদের সাথে একাত্মবোধ করেন না তার প্রমাণ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অগুনিত স্ট্যাটাস ও কমেন্ট।

আর আমার উপর রাগ নিয়েন না। পারলে ক্ষমা করে দিয়েন। আর ক্ষমা করতে না পারলে মুখের উপর সত্য কথা বলার ধৃষ্টতা দেখানোর অপরাধে আমাকে নিয়েও ইচ্ছা হলে ট্রল করতে পারেন। আমিও দেখতে খাটো আর কৃশকায়। আমার মুখের থুৎনির দিকটাও দেখতে বানরের সাথে অনেকটা মিল আছে। আমিও হিরো আলমের মতন নিম্নবর্গের বিধায় আমারো কোনো প্রতিরোধ নাই।

নিম্নবর্গের প্রতিরোধ থাকে না বলেই তারা নিম্নবর্গ থেকে যায়। উচ্চবর্গেরা সব অর্জুনের মতন রাজরক্ত বহন করে। আর হিরো আলমরা সব একলব্য। তাদেরকে আপনাদের সাথে এক পংক্তিতে বসতে না দেয়াই শ্রেয়।

লেখক : কবি ও শিক্ষক

বিজ্ঞাপন

সংশ্লিষ্ট বিষয়

হিরো আলম নির্বাচন

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.1640 seconds.