• ১১ নভেম্বর ২০১৮ ১৬:১১:৪৯
  • ১১ নভেম্বর ২০১৮ ১৭:১০:০৬
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

অতঃপর আন্দোলনে আমরা কী পেলাম?

ছবি : সংগৃহীত

এ বছর আমরা এক অভূতপূর্ব আন্দোলন দেখলাম। ছোট ছোট ছেলে-মেয়েদের হাত ধরে যে আন্দোলন ঢাকায় শুরু হয়েছিলো সেটাই এক সময় সারাদেশে ছড়িয়ে পড়লো রমিজউদ্দীন ক্যান্টনম্যান্ট স্কুলের দুজন ছাত্র-ছাত্রী জাবালে নুর নামক বাসের ধাক্কায় নিহত হওয়ার পরদিন থেকে।

তারপর অপ্রত্যাশিতভাবে সারাদেশের স্কুল, কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলে-মেয়েরা রাস্তায় নেমে এলো ঐ দুজন ছাত্র-ছাত্রী হত্যার বিচার এবং নিরাপদ সড়কের দাবিতে।

সপ্তাহ কালব্যাপী এ আন্দোলন চলেছিলো। ছেলে-মেয়েদের দাবির মুখে গাড়ির ফিটনেস, ড্রাইভিং লাইসেন্স এর ব্যাপারে কড়াকড়ি শুরু হলো। মোটরসাইকেল আরোহী এবং যাত্রীরা হেলমেট পরা শুরু করলো। সড়ক পরিবহন আইন সংসদে পাশ হলো। যদিও শ্রমিক সংগঠনগুলো তাতে নাখোশ। তারা এর প্রতিবাদে দুদিন ধর্মঘট পালন করেছে। আবার এ হুমকিও দিয়ে রেখেছে যে এ মাসের শেষে আবার ধর্মঘটে যেতে পারে।

ট্রাফিক পুলিশ এ আন্দোলনের পর থেকে রাস্তায় এখন অনেক সক্রিয়। তারা তাদের চলমান উন্নতির যে জায়গাগুলো সেটা ধরে রাখার চেষ্টা করে যাচ্ছে। রাজধানীতে কিছু কিছু জায়গায় “স্টপেজ শুরু” এবং “স্টপেজ শেষ” বলে সাইনবোর্ড টাঙিয়ে বাস স্টপেজ নির্ধারন করে দিয়েছে। তারপরও সড়কে বিশৃঙ্খলা কি বন্ধ হয়েছে? অথবা অবস্থার উন্নতি বা প্রাপ্তি কি উত্তোঙ্গ আন্দোলনের মতো আশানুরূপ হয়েছে?

এর উত্তর খুঁজতে গিয়ে আপনাদের মতোই আমাকেও কিছুটা আশাহতই হতে হলো। আমি নিয়মিত বাসে যাতায়াত করি। ফলে সড়কে পরিবর্তন কতটা হলো- সেটা নিজ চোখেই দেখতে পাই। ছেলে-মেয়েদের এ আন্দোলনের অন্যতম লক্ষ্য ছিলো জনসচেতনতা সৃষ্টি- সেটা যাত্রী এবং পরিবহন শ্রমিক সবার মধ্যেই সৃষ্টি করা। কিন্তু দুঃখের ব্যাপার হচ্ছে যে আমরা যাত্রী এবং শ্রমিক- কেউই সচেতন হইনি। এখনও যত্রতত্র গাড়ি দাঁড়িয়ে যাত্রী উঠানামা চলছেই। “স্টপেজ শুরু” এবং “স্টপেজ শেষ” বলে টাঙানো সাইনবোর্ড এখন কাজির গুরুর মতো কেতাবেই টিকে আছে। চালকেরা সেখানে থামছে না। আবার যাত্রীরাও নিয়মনীতি না মেনে ইচ্ছেমতো রাস্তা পার হচ্ছে আগের মতোই। মোটরসাইকেল আরোহীরা এখনও ফুটপথে মোটরসাইকেল চালিয়ে দিয়ে বিকট শব্দে হর্ণ বাজিয়ে চলছে। হাবভাব যেন ফুটপাথে মোটরসাইকেলই তো চলবে!

তার মানে হচ্ছে, এই যে আমরা ছেলে-মেয়েদের আন্দোলনের সময়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একের পর এক স্ট্যাটাস দিলাম সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার দাবিতে, আন্দোলন চলাকালীন ছেলে-মেয়েদের সাথে গলা মিলিয়ে স্লোগান দিলাম তারাই আবার কিভাবে আন্দোলন পরবর্তী সময়ে নিয়ম মানার কথা ভুলে গেলাম? তার মানে কি এটাই দাঁড়ালো, আমাদের স্রোতে গা ভাসিয়ে চলার যে প্রবণতা, নিয়ম না মানার যে উদগ্র বাসনা সেটাকে প্রয়োজনের খাতিরে একটু দুরে সরিয়ে রাখাটাকেই নীতিবাগিতার দারুণ পরাকাষ্ঠা হিসেবে সময়ে সময়ে হাজির করতে আমরা তৎপর থাকি? এই যদি হয় আমাদের মনের অবস্থা তাহলে শুধু আইন দিয়ে কি অবস্থার উন্নতি হবে? মনে হয় হবে না।

প্রশ্ন হচ্ছে, তাহলে করণীয় কী? আমার মনে হয় করণীয় আমাদের দুটো। (এক) সচেতনতা তৈরি (দুই) আইনের কঠোর প্রয়োগ। আইন মানতে বাধ্য করা। এই যে আমরা দেশের বাইরে গেলে ঠিকই নিয়ম মেনে রাস্তা পার হই, ট্রাফিক আইন পুরোপুরিই মেনে চলি। আবার দেশে এলেই সেই আমরাই আবার আইন ভাঙতে পারলেই যেন গৌরব বোধ করি। এই মানসিকতার পরিবর্তন দরকার। আর এজন্য সচেতনতার পাশাপাশি আইনের কঠোর প্রয়োগ করতে হবে। আইন প্রয়োগ না হলে তা যত ভালো আইন-ই হোক না কেন  বাস্তবে কোনো কাজেই আসবে না।

আমাদের দেশে ভালো ভালো আইন আছে কিন্তু তার কঠোর প্রয়োগ না হওয়ার ফলে জনগন নিজ দায়িত্বে তা পালন করার তাগিদ অনুভব করে না। এ কারণেই আইনের কঠোর প্রয়োগ হতে হবে। আইনের কঠোর প্রয়োগ না হলে জনগণ তা মানতে প্রয়োজন বা তাগিদ বোধ করে না-এটা এক চরম সত্যবচন। আর আইন প্রতিপালন যখন মানুষের অভ্যাসে পরিণত হবে তখন পরিবর্তন আপনা আপনিই আসবে। সে পরিবর্তন স্বাভাবিকভাবেই দ্রুততর এবং দৃশ্যমানও হবে। 

সামনে জাতীয় নির্বাচন। আমরা চাই রাজনৈতিক দলগুলো তাদের মেনিফেস্টোতে সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে প্রতিশ্রুতি দিক। নির্বাচন পরবর্তী সময়ে তা ধরে ধরে বাস্তবায়নেও যেন মনোযোগী হয় সে ব্যাপারেও সময় নির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি চাই। অর্থাৎ মেনিফেস্টো যেন শুধু কিছু ভাল ভাল কথার ফুলঝুরি না হয়ে থাকে। সেই সাথে আসুন নাগরিক হিসেবে আমরা নিজেরা আগে সচেতন হই, নিয়ম মানি এবং তা পালনে অন্যকেও উৎসাহিত করি। তাহলেই এই বাংলাদেশ সোনার বাংলাদেশে সহজেই রূপান্তরিত হতে পারবে।

লেখক : চিকিৎসক ও শিক্ষক। সহযোগী অধ্যাপক, ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগ, এনাম মেডিকেল কলেজ।

বিজ্ঞাপন

সংশ্লিষ্ট বিষয়

নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলন

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.1633 seconds.