• ০১ নভেম্বর ২০১৮ ১৩:৪৬:৫৬
  • ০১ নভেম্বর ২০১৮ ১৩:৪৬:৫৬
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

শয়তান সবসময়ই শয়তান

কর্মক্ষেত্রে নারীর বিরুদ্ধে যৌন হেনস্থা নিয়ে হলিউডে শুরু হওয়া #MeToo আন্দোলনে বলিউড এখন উত্তপ্ত। শুরুতে কোনো নারীর এর বিরুদ্ধে সরব হওয়া কঠিনই ছিলো। তবে এটা অন্দোলনে রূপ নিতে থাকে যখন এলিসো মিলানো নামক একজন আমেরিকান নারী অভিনেত্রী প্রভাবশালী ফিল্ম প্রযোজক হার্ভি ওয়েনস্টেইন এর বিরুদ্ধে ২০১৭ সালের অক্টোবরে প্রথম যখন যৌন নিপীড়নের অভিযোগ তোলেন তখন থেকেই। উক্ত অভিনেত্রী যখন #MeToo লিখে টুইটারে হার্ভি ওয়েনস্টেইন এর বিরুদ্ধে প্রথম মুখ খুলতে শুরু করার পরেই সে মাসেই আরো প্রায় ৮০ জন নারীও একই অভিযোগ তোলেন এ প্রযোজকের বিরুদ্ধে। এভাবেই #MeToo একটা আন্দোলন হিসেবে ধীরে ধীরে জনপ্রিয়তা পেতে শুরু করে।

পরে এ ঢেউ ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে। ব্রিটেনে রাজনীতিবিদদের বিরুদ্ধে একের পর এক অভিযোগ আসতে থাকে। তার জের ধরে প্রতিরক্ষামন্ত্রী মাইকেল ফেলন, কেবিনেট মন্ত্রী ডেমিয়েন গ্রীন পদত্যাগে বাধ্য হন।সম্প্রতি মুম্বাই ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে #MeToo এর ধাক্কা লেগেছে বেশ ভালোভাবেই। ‘আশিক বানায়া’ মুভির নায়িকা তনুশ্রী দত্ত এখানে প্রথ প্রদর্শক। তিনি অভিনেতা নানা পাটেকরের বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ তোলার পর থেকে একের পর এক অভিযোগ উঠতে শুরু করেছে প্রযোজক এবং পরিচালক সুভাষ ঘাই, সাংবাদিক এম জে আকবর, সুরকার অনু মালিক, অভিনেতা রজত কাপুর, কৈলাশ খের, অলোক নাথসহ অনেকের বিরুদ্ধে। এর পক্ষে সরব হয়েছেন জুহি চাওলা, ক্যাটরিনা কাইফ। তারা #MeToo আন্দোলনকে সমর্থন করেছেন।সামনের দিনগুলোতে আরো অনেকেই হয়তো সমর্থন জানাবেন এবং সরব হবেন। 

এই যে #MeToo এর কারণে ‘হার্ভি ওয়েনস্টেইন ইফেক্ট’ শুরু হয়েছে অবশেষে সেটার ঢেউ আমাদের দেশেও এসে লেগেছে। যদিও আমাদের সামাজিক বাস্তবতার নিরিখে যেখানে অভিযোগকারী নারীকেই চরিত্রহীন, লম্পট এসব বলা হয় সেখানে সত্যি সত্যি আমি ভাবিনি যে আমাদের দেশের কোনো নারী কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানির শিকার হলেও তা নিয়ে মুখ খুলবেন! অবশ্য নারীরা কর্মক্ষেত্রে যে নানা রকম যৌন হয়রানির শিকার হন সেটা আমাদের কারো অজানা নয়। তবে একটা ঢাক ঢাক গুড় গুড় ভাব নিয়ে সবাই চলে। জানি, দেখি কিন্তু ভাবটা এমন যেন কই আমি তো কিছু জানি না বা জানতাম না!

#MeToo আন্দোলনের কারণেই আজ হয়তো অভিনেত্রী বাঁধন মুখ খুলতে সাহস দেখিয়েছেন। তার এরকম সাহসী উচ্চারণের জন্য অবশ্যই তিনি ধন্যবাদ পাবার যোগ্য। যদিও বাঁধন তার সাক্ষাৎকারে কারো নাম বলেননি। তবে, যা বলেছেন তাতেই অনেকের হয়তো শরীরে চিকন ঘাম দিতে শুরু করেছে। কারণ তিনি বলেছেন, সময় হলে ঠিকই বলব। সেই সাথে তিনি বলেছেন আপত্তিকর প্রস্তাব দেয়ায় অনেক কাজই তিনি এর আগে ছেড়ে দিয়েছেন। উনার সাক্ষাৎকারের যে মন্তব্যটি আমার সবচেয়ে ভালো লেগেছে সেটা হচ্ছে, ‘ভালো মানুষ হঠাৎ করে শয়তান হয়েছে, এমনটা দেখা যায় না। আমরা মনে হয়, যারা শয়তান তারা সব সময়ই শয়তান, প্রমানিত শয়তান’। তার এ মন্তব্য আমার কাছে বাঁধিয়ে রাখার মতো মনে হয়েছে। মনে হয়েছে যেন হাজার কথার এক কথা।

যদিও অনেকেই হয়তো অভিনেত্রী বাঁধনকেই ধুয়ে ফেলবেন বা ফেলছেন এমন অভিযোগ করার জন্য। কিন্তু তাতে কী যায় আসে! উনি একটা চরম এবং নির্মম সত্যকেই তুলে ধরেছেন মাত্র। সেটা যদি আপনি মানতে না চান তাহলে সেটা আপনার মন ও মননের ব্যাপার। আপনার রুচির ব্যাপার। দুঃখ একটাই- আপনিও শয়তানের পক্ষই নিলেন!

তবে, মিস আয়ারল্যান্ড প্রিয়তি কিন্তু ঠিকই সাহস করে এতদিন পরে হলেও একজন প্রভাবশালী ব্যক্তির নাম সবার কাছে উন্মোচন করে দিয়েছেন। ২০১৫ সালে রংধনু গ্রুপের একটি পণ্যের বিজ্ঞাপনচিত্রে শুটিং করতে এসে রংধনু গ্রুপের কার্যালয়ে গেলে তাকে সেখানে ‘ধর্ষণের চেষ্টা’ করেন উক্ত গ্রুপের চেয়ারম্যান রফিকুল। যদিও রফিকুল স্বাভাবিক নিয়মেই তা অস্বীকার করেছেন।

তবে সেই সাথে প্রিয়তি একটা মোক্ষম জবাবও দিয়ে রেখেছেন যারা এমন গুরুতর অভিযোগ করার পরেও অভিযোগকারীর বিপক্ষে নানা কথা বলতে থাকেন তাদেরকে উদ্দেশ্য করে। তিনি বলেছেন, ‘আমার চরিত্র নিয়ে গবেষণা হবে, পোস্টমর্টেম হবে। বলবে ভাইরাল হওয়ার জন্য করেছি। তাহলে বলবটা কখন? ভাইরাল হওয়ার জন্য ব্লেম নিতে হয়? তাহলে মেয়েরা বলবেটা কখন?’

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, শুধু কি ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি এবং মিডিয়া জগতেই নারীরা এই শয়তানদের দ্বারা যৌন নিপীড়নের শিকার হচ্ছেন? শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, রাজনীতি- কোথায় নেই নারীদেরকে যৌন হয়রানির খবর? ঘরের ভেতরেও যে নারীরা যৌন নিপীড়নের শিকার হচ্ছে- সেটাও তো আমাদের অজানা নয়। একদম ছোট মেয়ে শিশু থেকে তরুণী, বয়স্কা- কে নেই এই তালিকায়? শুনলে অবাক হবেন, অধিকাংশ নারীই কিন্তু তার পরিচিত লোকদের দ্বারাই নানারকম আপত্তিকর অঙ্গভঙ্গি থেকে শুরু করে যৌন নিপীড়নের শিকার হন ঘরের মধ্যেই।

অনেক নারী আবার তার পরিবারের লোকজনের কাছে এমন আপত্তিকর ব্যক্তি সম্বন্ধে নালিশ করলেও পরিবারের লোকজনদের দ্বারাই উল্টো তিরষ্কারের শিকার হন। ফলে এসব শয়তানের মুখ তাই ভালো মানুষের মুখোশের আড়ালে ঢাকা পড়ে থাকে সবসময়। দেখা যায় এসব লোকই হয়তো নারী নিপীড়নের পক্ষে ইনিয়ে বিনিয়ে নারীর পোশাক থেকে শুরু করে নানা বিষয় তুলে ধরছে- ঐ নারী নিপীড়িত হওয়ার কারণ হিসেবে। ঠিক জানি না– ঘরে এবং কর্মক্ষেত্রে এরাই কী তবে নারীকে ভোগ্যপণ্য হিসেবে দেখতে মানসিকভাবে অভ্যস্থ!

বাঁধন বা প্রয়তিই শুধু একা নন। এরকম অনেক বাঁধন বা প্রিয়তিই ঘরে এবং ঘরের বাইরে যৌন নিপীড়নের শিকার হচ্ছেন। আগেই বলেছি- সামাজিক বাস্তবতায় আমাদের দেশের অধিকাংশ নারীই তা প্রকাশ করতে সাহসী হন না। তবে নারীরা যদি এক এক করে- ঘরে এবং ঘরের বাইরে, চলাচলের পথে বা কর্মক্ষেত্রে সত্যি সত্যি পুরুষ নামক ভদ্রবেশী শয়তান দ্বারা এবং পুরুষতন্ত্র নামক মানসিকতা দ্বারা কিভাবে যৌন নিপীড়নের শিকার হচ্ছেন সেগুলো বলা শুরু করেন তাহলে হয়তো বিদ্যমান বাস্তবতা অনেকটাই পরিবর্তিত হয়ে যাবে।#MeToo আন্দোলন যদি নারীদেরকে সত্যিকার অর্থেই সাহসী করে তোলে তাহলেই এ আন্দোলন স্বার্থক হয়ে উঠবে।

আর আমরা যারা পুরুষ তাদের অন্তত এতটুকু দায় নিলেও বোধ হয় চলে- সেটা হচ্ছে যে যৌন নিপীড়নের শিকার কোনো নারীর পাশে গিয়ে না দাঁড়ালেও আর যাই হোক নিপীড়নকারীর পক্ষে দাঁড়িয়ে ইনিয়ে বিনিয়ে একথা সেকথা বলে যেন পুরুষতন্ত্র নামক মানসিকতার উদগ্র প্রকাশ না ঘটাই।

মনে রাখতে হবে মৌনতাও অনেক সময় দারুণ কাজ করে। অন্ততপক্ষে সেটা হলেও আমাদের দেশের নারীরা ঘরে এবং ঘরের বাইরে একটা ভালো পরিবেশ যে পাবেন- সেটা খোলা চোখে যেমন বলতে পারা সম্ভব, তেমনিভাবে চোখ বুঁজেও বলা, বলতে পারা কঠিন কোনো বিষয় হবে কি?

লেখক : চিকিৎসক ও শিক্ষক। সহযোগী অধ্যাপক, ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগ, এনাম মেডিকেল কলেজ।

বিজ্ঞাপন

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.1639 seconds.