• ২৮ অক্টোবর ২০১৮ ১৬:১৬:০৫
  • ২৮ অক্টোবর ২০১৮ ১৬:১৬:০৫
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

এক ‘ফল চোরের’ গল্প!

ছবি : সংগৃহীত

সাম্প্রতিক বাংলাদেশে ব্যাংকের ভল্ট থেকে সোনা চুরি, হাজার কোটি টাকা চুরি, জনগণের অর্থ সম্পদ চুরি করে সম্পদের পাহাড় গড়া গল্পকে পেছনে ফেলে একটি চুরির গল্প বেশ আলোচিত। তা হলো ‘ফল চুরি মাছ চুরি...’। ফল ও মাছ চুরির অভিযোগ এসেছে যার বিরুদ্ধে তার নাম ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী। কাজী মহিবুর রব নামে এক ব্যবসায়ী গত বুধবার এই চিকিৎসক, সংগঠক, রাজনীতিকের উপর এই অভিযোগ আনেন। শুধু তাই নয়, ফল-মাছ চুরির সাথে চাঁদাবাজির অভিযোগও এনেছেন। যাই হোক আমরা সেই ‘মাছ ও ফল ‍চুরি’র অভিযোগে অভিযুক্ত এই ব্যক্তির সম্পর্কে একটু জেনে নিতে পারি পেছনে তাকিয়ে।

১৯৭১ সালে শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। যুদ্ধে যোগ দিচ্ছে এই দেশের কৃষক, শ্রমিক ছাত্র শিক্ষক নানা শ্রেণি পেশার মানুষ। তখন ইংল্যান্ডে এফ.আর.সি.এস. পড়ছিলো জাফরুল্লাহ নামের এক তরুণ চিকিৎসক। ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাশ করে উচ্চতর ডিগ্রি নিতে তিনি ইংল্যান্ডে তখন। যারা চিকিৎসা বিজ্ঞান নিয়ে পড়াশুনা করছেন তারা নিজেদের জীবন দিয়েই উপলব্ধি করে থাকেন বিশেষজ্ঞ ডিগ্রি নিতে গিয়ে কি পরিমান ভয়াবহ খাটুনি খাটতে হয়। চার বছর পড়াশুনা করে যখন চূড়ান্ত পরীক্ষা শুরু হবে, এতোদিনের কষ্টের ফলাফল যখন হাতের কাছে ঠিক তখনই শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। পরীক্ষার পাঠ বন্ধ করে পাঠ শুরু করলেন অন্য জীবনের গল্প। যে জীবন একটি ভূখন্ডের মানুষের অস্তিত্ব রক্ষার পাঠে নিয়োজিত হয়। ব্রিটেনে বসবাসরত এক হাজারেরও বেশি বাংলাদেশি চিকিৎসক নিয়ে ডা. এ এইচ সায়েদুর রহমানকে সভাপতি এবং ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীকে সাধারণ সম্পাদক করে বাংলাদেশ মেডিকেল এ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ) করা হয়। ওই সংগঠনের পক্ষ থেকে এরপর ডা. এম এ মবিন ও ডা. জাফরুল্লাহকে দায়িত্ব দিয়ে পাঠানো হয় মুক্তিযুদ্ধে চিকিৎসা সহায়তা দেয়ার জন্য মেডিক্যাল টিম গঠন করতে।

শহীদ জননী জাহানারা ইমামের ‘৭১রের দিনগুলি’ বইয়ে সেই ঘটনার কিছুটা বর্ণনা আছে। ১৬১ পৃষ্ঠায় উল্লেখিত ঘটনাটির কিছু অংশ তুলে ধরা হলো- ‘ ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, ডা. এম এ মোবিন। এরা দুজনে ইংল্যান্ডে এফ.আর.সি.এস. পড়ছিলো। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাস করে বিলেতে চার বছর হাড় ভাঙা খাটুনির পর যখন এফআরসিএস পরীক্ষা মাত্র এক সপ্তাহ পরে, তখনই বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়। ছেলে দুটি পরীক্ষা বাদ দিয়ে বাংলাদেশ আন্দোলনে অংশ নিলো, পাকিস্তানি নাগরিকত্ব বর্জন করলো, ভারতীয় ট্রাভেল পারমিট যোগার করে দিল্লীর প্লেনে চড়ে বসলো, উদ্দেশ্য ওখান থেকে কলকাতা হয়ে রণাঙ্গনে যাওয়া। প্লেনটা ছিলো সিরিয়া এয়ারলাইন্সের। দামাস্কাসে পাঁচ ঘণ্টা লেট। সব যাত্রী নেমেছে ওরা দুজন আর প্লেন থেকে নামে না। ভাগ্যিস নামেনি। এয়ার পোর্টে এক পাকিস্তানি কর্ণেল উপস্থিত ছিলো ওই দুজন পলাতক পাকিস্তানি নাগরিককে গ্রেপ্তার করার জন্য। প্লেনের মধ্যে কাউকে গ্রেপ্তার করা যায় না। কারণ প্লেন ইন্টারন্যাশনাল জোন। দামাস্কাসে সিরিয়ান এয়ারপোর্ট কর্মকর্তা ওদের দুজনকে জানিয়েছিলো ওদের জন্যই প্লেন পাঁচ ঘণ্টা লেট। এমনি করে ওরা বিপদের মধ্য দিয়ে মে মাসের শেষাশেষি সেক্টর টু রণাঙ্গনে হাজির হয়েছে।’

ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী ও  ডা. এম এ মোবিন অস্থায়ী (মুজিবনগর) বাংলাদেশ সরকারের সহায়তায় ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যে মেলাঘরে ৪৮০ শয্যাবিশিষ্ট বাংলাদেশ ফিল্ড হাসপাতাল স্থাপন করে। সেনাবাহিনীর ডাক্তার (এমএস) সিতারা বেগম এই হাসপাতালের কমান্ডিং অফিসার ছিলেন।

দেশ স্বাধীন হলে ১৯৭২ সালে এই হাসপাতাল ঢাকার ইস্কাটনে স্থানান্তরিত হয় এবং ওই বছরই এপ্রিল মাসে তৃণমূল পর্যায়ে দরিদ্র মানুষের ভেতর স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে গণ স্বাস্থ্যসেবা নাম নিয়ে সাভারে স্থানান্তরিত করা হয়। বৈষম্যহীন সমাজ ব্যবস্থা ভেঙ্গে যে গণ মানুষের মুক্তির স্বপ্ন নিয়ে দেশ স্বাধীন হয়েছিলো সেই স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করার একটি লক্ষ্য নিয়েই প্রতিষ্ঠিত হয় এই গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র। পরবর্তীতে গণমুখি স্বাস্থ্য সেবা, স্বাস্থ্যখাতে বৈষম্য দূরসহ এই গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র থেকেই শুরু হয় নানা মুখি সেবামূলক কর্মকাণ্ড। এই গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতার নামই ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী।

যে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের জন্ম হয়েছিলো ৭১’রের রণাঙ্গনের ময়দানে সেই প্রতিষ্ঠানটির উপর আমরা হামলা হতে দেখলাম। বিভিন্ন গণমাধ্যমের দেয়া তথ্য অনুযায়ী গত ২৬ অক্টোবর গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রে হামলা চালিয়েছে প্রায় ২ শতাধিক অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী। গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্র পিএইচএ ভবনে হামলা চালিয়ে ব্যাপক ভাঙচুর ও লুটপাট করা হয়েছে। কেন্দ্রের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বাসভবন, ছাত্রী হোস্টেল ও গণস্বাস্থ্য ফার্মাসিউটিক্যালসেও হামলা চালানো হয়। এই হামলার ১ দিন আগে এই গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতার বিরুদ্ধে আমরা ফল চুরি মাছ চুরির অভিযোগে মামলা হতে দেখলাম। তার পরপরই হামলা ভাংচুরের খবর হলো।

এই হলো মাছ ও ফল চুরির অভিযোগে অভিযুক্ত ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী। যেখানে চিকিৎসা সেবা এখন উচ্চ মূল্যের বাণিজ্য, অসুখ যেখানে ব্যবসার পণ্যের মতো ব্যবহার হচ্ছে, সেখানে অসুখের বিরুদ্ধেই যুদ্ধের ডাক দিয়েছিলেন তিনি। চিকিৎসা সেবার চেয়ে স্বাস্থ্য সেবার প্রতি বেশি মনযোগি হয়েই গড়ে তুলেছিলেন গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র।

সেই জাফরুল্লাহ চৌধুরী এখন রাজনৈতিক প্রতিহিংসা আরেকটি উদাহরণ হয়তো হয়ে থাকবেন। ইতিহাসে যুক্ত হবে আরো একটি গল্প, যে গল্পে লেখা থাকবে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম চিকিৎসক সংগঠকের বিরুদ্ধে শেষ বয়সে ফল চুরি মাছ চুরির মামলা হয়েছিলো। কেন হয়েছিলো, কি কারণে হয়েছিলো সেটাও হয়তো ইতিহাস বিশ্লেষন করবে। তখন হয়তো ইতিহাসের কাঠগড়ায় অনেককেই দাঁড়াতে হবে। সেই ইতিহাস জেনে প্রজন্মের পর প্রজন্ম সেখানে রায় দিয়ে যাবে। সেই রায় কেমন হবে অনুমান করে নিন দূরদৃষ্টি সম্পন্নরা।

লেখক : সাংবাদিক ও নির্মাতা

বিজ্ঞাপন

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.1640 seconds.