• ২৭ অক্টোবর ২০১৮ ১৭:৪৯:৫৬
  • ২৭ অক্টোবর ২০১৮ ১৮:৫৭:১১
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

ঠিক কত বছর একটা সেতুতে টোল আদায় করা যায়, কী হারে?

ঢাকার পোস্তগোলায় প্রথম বুড়িগঙ্গা সেতুকে টোলমুক্ত ঘোষণার দাবিতে বিক্ষোভের সময় শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষে এক শ্রমিক নিহত হয়েছেন। ছবি : সংগৃহীত


ফাইজ তাইয়েব আহমেদ :


বাংলাদেশ-চীন মৈত্রীর প্যাকেজে এরশাদ সরকার ৭২৫ মিটার দৈর্ঘের পোস্তগোলা বুড়িগঙ্গা সেতু তৈরি করে ১৯৮৯ সালে তা যানচলাচলের জন্য উন্মুক্ত করে। তখন থেকে এই সেতুতে টোল আদায় হচ্ছে। এখন কথা হচ্ছে, চীন থেকে সরকার কত ঋণ নিয়েছিল? কত সুদে? কয় বছর মেয়াদী? এবং বছরে কত প্রিমিয়াম দিতে হয়? সাধরনভাবে আমরা জানি, এই ধরনের ঋণপত্র ১০ থেকে ২০ বছর মেয়াদী হয়। ধরলাম ২০ বছর মেয়াদেই নিয়েছে।

ঋণের সুদ-আসল দেওয়ার কয়েকটি প্রতিষ্ঠিত নিয়ম আছে। এর একটা হলো- এনুইটি পেমেন্ট, যেখানে প্রথম থেকে ২০ বছরের শেষ পর্যন্ত পুরা সময় একই রেটে প্রিমিয়াম দেওয়া হবে। এই ক্ষেত্রে এই প্রকল্পের ঋণের সুদ -আসলের প্রিমিয়ামের ভিত্তিতে ধার্য করা প্রাথমিক টোলের ওপর বাৎসরিক মূল্যস্ফীতি হারে প্রতি বছর টোল যদি বাড়ে তাইলে অর্থনীতির দৃষ্টিকোণ থেকে আপত্তির কিছু নেই।

আরেকটা পেমেন্ট মেথড হলো- লিনিয়ার, যেখানে প্রথম দিকে প্রিমিয়াম বেশি দেওয়া হয় যা সময়ের সাথে সাথে লিনিয়ারলি কমে আসে। এই পেমেন্ট পদ্ধতিতে ঋণের সুদ -আসলের প্রিমিয়ামের ভিত্তিতে ধার্য করা প্রাথমিক টোলের ওপর বাৎসরিক মূল্যস্ফীতি হার যোগ করাও অযৌক্তিক, কেননা এই স্কীম মতেই প্রিমিয়াম অটোমেটিক বছর বছর কমে আসবে যা মূল্যস্ফীতির সাথে কাটাকাটি হবে। হ্যাঁ, আপনি দাবি করতে পারেন হয় না, কিছু বাকি থাকে, তাইলে শুধু সেই ডেল্টা অংশ আপনি টোল বাড়াতে পারেন যা বাৎসরিক মূল্যস্ফীতি থেকে অনেক অনেক কম হবে।

আজকে শ্রমিকরা বলছেন, বুড়িগঙ্গা সেতুতে আগে ট্রাকের টোল ছিল ৩০ টাকা যা গত ২২ অক্টোবর অবিশ্বাস্যভাবে বাড়িয়ে করা হয় ২৪০ টাকা (৮ গুণ, ৭০০% শুধু বৃদ্ধি হয়েছে)। কথা হচ্ছে, মূল্যস্ফীতি হচ্ছে ~৫% অথচ আপনি টোল বাড়াচ্ছেন ৭০০%। এটা কিভাবে করলেন??

২.
নাগরিককে গুলি করার অধিকার কে দিয়েছে পুলিশকে? 
সে তো টোল দিতে অস্বীকার করেনি, অযৌক্তিক টোল বৃদ্ধির প্রতিবাদ করেছে শুধু।

অযৌক্তিক কিছু দাবি করলেও একটি দেশের পুলিশ ও সেনা তার নিজের নাগরিককে গুলি করে মারা অধিকার রাখে না।

৩.
আমি মোটামূটি নিশ্চিত যে বুড়িগঙ্গা সেতুতে যে ঋণ নেয়া হয়েছে তা ২৯ বছর ব্যাপী ছিল না, সম্ভবত ২০ বছর ব্যাপীই ছিল। (কেউ পারলে আমাকে একুরেইট তথ্য দিয়ে সাহায্য করবেন প্লিজ, এই দেশে এক্সেস টু প্রাইমারি ইনফরমেশন সীমিত)। সেক্ষেত্রে আপনি কোন হিসেবে ২৯ বছর পরে এসে এই সেতুতে টোল নিচ্ছেন, তাও আবার কোন অধিকারে ৭০০% একধাপেই বৃদ্ধি করছেন???

অন্য সব সেতু মেঘনা, গোমাতী, ব্রহ্মপুত্রের উপর পাটগুদাম ইত্যাদি সেসব ২৫ বছরের পুরানো (২০০ মিটারের বেশি) সব সেতুতেই একই জালিয়াতি হচ্ছে।

বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী, বাংলাদেশ-জাপান মৈত্রীর প্যাকেজে সহজ শর্তে ঋণ আনার কথা বলে নির্মিত হলেও সেতু থেকে অন্যায্য টোল আদায় করে একটা মহাজনী সিস্টেম চালু রাখা হয়েছে। বিদেশি রাষ্ট্রের সাথে মৈত্রীর সেতুতে হলেও সেই মৈত্রীতে জনতার হিস্যা কম।

৪.
পনি বলতে পারেন, আমি তো সেতু মেরামত ও মেইন্টেনেন্সে খরচ করছি। ভেরি ক্লিয়ার করে বলতে চাই, সেজন্য আপনি যানবাহন প্রতি ফিবছর রুট পারমিট নিচ্ছেন, হ্যাঁ সেটা অতি উচ্চ হারে। পারলে খরচ এবং রুট পারমিট থেকে প্রাপ্ত আয়ের ব্যালান্স সীট দেখান।

যদি ব্যালান্স সীট নেগেটিভ হয়, সেক্ষেত্রে কিছু টোল আদায় করা যাবে, তবে অতি অবশ্যই সেটা ঋণের প্রিমিয়ামের হারে নয়। অর্থাৎ ২০ বছর পরে এমনিতেই টোল আদায়ের রেট ঠাস করে কমে যাবার কথা।

ফেয়ার ইকোনোমিক প্লে না করে আপনি সেতুর টোলকে নিয়েছেন রাজস্ব তোলার প্রকল্প হিসেবে? এই ধান্ধাবাজির অবসান চাই। খাত ভিত্তিক সেবার বিপরীতে রাজস্ব তুলতে হবে। এই দাবিতে সোচ্চার হতে হবে জনগণকে, এই কারিগরি অর্থনীতির ব্যাপার গুলো জনগণের জানার সীমানায় আনতে হবে, নাইলে অর্থনৈতিক মুক্তি দাবির ভিত্তি গুলো তৈরি হবে না।

৫.
বেশুমার খরচ বাড়িয়ে চুরি ও লূটের যোগ রমরমা করতে দরকার বিশাল বড় বাজেট। বিশাল বড় বাজেটে দরকার বিশাল বড় রাজস্ব। বেশি বেশি রাজস্ব আনতে সরকারের মাথা খারাপ। তাই রাজস্ব উঠানোর খাতগুলোতে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে। এরকম একটা সাধারণ খাত 'টোল আদায়'। ২০১৫ জানুরারিতে নতুন টোল নীতির নাম করে সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তরের ৫১টি সেতু টোল অস্বাভাবিক ভাবে বৃদ্ধি করা হয়েছে এবং নতুন ৩টি সড়ক ও ৪৫টি ফেরিতে ট্রাক চলাচলে মাসুল আরোপ শুরু করেছিল। গাড়ির শ্রেণী বাড়িয়ে ১৩টি কর হয়েছে। চলাচলের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি টোল বাড়ানো হয়েছে ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যানে। সেতুভেদে টোলের হার বাড়বে সর্বোচ্চ ৭০০ শতাংশ পর্যন্ত ছিল। পর্যায়ক্রমে এই টোল নীতি বাস্তবায়ন শুরু হলে পরিবহণ সংশ্লিষ্টরা বিচ্ছিন্নভাবে প্রতিবাদ করেও থামাতে সক্ষম হননি।

লেখক : সিনিয়র সফটওয়্যার সলিউশন আর্কিটেক্ট, ভোডাফোন নেদারল্যান্ডস।

বিজ্ঞাপন

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.1626 seconds.