• ২৭ অক্টোবর ২০১৮ ১৭:১০:০৩
  • ২৭ অক্টোবর ২০১৮ ২১:২৮:৫৩
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

নির্বাচনী ডামাডোল এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা

দেশে জাতীয় নির্বাচন আসন্ন। এই নির্বাচনের দিকে সবাই তাকিয়ে আছে। কারণ এটা সরকার পরিবর্তনের নির্বাচন। ফলে এ নির্বাচনের গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি। নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণ তার পছন্দমতো সরকারের পক্ষে ভোটপ্রদান করে তার প্রতিনিধি নির্বাচনের সুযোগ লাভ করে থাকে। ফলে জনগণের একটা স্বতস্ফুর্ত অংশগ্রহণ থাকে নির্বাচনী প্রক্রিয়ায়। আর এভাবেই গণতান্ত্রিক ধারার অগ্রযাত্রা অব্যাহত থাকে।

তবে, আমাদের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশে নানা ধরনের খেলোয়াড় নির্বাচনের আগে নানা রকমের এজেন্ডা নিয়ে রাস্তায় সরব হওয়ার চেষ্টা করে। কারণ ঐ যে আগেই বলেছি, যে কোনভাবে সরকারে আসতে পারলে নানা ধরনের সুযোগ সুবিধা লাভের একটা ক্ষেত্র তৈরি হয়। ফলে নির্বাচনকেন্দ্রিক এক ধরনের অস্থিরতা তৈরি করার চেষ্টা চলে—দেশ এবং দেশের বাইরে থেকেও।

আমেরিকার নির্বাচনে ট্রাম্পের বিজয়ের পেছনে রাশিয়ার হাত আছে- এ অভিযোগ নির্বাচনের পর থেকে এখনও শনৈ শনৈ উঠছে। ফেসবুকেও নাকি কয়েক লক্ষ মিথ্যা প্রচারণা চলেছে ট্রাম্পের পক্ষে। ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নামক অতীতের গৌরবগাঁথার আড়ালে আসলে চলেছে ব্যাপকতর সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে (কালো এবং ইমিগ্রেন্ট) বিদ্বেষের উগ্র জাতীয়তাবাদী ধারা। সেই শ্লোগান গিলেছে সে দেশের তরুণ প্রজন্ম। ভাবখানা এমন ছিলো যেন ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ হতে হলে ট্রাম্পকেই লাগবে। না হলে আমেরিকা পপাত ধরনীতল হবে। বিশ্ব মনে হয় উচ্ছন্নে যাবে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে হিটলারও এমন সাম্প্রদায়িক, উগ্র জাতীয়তাবাদ ছড়িয়েই যুদ্ধের ক্ষেত্র প্রস্তুত করেছিলো। তার ফলে ৫০-৬০ লাখ ইহুদি মারা পড়ে হিটলার বাহিনীর হাতে। আমাদের পাশের দেশ ভারতেও  এখন উগ্র জাতীয়তাবাদ মাথা চাড়া দিয়ে উঠছে। আর এর ফলে শঙ্কায় পড়ছে সে দেশের ভাষা বা ধর্মভিত্তিক সংখ্যালঘুরা। মিয়ানমারে এ উগ্র জাতীয়তাবাদের কারণে রোহিঙ্গারা উদ্বাস্তু হয়েছে।

আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়ে পাকিস্তানিরা নির্বিচারে বাঙালিদের নিধন করেছে। কিন্তু তাদের সব চেয়ে বেশি রাগ ছিলো সংখ্যালঘু সম্প্রদায় অর্থাৎ হিন্দুদের উপরে। পশ্চিম পাকিস্তানে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন ধারনা দেয়া হয়েছিলো যে এ যুদ্ধের জন্য পূর্ব পাকিস্তানের হিন্দুরা এবং তাদের সহযোগী ভারত দায়ী। মুক্তিযুদ্ধও যেহেতু আক্ষরিকভাবে ১৯৭০ এর নির্বাচনের পরে শুরু হয়েছিলো ফলে সংখ্যালঘু হিন্দুরা ব্যাপকভাবে বলির পাঠা হয়েছিলো-মারা পড়েছিলো আর না হয় উদ্বাস্তু হতে বাধ্য হয়েছিলো।

দেশ স্বাধীনের পরেও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের দেশত্যাগের মিছিল এখন শেষ হয়নি। বরং দিনকে দিন তাদের সংখ্যা কমছে। সাম্প্রদায়িক রাজনীতির শিকার হয়ে দেশত্যাগে বাধ্য হচ্ছে বিশেষ করে ২০০১ সালে নির্বাচনের পরে বিএনপি-জামাত জোটের ভয়াবহ তান্ডবের শিকার হওয়ার পর থেকে নির্বাচনকেন্দ্রিক এক ধরনের ভয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মনে জেঁকে বসেছে।

আবার ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের পরে যশোরের অভয়নগরের মালোপাড়ায় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের লোকজনের ভয়াবহ নির্মমতার শিকার হওয়ার কথা আমরা সবাই জানি। আওয়ামী লীগ থেকে নমিনেশান বঞ্চিত হওয়ার পরে দলের সিদ্ধান্ত অমান্য করেই নির্বাচন করেছিলেন একজন বিদ্রোহী প্রার্থী; যিনি আগেও এখান থেকে এমপি নির্বাচিত হয়েছিলেন। কিন্তু ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী বাবু রনজিত রায়ের কাছে পরাজিত হওয়ার পরে শোনা যায় ঐ বিদ্রোহী প্রার্থী তার এলাকা অভয়নগরে সংখ্যালঘুদেরকে নিপীড়নে পেছন থেকে কলকাঠি নেড়েছিলেন। আজ অবধি সেদিনের সে নিপীড়নকারীদের দৃষ্টান্তমূলক কোনো শান্তি সংখ্যালঘু সম্প্রদায় দেখতে পায়নি। তাহলে তাদের ভেতরে আসন্ন এ নির্বাচনের সময়ে কিভাবে আস্থা ফিরে আসবে? এবারও এ বিদ্রোহী প্রার্থী আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন চাইলে অবাক হওয়ার কিছুই থাকবে না! অথচ এ বিদ্রোহী প্রার্থীর মনোনয়ন ফর্মই আওয়ামী লীগ থেকে কিনতে পারার কথা না; যদি আওয়ামী লীগ সত্যিকার অর্থেই অসাম্প্রদায়িক রাজনীতিতে জোর বিশ্বাস স্থাপন করে থাকে।

অর্থাৎ নির্বাচনে হারা বা জিতার প্রশ্ন নেই; প্রশ্ন হচ্ছে যেভাবেই হোক পরাজয়ের ক্ষোভ বা জেতার আনন্দ উদযাপনে সংখ্যালঘুদেরকে বলির পাঠা বানাতে হবে। তাদের উপরেই সব ঝাল বা আনন্দ মেটাতে হবে। এই হচ্ছে, নির্বাচনকেন্দ্রিক আগে বা পরে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপরে নিপীড়নের এক সরলীকরন কাহিনী।
সম্প্র্রতি ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে বিএনপি, গণফোরাম, নাগরিক ঐক্য, জেএসডি মিলে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠিত হয়েছে। যদিও সেখানে জামাতের অবস্থান নিয়ে তাদের বক্তব্য একদম অপরিষ্কার। ফলে ড. কামাল হোসেন মুক্তিযুদ্ধের চেতনার আলোকে দেশ পরিচালনার যে কথা বলছেন তাতে আস্থা রাখা কঠিন বৈকি।

এদিকে তাদের প্রণীত ৭ দফার কোথাও দেখলাম না সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিষয়কে উল্লেখ করে সরকারের কাছে দাবি জানাতে। উক্ত ৭ দফা যদি শান্তিপূর্ণ নির্বানের জন্য তৈরি করা হয় তাহলে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বিষয়টা কি তাতে যুক্ত করা উচিত ছিলো না? অন্যদিকে আওয়ামী লীগের নেতৃত্ত্বে গঠিত জোট  তাদের নির্বাচনী ইশতেহার প্রকাশ করলে বোঝা যাবে সেখানে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের স্বার্থ কিভাবে রক্ষিত হওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়।

আমাদের দেশে নির্বাচন এখন সংখ্যালঘুদের জন্য জীবন মরনের ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। সামনে নির্বাচন— ডিসেম্বরেই হবে হয়তো। কিন্তু এখন থেকেই সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মনে অজানা এক ভীতির সৃষ্টি হতে চলেছে। এ ভীতি দূর করা তাই সকল রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজ, আইন শৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনী, নির্বাচন কমিশন- প্রত্যেকের দায় এবং দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। কারণ গণতান্ত্রিক সমাজে ধর্ম যেন কোনভাবেই বিভেদ এবং নিপীড়নের হাতিয়ার না হয়ে ওঠে—সেটা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। আসন্ন নির্বাচনের আগে ও পরে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সে নিরাপত্তা রাষ্ট্র নিশ্চিত করতে পারবে তো?

লেখক : চিকিৎসক ও শিক্ষক। সহযোগী অধ্যাপক, ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগ, এনাম মেডিকেল কলেজ।

বিজ্ঞাপন

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.1630 seconds.