• ২৩ অক্টোবর ২০১৮ ২১:২৭:৫৯
  • ২৩ অক্টোবর ২০১৮ ২১:২৭:৫৯
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

এই সময়ের বুকে ক্ষত জমে আছে

ফাইল ছবি

আবদুল্লাহ মাহফুজ অভি :

সোমবার দুপুরে একটি কাজ সেরে যখন ঢাকায় ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছি ঠিক তখনই সামনে পরলো ‘সমকাল’ পত্রিকাটি। খবরের কাগজ হাতে নেড়ে চেড়ে দেখাটা আমাদের নাগরিক অভ্যাস। ওই পত্রিকাটির লিড নিউজ ছিলো- ‘রাস্তার পাশে পড়ে আছে ৬ যুবকের লাশ’ (এর মাঝে নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে ৪টি লাশ, উত্তরার দিয়াবাড়ীতে ২টি লাশ)।

মনটাই খারাপ হয়ে গেলো। সেই সাথে অজানা এক ভয় ঘিরে ধরলো। এই ভয়ের উৎস্য কোথায়? জন্মদাতা কে? সেসব নিয়ে আর মাথা ঘামাতে ইচ্ছা করলো না। ভীতিকর এক বিষাদে আক্রান্ত হয়ে সংবাদটির অর্ধেক পড়ে রেখে দিলাম। বিষন্নতা নিয়ে ঢাকায় যখন রওনা দিলাম তখন মহা সড়কের দুই পাশে কাশফুল আর গোধূলী বিকালকে মনে হচ্ছিলো বিপন্ন পৃথিবীর শেষ দৃশ্য!

গাড়িতে বসে মোবাইলে ফেসবুক স্ক্রল করতে গিয়ে চোখে পড়লো বাংলাডট রির্পোটের শিরোনাম ‘নারায়নগঞ্জ সড়কের পাশে চার যুবকের লাশ’। এই ঘটনার উপরই ‘বাংলা ডট রির্পোট’এর আরেকটি শিরোনাম ছিলো- ‘নিহতদের ৩ জনকে ডিবি পরিচয়ে তুলে নেয়া হয়েছিলো’। পরিবারের সদস্যদের বরাত দিয়ে এই নিউজটি করা হয়েছে। তারা জানায়, পুলিশ ও ডিবি পরিচয়ে তাদের তুলে নেয়া হয়েছে। অন্যদিকে পুলিশ বলছে এমন কোনো ঘটনা ঘটেনি। এ অভিযোগ সত্য নয়।

প্রশ্ন হচ্ছে কেন ‍পুলিশের বিরুদ্ধেই এই অভিযোগ উঠবে? তাহলে কি পুলিশ জনগণের প্রতিপক্ষ যে- জনতা তাকে ফাঁসানোর জন্য মিথ্যা অভিযোগ দিবে? প্রশ্নের পর প্রশ্ন থেকেই যাবে। এমন অজস্র প্রশ্নের উত্তরহীন জীবন যাপন করছি আমরা।

এই ঘটনা ‘প্রথম আলো’ পত্রিকাতে ছাপা হয়েছে ‘রাতে ফাঁড়িতে, সকালে সড়কে লাশ’ শিরোনামে । খবরে বলা হয়, নারায়নগঞ্জের আড়াইহাজারে মহাসড়কের পাশে যে চারটি লাশ পড়ে থাকতে দেখা গেছে তার ভেতর একটি লাশ বাস চালক ফারুক হোসেনের। তার স্ত্রী তাসলিমা জানায় শুক্রবার বিকেলে পুলিশ পরিচয়ে তাকে হ্যান্ডকাফ পরিয়ে বাসা থেকে ধরে নিয়ে যায়। শনিবার রাতে সে ভুলতা পুলিশ ফাঁড়িতে গিয়ে স্বামীর সাথে দেখা করে এবং মাছ-ভাত দিয়ে আসে। রোববার সকালে ঢাকা সিলেট মহাসড়কের পাশে তার স্বামীর গুলিবিদ্ধ লাশ পড়ে থাকার খবর পায়। ফারুক হোসেনসহ ৪জনের লাশ পড়েছিলো রাস্তায়। লাশের পাশ থেকে অস্ত্র উদ্ধার করে পুলিশ। অন্যদিকে পুলিশের পক্ষ থেকে নিহতদের স্বজনদের দেয়া বক্তব্য অস্বীকার করা হয়েছে।

তাহলে তাসলিমা যে বললো ভুলতা পুলিশ ফাঁড়িতে গিয়ে কথা বলেছে, খাবার দিয়েছে? অথচ এমন ঘটনা অস্বীকার করেছে পুলিশ। তবেকি পুরো ঘটনা যাদুবস্তবতার কোনো গল্প। যে গল্প ম্যাজিক রিয়েলিজমের জনক মার্কেজকেও হার মানায়! অদ্ভুত এক ঘোর যেন বিরাজ করছে চারিদিকে। আমরা সবাই ঢেকে গেছি রহস্যময় কুহকে। কি ঘটছে কেন ঘটছে এর কোনো প্রকৃত উত্তর নেই যেন। স্বজনরা জানে পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে আর পুলিশ জানায় তারা নেয়নি। তাহলে কারা নেমে আসে এই রহস্যময় দেশে? গভীর রাতে কিংবা ভর দুপুরে কারা তুলে নিয়েছে? কারা সেই নাম পরিচয়হীন মানুষ যারা হঠাৎ আসে হঠাৎ চলে যায় লাশ ফেলে রেখে?

আর নিহতের স্বজনরা কেন বারবার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দিকে অভিযোগের আঙুল তোলে? সত্য এখানে কুহক। প্রকৃত ঘটনা আসলে কি তা এখন এক গোলক ধাঁধা আমাদের কাছে। সংবাদমাধ্যম মানেই আমাদের কাছে এখন রহস্য গল্পের সম্ভার।

ঘটনা যেটাই হোক বাস্তবতা হলো মৃত মানুষেরা ফিরে আসে না। রাস্তার পাশে পরে থাকা লাশগুলো কবরে যাবে। ঘরে আর যাবে না। অদ্ভুত এক রহস্যময়তা বিরাজ করে চারিদিকে। ভয় অস্পষ্টতায় জীবন যেন এক দুঃস্বপ্নের যাদুবাস্তবতা। যেখানে ঘটনা আছে দৃশ্য নাই! আছে শুধু যন্ত্রণার নীল ক্ষত...।

২.
সোমবার সকাল থেকে ফেসবুকে একটি ভিডিও ছড়িয়ে পরে। পুলিশের কোনো একটি চেকপোস্টে সিএনজিবাহী এক নারী যাত্রীর সাথে পুলিশের কথপোকথনের ভিডিও। কোনো স্পটে এটা ঠিক বোঝা না গেলেও ঢাকার ঘটনা সেটা বোঝা গেলো।

মধ্যরাতে ওই নারী যাত্রী সিএনজিতে যাচ্ছিলেন। পথে পুলিশ তাকে থামায়। ভিডিও শুরু হয় কথোপকথনের এক পর্যায়ে। ভিডিও দেখে বোঝা যায় আরো আগে থেকে বাকবিতণ্ডতা শুরু হয়েছে এই নারী যাত্রীর সাথে। যাত্রীর কথা থেকে মনে হয় তাকে উত্যক্ত করায় তিনি উত্তেজিত হয়ে প্রতিবাদ করেছে। তিনি উপস্থিত পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে উত্যক্ত করার অভিযোগ আনেন ভিডিওতে। অন্যদিকে পুলিশ সদস্যদের তাকে বলতে শোনা যায়, ‘বেয়াদপ’, ‘একটা ভদ্র ফ্যামিলির মেয়ে রাত আড়াইটা বাজে চলাচল করেনা’   ইত্যাদি। মেয়েটি লাইট সরাতে বললে উত্তর শোনা যায়- ‘না আমি আপনাকে দেখবো’। এমন অনেক অযাচিত কথপোকথন হয়। এক পর্যায়ে ‘এডিক্টেড’ বলা হয় মেয়েটিকে। যদও ভিডিওতে নেশা জাতিয় কিছু পাওয়া গেছে বা কোন টেস্ট করা হয়েছে কিনা তা দেখা যায়নি। অর্থ্যাত কোন ধরনের চেক ছাড়াই পুলিশ তাকে ‘এডিক্টেড’ বলেছে। পুরো ভিডিওটি অস্বস্তিকর ও ভীতিময়।

কেননা মধ্যরাতে একদল ক্ষমতাবান পুরুষ বনাম একটি নারীর বাকযুদ্ধ, অপমানকর কথাবার্তা নিশ্চই নাগরিক হিসেবে সন্মানজনক কিছু না। পুলিশ চেকপোস্টে বসাবে প্রয়োজনে নাগরিকদের তল্লাশি করবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সেখান থেকে অপ্রীতিকর ঘটনার জন্ম নিলে তাতো আরো বেশি ভয়ঙ্কর ও অমার্যাদার।

পুরো ভিডিও চিত্রটি দেখে বারবার মনে হয়েছে মেয়েটি কোনো আচরণে প্রচণ্ড পরিমাণ অপমানিত বোধ করেছেন। এক পর্যায়ে তিনিও পুলিশের সাথে পাল্টা অসৌজন্যমূলক কথা বলতে শুরু করেন। কিন্তু তার আগে ভাবতে হবে কোন পর্যায়ে গেলে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। ঘটনা ভিডিও করে ফেসবুকেও তারা ছেড়ে দিয়েছে এগুলো কতটুকু আইনসম্মত কাজ হয়েছে, কতটুকু দায়িত্বশীল আচরণ হয়েছে তা কী ভেবে দেখবেন কর্তৃপক্ষ?

মেয়েটির সাথে যে ‘অমর্যাদাকর’ ও ‘ইঙ্গিতপূর্ণ’ শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে এবং এর ভিডিও ছেড়ে দেয়া হয়েছে ফেসবুকে এতে কি তার জন্য সন্মানহানি ঘটেছে কিনা? তার আগে আমরা দেশের একটি আলোচিত ঘটনার কথা টেনে আনি। সাংবাদিক মাসুদা ভাট্টিকে টকশোতে ‘চরিত্রহীন’ বলেছিলেন ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন। এই ঘটনার জের ধরে এক রকম তোলপার হয়ে গেলো। নারী সাংবাদিকরা প্রতিবাদ জানালেন। সম্পাদকরা বিবৃতি দিলেন। হাজার কোটি টাকার মানহানি মামলা হলো। যদিও মইনুল হোসেন দুঃখ প্রকাশ করেছিলেন। ক্ষমাও চেয়েছিলেন। তারপরও শেষ রক্ষা হয়নি। গ্রেপ্তার হয়েছেন।

অথচ এখন পর্যন্ত আরো বেশি রকম হেনেস্তার শিকার হওয়া এই নারীটির জন্য নারীবাদী কোন সংগঠনের বিবৃতি আমার চোখে পরেনি। তারা এর প্রয়োজন মনে করেছেন কিনা তাও জানতে পারিনি। আমি তাদের কথাই বলছি যারা প্রভাবশালী মাসুদা ভাট্টির জন্য প্রতিবাদ জরুরি মনে করেন কিন্তু এই মেয়েটির ক্ষেত্রে তেমন কোনো কিছু অনুভব করেছেন কিনা তা জানান না বা আমরা এখনো জানতে পারিনা।

আমি জানিনা রাতে সিএনজিতে করে ফেরার পথে যে মেয়েটি হেনেস্তা হলো তাকে কি আদৌ ‘হেনেস্তা’ হিসেবে স্বীকার করবেন কিনা সেই সব এলিট নারীবাদীরা? যারা মুখ দেখে প্রতিবাদ করেন এবং মুখ দেখে মুখ বুঝে থাকেন?
 
সাধারনের এইসব মান অপমান নিয়ে আমরা এখন আর তা নিয়ে আলোচনার প্রয়োজন বোধ করি না। এ নিয়ে কথা বলাটাও হয়তো গুরুত্বহীন অনেকের কাছে। কারণ আমাদের নাগরিক মন জুড়ে অনেক বড় ক্ষত আছে। প্রতিনিয়ত আরো বড় বড় ক্ষত হচ্ছে।

৩.
বিষাদ বাড়তে থাকে। বড় বড় সব দীর্ঘশ্বাস জমা হয় বুকে। আমি গল্প ভাবতে পছন্দ করি। আমি তাই ভাবতে চাই- একটি মেয়ে সিএনজিতে করে বাড়ি ফিরছে মধ্যরাতে। সামনে পুলিশের চেকপোস্ট। পুলিশ সিএনজি থামিয়ে প্রশ্ন করলো- ম্যাডাম এতো রাতে? কোনো সমস্যা? কোনো বিপদে পড়েছেন কি? হেল্প লাগবে? আমাদের টহল টিম আপনাকে সামনের চেক পোস্ট পর্যন্ত পৌঁছে দিবে। পরবর্তী চেক পোস্টের টিম আপনাকে গন্তব্যে পৌঁছে দিবে। নো টেনশন...।

এমন সব সুন্দর গল্প ভাবতে ভালো লাগে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন, অসংখ্য ক্ষতময় সেই বাস্তবতা। যেখানে আমরা সব বিষাদগ্রস্থ বিপন্ন জীবনের ফেরিওয়ালা হয়ে উঠছি। আমাদের ভেতরে এক থমথমে মেঘলা আকাশ। আমাদের স্বপ্নরা বিষাদে রুপ নিচ্ছে ।

‘এই সময়ের বুকে ক্ষত জমে আছে 
শহরের বুকে ক্ষত জমে আছে
কিছু দেখি কিছু দেখতে পাই না...।’

লেখক : সাংবাদিক ও নির্মাতা।

বিজ্ঞাপন

সংশ্লিষ্ট বিষয়

পুলিশ হত্যা

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.1679 seconds.