• ২০ অক্টোবর ২০১৮ ১৮:৩১:৩৩
  • ২০ অক্টোবর ২০১৮ ১৮:৩১:৩৩
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

জামাল খাশোগি কার লোক ছিলেন?

জামাল খাশোগি। ছবি : সংগৃহিত


আলতাফ পারভেজ :


এক.
খাশোগিকে কে খুন করেছে সেটা অনুমান করা যাচ্ছে ভালোভাবেই। সুতরাং এখন মনযোগ দেয়া দরকার কেন তিনি খুন হলেন-- সেটা জানতে। কিংবা তার চেয়েও জরুরি এটা জানা, মধ্যপ্রাচ্যে কর্তৃত্ববাদী শাসনের বিরুদ্ধে প্রকৃতই কোন জিহাদি বীর ছিলেন কি না খাসোগি?

দুই.
বলা হচ্ছে, খাশোগি সৌদ রাজ পরিবারের কট্টর সমালোচক ছিলেন। প্রশ্ন হলো, সেটা কবে থেকে? বলা হচ্ছে, খাশোগি ওয়াশিংটন পোস্টে মধ্যপ্রাচ্যে রাজনৈতিক সংস্কারের লক্ষ্যে লিখতেন। সেক্ষেত্রেও জানা দরকার, ইংরেজি সাংবাদিকতার বাইরে তাঁর লেখালেখির ধরন কী ছিল? সেখানে কতটা সংস্কারবাদী ছিলেন তিনি?

তিন.
প্রথমে নীচের ছবিটি দেখা যাক। ছবির মাঝখানে রকেট লাঞ্চার হাতে যিনি দাঁড়িয়ে তিনিই জামাল খাশোগি। ছবিটি আফগানিস্তানের। খাশোগি তখন আফগান যুদ্ধে ওসামা বিন লাদেনের অন্যতম ঘনিষ্টজন। হাইস্কুল থেকে তাঁরা বন্ধু।

সরাসরি যুদ্ধ না করলেও খাশোগি আফগানিস্তান থেকে আরব নিউজে নিয়মিত লিখতেন। সময়টা ১৯৮৮ সাল। আল-কায়দার ওয়ার জোন থেকে লিখতে সমর্থ ছিলেন খাশোগি। ইতিহাসের এই সময়টিতে সৌদদের অর্থে সিআইএ আফগানিস্তানে সোভিয়েত সমর্থিত সরকারের বিরুদ্ধে গেরিলাযুদ্ধ ছড়িয়ে দিতে সচেষ্ট। খাশোগি এই প্রক্রিয়ার অন্যতম সৈনিক ছিলেন। এটা সম্ভব হয়েছিল সৌদবংশের সঙ্গে তাঁর অতি অন্তরঙ্গ এবং বিশ্বাসী সম্পর্কের কারণে।

চার.
জামাল খাশোগির দাদা (মোহাম্মদ খাশোগি) ছিলেন গ্রান্ড সৌদ আবদুল আজিজের ব্যক্তিগত চিকিৎসক। এই সূত্রেই সৌদদের উচ্চমহলে খাশোগির বিচরণ। মোহাম্মদ খাশোগির জন্ম ছিল তার্কিতে। সেই সূত্রে খাশোগি পরিবারের সঙ্গে তার্কির একটা সম্পর্ক রয়েছে। জামাল খাশোগির চাচা ছিলেন কুখ্যাত অস্ত্র ব্যবসায়ী আদনান খাশোগি। প্রেসিডেন্ট রিগ্যানের আমলে ইরান-কন্ট্রা কেলেংকারীতে যিনি ছিলেন মুখ্যচরিত্র।

সিআইএ আদনান খাশোগিকে দিয়ে ইরানের কাছে অস্ত্র বিক্রি করে সেই অর্থ ব্যবহার করতো নিকারাগুয়ার বিপ্লবী সরকারকে অপসারণের লক্ষ্যে ‘কন্ট্রা’ গেরিলাদের সংঘবদ্ধ করার কাজে। খাশোগি পরিবার এভাবে বহু আগে থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের এস্টাবলিশমেন্টেরও ঘনিষ্ট। ফলে মুক্ত গণমাধ্যম নয়-- বরং যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদদের পক্ষে বিভিন্ন আন্তঃরাষ্ট্রীয় কর্মকান্ডেই তাদের সম্পৃক্তি।

পাঁচ.
সৌদদের মাঝে খাশোগি বিশেষ ঘনিষ্ট ছিলেন প্রিন্স তুর্কি আল-ফয়সালের সঙ্গে। একজন সাংবাদিক হিসেবে এটাও স্বাভাবিক। কারণ প্রিন্স তুর্কি প্রায় ২৩ বছর সৌদদের ফরেন ইনটেলিজেন্সের চিফ ছিলেন। এই প্রিন্স তার্কির অভিভাবকত্বেই মূলত আফগান মুজাহিদিনদের সংঘবদ্ধ করা হয়।

প্রিন্স তুর্কির ভাই খালিদ আল-ফয়সালের আল-ওয়াতানে কাজ করতেন খাশোগি। ২০০৩ ও ২০০৭-- দু’দফা তিনি আল-ওয়াতানে উচ্চপদে ছিলেন। প্রিন্স তুর্কি ওয়াশিংটনে সৌদি রাষ্ট্রদূত হলে খাশোগিও তাঁর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান। সেই সূত্রেই শুরু যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদ মাধ্যম জগতের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক। সেই সূত্রেই তিনি ওয়াশিংটন পোস্টের লেখক।

ছয়.
খাশোগির সাংবাদিকতার কৌতূহল উদ্দীপক দিক হলো আরবিতে তিনি প্যালেস্টাইনীদের সংগ্রামের একজন আপোষহীন সমর্থক হলেও ইংরেজি জগতে কখনোই তিনি প্যালেস্টাইন ইস্যুতে কিছু লিখেননি। আবার ইউরোপ আমেরিকায় লিখতে যেয়ে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক সংস্কার চাইলেও আরবিতে তিনি সবসময়ই স্থানীয় শাসকদের পক্ষে ছিলেন।

প্রিন্স তুর্কির প্রয়োজনে মার্কিন মুল্লুকের সাংবাদিকদের সঙ্গে মিশতে যেয়ে তিনি সৌদদের সঙ্গে তাদের যোগাযোগের অন্যতম সূত্র হয়ে উঠেছিলেন। সেই ধারাবাহিকতা থেকেই এক পর্যায়ে বহু আলোচিত প্রিন্স বিন-তালালের সঙ্গে খাশোগির ঘনিষ্টতা বাড়ে। তালালের অর্থে তিনি ২০১৫ সালে ‘আল-আরব’ নামে একটি নিউজি চ্যানেলও করেছিলেন মানামা থেকে।

ঠিক এই সময়ে সৌদি শাসক বংশে ক্ষমতার যে রেষারেষি শুরু হয় তাতে প্রিন্স তুর্কি ও প্রিন্স তালালদের কোনঠাসা করে এগিয়ে যান ক্রাউন প্রিন্স সালমান। খাশোগির ভাগ্য বিপর্যয়ের শুরু বস্তুত এই সময় থেকে।

সাত.
এটা এখন দুনিয়াব্যাপী জানা যে, ক্রাউন প্রিন্স সালমান ক্ষমতায় এসে সৌদবংশের সিদ্ধান্তগ্রহণ প্রক্রিয়া আমূল বদলে দিয়েছেন। পূর্বে প্রভাবশালী প্রিন্সদের যৌথভাবে বসে সিদ্ধান্ত নেয়ার যে রেওয়াজ ছিল সালমান তা বন্ধ করে সকল সিদ্ধান্ত নেয়ার এখতিয়ার নিজের হাতে নিয়ে নেন। প্রিন্স তুর্কি ও তালাল এসময় ক্রাউন প্রিন্সের শত্রু হিসেবে চিহ্নিত হন। তালালকে আটক করা হয়। সিটি গ্রুপ, অ্যাপেল, টুইটারসহ বহু কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের বড় এক বিনিয়োগকারী হওয়া সত্ত্বেও তালালকে রক্ষা করা যায়নি ক্রাউন প্রিন্সের রোষানল থেকে। 

খাশোগি ঠিক এই সময়ই যুক্তরাষ্ট্র পাড়ি জমান। এই প্রথম তিনি সৌদ বংশের প্রভাব বলয় থেকে ছিটকে পড়েন। কিন্তু ওয়াশিংটনের মিডিয়া জগতের সঙ্গে খাশোগির ঘনিষ্টতায় সালমান শিবির ছিল উদ্বিগ্ন।  খাশোগির মাধ্যমে সৌদদের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতাবিবাদের পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাচ্ছিল প্রভাবশালী মিডিয়াগুলো। উপরন্তু নিউয়র্কে এক হোটেলে সৌদদের এমুহূর্তের অন্যতম প্রতিপক্ষ কাতারের আমিরের সঙ্গে খাশোগির বৈঠকের বিষয়টিও রিয়াদকে ক্ষুব্ধ করেছিল। সৌদবংশ সাধারণত নিজ পরিমন্ডলের কারো পক্ষ পরিবর্তন পছন্দ করে না। 

খাশোগির সঙ্গে ক্রাউন প্রিন্স সালমানের দূরত্বের জায়গাটুকু ঠিক এটুকুই। এর বেশি কিছু নয়। যেমনটি বলতে চাইছে ইউরোপ-আমেরিকার মানবাধিকার সংগঠনগুলো।
এটাও একটা অন্তত ডাহা মিথ্যা কথা যে, জামাল খাশোগি রাজতন্ত্রের বিরোধী বা কট্টর সমালোচক ছিলেন। বরং তাঁর পুরো জীবনই ছিল ক্ষমতাধর সৌদী প্রিন্সদের সম্পৃক্ততায় ভরা। তাদের একজন সহযোগী সাংবাদিক মাত্র ছিলেন তিনি। 

আট.
যেহেতু খাশোগি বরাবরই মুসলিম ব্রাদারহুডের একজন সহানুভূতিশীল হিসেবে পরিচিত সেকারণে তার্কিতে তিনি বিশেষ নিরাপদ ছিলেন। তার্কির শাসকদের সঙ্গেও তাঁর সখ্যতা সেই সূত্রেই। ঠিক একই কারণেই খাশোগির অন্তর্ধানের তদন্তে তার্কির শাসকদের চলতি আন্তরিক মনযোগ। আবার যেহেতু খাশোগি ওয়াশিংটন পোস্ট ও গার্ডিয়ানে লিখতেন-- ফলে তাঁকে মেরে ফেলাকে মিডিয়া মোগলরা দেখছে সৌদদের একটু বাড়াবাড়ি রকমের বেয়াদবি হিসেবে। 

তৃতীয় দুনিয়ায় বসে এসবকে সংবাদপত্র বা লেখালেখির স্বাধীনতার জন্য তার্কি বা ওয়াশিংটনের আগ্রহের সঙ্গে মিশিয়ে ফেললে ভবিষ্যতে হিসাব মেলানো কঠিন হয়ে পড়বে।

লেখক ও গবেষক

বিজ্ঞাপন

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.1624 seconds.