• ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮ ২২:১৭:৫০
  • ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮ ১৮:৫২:৫৩
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

প্রাণ বৈচিত্রময় জাবির ‘বন উজার’ করে ভবন হবে

এ গাছগুলোই কেটে ফেলার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। ছবি : বাংলা

মাইদুল মিঠুন, জাবি প্রতিনিধি :

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাবি) নতুন ভবন নির্মাণকে কেন্দ্র করে বিলুপ্ত প্রায় প্রজাতির কয়েক’শ গাছ কাটার পাঁয়তারা চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। যে বন উজার করে এই ভবন নির্মাণ হবে সেখানে রয়েছে বেশ কিছু পুরোনো শাল বৃক্ষ। যা এই অঞ্চলে এক সময় শাল বনের নিদর্শন হিসেবে টিকে আছে।

প্রকৃতির বৈচিত্রপূর্ণ এই ক্যাম্পাসটিতে এভাবে গাছ কাটা হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাকৃতিক পরিবেশ ধ্বংস ও জীববৈচিত্র্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা বলছেন, গাছ না কেটেও ভবন নির্মাণ করা যায়। তারা এই সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে। অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের গাছ রোপণ ও সংরক্ষণ কমিটি বলছে, যে গাছ কাটা হবে সেগুলো অপ্রয়োজনীয় ও পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর।

রেজিস্ট্রার কার্যালয় সূত্র জানায়, চলতি বছরের ৪ ও ৫ জুন বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩০৩তম সিন্ডিকেট সভায় ব্যবসায় প্রশাসন ইন্সটিটিউটের নতুন ভবন নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এ ভবন নির্মাণের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়াজেদ মিয়া বিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্রের পেছন থেকে বিজ্ঞান কারখানা পর্যন্ত স্থানটিকে নির্বাচন করে। এই নির্বাচিত স্থানে প্রায় ৫০০টি বিলুপ্ত প্রায় প্রজাতির শাল ও অল্প সংখ্যক একাশিয়া গাছ রয়েছে। এখানে ভবন নির্মাণ করতে গেলে যেগুলো কাটতে হবে। আর এই সিদ্ধান্তকে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বার্থ পন্থী হিসেবে মন্তব্য করেছেন শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের যুক্তি ও পাল্টাপাল্টি বক্তব্য:

যে গাছ কেটে ভবন নির্মাণ করা হবে সে গাছগুলো ক্ষতিকর ও অপ্রয়োজনীয় হিসেবে মন্তব্য করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের গাছ রোপণ ও সংরক্ষণ কমিটির সভাপতি এবং জাবি কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক শেখ মনজুরুল হক। অন্যদিকে গাছ কাটাতে ক্ষতি হবে স্বীকার করে ভবনের জন্য স্থান নির্বাচনের ক্ষেত্রে আইবিএ অনুষদকে দায়ী করলেন এস্টেট শাখার কর্মকর্তা ও উদ্যানতত্ত্ববিদ নুরুল আমিন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের গাছ রোপণ ও সংরক্ষণ কমিটির সভাপতি অধ্যাপক শেখ মনজুরুল হক বলেন, ‘একাশিয়া গাছ পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। এছাড়া শাল গাছ একটি কাষ্ঠল উদ্ভিদ। এর ফল পশু-পাখির উপকারে আসে না। ভবন নির্মাণের উপযুক্ত জায়গা না থাকায় সেগুলো কেটে ফেলাই ভাল।’

এস্টেট শাখার কর্মকর্তা ও উদ্যানতত্ত্ববিদ নুরুল আমিন বলেন, ‘শালগাছ কেটে ভবন নির্মাণ করা হলে তা পরিবেশের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর হবে। বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে আমরা টারজান পয়েন্ট সংলগ্ন ফাঁকা জায়গায় আইবিএ ভবন নির্মাণের পরামর্শ দিয়েছি। কিন্তু আইবিএ অনুষদ তা মানছে না।’

তবে আইবিএ অনুষদের পরিচালক শেখ রাফিউল হক বিষয়টি অস্বীকার করে বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আমাদের ওই জায়গায় ভবন নির্মাণের অনুমতি দিয়েছে। প্রশাসন যেখানে অনুমোদন দিবে সেখানেই ভবন নির্মাণ করব।’

পরিবেশবিদ ও পরিবেশ সচেতন শিক্ষকরা যা বলছেন:

প্রশাসনের পক্ষ থেকে বৃক্ষ নিধনের এমন সিদ্ধান্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য আত্মঘাতী উল্লেখ করে পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক ড. আমির হোসেন ভূঁইয়া বাংলা’কে বলেন, ‘শাল গাছ আমাদের ঐতিহ্যের অংশ। তাছাড়া পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় এ গাছ ব্যাপক ভূমিকা রাখতে সক্ষম। একসাথে এতগুলো ঐতিহ্যবাহী শাল গাছ নিধন করা হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক পরিবেশ হুমকির মুখে পড়বে।’

তিনি বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে অনেক পরিত্যক্ত জায়গা রয়েছে। টারজান পয়েন্ট সংলগ্ন এলাকা, শহীদ রফিক জব্বার হল সংলগ্ন এলাকা, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশমাইল এলাকায় বিস্তীর্ণ পরিত্যক্ত মাঠসহ অনেক জায়গা রয়েছে। এসব জায়গায় ভবন নির্মিত হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ হুমকির মুখে পড়বে না। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সেটি না করে কোন বিভাগ বা ইন্সটিটিউট দাবি করলেই ইচ্ছেমত জায়গা বরাদ্দ দিতে পারে না।’

একাশিয়া গাছ পরিবেশের জন্য কতটা ক্ষতিকর জানতে চাইলে অধ্যাপক আমির হোসেন ভূঁইয়া বলেন, ‘একাশিয়া গাছ আমাদের উপমহাদেশের বৃক্ষ না হওয়ায় কিছু সমস্য হয় ঠিকই। তবে তা এতটাও ক্ষতিকর নয় যে নিধন করে ফেলতে হবে। আর শাল গাছের আমাদের ঐতিহ্যের অংশ। এ নিয়ে নতুন করে বলার কিছু নেই।’

দীর্ঘদিন ধরে দেশের পরিবেশ আন্দোলনের সাথে যুক্ত ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, ‘জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় প্রাণ প্রকৃতি বৈচিত্রপূর্ণ পরিবেশের জন্য পরিচিত। কিন্তু এখানকার পরিবেশ নষ্ট করে এই প্রাকৃতিক বৈচিত্র নষ্ট করে কোন উদ্যোগ নেয়াটা ঠিক হবে না। গাছ না কেটেও ভবন করা যায়। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন বহু জায়গা রয়েছে যেখানে ভবন নির্মাণ করা যায়। এ জন্য গাছ কাটার প্রয়োজন নেই। গাছ কাটার ফলে যে শ্রেণিটা সুবিধা ভোগ করবে এমন সুবিধা ভোগীদের দ্বারা প্রশাসন পরিচালিত হবে না বলে আমি আশা রাখি।’

সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের দাবি শিক্ষার্থীদের :

গাছ কাটার সিদ্ধান্তকে ক্যাম্পাস সবুজ শূণ্য করার চক্রান্ত বলে মন্তব্য করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রগতিশীল ছাত্রসংগঠনের প্রতিনিধিরা। তারা এই সিদ্ধান্ত বাতিলের দাবি জানিয়েছেন।

ছাত্র ইউনিয়ন জাবি শাখার সহ-সভাপতি অলিউর রহমান সান বাংলা’কে বলেন, ‘মাজহারুল ইসলাম প্রণীত মূল নকশা লঙ্ঘন করে বারবার অবকাঠামোগত উন্নয়নের নামে যত্রতত্র ভবন নির্মাণের ফলে ইতোমধ্যে প্রাকৃতিক পরিবেশ ক্রমশ সংকুচিত হচ্ছে। যা একইসাথে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থান ব্যবস্থাপনায় প্রশাসনের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনাহীনতার প্রমাণ দেয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের এই বৈচিত্রপূর্ণ প্রাকৃতিক পরিবেশ বিনষ্ট করে ভবন নির্মাণ করতে গাছ কাটার এই সিদ্ধান্ত প্রত্যার করার দাবি জানাচ্ছি। অন্যথায় আমরা প্রতিবাদ করবো।’

সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের জাবি শাখার সাধারন সম্পাদক মাহাথির মুহম্মদ বাংলা’কে বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণ প্রকৃতি ধ্বংস করতেই এই যে আয়োজন। এর পেছনে অসৎ বাণিজ্য আছে। অতীতেও নানাভাবে হয়েছে অপ্রয়োজনে গাছ কাটা হয়েছে। যার কোনো দরকার ছিলো না। সম্প্রতি শোনা যাচ্ছে নতুন ভবনের নাম করে ৫শ গাছ কাটা হবে। আমরা এই সিদ্ধান্ত মানি না। আমরা এই সিদ্ধান্ত অবিলম্বে প্রত্যাহারির দাবি জানাচ্ছি।’

তিনি আরো বলেন, ‘এটা পরিবেশ আইনের সাথেও সাংঘর্ষিক। শুনেছি তারা নাকি মাস্টার প্লান করেছে। কিন্তু মাস্টার প্লানে কি আছে আমরা জানিনা। এই মাস্টার প্লান চূড়ান্তভাবে পাশ হওয়ার আগে ছাত্রদের দেখাতে হবে। মাস্টার প্লানের নামে ক্যাম্পাসকে সবুজ শূণ্য করার যে পায়তারা করছে তা করতে দেয়া হবে না। গাছ কাটার সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার না করলে আমরা প্রতিবাদ জানাবো।’

জঙ্গল পুড়িয়ে গাছ লাগাচ্ছে জাবি প্রশাসন :

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাবি) বিস্তীর্ণ অঞ্চল বন-জঙ্গল কেটে ও পুড়িয়ে গাছ লাগানোর উদ্যোগ নিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। গত সোমবার (১৭ সেপ্টেম্বর) সকালে এস্টেট শাখার কর্মচারিরা বিশ্ববিদ্যালয়ের বোটানিক্যাল গার্ডেন সংলগ্ন স্থানে আগুন লাগিয়ে কেটে ফেলা জঙ্গল পুড়িয়ে ফেলেন। সম্প্রতি ওই স্থানের জঙ্গল কেটে ফেলা হয়।

আগামী ২৫ সেপ্টেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. ফারজানা ইসলাম বৃক্ষরোপন কর্মসূচির উদ্বোধন করবেন। ওই স্থানে এক থেকে দেড় হাজার গজারি গাছ লাগানো হবে বলে জানা গেছে।

এর আগে এই স্থানে ভবন নির্মাণের উদ্দেশ্যে কয়েক শত গাছ কেটে পরিষ্কার করে ইনস্টিটিউট অব বিজনেস এ্যাডমিনিস্ট্রেশন (আইবিএ-জেইউ)। পরে সে উদ্যোগ প্রত্যাহার করা হয়। এরপর বৃক্ষরোপনের উদ্দেশ্যে একই স্থানে প্রাকৃতিকভাবে গড়ে ওঠা জঙ্গল পরিষ্কার করা হলো।

এদিকে এভাবে বন-জঙ্গল পরিষ্কার করায় জীববৈচিত্রের উপর প্রভাব পড়বে বলে অভিযোগ করেছেন প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও প্রজাপতি গবেষক মো. মনোয়ার হোসেন। এমন কর্মকাণ্ডে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণীকুল-কীটপতঙ্গ ক্ষতিগ্রস্থ হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

অধ্যাপক মো. মনোয়ার হোসেন বলেন, ‘জঙ্গল কেটে বা পুড়িয়ে গাছ লাগানোর তো কোন যৌক্তিকতা নেই। জঙ্গলে অনেক প্রজাপতি, কীটপতঙ্গ, লতাগুল্ম থাকে। কেটে বা পুড়িয়ে ফেলার কারণে এগুলো আর থাকবে না। এমনিতে বিশ্ববিদ্যালয়ে জঙ্গল থাকছে না। জঙ্গল উজাড় না করে যে স্থানে গাছ লাগানো হবে শুধু সে স্থানটি পরিস্কার করা যেত।’

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় এস্টেটের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও মুখ্য উদ্যানতত্ত্ববিদ মো. নুরুল আমিন বলেন, ‘প্রশাসনের উদ্যোগে আমরা জঙ্গল কেটে পুড়িয়েছি। আমরা ওখানে বৃক্ষরোপন করবো। ওই জায়গায় এক থেকে দেড় হাজার গর্জন গাছ লাগানো হবে। উপাচার্য ম্যাডাম ২৫ সেপ্টেম্বর বৃক্ষরোপন কর্মসূচির উদ্বোধন করবেন।’

বিজ্ঞাপন

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.1631 seconds.