• ১০ সেপ্টেম্বর ২০১৮ ১৭:৪৭:৩২
  • ১০ সেপ্টেম্বর ২০১৮ ১৭:৪৭:৩২
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

‘বারোয়ারি উপলব্ধিতে ঠাসা মোহান্ধ জীবনের গল্প লিখি’

আবদুল্লাহ আল ইমরান। ছবি: বাংলা

চঞ্চল শাহরিয়ার :

আবদুল্লাহ আল ইমরানের জন্ম খুলনায়। শৈশব, কৈশোরের মোহগ্রস্ততা থেকে লেখালেখি করছেন এক যুগ। মফস্বলের সবুজ অনুভূতি বুকে নিয়ে খুলনা ছেড়ে ঢাকা এসেছিলেন।

ঝলমলে নাগরিক প্রলোভনেও সেই গেরুয়া অনুভূতি মুছে যায়নি। যায়নি বলেই ইমরানের লেখালেখি-জুড়ে থাকে প্রান্তিক মানুষের নিয়ত সংগ্রাম, উঠে আসে বারোয়ারি উপলব্ধিতে ঠাসা মোহান্ধ জীবনের গল্প। প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা পাঁচ। তিনটি উপন্যাস, একটি ছোট গল্প এবং একটি রাজনৈতিক সাক্ষাৎকার।

খুলনা সেন্ট যোসেফস স্কুল থেকে এসএসসি, খুলনা পাবলিক কলেজ থেকে এইচএসসি এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষে সাংবাদিকতা পেশায় প্রবেশ। বর্তমানে অনুসন্ধানী সাংবাদিক হিসেবে কাজ করছেন চ্যানেল টোয়েন্টিফোরে। এর আগে ছিলেন দৈনিক সকালের খবর ও কালের কন্ঠে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আইটি সোসাইটির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি আবদুল্লাহ আল ইমরান জিতেছেন ২১তম জাতীয় টেলিভিশন বিতর্ক প্রতিযোগিতার (সংসদীয় ধারা) চূড়ান্ত পর্বের শ্রেষ্ঠ বক্তার পুরস্কারও।

নৈমিত্তিক নাগরিক ভোগান্তিতে সচেতনতা তৈরিতে ‘ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানো’র স্বীকৃতি হিসেবে পেয়েছেন ‘যমুনা টেলিভিশন দুরন্ত বাংলাদেশ’ সম্মাননা। এছাড়াও নারীদের সাইবার নিরাপত্তা সচতেনতা বৃদ্ধি ও নানাবিধ হয়রানি বন্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার কাজ করছেন দীর্ঘদিন।

সম্প্রতি রাজধানীর চাঁদনি চক মার্কেট এলাকায় ইডেন ছাত্রীদের এবং মিরপুরে লালামাটিয়া মহিলা কলেজের এক শিক্ষার্থীর শ্লীলতাহানির ঘটনায় অপরাধিদের গ্রেপ্তারে ভূমিকা রাখায় এবং এসব ক্ষেত্রে নারীদের নিয়মতান্ত্রিক প্রতিবাদের পথ বাতলে দিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তুমুল আলোচিত হয়েছেন ইমরান।

মোহান্ধ জীবনের গল্প

নিজের ফেসবুক পাতায় পরিচিতিতে আবদুল্লাহ আল ইমরান লিখে রেখেছেন, ‘বারোয়ারি উপলব্ধিতে ঠাসা মোহান্ধ জীবনের গল্প লিখি।’ ইমরানের তিনটি উপন্যাস পড়লে সেই মোহান্ধ জীবনের খোঁজ পাওয়া যায়। 
ইমরানের কাছে পৃথিবীটা বৈচিত্রময় গল্পের মায়াবী এক জাদুঘর। স্মৃতির পুরাকীর্তি নিয়ে যাতে আমাদের বিচরণ।

এমনই দুটি ভিন্ন মানুষের অদ্ভুত এক কাছে আসার গল্প নিয়েই ইমরানের প্রথম উপন্যাস ‘এইসব ভালোবাসা মিছে নয়’। ২০১৫ সালে প্রকাশিত এই উপন্যাসের প্রচ্ছদ এঁকেছেন দেওয়ান আতিকুর রহমান, প্রকাশ করেছে ভাষাচিত্র।

ইমরানের দ্বিতীয় উপন্যাস ‘কালচক্র’। প্রকাশিত হয়েছে ২০১৬ সালে। খুলনার পাটকল শ্রমিকদের পটভূমিতে রচিত এ উপন্যাস জীবনের অজস্র জটিল হিসাব-নিকাশের গল্প। গল্প অসংখ্য হারিয়ে ফেলা অনুভূতিরও। কাহিনী যত এগোবে, ততো উন্মোচিত হবে মৃত এক শিল্প অঞ্চলের বহুমাত্রিক মানুষের বৈচিত্রময় জীবনবোধ। ‘কালচক্র’ পাটকলনির্ভর নদীঘেরা জনপদের ওপর রচিত এমন এক মানবিক আখ্যান, যেখানে জীবনের ভাঙা-গড়া, আনন্দ-বেদনার গল্পেরা চক্রাকারে বয়ে চলে অবিরাম।

কালচক্র উপন্যাসটি দেশে-বিদেশে সমার্দিত হয়েছে। বরেণ্য কথা সাহিত্যিক সেলিনা হোসেন এ উপন্যাস নিয়ে বলেছেন, ‘বিষয়কে ধরা, ধরে উপস্থাপন করা, তার জন্য ভাষা ও চরিত্র নির্মাণ এবং এ সবকিছুর মধ্য দিয়ে একটি শিল্পিত উপন্যাস পাঠককে উপহার দেয়া একজন লেখকের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। কালচক্র উপন্যাসে এ দায়িত্ব পালনে দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন আবদুল্লাহ আল ইমরান। কালচক্র যদি একটি সময়কে ধরে চক্রের আবর্তন হয় তবে এ উপন্যাসে লেখক খুব ভালো ভাবে তা ধরতে পেরেছেন। আর এই ধরার ভেতর দিয়ে আমাদের সাহিত্যে একটি নতুন ও গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন ঘটেছে।’

২০১৭ সালে প্রকাশিত হয় তৃতীয় উপন্যাস ‘দিবানিশি’। মারফতি নূরে উদ্ভাসিত অলক্ষে বহমান এক জনপদের কাহিনী এ উপন্যাসে বিবৃত হয়েছে সহজিয়া জীবন দর্শনে। আছে শেকড়ে ফিরতে চাওয়া এবং জলের গর্ভে সব হারানো দুই নারীর অদম্য লড়াই। এ গল্প মনসা দেবীর অভিশাপে বংশ বাতি নিভতে বসা চমকপ্রদ এক লোকজ মিথেরও। কালচক্র ও দিবানিশির প্রচ্ছদ করেছেন লেখক পত্নী সানজিদা পারভীন তিন্নি। প্রকাশ করেছে অন্বেষা।

নিজের লেখালেখি নিয়ে আবদুল্লাহ আল ইমরান বলেন, ‘শ্রমিক এলাকার নদীপাড়ে বেড়ে উঠেছি বলে জীবনের বাঁকে বাঁকে নানা অভিজ্ঞতা হয়েছে আমার। সুযোগ হয়েছে প্রান্তিক মানুষের সঙ্গে মেশারও। যাদের জীবনজুড়ে অসংখ্য ঘটনা, অজস্র গল্প। এই গল্পগুলো আমাকে ভাবায়, অভিভূত করে। লিখতে বসলে সেসব মনে পড়ে। মনে পড়ে ফেলে আসা মুখ, মানুষের মানচিত্র। এসবই লিখি আমি, লিখি মানুষের ইতিহাস।’

ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানো সাংবাদিকতা করছেন সাত বছর। কঠিন সব দায়িত্ব, নানা রকম ব্যস্ততা। সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশ্ন ফাঁস ও ভর্তি জালিয়াত চক্র উদঘাটন করেছেন। বের করেছেন বিসিএস প্রশ্নফাঁস চক্রকেও। এসব অনুসন্ধানী রিপোর্ট দেশজুড়ে আলোচিত হয়েছে। এতো কিছুর মধ্যেও আবদুল্লাহ আল ইমরানের স্বেচ্ছাসেবী কর্মকাণ্ড মানুষের নজর কেড়েছে। বিশেষ করে নৈমত্তিক নাগরিক ভোগান্তি লাঘবে নেওয়া বেশ কিছু উদ্যোগ উদাহরণে পরিণত হয়েছে। নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে ও বিদ্যমান আইন ব্যবহার করে কিভাবে হয়রানির প্রতিবাদ করা যায় তা নিয়ে ইমরান কাজ করছেন গত আড়াই বছর ধরে।

সম্প্রতি এমনই একটি ঘটনা সবার নজর করেছে। রাজধানীর চাঁদনি চক মার্কেটে কেনাকাটা করতে গিয়ে দোকান কর্মচারিদের অশোভন আচরণের শিকার হন ইডেন মহিলা কলেজের কয়েকজন ছাত্রী। এ ঘটনায় হয়রানি শিকার হওয়া এক মেয়ের ফেসবুক স্টাটাস দেখে সহযোগিতার হাত বাড়ান ইমরান। এরপর নিয়মার্কেট থানা পুলিশের সহযোগিতায় আটক করা হয় চার কর্মচারিকে। পাঠানো হয় কারাগারে। থানায় মামলাও করেন ভূক্তভোগি ছাত্রীরা।

এ ঘটনার আদ্যোপান্ত লিখে নিজের ফেসবুক ওয়ালে একটি স্টাটাস দেন ইমরান। সেখানে জানান, এমন পরিস্থিতির শিকার হলে একজন নারী বা পুরুষকে আসলে কি করতে হবে। সঙ্গে দুই মিনিটের একটি ভিডিও জুড়ে দেন। ওই ভিডিও পোস্টটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়ে যায়। প্রায় ৬ লাখ মানুষ ভিডিওটি দেখেছেন এবং অন্তত ৩০ হাজার মানুষ সেখানে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন।

বছর দেড়েক আগে গাউছিয়া মার্কেটে এলাকায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রীর সঙ্গেও এমন ঘটনা ঘটে। মা ও মেয়েকে হয়রারির ওই ঘটনাতেও নিয়মতান্ত্রিক প্রতিবাদের চমৎকার উদাহরণ তৈরি করেছিলেন ইমরান। সে ঘটনাটিও ভাইরাল হয়। প্রায় সাড়ে ৭ লাখ মানুষ তাতে প্রতিক্রিয়া জানান। সাহসী সেই ছাত্রী ও ইমরানের ভূমিকা নিয়ে বিবিসি গত ২৮ মার্চ ‘ঢাকার নিউমার্কেটে হয়রানির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো এক নারীর গল্প’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রচার করে।

এছাড়াও অনলাইন জগতে নারীর অবাধ বিচরণ নিশ্চিত করতে এবং সাইবার অপরাধ প্রতিরোধ করতে লেখালেখির মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরেই সচেতনতা তৈরি করেন ইমরান। সরকারের আইসিটি ডিভিশনের উদ্যোগে গত বছর সারা দেশের ৪০টি স্কুল ও কলেছে ১০ হাজার অল্প বয়সী মেয়েরা সাইবার অপরাধ বিষয়ক প্রশিক্ষণ পায়। আবদুল্লাহ আল ইমরান ছিলেন সেসব কর্মশালার বক্তা। এই কর্মশালাগুলো নিয়ে বিশ্বের প্রভাবশালী গণমাধ্যম দ্যা গার্ডিয়ান এবং ভয়েস অব আমেরিকা সংবাদ প্রচার করেছে।

ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানোর এই কর্মকাণ্ড সম্পর্কে ইমরান বলেন, ‘আজকে অন্যের বোন, স্ত্রী বা প্রেমিকা ভেবে আমি যদি এড়িয়ে যাই, কালকে হয়তো আমার স্বজনরাই এই অন্যায়গুলোর শিকার হবে। এমন ভাবনাই এই কাজগুলোতে এগিয়ে আসতে আমাকে প্ররোচিত করে। এছাড়াও সাংবাদিকতা পেশার কারনে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কর্তা ব্যক্তিদের অনেকের সঙ্গেই আমার ভালো যোগাযোগ আছে। ভূক্তভোগিদের ন্যায় বিচারে তাদের সহযোহিতা নেই। আমার সব সময় মনে হয়, যে যার অবস্থান থেকে সামান্য চেষ্টা করলেই দেশটা বদলে যাবে।’

যে জীবন দোয়েলের, ফড়িংয়ের

‘সাংবাদিকতা নাকি লেখালেখি, কোনটা বেশি পছন্দ?’ এমন প্রশ্নে আবদুল্লাহ আল ইমরানের সোজাসাপ্টা উত্তর, ‘চার আনার কেরানীর চাকরি করে ষোলো আনা লেখক হবার স্বপ্ন দেখি’। মানে বুকের ভেতর লেখক হবার পূর্ণ বাসনা লালন করেন তিনি।

এ প্রসঙ্গে তিনি আরো বলেন, ‘গার্বিয়েল গার্সিয়া মার্কেস আমার প্রিয় লেখক। তিনি এক সময় সাংবাদিক ছিলেন। তিনি বলতেন, আমি কিছুকাল সাংবাদিকতা করবো। তারপর সেই অভিজ্ঞতা নিয়ে সারাজীবন লিখব। আমার এখন সেই অভিজ্ঞতা যোগাড়ের কাল। বাকি জীবন শুধু লিখব আর পড়ব!’

নতুন কি লিখছেন- জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘মফস্বল ছেড়ে আসা তরুণের শহুরে সংগ্রাম ও আত্মখনন নিয়ে বৃহৎ ক্যানভাসের একটি উপন্যাস লিখছি। নাম এই আমি নই আমি। কালচক্র ও দিবানিশি - পরপর দুটো উপন্যাসে গ্রামীণ ও প্রান্তিক মানুষের কথা বলেছি। এবার একটু শহরে ফেরা। মধ্যবিত্ত জীবন ও টানাপড়েনের কিছু আনকোড়া গল্প বলব এখানে। আমার চতুর্দিকের চেনা মানুষেরাই এই উপন্যাসের চরিত্র।’

বিজ্ঞাপন

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.1614 seconds.